Monday, June 15, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেমাতাল প্রেমাতাল পর্ব ৪৯

প্রেমাতাল পর্ব ৪৯

0
2471

প্রেমাতাল
পর্ব ৪৯
মৌরি মরিয়ম

মা আর স্নিগ্ধ ফেরার পর ওরা সবাই মিলে মিটিং এ বসলো। তিতির বসলো একদম মুগ্ধর মার গা ঘেঁষে। মা ওকে জড়িয়ে ধরে বসেছিল। প্রথম কথা উঠলো কাকে কাকে দাওয়াত করা হবে। মুগ্ধ বলল,
-“এত দাওয়াত ফাওয়াতের কি দরকার মা? আপাতত নিজেরা নিজেরাই করি। কয়েক মাস পরে নাহয় অনুষ্ঠান করবো, তখন সবাইকে দাওয়াত দিও?”
মা বলল,
-“হ্যা সেটা তো করতেই হবে। কিন্তু এখনও তো তোর চাচা,ফুপী,মামা খালাদের না বলে পারবো না। অন্তত যারা ঢাকায় আছে।”
-“না মা, কাউকেই বলোনা। লাগলে সামনের মাসেই অনুষ্ঠান টা করবো। তবু আজ কাউকে বলো না।”
-“কিন্তু বিয়ের জন্য সাক্ষী লাগে।”
-“আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডদের ডেকে নিচ্ছি। রিলেটিভ কাউকে চাচ্ছি না। জানি এসেই পিঞ্চ করতে শুরু করবে, আজকের দিনে আমি মেজাজ খারাপ করতে চাই না।”
-“আচ্ছা ঠিকাছে কিন্তু বাবা বিয়ে পড়াতে কাজী আসবে, রেজিস্ট্রি করতে উকিল আসবে, তোর ফ্রেন্ডরা আসবে তাই রান্নাবান্নার ব্যবস্থা তো কিছু করতে হবে।”
-“হ্যা, সেটা তোমার যা মন চায় করো।”
-“বাসায় প্রায় সবই আছে।শুধু টুকটাক কিছু বাজার লাগবে।”
-“আচ্ছা আমি আর স্নিগ্ধ যাচ্ছি বাজারে, কি কি লাগবে লিস্ট করে দাও।”
-“দুজন গিয়ে কি করবি? তুই একা যা। স্নিগ্ধকে অন্য কাজে পাঠাবো।”
স্নিগ্ধ বলল,
-“কি কাজ আম্মু?”
মা বলল,
-“ওইযে ফুলের কাজ করে না? তুই ওদের আনতে যাবি। বাসরঘর সাজাবার জন্য।”
তিতির লজ্জা পেল, কিন্তু কিছু বলল না। ছোট ভাইবোনদের সামনে মুগ্ধও যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেল। বলল,
-“আরে না মা। বাসরঘর সাজানো লাগবে না।”
-“একটা থাপ্পড় মারবো যদি সবকিছুতে না না করিস। বিয়ে যেমনভাবেই হোক সেটা প্রত্যেকটা মানুষের জীবনের খুব স্পেশাল একটা দিন। সেটাকে স্পেশাল করার জন্য কিছু তো করতেই হবে। এই দিন জীবনে বারবার আসবে না।”
-“আচ্ছা আচ্ছা যা মন চায় করো।”
-“উকিল আর কাজীর সাথে কথা বলেছিস?”
-“হ্যা, ওনারা সন্ধ্যা ৬ টায় চলে আসবে।”
-“আচ্ছা।”
মা এবার তিতিরের দিকে ফিরে বলল,
-“মা চলো আমরা একটু শপিং এ যাই। তোমাকে বউ সাজাতে হবে না?”
তিতির বলল,
-“না না, আন্টি আমি এখন শপিং এ যাব না।”
-“এখনো আন্টি বলছো? মা বলো।”
তিতির হেসে বলল,
-“হ্যা মা। আমার মা।”
-“হ্যা, এবার বলো শপিং এ কেন যেতে যাচ্ছো না?”
-“এখন বিয়েটাই সবচেয়ে বেশি ইম্পরট্যান্ট মা। কি পড়লাম কি সাজলাম সেটা আমার কাছে ইম্পরট্যান্ট না। শুধু শুধু টাকা নষ্ট করে কি লাভ? সময়ওতো নষ্ট হবে। আপনার ছেলের কাছে আমার কয়েকটা শাড়ি আছে। সেখান থেকে একটা শাড়ি পড়ে নেব।”
মা তিতিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-“মাগো, তোমার শ্বশুর বেঁচে থাকলে দেখতে কত কি করতো। আমাদের তো পালিয়ে বিয়ে হয়েছিল। খুব সাদামাটাভাবে হয়েছিল আমাদের বিয়ে। তাই মুগ্ধর বিয়ে নিয়ে আমাদের দুজনের অনেক স্বপ্ন ছিল। ইচ্ছে করছে না এমন চুপচাপ বিয়ে দিতে। যাই হোক, তুমি যখন চাইছো না শপিং এ যেতে আমি জোর করবো না। কিন্তু বউ তো সাজতে হবে মা। পালিয়ে গিয়ে আমাদের বিয়ে হলেও তোমার শ্বশুর আমাকে বেনারসি শাড়ি দিয়েছিল বিয়েতে। খুব যত্ন করে রেখেছিলাম মুগ্ধর বউয়ের জন্য। তুমি কি আজ ওটা পড়বে? আর মুগ্ধর বউয়ের জন্য যে গয়নাগুলো বানিয়েছিলাম সেগুলো?”
-“অবশ্যই পড়বো মা। আমি শুধু শপিং এ যেতে চাচ্ছিলাম না। আপনার বিয়ের শাড়ি পড়বো এটাতো আমার সৌভাগ্য।”
-“আচ্ছা ঠিকাছে তাহলে।”
বিকাল ৪ টা। তিতির মুগ্ধর ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখছে। সাজগোজ কিছু নয়, শুধু একটা লাল বেনারসি। মুগ্ধর মায়ের বিয়ের বেনারসি। আর কানে ঝুমকা, গলায় নেকলেস, হাতে চুড়ি, কপালে টিকলি-টায়রা, নাকে নথ আর চোখে গাঢ় করে কাজল লাগিয়েছে ব্যাস। ঘরের বিছানায় লাল রঙের একটা বেডকভার দেয়া হয়েছে। বিছানার উপর বেলী আর গোলাপ ফুল দিয়ে বাসরঘর সাজানো হয়েছে, সিম্পলভাবে সাজানো হয়েছে কিন্তু তিতিরের মনে হলো এত সুন্দর বাসরঘর এর আগে কোনদিনও দেখেনি ও। আজ রাতে এই বিছানায়ই মুগ্ধর হাতে তিতিরের মরণ হবে, সুখের মরণ। ভাবতেই লজ্জা লাগলো তিতিরের।
হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ পেয়ে তিতির ফিরে তাকাতেই সাদা পাঞ্জাবী পড়া মুগ্ধকে দেখতে পেল। মুগ্ধ ওকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লো। ইশ কি সুন্দর দেখাচ্ছে তিতিরকে। মুগ্ধ তিতিরের দিকে এগিয়ে গেল। ও এমন হা করে তাকিয়ে আছে যে তিতিরের লজ্জাই করছে। মুগ্ধ কাছে এসে আঁচলটা তুলে ঘোমটা দিয়ে দিল তিতিরের মাথায়। তারপর মুখটা দুহাতে ধরে বলল,
-“পুরা বউ, তোমাকে যে কি সুন্দর লাগছে তিতির। বলে বোঝাতে পারবো না। অসাধারণ অসাধারণ। দাঁড়াও..”
একথা বলেই মুগ্ধ আলমারির দিকে গেল। আলমারি খুলে সিলেটের সেই লাল টিপের পাতাটা বের করলো। একটা টিপ উঠিয়ে তিতিরের কপালে পড়িয়ে দিল। তারপর বলল,
-“একদম পারফেক্ট বউ আমার।”
তিতির মুচকি হাসলো। বলল,
-“এই তুমি যে এমন সময় ঘরে এলে কেউ কিছু মনে করবে না?”
-“আরে না।”
-“আমি বাইরে যাই, কেউ যদি চলে আসে?”
মুগ্ধ তিতিরকে যেতে দিল না। বলল,
-“সবাই ব্যাস্ত, কেউ আসবে না। আর শোনো একটা কথা, আমি বোধহয় এ মাসে ছুটি পাব না। তাই হানিমুনের জন্য তোমাকে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।”
-“আমার কোন সমস্যা নেই।”
-“কাছে কোথাও গেলে যেতে পারতাম শুক্র, শনি বার।”
-“আমরা কোথায় যাব?”
-“কেন কাশ্মীর। সব ভুলে গেছো? আমরা প্ল্যান করেছিলাম না হানিমুনে কাশ্মীর যাব?”
-“ভুলিনি, মনে আছে। তবু যদি চেঞ্জ করো তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
-“না চেঞ্জ করবো কেন? যেরকম প্ল্যান হয়েছিল সেরকমই হবে। যেহেতু ১২ দিনের ট্রিপ তাই এখনই যেতে পারছি না। এতগুলো দিনের ছুটি হুট করে পাওয়া সম্ভব না।”
-“আচ্ছা আচ্ছা সমস্যা নেই তো।”
-“তোমার পাসপোর্ট আছে?”
-“না।”
-“ওহ, তাহলে এর মধ্যে পাসপোর্ট টাও করে ফেলবো।”
-“আচ্ছা।”
“আচ্ছা তিতির, এসবের কোন মানে হয় বলো?”
-“কোন সবের?”
-“এইযে…. বাসরঘর রেডি, বিছানা রেডি, বর রেডি, বউ রেডি। অথচ শুধু একটা বিয়ের জন্য বসে থাকতে হচ্ছে, এর কোন মানে হয়? চলো শুরু করে দিই?”
তিতির মুগ্ধর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
-“যাহ, যত্ত আজেবাজে কথা!”
-“এহ, আজেবাজে কথা আমি বলি? কাল রাতে কি বলেছিলে? আমি হাগ আর কিস ছাড়া কিছুই করতে পারি না! আর শুধু কি বলা! কি যে করেছো! আমার ইজ্জত যায় যায় অবস্থা, প্যান্ট ধরে টানাটানি! ছিঃ এই ছিল তোমার মনে?”
তিতির লজ্জায় লুটিয়ে পড়ছিল। নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল। মুগ্ধ বলল,
-“আজকে রাতে যে তোমার কি হবে তিতির! রেডি থেকো। কাল সারারাত আমাকে কষ্ট দিয়েছো। সব শোধ তুলবো আজ রাতে। খালি বিয়েটা হয়ে যেতে দাও। খুব ভালভাবে বোঝাবো মুগ্ধ কি পারে আর কি পারে না।”
তিতির মুগ্ধর বুকে কিল মারতেই মুগ্ধ তিতিরকে জড়িয়ে ধরলো। জড়িয়ে ধরলো মুগ্ধও। তিতির বলল,
-“তুমি আমাকে আর গান শোনাও না কেন? সেইযে সিলেট গিয়েছিলাম। দু’দিনে একটা গানও শোনাওনি।”
-“তখন কি গান গাওয়ার মত মন মানসিকতায় ছিলাম? তুমিও তো শুনতে চাওনি।”
-“তা অবশ্য ঠিক।”
-“দুজনেরই তো তখন বুকের ভেতর কষ্টের চাষবাস চলছিল।”
-“হুম।”
-“এখন শুনবে?”
-“হ্যা। কিন্তু কেউ শুনলে কি ভাববে?”
-“শুধুমাত্র বাংলা সিনেমাতেই সম্ভব অনেক দূর থেকেও গান শুনতে পাওয়া। এটা বাস্তব, তাই এখানে বসে গাইলে তা বাইরে যাবেও না। আর কেউ হুট করে আসবেও না।”
-“তাহলে শুনবো, গাও.. আমি কান পেতে আছি।”
-“এটা আমার অনেক অনেক প্রিয় একটা গান তিতির। কিন্তু তবুও এই গানটা আমি কখনো তোমাকে শোনাইনি। জমিয়ে রেখেছিলাম বিয়ের রাতে তোমাকে শোনাব বলে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি রাতে গান টান গাওয়ার যময় পাব না। তাই এখনই শোনাচ্ছি।”
তিতির লজ্জা পেয়ে সরে যাচ্ছিল,
-“উফফফ তুমি না!”
মুগ্ধ ওকে আবার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে দেয়ালে হেলান দিয়ে গাইতে শুরু করলো,
“বলছি তোমার কানে কানে আমার তুমি
বলছি আমার গানে গানে আমার তুমি
আজকে আমার প্রাণ পেয়েছে
অনেক নতুন ভাষা
অনেক দিনের স্বপ্ন যে
অনেক দিনের আশা
বলছি তোমার কানে কানে আমার তুমি
বলছি আমার গানে গানে আমার তুমি
তোমায় পেয়ে হয় যে মনে
আর জনমেও সাথে ছিলাম
আমরা দুজন মনের সুখে
অনেক জনম ঘুরে এলাম
চিরদিনই থাকবে একই
আমাদের এই ভালবাসা
বলছি তোমার কানে কানে আমার তুমি
বলছি আমার গানে গানে আমার তুমি
তুমি আমার অনেক আপন
মেনে নিয়েও বলে এমন
হওনা তুমি আরো কাছে
হওনা তুমি আরো আপন
এক সাগরে মিলবো বলে
তোমার আমার স্রোতে ভাষা।
বলছি তোমার কানে কানে আমার তুমি
বলছি আমার গানে গানে আমার তুমি
আজকে আমার প্রাণ পেয়েছে
অনেক নতুন ভাষা
অনেক দিনের স্বপ্ন যে
অনেক দিনের আশা
বলছি তোমার কানে কানে আমার তুমি
বলছি আমার গানে গানে আমার তুমি!”

To be continued…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here