বৃষ্টিস্নাত_রাত্রি পর্বঃ ০১

অফিস শেষ করে নিচে আসতেই আকাশে বিকট শব্দে মেঘের গর্জন। সাথে বিদ্যুৎ ঝলকানি। একটু ভয়ই পেলাম। পুরো আকাশ কালো হয়ে থমথমে অবস্থা। দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি আকাশ ফেটে বৃষ্টি নামবে। ভাবতে ভাবতেই তাই হলো। মুশলধারায় বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। আহ! সেকি বৃষ্টি। কোন মতে দাঁড়িয়ে আছি বাসের অপেক্ষায়। কিন্তু বাসের কোন খবর নেই। আমার সাথে যারা দাঁড়িয়ে ছিল একে একে তারা সবাই চলে যায়। কিন্তু আমার গন্তব্যের বাসের কোন খবর নেই। কি আজব ব্যাপার! বেশ বিরক্ত লাগছিল। তবে সেটা বেশিক্ষণ আর স্থায়িত্ব পায় নি তার আগেই অবশেষে আমার গন্তব্যের বাসটি চলে আসল। দ্রুত উঠে গেলাম। বাস আবার চলতে শুরু করলো তার আপন গতিতে। ঘড়িতে এখন ৯ টা নাগাদ বাজতে চলছে। আজ অফিসে বেশ বড়ো একটা প্রজেক্ট নিয়ে মিটিং চলছিল। যার দরুন অন্যদিনের চেয়ে কিছুটা দেরি হয়ে গেল। তবে কোন সমস্যা নেই। একা একজন মানুষ। বাসায় অপেক্ষা করার মতো কেউই নেই। বিষন্নতা যার বন্ধু তার আর কি লাগে এই একাকিত্ব জীবনে! কিছুই না৷ বাসের জানালা গুলো বন্ধ। এত জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল যে বাইরের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। এই বৃষ্টির সময়সীমা আমার গন্তব্য পর্যন্ত অতিবাহিত হলো। বাস থেকে নেমেই দিলাম দৌড়। যে বৃষ্টি পুরো ভিজেই যাচ্ছি। দুটো গলি পরেই আমার বাসা। প্রথম গলি পাড় করে দ্বিতীয় গলির সামনে আসতেই মনে হলো চোখে কিছু একটা বেজেছে। কিছু একটা পিছনে ফেলে এসেছি। অদ্ভুত কিছু। থমকে যাই। দ্রুত পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি বিয়ের ড্রেস পরা একটা মেয়ে সম্পূর্ণ বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে অবস্থায় গুটিসুটি মেরে একটা বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। এদিকে আমি যে বৃষ্টিতে ভিজছি তার কোন হদিসই যেন আমার নেই। থাকবেই বা কিভাবে! এরকমই অদ্ভুত দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। আমি অজান্তেই মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে একটু দেখে অসম্ভব অবাক হয়ে বলে উঠলাম,

— আবনী তুমি!

অবনী আমার কণ্ঠ শুনে বেশ চমকে উঠে আমার দিকে তাকায়। আমি ওর অশ্রুসিক্ত নয়ন জোড়া স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তার চেয়ে বেশি নজর কাড়ছে ওর কাঁপা শরীর। অবনী আমাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে দিয়ে বলে,

~ স্যার আমাকে বাঁচান। আমি আর পারছি না। প্লিজ আমাকে একটু ঠাই দেন। আমার খুব খারাপ লাগছে।

অবনীর এমন আকুতি শুনে আর ওর এই অবস্থা দেখে আমি কিছুটা উপস্থিত বুদ্ধি হারিয়ে ফেলি। কিন্তু মেঘের গর্জনে অতিবিলম্বে আবার বুদ্ধি ফিরে আসে। তাই আমি অস্থির কণ্ঠে কিছু না ভেবেই বলে দেই,

— আমার বাসা সামনেই। তুমি তাড়াতাড়ি আমার সাথে আসো।

আমি অবনীকে সাথে নিয়ে কোন কিছু না ভেবেই আমার বাসার দিকে রওনা হই। বাড়ির মেইন গেইট দিয়ে ঢুকতেই দারোয়ান চাচা দ্রুত এগিয়ে আসেন আমাদের কাছে। আমি সাথে সাথে ভয় পেয়ে যাই। এখন নিশ্চিত উনি আমাকে জেরা করবেন। কিন্তু আমার সব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে উনি কিছুক্ষণ আমাদের দেখে দ্রুত আমার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নিয়ে বললেন,

— স্যার আসেন আমি সাহায্য করছি।

আমি অসম্ভব অবাক হলাম। উনি কাঁধের ব্যাগটা নেওয়াতে আমার অবনীকে ধরতে সহজ হলো। ওকে ধরে কোন মতে দোতলায় আনলাম। দারোয়ান চাচাকে বললাম ব্যাগে চাবি আছে। উনি দ্রুত চাবি খুঁজে বের করে তালা খুললেন। অবনীকে ভিতর নিয়ে কাঠের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলাম। ওর অবস্থা খুব খারাপ। ভিজে একাকার অবস্থা। ওর এই ভিজা ড্রেস খুব দ্রুত চেঞ্জ করাতে হবে। আমি দারোয়ান চাচার দিকে তাকিয়ে ইশারায় ওনাকে অবনীকে দেখতে বললাম। তারপর আমি দ্রুত আমার রুমে গিয়ে একটা ট্রাউজার এবং শীতের মোটা একটা সোয়েটার আর তোয়ালে এনে অবনীর হাতে দিয়ে বললাম,

— তুমি কি একটু কষ্ট করে এগুলো চেঞ্জ করে আসতে পারবে?

অবনী মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। আমি ওকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিলাম। অবনী উঠতে নিলে পরে যেতে নেয়। তাই আমি ওকে ধরে এগিয়ে দিয়ে আসলাম। ও ফ্রেশ হতে চলে গেল। তারপর দারোয়ান চাচার কাছে দোষীর মতো আসলাম। আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই উনি বলে উঠলেন,

— স্যার কোন কিছু লাগলে আমাকে ডাক দিয়েন। আমি নিচে আছি। চিন্তা নাই।
— জিজ্ঞেস করবেন না এই মেয়ে কে?
— বিপদ যাক তারপর না হয় সব জানা যাবে। আপনি কোন চিন্তা কইরেন না।
— আপনে আসলেই অনেক ভালো একটা মানুষ। সত্যিই অনেক ভালো। আমার বাবার মতো।
— আপামনির খেয়াল রাইখেন। আমি আসি। (একটা হাসি দিয়ে বললেন)
— আচ্ছা।

দারোয়ান চাচা চলে গেলেন। তিনি আমাকে গত চার বছর যাবৎ চিনেন। যেদিন থেকে এই বাড়িতে এসেছি সেদিন থেকে। হয়তো সেই বিশ্বাসেই কিছু জিজ্ঞেস করেন নি। কিন্তু এখন বড়ো চিন্তা অবনীকে নিয়ে। ওর এই অবস্থা কেন? কি হয়েছে ওর সাথে? ভাবতে ভাবতেই কিন্তুক্ষণ পর অবনী বের হয়ে আসে। আমি দ্রুত ওর কাছে এগিয়ে যাই। ওকে দেখে আমি পুরো অবাক। আর ও বেশ লজ্জা আর সংকোচ করছিল আমার ট্রাউজার আর সোয়েটার পরে। আমিও এই প্রথম কোন মেয়েকে এভাবে দেখছি। আমার নিজেরই কেমন জানি লাগছিল। ওর লম্বা ঘন কালো ভেজা চুল গুলো পিছনে ছাড়া ছিল। এই দৃশ্য যেকোন ছেলেকে পাগল করে দিতে পারে৷ তবে আমার ক্ষেত্রে ভিন্ন হলো। আমি অবনীর খারাপ অবস্থা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিলাম। তাই আর কোন কিছু না ভেবে দ্রুত ওকে ধরে সোফাতে বসালাম। অবনীকে দেখে মনে হচ্ছে ওর গায়ে জ্বর উঠেছে। কারণ থরথর করে কাঁপছিল অসহায় মেয়েটা। আমি ওকে আরেকটা তোয়ালে এনে দিয়ে বললাম,

— কষ্ট করে চুলে এটা প্যাচিয়ে নেও। আমি গরম গরম কিছু নিয়ে আসি খাবার জন্য৷ তাহলে ভালো লাগবে তোমার। তুমি এখানে বসো। আমি আসছি।

অবনী চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলো। আমি যে নিজে ভেজা শরীর নিয়ে এত কিছু করছি সেদিকে আমার খেয়ালই নেই। রান্না ঘরে গিয়ে খুঁজে ইন্সট্যান্ট স্যুপের প্যাকেট বের করলাম। দ্রুত সেটা রান্না করে অবনীর জন্য নিয়ে আসলাম। ওর সামনে একটা টুল রেখে স্যুপটা রেখে বললাম,

— স্যুপটা খেয়ে এই দুটো ট্যাবলেট খেয়ে নিও। তাহলে জ্বর কমে যাবে সকালের মধ্যে।

দেখলাম অবনী লজ্জা পাচ্ছে। কেমন কেমন জানি করছে। আমি আবার বললাম,

— সংকোচ করো না। বুঝতে পেরেছি হয়তো কোন বড়ো বিপদে পড়েছো। ভয় নেই তুমি এখানে সেইফ আছো। স্যুপটা খেয়ে নেও।

এবার অবনী আস্তে আস্তে স্যুপের বাটিটা নিয়ে খেতে থাকে। ওকে খেতে দেখে মনে হচ্ছে ওর ভালোই লাগছে। স্যুপ খাওয়া শেষ হলে আমি পানি এনে দি। ও পানির সাথে ম্যাডিসন দুটো খেয়ে নেয়। আমি সব কিছু রেখে আমার বেড রুমে এসে বিছানাটা সুন্দর করে রেডি করে ওর কাছে এসে বলি,

— অনেক রাত হয়েছে। তুমি আমার বেড রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি কম্বল নামিয়ে দিয়েছি। যদি বেশি শীত করে ব্যবহার করো। তাছাড়া কাঁথাও আছে।

অবনী আস্তে আস্তে আমার দিকে তাকায়। মেয়েটাকে কত্তো ইনোসেন্ট লাগছে। আর বেশ মায়াবী। ও আমার দিকে এক নজর তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলে,

~ স্যার আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দিব আমার জানা নেই৷ আপনি সেই আগেও অনেক ভালো ছিলেন আজও সেরকমই আছেন৷
— আচ্ছা এগুলো পরে হবে৷ তোমাকে দুর্বল লাগছে। আগে সুস্থ হও তারপর সব কথা হবে৷ চলো ঘুমাবে…

আমি অবনীকে ধরে আমার রুমে এনে ওকে শুইয়ে দি। লাইট অফ করে বাইরে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ি। আর সাথে সাথেই একটা হাঁচি দেই। পরক্ষণেই মনে পড়ে আরে আমি নিজেই তো ভিজা জামা কাপড় পরে আছি। দ্রুত রুম থেকে পরনের জামা কাপড় এনে ফ্রেশ হতে চলে যাই৷ আর পুরো সময় ধরে মাথার ভিতর শুধু অবনীর কথায় ঘুরছিল। কি কারণে বিয়ের ড্রেস পরে ও এভাবে কাক ভেজা ভিজছিল? কি কারণে? এর উত্তর কাল সকালেই জানা যাবে। ফ্রেশ হয়ে এসে ইন্সট্যান্ট নুডলস রান্না করে খেয়ে নিলাম। রাতে আমি ভাত খাই না। সকালে দুটো পাউরুটি আর দুপুরে অফিসে পেট ভরে খাই। আর রাতে ইন্সট্যান্ট যা বানানো যায় আর কি। মাঝে মাঝে মন খুব খারাপ থাকলে না খেয়েই ঘুমিয়ে পরি। অফিসের ব্যাগটা বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে। ভাগ্য ভালো ব্যাগটা ওয়াটার প্রুফ ছিল। যার জন্য ভিতরে কিছুই ভিজে নি। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে চার্জে দি। আর ব্যাগটা শুকাতে দিয়ে সোফায় বসে পরি। অবনী হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে। আজ দীর্ঘ ২ বছর পর আবার অবনীকে দেখলাম। আমার সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী ওই ছিল। সবসময় হাসিখুশি থাকতো। সবার আগে এসে এসে আমার সাথে গল্প করবো, পড়তো। কিন্তু আজ ও ঘর ছাড়া কেন? তাও বিয়ের ড্রেসে? কাল সকালে জানা যাবে হয়তো। তাহলে আজ এই বৃষ্টিস্নাত রাত্রি এভাবেই পাড় করা যাক। কখন যেন সোফাতেই বসে বসে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে কারো নরম হাতের স্পর্শে আর মিষ্টি কণ্ঠে আমার ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি এ যেন….

চলবে…?

বৃষ্টিস্নাত_রাত্রি পর্বঃ ০১

লেখকঃ আবির খান

কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু। আর পরবর্তী পর্বের লিংক কমেন্ট দেওয়া হবে৷ ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here