বৃষ্টিস্নাত_রাত্রি লেখকঃ আবির খান পর্বঃ ০৪

বৃষ্টিস্নাত_রাত্রি
লেখকঃ আবির খান
পর্বঃ ০৪
আমি ভিতরে ঢুকে অবনীর দিকে তাকাতেই পুরো “থ”। রীতিমতো হা করে তাকিয়ে আছি। আর অবনী আমার অবস্থা দেখে লজ্জায় লাল টুকটুকে হয়ে আছে। আমি কোন কিছু না বলে চুপচাপ আমার রুমে চলে আসি। এসে মুচকি হাসছি। কারণ অবনীকে আমার শার্টে একদম অন্যরকম লাগছিল। ওর চুলগুলো অনেক লম্বা বড়ো আর ঘন কালো। সেগুলো সে ছেড়ে দিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তো দেখে পুরো মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা আসলেই অনেক সুন্দরী হয়েছে। ওর জামাই টা ওকে পেলে অনেক হ্যাপি হবে। এসব ভেবে ভেবে বাসার ড্রেস পরে বাইরে আসি। এসে দেখি অবনী দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। টেবিলের দিকে তাকাতেই দেখি সুন্দর করে খাবার বেড়ে ঢেকে রেখেছে ও। আমি হাত ধুতে ধুতে বললাম,

— তুমি আমার বাসার মেহমান। তোমাকে এসব কে করতে বলেছে বলতো? আমি কি পারতাম না?

অবনী লজ্জাসিক্ত কণ্ঠে কিছুটা জোর দিয়ে বলে,

~ না না স্যার আপনি কেন করবেন? বরং এটুকু কাজ করা আমার অধিকার। আমি এমনিই আপনাকে ঝামেলা দিচ্ছি। আমি এটুকু কাজ না করলে আমার নিজেরই খারাপ লাগবে। প্লিজ আপনি না করবেন না।

অবনীর দিকে তাকিয়ে বুঝলাম ও আসলে চুপচাপ বসে বসে খাবে এটা চায় না৷ হয়তো ওর ব্যক্তিত্বে লাগছে। তাই আমি মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,

— আচ্ছা ঠিক আছে। এবার খেতে বসো। নাহলে কিন্তু আমি একাই খাবো। কারণ অনেক ক্ষুধা লেগেছে আমার।
~ জি জি বসছি।

এরপর আমি আর ও খাওয়া শুরু করি। খেতে খেতে ওকে বলি,

— খিচুড়িটা কেমন লাগছে?
~ জি অনেক মজার৷
— আমার মোস্ট ফেভারিট একটা খাবার এটা। সাথে আবার ভুনা গোসত। আহ! কি সুস্বাদু! তাই আজকে এটাই অর্ডার করেছি।
~ ওও, আপনারও খিচুড়ি পছন্দের?
— অনেক অনেক। কেন তোমারও নাকি?
~ জি। মাম্মি খুব সুন্দর করে রান্না করে। অনেক মজার হয়।
— বাহ! আমাদের পছন্দ তাহলে মিলে গেল। ভালোই হলো। নেও নেও আরেকটু নেও।
~ না না। আপনি নিন।
— আমি তো তুমি বললেও নিব না বললেও আরেকটু বেশি নিব। হাহা।

অবনী হেসে দেয়। আমি আরও খিচুড়ি নিয়ে আরাম করে খাচ্ছিলাম গোসত দিয়ে। আর ও আমার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। যেটা আমি খেয়ালই করিনি। ওর সেই তাকানো অর্থও জানিনি৷ খাওয়ার শেষ পর্যায়ে মনে পড়ে,

— ওহ! ভালো কথা, আজ সন্ধ্যায় কিন্তু আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আসিফ আর ওর ওয়াইফ আসবে আমাদের সাথে দেখা করতে। ও আমার অনেক কাছের। আমার আপন ভাইয়ের মতো। আর রাতের খাবারও নাকি নিয়ে আসবে আমাদের জন্য।
~ ওহ!
— হুম৷ তুমি রেডি হয়ে থেকো।
~ আচ্ছা৷

এরপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি টেবিল গোছাতে নিলে অবনী আমাকে বাঁধা দিয়ে সরিয়ে দেয়। আমি আর কি বলবো! তাই বাধ্য হয়ে সোফাতে এসে বসে পড়ি। যাতে অবনী না বসতে পারে। ও টেবিল গুছিলে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। আর বলে,

~ যান স্যার আপনি গিয়ে রেস্ট নিন। আমি এখানে বসি।
— নো নো সেটা হবে না। তোমার না প্রতিদিন বিকেলে ঘুমানোর অভ্যাস? যাও যাও গিয়ে একটা ঘুম দেও। আমি বিকেলে ঘুমাই না। সো চিন্তা নাই। আর তোমার পার্সেলও তো আসবে৷ সেটা রিসিভ করতে হবে না? তুমি যাও আমি আছি এখানে।
~ স্যার আপনার এখনো আমার সবকিছু মনে আছে?(অবাক হয়ে)
— হুম৷ থাকবে না কেন৷ তুমি একদিনও বিকেলে আমার কাছে পড়তে না৷ ঘুম দিয়ে চোখ মুখ ফুলিয়ে তারপর সন্ধ্যায় পড়তে বসতে। হাহা।

অবনী খুব লজ্জা পায়৷ লজ্জায় আমার রুমে চলে যায়। আর আমি হাসতে হাসতে সোফায় বসে ফোন চালাচ্ছি।

অন্যদিকে,

অবনী নীলের রুমে এসে লজ্জায় বেডে বসে পড়ে। বসে আড় চোখে নীলকে দেখতে থাকে আর মুচকি হাসতে থাকে। ও মনে মনে বলছে,

~ স্যার, একটা মানুষ কিভাবে এত ভালো হতে পারে বলুন তো? আপনি এত ভালো কেন? সেই আগের দিন গুলোর মতো আছেন এখনো। আপনি আমার মতো সামান্য একটা ছাত্রীর সব মনে রেখেছেন এত বছর পরও। আমি কেন যে আপনার সামনে আসলে কথা বলতে পারি না? কেন? কবে আমি আপনাকে আমার….

অবনী থেমে যায়। ওর হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়েই যাচ্ছে। ও আস্তে আস্তে বেডে শুয়ে পড়ে লজ্জাসিক্ত মুখখানা নিয়ে। নীল যদি এখন ওকে দেখতো নিশ্চিত হা করে তাকিয়ে থাকতো। কারণ অবনী লজ্জায় একদম মুখটা লাল করে ফেলেছে। অবনী একসময় ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়।

এখন ঘড়িতে প্রায় বিকেল পাঁচটা নাগাদ বাজে। অবনীর পার্সেলও দিয়ে গিয়েছে। আমি খুলে দেখি নি। কারণ এটা মেয়েদের জিনিসপত্র। আমার দেখাটা অভদ্রতা হবে। তাই ব্যাগটা রেখে আস্তে আস্তে অবনীর কাছে যাই। অবশ্য যাওয়ার আগে অনেকবার ভাবতে হয়েছে আমাকে। ওর কাছে গিয়ে দেখি একদম বাচ্চা মেয়ের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছি। যেই ঘুরে ওর মুখের সামনের দিকটায় আসলাম আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে যাই। আসলে স্তব্ধ না এটা মুগ্ধতা বলা যায়। আমি হা করে তাকিয়ে আছি ওর ঘুমন্ত মুখখানার দিকে। পড়ন্ত বিকেলের লাল আভা জানালা দিয়ে এসে অবনীর মায়াবী মিষ্টি মুখের উপর পড়ছে। ওর সৌন্দর্য যেন হাজার গুন বেড়ে গিয়েছে। ওর বড়ো বড়ো চোখের পাপড়ি গুলো যেন ওর মায়াবীপানা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জানি না কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎই ও একটু নড়েচড়ে ওঠায় আমার ঘোর কাটে। খুব লজ্জায় পড়ে যাই। ছি ছি কি হয়েছিলা আমার! হয়তো কখনো কাউকে এভাবে এত কাছ থেকে দেখা হয়নি তাই হয়তো। আমি নিজেকে সামলে আস্তে করে অবনীকে ডাক দি। দুটো ডাক দিতেই ও আস্তে আস্তে খুব কিউট করে চোখ মেলে তাকায়। আমাকে সামনে দেখে ও ভরকে যায়। আর একলাফে উঠে বসে বলে,

~ স্যার কোন সমস্যা?
— না না। সরি তুমি মেইবি ভয় পেলে। আসলে তোমার ড্রেস গুলো এসেছে। যদি দেখতে ভালো হতো। আর আমার মনে হয় তুমি আমার এই শার্ট পরে আর বেশিক্ষণ থাকতে চাও না। তাই আর কি…
~ ওহ! আচ্ছা আচ্ছা আমি আসছি।
— ঠিক আছে।

আমি দ্রুত সোফায় এসে বসে পড়ি। হায় রে অবনীকে হয়তো এভাবে ডাকা ঠিকই হয়নি। ওর যখন মন চায় উঠতো। কিন্তু আসলে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। একটু পর আসিফরাও আসবে তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই ওকে ডাকলাম। যাইহোক অবনী ফ্রেশ হয়ে আমার কাছে আসলো। আমি ওর হাতে ব্যাগটা দিয়ে বললাম,

— আচ্ছা তুমি এগুলো ট্রাই করে দেখো। আমি বাইরে থেকে সন্ধ্যার নাস্তার জন্য কিছু নিয়ে আসি। ওদেরকে তো আর খালি মুখে যেতে দেওয়া যায় না।
~ হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক বলেছেন।

দেখলাম অবনী মুহূর্তেই খুব খুশি হয়ে গেল। বুঝলাম ও মনে মনে চাচ্ছিল আমি বাসায় না থাকা অবস্থায় ও ড্রেস গুলো পরুক। তাই আমিই বুদ্ধি করে বের হচ্ছি। যাইহোক ওকে রেখে নিচে এসে কতক্ষণ দারোয়ান চাচার সাথে গল্প করলাম। তিনিও আমার মতো একা। তবে আমাকে খুব ভালবাসেন। নিজের ছেলের মতো। মাঝে মাঝে ওনার সাথে বসে বাবার কমতি পূরণ করি। গল্প শেষে নাস্তা আনতে চলে গেলাম। আসিফ কল দিয়ে জানিয়েছে ওরা রওনা দিয়েছে। আর ৫ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে। তাই আমি আর উপরে না গিয়ে ভাবলার ওদের একসাথে নিয়েই বাসায় যাই। দেখতে দেখতে আসিফ আর রিনা ভাবী চলে আসলো। রিনা আমার বয়সে ছোট হলেও ভাবী বলেই সম্মান দি। আমাকে দেখে আসিফ অবাক। ও বলে উঠে,

— কিরে তুই নিচে এসে অপেক্ষা করছিলি নাকি?
— এহহ্! আমার আর কাজ নাই না? তোদের জন্য নাস্তা আনতে নেমেছিলাম। এর মধ্যে তোরা এসে গেলি তাই আর যাই নি।
— তো কথা তো শালা সেই একই হইলো। অপেক্ষাই করছিলি। চল চল আমাদের পিচ্চি ভাবীকে দেখবো। হাহা।
— এই ব্যাটা কি যাতা বলছিস? ভাবী ওকে চুপ করতে বলেন তো। নাহলে আমার মাথা কাটা যাবে আজকে নিশ্চিত।
~ এই চুপ করো তো। ভাইয়া আপনি ভালো আছেন তো?
— হুম একদম আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?
— আচ্ছা তোরা কি রাস্তায়ই থাকবি? নাকি উপরে যেয়ে খোশামোদ করবি।
— ওহ হো, সরি সরি। চল চল…

আমি আসিফ আর ভাবীকে নিয়ে বাসার দিকে উঠছি। আমার জন্য আর অবনীর জন্য যে এত বড়ো একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে তা কল্পনাও করি নি। আমি বেল দিতেই অবনী দ্রুত দরজা খুলে। অবনীকে দেখে আমি পুরো থ। সাথে ও আমাদের দেখে পুরো স্তব্ধ। অবনী বেশ অবাক কণ্ঠে বলে উঠে,

~ আপু তুমি?
~ অবনী তুই এখানে? (রিনা)

মাঝ দিয়ে আমি আর আসিফ স্তব্ধ হয়ে আছি। আসলে…

চলবে…?

সবার ভালো সাড়া চাই তাহলে খুব তাড়াতাড়ি পরবর্তী পর্ব দেওয়া হবে। আর কেমন লেগেছে জানাবেন কিন্তু। আগের এবং পরবর্তী পর্বের লিংক কমেন্ট দেওয়া হবে। ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here