মন খারাপের ডায়েরি (৩)

মন খারাপের ডায়েরি (৩)
#অলিন্দ্রিয়া_রুহি

_
না, আমি ভাবিনি এতটা তুচ্ছ আমি আপনার কাছে! কী এমন করেছি যার জন্যে প্রতিনিয়ত মনটাকে ভেঙেচুরে খানখান করে দিচ্ছেন? ভালোবেসেছি,এই-ই কী মহাপাপ? আমার কাজিন সুমি আপুর কথা মনে আছে আপনার? ভাইয়া তাকে পাগলের মতো ভালোবাসলেও সুমি আপু পাত্তাই দেয় না। সে চলে নিজের মতোন করে। কে কী ভাবল, কী করল না করল, সে ফিরেও তাকায় না। ভাইয়ার মন খারাপের দিনগুলো গাঢ় হয় সুমি আপুর জন্যে। সে হাহাকার করে একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে। সেখানে আপনি না চাইতেও আমার ভালোবাসা পেয়েছেন। আপনাকে আমি পাগলের চেয়েও বেশি ভালোবাসি আয়মান। আপনি কী কোনোদিন বুঝবেন না? নাকি আমার মৃত্যুর অপেক্ষায় আছেন? যেদিন মৃত্যু আমাকে আপনার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে,সেদিন দেখবো আমি.. কতটা ভালো থাকতে পারেন। কীভাবে থাকেন আমাকে ছাড়া! দেখব আমি, সত্যি দেখবো…

_
‘কী করো?’ সানার আচানক ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নে উবু থেকে সোজা হয়ে বসে তরী। দরজা না লাগিয়েই সে ডায়েরি খুলে বসেছিল যে,লক্ষ করে এবার। ফাঁকা ঢোক গিলে ডায়েরিটাকে দ্রুত কোলের ভেতর লুকোনোর চেষ্টা করে। ছলছল চোখে সানার দিকে তাকায়। শীতল অথচ কঠিন স্বরে জবাব দিলো, ‘আমি একটু একা থাকতে চাই সানা।’
‘কাকে চিঠি লিখো লুকিয়ে লুকিয়ে হুম?’ ভ্রু নাচায় সানা। এগিয়ে এলে তরী কোলে থাকা ডায়েরিটাকে শক্ত করে চেপে ধরে। বিদ্যুৎ গতিতে উঠে দাঁড়ায় এবং সানাকে একপ্রকার ধাক্কার সহিত বের করে দেয় রুম থেকে।
‘তোমাকে বললাম না আমি একা থাকব খানিকক্ষণ! শোনো না কেন কোনো কথা? প্লিজ যাও..’ দুর্বল কণ্ঠটি নাড়িয়ে দরজা ঠাস করে লাগিয়ে দিলো মুখের উপর। রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে সানার চোখেমুখে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সরে যায় দরজার সামনে দিয়ে। ধপধপ করে হেঁটে গিয়ে বসে সোনালি বেগমের পাশে। হালিমা বেগম সানার চোখমুখ দেখে বললেন, ‘কিছু হয়েছে মা?’
সানা ঝামটা মেরে উত্তর দিলো, ‘কিছু না।’
বলে বেরিয়ে গেল বিভার ঘরের উদ্দেশ্যে। সোনালি কাচুমাচু কণ্ঠে বললেন, ‘কিছু মনে করিস না আপা ওর ব্যবহারে।’
হালিমা বেগম কিছুই বললেন না। সানার এইরকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্যেই তাকে পছন্দ নয়। বিভা হাত খোঁপা করছিল, সানা গিয়ে তার বিছানায় আয়েশ করে বসল।
‘তোমারই কপাল আপা। ঘুম থেকে উঠো দশটায়!’
বিভা দায়সারাভাবে বলল, ‘আরো আগেই উঠছি। শুয়ে ছিলাম।’
‘তা আপা, তোমার ভার্সিটি জীবন যাচ্ছে কেমন?’
‘ভালো, খুব ভালো।’
‘হুম… আচ্ছা আপা, আয়মান ভাইয়ার বিয়ের কত বছর হলো? দুই বছর?’
‘ওর চাইতে একটু কম,কেন?’
সানা মিথ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভাবখানা এমন, আয়মানের জন্যে মরমে মরে যাচ্ছে সে। বিভা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সানা পুনরায় আরেকটি গাঢ় শ্বাস ফেলে বলল, ‘এইজন্যেই ভাইয়ার কদর কমে গেছে ভাবীর কাছে। ভাইয়াকে রেখে কোথায় কী করে একটু চোখে চোখে রাইখো আপা।’
বিভা হতবিহ্বল বিস্ময়ে, ‘কী বলছো তুমি! মানে কী?’
‘আজকে দেখলাম লুকিয়ে লুকিয়ে কাকে যেন চিঠি লিখছে। আমি দেখতে গেলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তারপর দরজা আঁটকে দেয়। তাই আর দেখতে পারিনি। তুমি একটু নজরে রাইখো বুঝছো?’
বিভা জবাব দিলো না। আপনমনে কিছু ভেবে বাথরুমে ঢুকে গেল।

_
আয়মান বাড়ি ফিরেছে। সোনালি চলে গেলেও সানা রয়ে গেছে। সে রাতেও এই বাড়িতে থাকবে। তরী দুপুরের রান্নার সময় সানা তার ঘরে গিয়ে খুঁজে এসেছে। কিন্তু কোথাও ডায়েরি বা চিঠি পায়নি। আয়মানের কানে বিষ ঢালা হয়ে গেছে সানার। এখন অপেক্ষা তান্ডবের। আয়মান সোফায় বসে টিভি দেখছিল ফ্রেশ হয়ে আর তখনই সানা এসে এসব বলল। রিমোট রেখে সোজা বেডরুমের দিকে পা বাড়ায় আয়মান। তরী বারান্দায় উদাসী ভাবে চেয়ে ছিল অন্তরীক্ষে। পেছন থেকে আয়মানের তিরস্কার মাখানো কথার বাণ ছুঁটে আসে।
‘প্রেমিকের কথা চিন্তা করছো নাকি?’
তরী পেছন ফিরে অবাক হয়। কথার মর্মার্থ ধরতে পারল না। অবাক চিত্তে জানতে চাইলো, ‘মানে?’
‘নাটক? এতদিন এত নাটক করেও সাধ মেটেনি? আজ তো ধৈর্যের বাধ ভেঙে দিয়েছো তুমি।’
‘আ..আমি কী করেছি?’ তরীর গলা কাঁপছে। আয়মানকে চেনে সে। এমনিতে শান্ত,রাগলে ভয়ংকর হয়ে উঠে। মারধোর করতেও পিছপা হয় না। তরী দ্বিতীয় শব্দ উচ্চারণ করার আগেই গালে আয়মানের হাতের স্পর্শ পেল। সেকেন্ডে পুরো কান স্তব্ধ হয়ে গেল। একটা ঝিনঝিন শব্দ ছেয়ে গেল পুরো মস্তিষ্ক জুড়ে। আয়মান ততক্ষণে ক্যাঁজা করে ধরেছে তরীর হাত। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠে তরী। চোখ ফেটে জল বের হলো। আয়মানের দয়া হয় না। আক্রোশপূর্ণ গলায় প্রশ্ন করল, ‘কাকে চিঠি লিখিস তুই? কীসের চিঠি? দেখা আমাকে।’
‘আমি কাউকে কোনো চিঠি লিখি না। এসব কী বলছেন আপনি?’
‘আবার মিথ্যা! তাহলে কী সানা ভুল দেখেছে? ওকে দেখে তুই চিঠি লুকাসনি?’
‘সানা…’ থমকে গেল তরীর কান্না। বোঝা হয়ে গেল সমস্তকিছু। আয়মান দ্বিতীয় থাপ্পর মারলো। তরী অস্ফুট শব্দটিও করল না। জমে গেল একদম। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে তৃতীয় বার থাপ্পর দিতে নিলে হাত ধরে ফেলল তরী। আয়মান আগুন চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে ধাক্কা মারলো তরী। সরে দাঁড়াল নিজেও। কেঁদে উঠল হাউমাউ করে। বলতে লাগল অনর্গল করে একের পর এক, ‘আমি ফোন করলে বিরক্ত হন, আর সানা ফোন দিলে দৌড়ে চলে আসেন! আমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না,সানার সঙ্গে আড্ডা দিতে খুব ভালো লাগে? সানার সঙ্গে জড়াজড়ি করে ছবি তোলা,সানাকে প্রায়োরিটি দেওয়া,সানার কথায় নিজের স্ত্রীকে অত্যাচার করা! লোকে জানুক,আপনি কতটা নিকৃষ্ট! কতটা নিচে নেমে গেছেন! আপনি… আপনাকে কী বলে উপমা দিবো, বুঝতেছি না।’
‘এত গলা বেড়েছে! এত? ওই প্রেমিকের জন্য? প্রেমিক পুরুষ?’ আয়মানের গলার স্বর বাড়লো। বাড়ির সকলে ছুটে এসেছে ততক্ষণে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিছু ব্যক্তিও থেমে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে আছে ওদের দিকেই। আয়মান তরীকে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে এলো। দরজা আঁটকে দিতে নিলে পাল্লা ঠেলে হালিমা বেগম, বিভা ও সানা প্রবেশ করে। সানা ঠোঁট চিঁড়ে ক্রুর হাসিরা বেরিয়ে এসেছে। যদিও সে লুকোনোর চেষ্টা করছে। হালিমা বেগম স্তব্ধ হয়ে তরীর গালে তাকিয়ে রইলেন। পাঁচ হাতের আঙুলের দাগ লেগে রয়েছে। তিনি অস্থির কণ্ঠে বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে? আয়মান, তুই ওর গায়ে হাত তুলেছিস? কী করছে ও?’
‘তোমার আদরের বউ মা আরেকজনকে ধরছে। এইজন্যে বলছিলাম, গ্রামের মেয়েদের স্বভাব চরিত্র ভালো হয় না। এরা ভেজা বিলাই হয়ে থাকে। অথচ ভেতরটা নোংরা… এই মেয়েও কম না। না জানি কতদিন যাবত আমাকে ঠকিয়ে যাচ্ছে। আজ সানা হাতে নাতে ধরেছে বিধায় জানতে পারলাম।’
‘তুমি ভাইয়াকেও ওসব বলেছো?’ বিভা প্রশ্ন করল সানাকে। সানা কাচুমাচু কণ্ঠে হ্যাঁ জানালো। বিভা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো। সানার কথাগুলো পুরোটাই হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিল সে। তরীর উপর যথেষ্ট ভরসা ও বিশ্বাস রাখে বিভা। কিন্তু আয়মান! স্বামী হয়েও স্ত্রীকে চিনলো না! স্ত্রীর গায়ে হাত তুললো! যেখানে সানা কী-না তার আপন কেউই নয়…
‘কী বলছে সানা ওকে? এই সানা, কী দেখছো তুমি?’ গর্জে উঠলেন হালিমা বেগম। সানা নতমস্তকে সবটা আবারও বললে তরী ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বরে বলল, ‘তুমি কী দেখেছিলে আমি যে চিঠি লিখছিলাম? ওটা কী চিঠিই ছিল?’
‘আমি দেখিনাই। কিন্তু কিছু তো লেখছিলে। আর যদি সন্দেহজনক কিছু না থাকত তাহলে আমাকে ধাক্কা মেরে বের করে দিলে কেন?’ পাল্টা জবাবে বলল সানা।
তরী শক্ত চোয়ালে বলল, ‘মানুষের ব্যক্তিগত আরও অনেক কিছুই থাকতে পারে। আর তুমি যেরকম একরোখা, তাই ধাক্কা দিয়ে বের করা ছাড়া উপায় ছিল না। আর শোনো সানা, এভাবে আমাদের ভেতর সন্দেহের বীজ বোনা বন্ধ করো। তোমার নোংরা চাল আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।’
‘তরী!’ চেঁচিয়ে ধমক লাগাল আয়মান। তরী থামলো না, ‘আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন? আম্মা আপনি জানেন,এই সানা এখনো উনাকে পছন্দ করে। আমার থেকে কেড়ে নিতে চায়। আমাকে বলে, আমি নাকি উনার আমানত রেখে দিছি। আর বিয়ের আগে উনি সানার সঙ্গে কীভাবে ছবি তুলতো সেসব দেখায়। দেখিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়, আমাকে জ্বালায়। আমার ভেতর উনাকে নিয়ে সন্দেহ জাগায়। আম্মা, আপনিই বলেন এখন, দোষ কার? এই যুগে ফোন থাকতে কেউ চিঠি লেখে? বলুন আম্মা… আমি কী দোষ করলাম যার কারণে এই থাপ্পর গুলা গালে পড়ল?’

সানা দুর্যোগে পড়েছে। তরী যে এভাবে সব ফাঁস করে দিবে,বুঝতে পারেনি। তরীকে সিরিয়ালের আলাভোলা অসহায় নায়িকা হিসেবে বিবেচিত করেছিল সে। কিন্তু তরী অসহায় নয়, সে সহনশীল অতিমাত্রায়। বিভাকেও যে সানা উল্টাপাল্টা কথা বলেছিল,তা বিভা বলে দিলো। এইবার আয়মান নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। সানার কথায় এসেই মারামারি না করে আগে সবটা ক্লিয়ার করা উচিত ছিল। তরী কাঁদছে। যার সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানো হয়, যার জন্যে জীবন উৎসর্গ করা, সেই কী-না আজ অবিশ্বাস করে! গায়ে হাত তোলে! আহা পুরুষ! মেয়েদের অসহায় ভেবে শারীরিকের চাইতেও মানসিক ভাবে এই যে এত নির্যাতন করো, রোজ হাশরের ময়দানে কোথায় লুকোবে তোমাদের চাঁদ মুখখানা? সেদিন কী আল্লাহকে সমস্ত কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে না? সেদিন কী আল্লাহ এই অসহায় মেয়েদের হয়ে শাস্তি প্রদান করবেন না? সেদিন কী সব হিসাব-নিকাশের দিন না? একটু যদি ভাবত!

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here