Saturday, August 22, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১২ (শেষপর্ব)

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১২ (শেষপর্ব)

0
3

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১২ (শেষপর্ব)

জীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠতে চাইছে, মনে হয় আর পারছি না, আর সইছে না, আর হবে না! নিজের সমস্ত ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দিয়ে পায়ের নিচে যে শক্ত মাটির ভিত ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলাম, সবটাই এক লহমায় ভেঙে পড়েছে। আমার চাকরি নেই, ব্যবসার দুয়ার বন্ধ, বাড়ির ভেতর পরবাসী, বোনেদের পরীক্ষা সামনে, চালের ড্রামে জায়গা শূন্য হচ্ছে, বাজার বাড়ন্ত, ব্যাগে কাগজের নোট পরিমাণে কমছে – সামনে সব অন্ধকার! আমার একটা দিনের স্বার্থপরতার দাম এত? এতখানি নিঃস্ব করে দিলো আমাকে?
আশা-নিরাশা, ভালো-মন্দ, স্বপ্ন-বাস্তবতা – সর্বস্ব নিয়ে বাজি ধরে ফেললাম। নিয়ন না ফিরলে, আমি কোথায় যাব? যতই সোশ্যাল মিডিয়ার হুমকি দিই, আমি তো জানি সব ফাঁপা বুলি!
দুটো দিনের মাথায় এক দুঃসহ বিকেলে আবার আমাদের বাড়ির সামনে গাড়ির মিছিল এসে থামল। মায়ের চোখে খুশি উপচে পড়ছে,
–রুমকি, আরশির শাশুড়ি এসেছে। নিয়নের জন্য তোকে নেবে!
আমার হার্টবিট থেমে যেতে চাইল।
মা বলল,
–তাড়াতাড়ি মুখটা ধুয়ে নে। ওনারা শাড়ি পাঠিয়েছেন। শাড়িটা পরে সালাম করে আয়।
–উনি কোথায় বসেছেন?
–আরশির ঘরে।
–আমাদের ঘরে আসবেন না?
–আমি ডাকি নাই। আমার সাহস হয় নাই। কত বড়ো মানুষ উনি। আমার ঘরে কী আছে, ওনার সম্মান আপ্যায়ন কীভাবে করব?
–কিন্তু আমার মা তো তুমি। আমাকে নিতে হলে তোমার কাছেই চাইতে হবে। তোমার কুঁড়েতেই আসতে হবে।
–আর নাড়িস না! উনি যেখানে আরাম পান, সেখানেই থাকুন। আমার ঘরে এনে ওনাকে কষ্ট দিলে, তাতে কি আমার সম্মান বাড়বে? আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। যতটুকু পেয়েছি তাতেই হাজার শুকরিয়া। আরো বেশি চাইলে আল্লাহ নারাজ হবে না? অতি লোভে তাঁতি নষ্ট!
আমি শাড়ি পরলাম। ঝুমকি আমাকে সাজিয়ে দিলো। মা কাজলের টিকা লাগাতে লাগাতে বলল,
–তোরে যে কী সুন্দর লাগতেছে, আমি তো চোখ ফিরাইতে পারছি না রে রুমকি!
মিথ্যে করে থুথু ছিটিয়ে বলল,
–মা না ডাইনি! মায়ের নজর না লাগুক!
ছুটকিকে নিয়ে আমি বড়োচাচার বাড়ি গেলাম। ছুটকি জানাল,
–বেড়াটা বড়োচাচা ভেঙে দিয়েছে! আবার আমরা একবাড়ি!
বাড়িভর্তি লোক। সবার উৎসুক চোখ আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করছে!
আরশি আপু ছুটে এলো। একটা ট্রে আমার হাতে দিয়ে বলল,
–আম্মা আমার ঘরে বসেছেন। তুই ওখানে যা। ছুটকিকে রেখে যা। উনি তোকে একা ডেকেছেন। আর কথাবার্তা হিসাব করে বলিস। উনি বেয়াদবি একদম।পছন্দ করেন না।
ট্রেতে কিছু ফল আর এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি।
ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যান চলছে, নিচে স্ট্যান্ড ফ্যান শো শো করছে। সারিকা চৌধুরী আমাকে দেখে কোনো সম্ববোধন ছাড়াই বললেন,
–নিচের ফ্যানটা বন্ধ করে জানালাগুলো খুলে দাও। আওয়াজে মাথা ধরে গেছে!
আমি ফ্যান বন্ধ করে এসে ওনার সামনে দাঁড়ালে ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। মোবাইলে কথা বলছিলেন। ফোনটা রেখে পানিটা খেলেন। গ্লাসটা রেখে জানতে চাইলেন,
–নিয়নের সাথে দেখা হয়েছে?
আমি মাথা নাড়লাম। দেখা হয়নি ওর সাথে। এত লোকের মাঝে খুঁজিনি ওকে। আমার বুকের ভার নেমে গেছে। এতটুকুই যথেষ্ট।
ভদ্রমহিলা আজ পান্না সবুজ রঙের শাড়ি পরেছেন। গায়ে দামি অলংকার। খুব অভিজাত দেখাচ্ছে ওনাকে। স্নিগ্ধ হেসে বললেন,
–সুসংবাদটা ওকে দিইনি আমি!
আমি কৌতূহলী হলাম। জানতে চাইলাম,
–কোন সুসংবাদ?
–তোমার প্রেগন্যান্সীর সংবাদ! সুসংবাদ নয়?
আমি মাথা নিচু করে ফেললাম।
ওনার গলায় তারল্য। মজার গল্প বলার ছল করে বললেন,
–ওকে জানানো উচিত না?
আমি ডানেবামে মাথা নাড়লাম। বললাম,
–আপনি কখন বুঝলেন?
উনি হাসলেন,
–তখনই! রিপোর্টটা ফেইক ছিল। সারাদিন অসংখ্য কাগজপত্র নাড়াচারা করতে হয় আমাকে। অভিজ্ঞতার একটা গুরুত্ব আছে তো! কাগজ হাতে নিলেই টের পাই কোনটা আসল, কোনটা নকল। তুমিও ধরা পড়ার ভয়ে ওটা খুব দ্রুত হাতে সরিয়ে নিয়েছিলে। রিপোর্টটাতে লেখা ছিল, এইট উইকস প্রেগন্যান্সি। নিয়নের সাথে তোমার অত আগে দেখা হয়নি! আর তোমার পারসোনালিটি সম্পর্কে আমার কাছে যতখানি তথ্য আছে, তাতে তোমার কাছ থাকে ঐ ছেলেমানুষীটা এক্সপেক্টেড না! তুমি ন্যাকাবোকা ধরনের মেয়ে না, যে প্রেমিকের কাছে লয়্যালটি প্রমাণ করতে সোজা বিছানায় চলে যাবে!
আমি মৃদু হাসলাম,
–খুব তাড়াতাড়ি কাজটা করতে হয়েছিল। তাড়াহুড়ায় অত সব কারেকশন করা হয়নি। ছয়শো টাকায় বোধহয় এর চাইতে বেশি ডিটেইলিং আশাও করা যায় না!
–আমি ইমপ্রেসড! ইউ আর ইনডিড ব্রিলিয়ান্ট!
–আপনি জেনেও…
আমাকে শেষ করতে দিলেন না কথাটা। বললেন,
–আই ওয়ান্টেড টু কুইট! আমাদেরকে কোথায় থামতে হবে সেটা জানাটা জরুরি!
এক মুহূর্ত থামলেন উনি। বললেন,
–আমার মধ্যে কোনো রিগ্রেট নেই। আমি নিয়নকে মেনেও নিচ্ছি না। খুব দ্রুত তোমরা দেশ ছাড়বে সেটাই আশা করছি। চোখের সামনে ওকে হ্যাপি হতে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি অতখানি উদার মানুষ নই, রুমকি! আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছ আমি কতখানি ভিনডিকটিভ!
ভদ্রমহিলার কন্ঠ কঠিন হয়ে এলো।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। ওনার পা ছুঁয়ে সালাম করতে নতজানু হলাম।
উনি বললেন,
–আমি তোমাকে ব্লেসিংস দেবো না! সামহাউ, তোমার মধ্যে জেদি, ইন্টেলিজেন্ট, সেলফএস্টিমড ইয়াং সারিকাকে দেখতে পেয়েছিলাম, তাই এই একটা চান্স দিলাম। আমি শুধু এটা বুঝতে পারছি না, নিয়ন সাত আট ঘণ্টায় তোমাকে বিয়ে পর্যন্ত কীভাবে নিলো? হাউ কাম? তুমি তো এত সহজ মেয়ে নও!
তোমরা সবাইও এটা ভেবে অবাক হও, তাই না? কিন্তু নিয়ন তো আমার একদিনের সিদ্ধান্ত না। ও আমার কতদিনের প্রেম সেটা তো তোমরা জানোই, না? কতশত রাতের একটু করে করে জমানো ভালোবাসা। আমি কেমন করে পায়ে ঠেলতাম ওকে?
সারিকা চৌধুরী বললেন,
–অবশ্য, দ্যাট কিড ইজ ইনক্রেডিবলি ম্যানুপুলেটিভ, যাস্ট লাইক হিজ ফাদার! তুমি বলেছিলে না, আমি কেন জাহেদকে ছেড়ে দিইনি? অসংখ্যবার ছাড়তে চেয়েছি! ও ততবারই আমাকে এক্সপ্লয়েট করেছে! আমরা মেয়েরা মায়ার কাছে খুব অসহায়! আমার কী মনে হয়, জানো রুমকি? নারীর মেরুদন্ডের কিছুটা অংশ তার হৃদয়ে বসবাস করে! যতই সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাই, ততবারই কুঁজো হয়ে ফিরে আসি!
খুব বিষণ্ণ শোনাল ওনাকে। তারপর আবার ওনার চোয়াল শক্ত হতে দেখলাম। বললেন,
–আমি চাই, তুমিও আমার মতো সাফার করো। বিট্রেয়াল সহ্য করে কতখানি উদার হতে পারো, সেটা দেখতে চাই! তারপর আমাকে ক্রুয়েল মনে হয় কিনা সেটা নিয়ে বেশ একটা আড্ডা দেওয়া যাবে! তোমার সাথে আমার ডুয়েলটা জমবে ভালো!
আমার হাত পা শিরশির করে উঠল। ছাদে উঠে বসে থাকলাম। নিয়ন এলো শেষ বিকেলের সময়। নরম নীল রঙের শার্ট, চোখঢাকা রোদচশমা আর সমান করে ছাঁটা চুল। আর্মিছাট বা কদমছাট – কী যেন বলে এই হেয়ারকাটকে! আমি চমকে গেলাম ওকে দেখে। হাহাকার লাগল আমার। সব ভুলে কাছে গিয়ে বললাম,
–ও মা, এই চুল আবার আগের মতো হতে কতদিন লাগবে?
নিয়ন হাসলো। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে।
ও বলল,
–এতদিন পরে দেখা হলো! এই জানতে চাইছ?
আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। বললাম,
–না। অন্য জরুরি কথা আছে।
–হুম, বলো?
আমি অন্যদিকে তাকিয়ে বললাম,
–আমাদের বিয়ের কাবিন ছিল দশ লাখ টাকা। ওই টাকাটা আমার চাই। কালকে ব্যাংক আওয়ারে আমাকে টাকাটা দিয়ে দেবে তুমি!
নিয়ন থতমত খেয়ে গেল। বিস্মিত গলায় বলল,
–এটা তোমার জরুরি কথা ছিল? এজন্য আমাকে ডেকেছ?
–হুম!
–টাকাটাই শুধু চিনলে!
নিয়নের গলায় অভিমান।
আমি দাঁত কিড়িমিড়ি করলাম,
–একদম ন্যাকামি করবে না। বিয়ে করার সময়ে মনে ছিল না, দেনমোহর দিতে হবে? আমি অত্যন্ত অসৎ, মিথ্যাবাদী, জালিয়াত ধরণের মেয়ে! আমাকে নিয়ে তো রিসার্চ করেছিলে, এগুলো তো তোমার জানা থাকা উচিত!
নিয়নের গলায় আনন্দ খেলল,
–বিয়েটা করেছিলাম বলেই তো তুমি অপেক্ষা করেছিলে, নইলে কবে কোন জান কলিজার গলায় মালা দিয়ে দিতে!
আমি বললাম,
–আমাদের কথা হয়েছিল, আমরা এই বিয়ের কথা মুখে আনব না!
–তাহলে দেনমোহরের প্রশ্নও আসছে না!
নিয়ন কাঁধ নাচাল।
আমার মেজাজ খারাপ হলো খুব। রাগ করে ওর হাত কামড়ে দিলাম। নিয়ন ব্যথায় কাতর হয়ে গেল। মুখ লাল করে বলল,
–তুমি তো অনেক দুষ্টু, রুমঝুম!
বলতে বলতে আমাকে টেনে নিলো। সন্ধে নেমেছে অনেকক্ষণ। নিয়ন জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমি নিজেকে মুক্ত করতে চাইলে ওর আলিঙ্গন আরো শক্ত হলো। ফিসফিস করে বলল,
–ওখানে অনেক কষ্ট হয়েছে, রুমঝুম। আমার মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাচ্ছি। ভয়ংকর দমবন্ধ লাগত। মনে হতো, আর কোনদিন তোমাকে দেখতে পাব না। তুমি ছাড়া নিজের মানুষ আমার যে আর কেউ নেই! আরেকটু সময় কাছে থাকো, প্লিজ!
আমি ঢোঁক গিললাম। এই মানুষটা এতখানি কাছাকাছি এলে, আমি যে ভেসে যাই! জোর করেই ছাড়িয়ে নিলাম নিজেকে। নিচে নামতে নামতে ফিরে গেলাম। আরেকবার ভেসে যেতে ইচ্ছে করল। ওকে জড়িয়ে ধরলাম, গলা পেঁচিয়ে ধরলাম। ফট করে গালে একটা চুমু দিলাম।
নিয়ন বিড়বিড় করল,
–এইটুকু? এইটুকুতে কিছু হয় না, রুমঝুম! তোমার শেখা দরকার, চুমুর জায়গা এটা নয়!

পরিশিষ্টঃ

আমার দিনগুলো ভীষণ ব্যস্ততায় কাটছে। দেনমোহরের টাকাটা সম্পূর্ণ ব্যবসায় লগ্নি করেছি। বাজারে দোকান নিতে হয়েছে। দশজন কারিগর দিনরাত কাজ করছে। বাচ্চাদের পোশাকের ছোটো ছোটো কয়েকটা অর্ডার পেয়েছি। তাতেই নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়!
দুদিন হলো নিয়ন লাগেজ টাগেজ, একটা ফোল্ডিং বিছানা নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসে উঠেছে। ঝগড়া করেও লাভ হয়নি। আমাকে যুক্তি দেখাল,
–মনে করো আমাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে! সেরকমই তো, তাই না? এখন প্রেম করতে তো হবে!
ন্যাকামি দেখে আমার গা জ্বলে গেল!
ও আমার বোনেদেরকে ঘুষ দেয়। একবার দুলাভাই বলে ডাকলে প্রতিবার পাঁচশো টাকা পুরষ্কার।
রাতে কাজ করছি, ও দোকানে এসে হাজির। চিন্তিত কপালে ভাজ ফেলে, মুখটাকে সরু করে বলল,
–রুমঝুম, জান-কলিজা লেখা কালপ্রিটটা যে কে এখনো বের করতে পারিনি। আমার সূক্ষ্ম সন্দেহ হচ্ছে, ওই কাজটা তোমারই! তুমি অনেক দুষ্টু – ঝুমকি, চৈতি, ছুটকি ওরা কত সুইট!
আমি চোখ দিয়ে ভর্ৎসনা করি ওকে।
রাতে ঘুমাতে গেলে নিয়ন কাঁথা বালিশ নিয়ে আমার বিছানায় চলে এলো। আমার গা ঘেঁষে শুয়ে পড়ল!
বিছানাটা ছোটো। আমার আর ছুটকির জায়গায় হতে চায় না। আমি রেগে গিয়ে বললাম,
–মাঝখানে শুতে পারি না আমি। আমার দমবন্ধ লাগে। তুমি যেখানে শুয়েছিলে সেখানে যাও।
নিয়ন ঘুমঘুম গলা করে অভিনয় করে, আমার কোমর জাপটে ধরতে ধরতে বলল,
–তোমার আর আমার মধ্যে কোন কেমিস্ট্রি নেই, রুমঝুম! একসাথে দেখেও কেউ বুঝতেই পারে না, আমাদের বিয়ে-টিয়ে হয়ে গেছে। একটু কোঅপারেট করো! আমাদের মধ্যে প্রেম হোক।
আমি রেগে গিয়ে উঠে বসলাম। ধমক দিয়ে বললাম,
–আমি আগেই বলেছিলাম, এখন কোনো ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি কিছু হবে না!
–এত রুটিন মেনে প্রেম হয়?
–লাগবে না আমার প্রেম!
নিয়নও উঠে বসল। চোখ পাকিয়ে বলল,
–সত্যি করে বলো, রুমঝুম, তোমার মনে অন্য কিছু নেই তো? অন্য কেউ?
মা উঠে আসে। পাখার ডাঁটি দিয়ে আমাকে দুটো মারে, নিয়নকেও দুটো ঘা দেয়!
কড়া গলায় বলে,
–এতগুলো অবিবাহিত ছোটো বোন ঘরে, তার মধ্যে এই দুইটার বেহায়াপনা শুরু হয়ে গেছে! কালকেই আমার ঘর ছাড়বি তোরা?
আমি শুয়ে পড়তে পড়তে বললাম,
–একদম ঠিক হয়েছে, আরো করো কেমিস্ট্রি! কালকেই নিজের বাড়ি যাবা তুমি!
মা বলল,
–তোদের দুইজনকেই বলছি। নিজেদের রাস্তা দেখো, বাপু!
আমি উঠে বসলাম,
–আমি কিছু করিনি, মা।
আঙুল দিয়ে অপরাধী দেখিয়ে দিলাম,
–ওই আমাকে বিরক্ত করছে।
স্বাক্ষীও টানলাম,
–ছুটকি, বল? আমি তোর কাছে শুয়ে ঘুমিয়ে গেলাম না?
ছুটকি একগাল হেসে অবলীলায় বলল,
–দুইজনেই প্রেম করছে, মা! আমি কত বললাম, মা এসে পড়বে। শুনলই না। রুমকিই দুলাভাইকে যেতে দিলো না!
ঝুমকি আর চৈতি হেসে ফেলল শব্দ করে।
নিয়নও সায় দিলো,
–মা, আপনি ঠিক বলেছেন। কালকেই ওকে নিয়ে চলে যাব আমি। যার যার নিজের ঘরে থাকা উচিত। বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের আর বাপের বাড়িতে থাকতে হয় না। বিবাহিত মেয়েরা ছোটোদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে।
আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। মাকে বললাম,
–মা, যাও ঘুমাও। ও ওর বিছানায় চলে যাচ্ছে।
মা বলল,
–তুই শুনিস নাই, আমি কী বলেছি? বিয়েধারী মেয়ে, নিজের সংসার করবি। তা না, বোনগুলারে নষ্ট করছে।
আমি হাই তুললাম,
–করব তো। সংসার করব। না তো করিনি। ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেছে। আরেকটু…। এরপর এমন সিস্টেম করে দেবো, তুমিই দেখাশোনা করতে পারবে। ঝুমকি কোথায় ভর্তি হয় সেটাও দেখে নিই।
–লাগবে না। তুই আগে আমার ঘর ছাড়বি।
আমি শুয়ে পড়েছিলাম। লাফ দিয়ে উঠলাম,
–তারপর তুমি কেঁদেই মরে যাবে, মুন্সীর মেয়ে! এখন এত খুঁচিও না। দেখবে সত্যিই কাল না হলেও পরশু আমি নেই!
মা আর কথা বলল না। ঘর ছেড়ে চলে গেল। আমি জানি, এখন এই মহিলা আঁচলে ঘন ঘন চোখ মুছবে।
বেশিদিন এই খুনসুটি চলল না। নিয়ন খুব তাড়াতাড়ি আমার পাসপোর্ট ভিসা করিয়ে ফেলল। দেশ ছাড়ার আগে আগে কয়েকদিন মা খুব উৎসাহ দেখাল। এটাসেটা গুছিয়ে দিলো। একদম শেষদিনে ভেঙে পড়ল। নিয়নের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–রুমকি অনেক চাপা। সব কথা বলতে পারে না। তুমি বুঝে নিও ওকে। ওর উপরটা শক্ত, ভেতরটা খুব নরম। নিজেকে শক্ত দেখাতে গিয়ে অনেক কঠিন কঠিন কথা বলে। তুমি কষ্ট পাবা না ওর কথায়, আর ওকেও কষ্ট দিও না।
আঁচল পেতে দিয়ে বলল,
–আমি বুক খালি করে তোমাকে দিয়ে দিলাম। যদি কোনোদিন ওকে আর পছন্দ না হয়, আর ভালো না লাগে, ওকে কষ্ট দিও না, এই আঁচলে ফিরায়ে দিও। আমার বুকের ধন আমি বুকে করে রাখব!
আমি ফুঁপিয়ে উঠি,
–তুমিই তো আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ!
মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।
বড়োচাচা আসেন আমাকে এগিয়ে দিতে। নিয়নের হাত ধরে বলেন,
–কালামানিকটারে নিয়ে যাচ্ছ! ওর কদর কইরো। আর পড়াশোনা করাইও ওকে। এত ভালো মাথা ওর, অপচয় করা উচিত না। ওর অনেক জেদ। তাল মিলায়ে দুইজনে মিলঝিল করে থেকো!
চৈতি ফিসফিস করে বলল,
–ছুটকিটা সারাদিন ফোনে কী যেন করে। ওকে ফোন ধরতে মানা করে দিও, বড়ো আপা!
ঝুমকি লাল লিপস্টিকে আমার ঠোঁট রাঙিয়ে দিয়ে বলল,
–তোর ঠোঁটে লালের শেডগুলো খুব সুন্দর যায়, বড়ো আপা!
ছুটকিটা উড়ে আসে,
–রুমকি, তুই সবার আগে আমাকে নিবি না তোর কাছে? নাকি চৈতিকে নিবি? চৈতি কিন্তু তোর ব্যাগ থেকে টাকা সরায়! মিথ্যাবাদী আর চোর একটা!
আমি জড়িয়ে ধরি ওদেরকে। কেমন করে বাঁচব এদেরকে ছাড়া?
রাস্তায় বেরিয়ে মনসুর ভাইকে খুঁজি আমি। পাই না। চায়ের দোকানে উঁকি দিই। বাজারের সেলুনে খুঁজি। মনসুর ভাই নেই।
আমার কান্না পায়। আমার আগুনের দিনগুলো ফুরিয়ে গেছে। তাই মেঘের আনাগোনাও বন্ধ হয়ে গেছে! সেই মেঘে কোনোদিন বৃষ্টিও ঝরে না!
এয়ারপোর্টে ঢুকতে ঢুকতে মনসুর ভাইয়ের দেখা পেলাম। ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি গাড়ি থামিয়ে লাফ দিলাম। মনসুর ভাইও এগিয়ে এলেন, স্বভাবসুলভ হেসে বললেন,
–কী ভাবছিলা? তুমি যাওয়ার আগে আমি আসব না? ফাঁকি দেবো?
আমি কেঁদে ফেললাম। আকুল হয়ে কাঁদলাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
–আপনার জন্য শার্ট বানিয়েছিলাম। কতদিন ব্যাগে নিয়ে ঘুরছি। আপনি শুধু পালিয়ে বেড়ান।
শার্টটা নিয়েই পরে ফেললেন মনসুর ভাই। বললেন,
–ভালো ফিট হয়েছে তো! মাপ নিলা কখন? একদম পয়েন্টে পয়েন্টে মিলল কীভাবে?
আমি হেঁচকি তুলে বললাম,
–আন্টির কথা শুনবেন। বিয়ে করবেন। আমাকে বিয়ের ছবি পাঠাবেন।
–তুমি খুশি পাবা?
–অনেক খুশি হব।
–তাহলে যাও। বিয়ে করব কথা দিলাম।
জসীম ভাইয়ের চোখে পানি। বললাম,
–আপনি কাঁদেন কেন?
–তুমি যে কানতেছ, রুমকি আপু!
–নেশা করা ছেড়ে দিয়েন। ভাবি কষ্ট পায়। আর এসব আড্ডাবাজি বাদ দিয়ে আপনারা কাজে মন দেন।
নিয়ন এগিয়ে এলো। মনসুর ভাইয়ের সাথে হাত মেলাল। মনসুর ভাই ওকে বলল,
–মেয়েটা অনেক দুঃখ দেখেছে। আর যেন নতুন করে কোনো দুঃখ না চেনে! ওকে দুঃখ চিনতে দিও না, ভাই!
আমি বললাম,
–আপনার বাবার অনেক টাকা। হানিমুন করতে লন্ডন যাবেন। আমাকে দেখে আসবেন। আমি নিজের হাতে আপনাকে চা করে খাওয়াব!
মনসুর ভাই হাসলেন,
–ভালো থাইকো, রুমকি!
আমি আর পিছু ফিরে তাকালাম না, মনসুর ভাইয়ের চোখে জল দেখলে আমি আবার কেঁদে ফেলব। নিয়ন আমাকে শক্ত করে ধরল।
আমি একটু একটু করে এগিয়ে যেতে থাকলাম আমার নতুন জীবনের দিকে।
আমার জীবনে সুখগুলো কি এবার বৃষ্টি হয়ে ঝরবে?

সমাপ্ত
আফসানা আশা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here