রইলো_তোমার_নিমন্ত্রণ। [০৮]

#রইলো_তোমার_নিমন্ত্রণ।
[০৮]

শিমলার বিয়ের দিন আরাভ ও দিগন্ত দুজনেই যায় ময়মনসিংহ। ইউনুস হোসাইন আরাভের সাথে দিগন্তের পরিচয় করিয়ে দেন। দিগন্ত একমনে আরাভের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আরাভকে তার মনে ধরে বেশ। মনে মনে বলে, ” সত্যিই ভূমি আরাভের মতো ছেলেঠ ডিজার্ব করে।” দুজনের মাঝে কথা হয় বেশ। তবে সবটাই হয় ভূমিকে ঘিরে। ভূমির ছোটবেলা নিয়ে। দিগন্তের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে আরাভ। আর মনে মনে ভাবছে, ভূমির সাথে যদি তার ছোটবেলায় দেখা হতো ” দিগন্তকে বেশ ভালো লেগেছে আরাভের। কিছুসময়ের মাঝে দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। তন্ময় দুজনের মাঝে বসে কথা শুনছে। ওর দৃষ্টি একবার আরাভের দিকে তো একবার দিগন্তের দিকে। এদের দুজনের-ই ভূমিকে নিয়ে বেশ আগ্রহ।

বেশ অনেকটা পর ভূমি আসলো ওদের কাছে। ভূমিকে দেখে স্তব্ধ আরাভ। স্থান কাল পাত্র ভুলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ভূমির দিকে। ভূমি আজ নীল শাড়ি পরেছে তার সাথে ম্যাচিং জুয়েলারি। মুখে হালকা মেকাপ। খোলা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠময়। কিছু কাধের একপাশ দিয়ে রেখেছে। আরাভ ভূমিকে পা থেকে মাথা অব্ধি অবলোকন করে নিলো। ভূমির গলায় থাকা তিলটার দিকে চোখ পরতেই কেপে উঠলো আরাভের শরীর। শুকনো ডুক গিলে নিজেকে সংযোত করে তাকালো ভূমির মুখের দিকে। ভূমির মধ্যে কিছু একটা কম আছে। ওর সাজ সম্পূর্ণ লাগছে না। কিছু একটা ভেবে মৃদু হাসলো আরাভ। চোখের ইশারা নিজের পাশটা দেখিয়ে বসতে বলল ভূমিকে। ভূমি মৃদু হেসে আরাভের পাশে গিয়ে বসলো। দিগন্ত এতক্ষণ ধরে ওদের লক্ষ করছিল। ভূমি দেখে দিগন্তের দৃষ্টি থেমে গেলেও সে নিজেকে সামলে নেয়।একবারের জন্যেও তাকায় না ভূমির দিকে। যে মানুষটা ওর নয় তার জন্যে মায়া সে বাড়াতে চায়না। “যেখানে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই সেখানে মায়া কাটাতে শিখতে হয়।” ওদের দুজনকে এমনভাবে দেখে অধোর প্রসারিত হয় দিগন্তের।

ভূমির পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছে আরাভকে আর সবার সাথে পারিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আরাভ ভূমির সাথে পা মিলিয়ে হাটছে আর ভূমির কথা শুনছে। বর আসার হট্টগোল শুনা গেল। বাড়ির সকলে বাগানে চলে যায়। ভূমি যেতে চাইলে আরাভ ওকে আটকে দিয়ে একটা রুমে নিয়ে আসে। তারপর ভূমিকে সামনে দাঁড় করিয়ে ওর দিকে একপলকে তাকিয়ে থাকে। উড়না দিয়ে মাথায় ঘুমটা তুলে নেশালো কন্ঠে বলে,

“তুমি শিল্পীর তুলিতে আঁকা দূর নীলাচলের নীল ঘাস ফুল।না না তুমি নিবিড় নীলের নীল অভিলাষী
নীল জলের নীলোৎপল।
তোমার দিকে অনিমেষ দৃষ্টিতে
আকাশ হয়ে পড়ে নীলশূন্য।
মৌণ দেহের ভাঁজে নীলাম্বরী শাড়ির ছাড়া আঁচলে
তুমি তখন শরতের নীলিমায় নীল প্রজাপতি।
তোমার নীল শাড়ির সুখে আকাশ খুঁজে পায় নীলিমা,
বিশুদ্ধ আত্মার ঘ্রাণে, ময়ূর ফিরে পায় সৌন্দর্যের নীল দেহ।
নীলাদ্রিতা,
মাছরাঙার নীল ছুঁয়ে নীল শাড়িতে তুমি,
তোমার চপল চোখের রক্তিম ঠোঁটের হাসিতে
ঝরে পরে দুস্পাপ্য নীল জোছনা।
নীল বসনে তুমি, নীলে ভরা সুন্দর।
তুমি মরক্কোর নীল শহরে, নীলের রাজত্বে পূর্নিমার নীল চাঁদ।
তুমি বসন্তের নীলমনি লতা, তুমি গ্রীষ্মকালের নীলচে ‘লোবেলিয়া’।
তুমি নীল তাপসী, নীল মনিহার, নীল আকাশের নীলাঞ্জনা।
তোমার নীলিম শাড়ির আঁচলের ভাঁজে
লুকানো কবির নীল কবিতা।”

আরাভের হাত ভূমির আঁচল ভেদ করে কখন ভূমির গাল স্পর্শ করেছে জানা নেই। আরাভের এক হাত ভূমির গালে অন্যহাত কোমড়ে। মোহনীয় দৃষ্টিতে ভূমির মুখপানে তাকিয়ে আছে আরাভ। ভূমির দৃষ্টি আরাভের চোখের দিকে। আরাভের আফিম মেশানো কন্ঠের নেশায় বুদ হয়ে গেছে। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আরাভের দিকে। আরাভ ক্রমশ ভূমির কাছে আসতে থাকে। দুজনে মাঝে দূরত্ব খুব কম। আরাভের ওষ্ট ভূমির ওষ্টের বরাবর আসতেই আরাভের সেলফোন বেজে উঠে। কেপে উঠে দুজনেই। বাস্তবে ফিরতেই লজ্জা রাঙা হয়ে যায় ভূমি। কি করতে যাচ্ছিল সে? দুজনে এত কাছাকাছি ভাবতেই ব্লাশ করতে থাকে।আর আরাভ অধোর কামড়ে ধরে লম্বা শ্বাস টেলে কল রিসিভ করে বারান্দায় চলে যায়। কথা বলা শেষ করে অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে ভূমির সামনে দাঁড়ায়। তারপর বলে,

” স,, স, সরি। আমি বুঝতে পারিনি কি করে তোমার এতটা কাছে,,,, সরি।”

আরাভের অবস্থা দেখে ভূমির হাসি পাচ্ছে। সে নিজের হাসি চেপে বলল,
” সরি বলতে হবে না স্যার। ভুল আমারও ছিলো।” ভূমিও মাথা নিচু করে রইলো।

ভূমির কথায় আরাভ মনে হয় স্বস্তি পেল। সে ভূমির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বলল,
” তাহলে বলতে চাইছো তুমিও এডেক্টেড।”
” জ্বি স্যার। না মানে স্যার,,,
” আচ্ছা আমি বুঝতে পেরেছি।”
” কি বুঝতে পেরেছেন।”
ভূমির কথা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আরাভ ভূমির হাত দুটো মুষ্ঠিবদ্ধ করে নেয়। তারপর ভূমির চোখে চোখ রেখে বলে,

” এখানে কিন্তু তুমি আমার ছাত্রী নও আর আমিও তোমার স্যার নই। তাই কথা শুরু করার আগে পরে স্যার ডাকবে না।”

” তাহলে কি বলে সম্বোধন করবো?”

” নাম ধরে ডাকবে আমার।

” আপনার নাম ধরে ডাকবো!”

” হুম। কারন সেই অধীকার তোমার আছে।”

ভূমি হাস্যউজ্জল মুখে তাকিয়ে রইলো আরাভের দিকে। আরাভের অধোরেও হাসি। ভূমি নিজের হাত ছাড়িয়ে আরাভের আরো কাছে এলো। পায়ের উপর পা রেখে আরাভের গালে নিজের ওষ্ঠের স্পর্শ দিয়ে অধোর প্রসারিত করে সেখান থেকে প্রস্থান করলো। আরাভ অবাক, নির্বাক, স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো ভূমির চলে যাওয়ার দিকে। ভূমি চোখের আড়াল হতেই আরাভ নিজের হাত রাখলো গালে, তারপর বলল,
” ও এটা কি করলো। কিছ, কিছ করলো আমায়।”

শব্দকরে হাসলো আরাভ। হাসিমুখে সেও বেড়িয়ে গেল।

____________________________
ভূমির ওর নানার বাড়ি থেকে ফিরেছে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই সপ্তাহে আরাভ আর ভূমির সম্পর্ক এগিয়ে গেছে অনেকটা।কলেজ শেষ কফিশপে বসে কফি খাওয়া তারপর আরাভ নিজে ড্রাইভ করে ভূমিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। রোজরাতে ওদের নিয়ম করে কথা। আরাভ নিজের কাজ শেষে অপেক্ষায় থাকে কখন ভূমি কল করবে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাড়াতাড়ি নিজের কাজ শেষ করে বেলকনিতে বসে সিগারেটের ধোয়া উড়াচ্ছে আরাভ আর একটু পর পর মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকাচ্ছে। প্রায় অনেক্ষন হয়েগেছে ভূমি কল করছে না। আরাভ একটা সিগারেট শেষ করে আরেকটা হাতে নিলো। অস্বস্তি হচ্ছে খুব। মাথাটাও ভিষন ব্যাথা করছে। আজ কাজের প্রেশারটা তুলনামূলক ভাবে বেশী ছিলো। তুহিন নেই ওর দিকটাও আরাভকে সামলাতে হয়েছে। প্রায় কুড়ি মিনিট পর ভূমির নাম্বার থেকে একটা মেসেজ আসলো,

” কাল এসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। আজ কল দিতে পারবো না আপনি ঘুমিয়ে পরুন।”

ভূৃমির মেসেজ দেখে ব্যাথিত হলো আরাভ। চোখ বন্ধকরে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেলকনি ছেড়ে বিছানায় আসলো। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে আরাভ। ঘুমানোর চেষ্টা করেও পারছে না। এদিকে মাথা ব্যাথাটাও বেড়ে চলেছে। বেশ অনেকক্ষণ পর যখন ঘুমাতে ব্যর্থ আরাভ তখন উঠে বসে ভূমির নাম্বারে কল করলো। রিং হতেই কল রিসিভ করে ওপাশ থেকে ভূমি বলল,
” আরাভ, আপনি কল করেছেন কেন? ওপাশে সব ঠিক আছে তো। সবাই ঠিক আছে।”

” না ঠিক নেই। আমি ঠিক নেই। প্রিজ নীলাদ্রিতা, কথা বলো আমার সাথে। দশ মিনিট।”

” আপনার শরীর ঠিক আছে তো আরাভ? কন্ঠটা এমন লাগছে কেন?”

“কথা বলো দশ মিনিট সব ঠিক হয়ে যাবে।”

আরাভ এমন ভাবে বলল ভূমি আর কিছু বলতে পারলো না। দুজনের কথা চলল। দশ মিনিট বলে মিনিটের পর মিনিট কথা চলল।

রাতে আরাভের সাথে কথা বলায় নিজের এসাইনমেন্ট কমপ্লিট করতে পারেনি ভূমি। ভোর চারটার এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিল ভূমি। সেই ভোরে উঠে এসাইনমেন্ট শেষ করে মাত্র টেবিল ছেড়েছে। ঘরিতে তখন বাজে নয়টা। এবার ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে কলেজের জন্যে তৈরী হবে। ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই ভূমির সেলফোন বেজে উঠলো। বিছানা থেকে মোবাইল হাতে নিতেই দেখলো স্কিনে আরাভের নামটা জ্বলজ্বল করছে। ভূমি কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আরাভ অস্থির, ভয় আর ভীতি কন্ঠে বলে উঠলো,

” এখুনি কলেজে যাবে তুমি আর দিয়ার সাথে থাকবে। দিয়া কোথায় যায় আর কার সাথে দেখা করে সবটা খেয়াল করবে। মনে থাকবে।”

” কি হয়েছে দিয়ার?”

” তুমি যদি দিয়ার সাথে থাকো তাহলে কিছু হবে না অন্যথায় অনেক বড় বিপদ ঘটতে চলেছে। তুমি ওর খেয়াল রাখবে কেমন।”

” আচ্ছা।”

আরাভ কল কাটতেই ভূমির গভীর চিন্তায় পরে যায়। দিয়াকে কল করে ওর সাথে কথা বলে নেয়। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে দিয়ার কোন ক্ষতি সে হতে দিবে না। কিন্ত কে জানতো তার চোখের সামনে এমন একটা ঘটনা ঘটবে।

চলবে,,,,,,

Mahfuza Afrin Shikha.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here