Saturday, May 2, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প শিউলিবেলা শিউলিবেলা পর্বঃ১৫

শিউলিবেলা পর্বঃ১৫

0
906

শিউলিবেলা
খাদিজা আরুশি আরু
পর্বঃ ১৫

-“তোকে এ শহর ছাড়তে হবে। তুই পিথিউশার সামনে গেলে ও কখনোই অতসীকে বিয়ে করতে আগ্রহ দেখাবে না। কিছুক্ষণ আগে আমি তোর নানা-নানুর সঙ্গে কথা বলেছি, অতসীর বিয়ে পাকা হলেই তুই নানাবাড়ি চলে যাবি। তোর নানা সেখানকার হাইস্কুলে তোর চাকরির ব্যবস্থাও করে দেবেন। তারপর ওখানেই কাউকে দেখে-শুনে বিয়ে করে থিতু হবি। এদিকে তোর আসার প্রয়োজন নেই…”

কয়েক ঘন্টায় মা এতোসব ব্যবস্থা করে ফেললো! ভেবে পাচ্ছে না অরিত্রী, তার কি অবাক হওয়া উচিত? নাকি নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য কান্না করা উচিত? নিরবে বের হয়ে গেলো সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো, “এ শহরে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।”

২০
হাসপাতালের করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে পিথিউশাকে উদভ্রান্তের মতো ছুটে আসতে দেখে আড়ালে দাঁড়ালো অরিত্রী। পিথিউশা অতসীর কেবিনে ঢুকতেই বেরিয়ে এলেন মিনতি রহমান। অতসীর একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে পিথিউশা বললো,

-“একদম ভয় পাবেন না অতসী, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি তো…”

অতসীর ঠিক কি বলা উচিত সে বুঝতে পারছে না, এ মানুষটাকে সে কোনো একটা পার্টিতে একদিন দেখেছিলো। কিন্তু ক্লিয়ারলি কিছু মনে করতে পারছে না… মা বলেছে, এ মানুষটা তাকে বাড়িতে ফুল আর চিঠি পাঠিয়েছে। অরিত্রীর কাছে অবশ্য আগেও এ জাতীয় কিছু একটা শুনেছিলো সে, তবে আশ্রমের ব্যাপারটা আজই মায়ের মুখে প্রথম শুনলো। এ মুহূর্তে পিথিউশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকে ভরসা করতে ইচ্ছে করছে, মা বলেছে, অরিত্রীকে অতসী ভেবেই মনের কথা ব্যক্ত করেছে পিথিউশা। অতসী আলতো হাতে পিথিউশাকে জড়িয়ে ধরলো, তার বুকে মাথা রেখে হয়তো পিথিউশার ভালোবাসাকে পরখ করার চেষ্টা করলো। দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলো অরিত্রী, অতসীকে পিথিউশার বাহুডোরে দেখে নিরবে সরে এলো সে। দূর থেকে দেখলো, পিথিউশা মিনতি রহমান আর আতিকুর রহমানের সঙ্গে কোনো প্রসঙ্গে কথা বলছে। তারপর বিদায় জানিয়ে চলে গেলো… পিথিউশার প্রস্থানের পরই অরিত্রী মা-বাবার কাছে এগিয়ে যায়, অরিত্রীকে দেখে মিনতি রহমান বলেন,

-“পিথিউশা বলেছে, আগামী শুক্রবার ওর পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসবে। বাগদানের কাজ সম্পন্ন করে বিয়ের দিন তারিখও পাকা করে যাবেন ওনারা…”

অরিত্রী মা-বাবার চেহারার আনন্দটা উপলব্ধি করতে পারছে কিন্তু উপভোগ করতে পারলো না। কি করে পারবে, সে যে তাদের খুশি করতে গিয়ে নিজের শেষ স্বপ্নটাও বিসর্জন দিয়েছে। মিনতি রহমান আবার বললেন,

-“তুই তাহলে বাসায় গিয়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফেল, কাল সকাল সকাল রওয়ানা দিয়ে দে। এ মুহূর্তে তোর এ শহরে থাকাটাও রিস্ক…”

অরিত্রী কিছু বললো না, নিরবে বেরিয়ে গেলো। বাড়ি গিয়ে লম্বা সময় নিয়ে গোসল করলো, ব্যাগ গুছালো। কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতেই বেরিয়ে পড়লো নানাবাড়ির উদ্দেশ্যে। যাবার আগে স্কুলে রেজিগনেশন লেটার মেইল করে দিতেও ভুললো না। অমিতকে বাসস্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছুটা অবাক হলো অরিত্রী, এগিয়ে এসে অরিত্রীর ব্যাগটা নিলো অমিত। শান্তস্বরে বললো,

-“তুই কাজটা ঠিক করছিস না ছোটপু। তোদের দুজনের অস্তিত্বের কথা জানার অধিকার পিথিউশা ভাইয়ার আছে। তোর কি মনে হয়, তুই চলে গেলেই সব সমাধান হয়ে যাবে? না আপু, মায়ের কথা শুনে বড়পু ভাবছে পিথিউশা ভাইয়া তাকে ভালোবাসে। অথচ কথাটা সম্পূর্ণভাবে সত্যি না। পিথিউশা ভাইয়া যে মানুষটাকে চিনেছে, যে মানুষটা তাকে কাছ থেকে দেখেছে সে বড়পু নয়। এখন কিংবা বিয়ের পর, একটা সময় পিথিউশা ভাইয়া পার্থক্যটা টের পাবে। তখন বড়পু বা ভাইয়া কেউই সুখী হবে না। তোর ত্যাগটারও কোনো গুরুত্ব থাকবে না, কারন যে ত্যাগের ফলে দুজন মানুষক আমরণ একটা সম্পর্কে বাঁধা পড়ে যায় সে ত্যাগ মূলত ভিত্তিহীন। মা-বাবা মিলে তোদের তিনজনের জীবন নষ্ট করছে, আর তাতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করছিস তুই। ভিকটিম তুই না, ভিকটিম বড়পু আর পিথিউশা ভাইয়া। বড়পু সম্পূর্ণ সত্য জানে না আর ভাইয়া কিছুই জানে না।”

বাস চলে এসেছে, যাত্রীরা একে একে নিজেদের সিট খুঁজে নিচ্ছে। অরিত্রী অমিতের কথার প্রত্যুত্তরে কিছুই বলে না, কেবল ধীর পায়ে বাসের দিকে এগিয়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে আসে, অমিতকে জড়িয়ে ধরে বলে,

-“মা-বাবার খেয়াল রাখিস, নিজে ভালো থাকিস। আপু যা জানে না তা আপুকে জানতে দিস না। পিথিউশাকে সত্যটা জানানোর প্রয়োজন নেই, ওনার ভাগ্যে থাকলে উনি নিশ্চয়ই একদিন সবটা জানবেন… আসছি।”

অমিত কিছু বলে না, অরিত্রী চলে যাচ্ছে। তার ছোটপু চলে যাচ্ছে… দূর থেকে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য নিরুপায়ের মতো দেখছে অমিত। মনে মনে চাইছে তার ছোটপু না যাক, আবার বড়পুর কথা ভেবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এমনটা কেনো হলো তার দু’বোনের সঙ্গে? সে ভাই হয়ে বোনদের জন্য কিছু করতে পারলো না কেনো? বিধাতা তাকে আজ এতোটা নিরুুপায় না করলেই কি পারতেন না!

২১
বহুদিন যাবত ঈশানের কোনো খোঁজ নেই দেখে কিছুটা অবাক হলো অতসী। তবে কি তার এক্সিডেন্টের কথা জেনে গেছে? মুখে দাগওয়ালা মেয়েকে নিজের ভাইয়ের বউ হিসেবে চায় না সে? হাজার প্রশ্ন অতসীর মাথায় গিজগিজ করছে, থাকতে না পেরে কল করলো নিজেই। দু’বার রিং হতেই ফোন রিসিভ করলো ঈশান, বললো,

-“কেমন আছেন ভাবী? বিয়ে করবেন না, করবেন না করে শেষমেশ আমার ভাইয়ের গলায়ই ঝুলে পড়লেন?”

কিছুটা অবাক হয়ে অতসী জিজ্ঞেস করলো,

-“আপনার ভাই?”
-“হুম, আমার ভাই। পিথিউশা হক… অভিনন্দন ভাবী। আপনাদের এংগেজমেন্টের দিন দেখা হচ্ছে।”

কথাটা বলেই কল কেটে দিলো ঈশান, স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো অতসী। শেষমেশ কিনা ঈশানের ভাইয়ের সঙ্গেই তার গাট বেঁধে দিলো বিধাতা!

বাগদানের দিন অতসীকে পিথিউশার পাশে দেখে ঈশানের বুকের বা পাশে কিছু একটা সূঁচের মতো বিঁধছিলো। তাই ছাদে চুপচাপ চলে গিয়েছিলো সে… এক কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনছিলো ঈশান, সিঁড়িতে কারো পায়ের শব্দ শুনে একটু আড়ালে চলে গেলো সে। বড় ভাইয়ের বিয়ের দিন ছোট ভাইয়ের দূরে-দূরে থাকা নিশ্চয়ই অন্যরা ভালো চোখে দেখবে না। পিথিউশা আর অতসীকে দেখে আবারও বিষন্নতা এসে গ্রাস করলো ঈশানকে। অতসী পিথিউশাকে জড়িয়ে ধরেছে, পিথিউশার বুকে মুখ ঘষছে অনবরত। আজ সম্ভবত পূর্ণিমা, চাঁদের আলোয় দুজনকে দেখে যে কেউ রাজযোটক বলে মন্তব্য করতে ভুলবে না। কিন্তু ঈশানের অবচেতন মন এ দৃশ্য দেখে বিদ্রোহ করতে চাইছে, তার কিছু ভালো লাগছে না। বিনা শব্দে নিচে চলে গেলো ঈশান, এখানে আর এক মুহূর্ত থাকলে দম বন্ধ হয়ে যাবে তার। এতো মন পুঁড়ছে কেনো আজ?

অতসীকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো পিথিউশা, অতসী আবারও এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো। এবার অতসী একটা গুরুতর কাজ করলো, পিথিউশার পাঞ্জাবীর কলার ধরে তার পায়ের পাতায় দাঁড়ালো। পিথিউশাকে কাছে টেনে চুমু খেতে চাইলো… তড়িৎবেগে অতসীকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিলো পিথিউশা। তার দৃষ্টিতে অবিশ্বাসের ছায়া। পিথিউশা খুব কষ্টে গলা দিয়ে শব্দ বের করে বললো,

-“আপনাকে আজ এতো অচেনা লাগছে কেনো অতসী? আপনার মধ্যকার সংকোচ, লজ্জা, আড়ষ্টতা কিছুই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি। যে পুরুষের হাত আজ অবধি ধরলেন না, আজ তাকে চুমু দিতে যাচ্ছিলেন!”

ঘটনার আকষ্মিকতায় অতসী একদম চুপ হয়ে গেছে, তার হাত-পা কাঁপছে। হঠাৎ উচ্চশব্দে হাসতে শুরু করলো অতসী, হাসতে হাসতে কেঁদে ফেললো। ছাদের এক কোনে গুটিশুটি হয়ে বসে বললো,

-“অমিত ঠিক বলেছিলো, আপনি অরিত্রীকে ভালোবাসেন। আমাকে না…”

পিথিউশা পৃথিবী যেনো থমকে গেলো, অরিত্রী! অতসী, অরিত্রী দুজনেই কি এক মানুষ নয়? অতসী আবার বললো,

-“অরিত্রী আমার ছোট বোন, আমরা জমজ। দুজনে দেখতে একই হলেও অরিত্রী খুব সাধারণ জীবন যাপন করতো। আপনি এ বাড়িতে যে চিঠি আর শিউলি ফুল পাঠিয়েছিলেন তা অরিত্রী রাখতো, আমি না। আশ্রমেও আপনি অরিত্রীকে দেখেছিলেন, আমাকে না। আমার সঙ্গে আপনার মাত্র একবার দেখা হয়েছিলো, বৈশাখীর জন্মদিনের পার্টিতে… আপনি যাকে অতসী ভেবে ভালোবেসেছিলেন সে আসলে আমার ছোটবোন অরিত্রী ছিলো।”

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here