Saturday, May 2, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প আমার বোনু আমার বোনু পর্ব-২১

আমার বোনু পর্ব-২১

0
2374

#আমার_বোনু
#Part_21
#Writer_NOVA

পার্কের মধ্যে সবার সামনে, হুট করেই জিবরান, ঊষাকে কোলে তুলে নিলো। ঊষা হকচকিয়ে গেলো। ভাইদের সামনে জিবরান এমন একটা কান্ড করে বসবে তা সে বুঝতে পারেনি। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলো। ইশাত, অরূপ একসাথে ওহো বলে চেচিয়ে উঠলো। ঊষা নামার জন্য মোচড়ামুচড়ি শুরু করতেই জিবরান ধমক দিয়ে বললো,

— একদম নড়াচড়া করবা না। যেভাবে আছো সেভাবেই থাকো। নয়তো ফেলে দিবো।

ঈশান হাত দুটো উপরে তুলে হাই তুলতে তুলতে বললো,
— এটাকে কোলে নেওয়ার কি দরকার? ঐ ঝোপঝাড়ের মধ্যে ফেলে দিয়ে যা।

জিবরান একবার ঊষার দিকে তাকিয়ে ঈশানকে বললো,
— না ভাই! এটাকে ফেলে দিলে পরে আমি কান্না করবো।

অর্ণব, আদিল এক পলক ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো। দ্রুত সেখান থেকে কেটে পরলো, ঊষা লজ্জা পাবে বলে। এক হিসেবে খুশিও হলো। বোনের জন্য সঠিক মানুষ নির্বাচন করতে পেরে। পূর্ব দিকে জিনিয়া, অনল, অথৈ ঘাসের ওপর বসে গল্প করছে আর বাদাম খাচ্ছে। তারা সেদিকে চলে গেলো।

অরূপ আফসোসের সুরে বললো,
— আহা, আজ একটা বউ নেই বলে এভাবে কোলে তুলে ঘুরতে পারি না।

ইশাতও সুর মিলালো,
— ঠিক বলেছিস অরূপ। আজ কেউ নেই বলে।

ইশাতের শেষ কথাটায় আফসোস ফুটে উঠলো।ঈশান তা শুনে বললো,
— কত মেয়ে তোর জন্য পাগল হয়ে আছে। সেখান থেকে একটাকে পাত্তা দিলেই তো হয়। তারিন কিন্তু মেয়ে হিসেবে খারাপ নয়।

অন্যদিন তারিনের কথা শুনলে ইশাত ফোঁস করে উঠতো। কিন্তু আজ তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না। তাতে অরূপ, ঈশান দুজনেই একটু অবাক হলো। অরূপ ভ্রু কুঁচকে বললো,

— ঘটনা কি ইশাত? আজ তারিনের কথা শুনে তোর রিয়েকশন স্বাভাবিক কেন?

ঈশান কাধ দিয়ে ইশাতকে ধাক্কা মেরে অরূপকে বললো,
— কুচ কুচ হোতা হে?

ইশাত কোন উত্তর দিলো না। মুচকি হাসলো। এতেই দুজন ওকে জেঁকে ধরলো। আসল কাহিনি জানতে। জিবরান, ঊষাকে কোলে তুলে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছে। ঊষা নিচুস্বরে জিবরানকে বললো,

— এবার নামিয়ে দিন। আমি হাঁটতে পারবো।

জিবরান চোখ পাকিয়ে তাকাতেই ঊষা চুপ হয়ে গেলো। সব ভাই-বোন এসেছিলো ছুটির দিনে সামনের একটা পার্কে ঘুরতে। হঠাৎ করে একটা ছোট ইটের টুকরোর সাথে ঊষার পা বাকিয়ে মচকে গেছে। তাই সে হাঁটতে পারছিলো না। এই কারণে সবার সামনে জিবরান ওকে কোলে তুলে নিলো।

কিছুদূর যাওয়ার পর সিমেন্টের বসার জায়গা দেখতে পেলো জিবরান। অনেকে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাতে ঊষা অস্বস্তিতে পরলেও জিবরানের কিছু আসে-যায় না। জিবরান সেখানে নিয়ে ঊষাকে বসালো। ওদের ক্রস করে বাদাম ওয়ালা যেতে নিলে তাকে ডেকে বাদাম কিনে নিলো। টাকা পরিশোধ করে ঊষার দিকে বাদাম এগিয়ে দিয়ে বললো,

— নাও বাদাম খাও।

ঊষা নাক কুঁচকে বললো,
— ভালো লাগছে না।

জিবরান ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— পা ব্যাথা করছে?

ঊষা মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। তারপর জিবরানের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়ে বললো,
— এখন ভালো লাগছে।

জিবরানের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা দেখা গেলো। সে এখন মনোযোগ সহকারে বাদামের খোসা ছাড়াতে ব্যস্ত। প্রেয়সী তার কাঁধে মাথা রেখেছে। এতে তার মনে অন্য রকম প্রশান্তি কাজ করছে।

আরান ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই তার মুখে একটা ঘুষি পরলো। তারপর একের পর এক পরতেই থাকলো। সে মার খাচ্ছে তাতে তার কষ্ট নেই। কিন্তু যে মার দিচ্ছে তাকে দেখে সে বেশি অবাক হলো। হাত দিয়ে বাঁধা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— কি হয়েছে ভাই? আমাকে মারছো কেন? কি করেছি আমি?

মাসফি একদফা মেরে হয়রান হয়ে হাঁপাতে লাগলো। আরান পায়ের কাছে বসে জিজ্ঞেস করেই যাচ্ছে,”কি হয়েছে ভাই?” কিন্তু মাসফি কোন উত্তর দিচ্ছে না। রাগে ওর চোখ, মুখ লাল টকটকে বর্ণ ধারণ করেছে। আরান আবারো করুন সুরে জিজ্ঞেস করলো,

— ভাই আমি কি করেছি বলো না? আমার অপরাধটা কি? তুমি আমায় মারলে কেনো?

মাসফি হাত মুঠ করে রাগ কন্ট্রোল করে বললো,
— বাঁচতে চাইলে চোখের সামনে থেকে সর। নয়তো তোর অবস্থা কি হবে আমি নিজেও জানি না।

— আমার অপরাধটাতো বলবে?

মাসফি হুংকার দিয়ে বললো,
— তুই জানিস না তুই কি করেছিস?

আরান মাথা নাড়িয়ে বললো,
— সত্যি আমি জানি না।

মাসফি রাগে আরানের কলার ধরে বললো,
— তুই কোন সাহসে অদিতির ঔষধ পাল্টিয়ে সেখানে ড্রাগ মিশানো ঔষধ রেখেয়েছিস?

আরান যেনো আকাশ থেকে পরলো। কি বলে এসব? সে কেন অদিতির ঔষধ পাল্টিয়ে ড্রাগ মেশানো ঔষধ রাখবে? আরান অবাকের সুরে বললো,

— কি বলছো এসব ভাই? তোমার মাথা ঠিক আছে। আমি অদিতি আপুকে নিজের বোনের চোখে দেখি। নিজের বোনের জন্য আমি এরকম ঘৃণিত কাজ কেন করবো?

— তাহলে অন্য কেউ মেশায়? তুই ঔষধগুলো আনিস। তাহলে অন্য কেউ কিভাবে মিশাবে?

আরান এবার জোর গলায় বললো,
— তুমি এমনটা ভাবলে কি করে ভাই? আমার মাথায় তো এসব খেলেইনি। সেখানে এই কাজ আমি করবো? ঔষধগুলো প্রতিবার পাপা আমার হাতে দিয়ে তোমার এখানে পৌঁছে দিতে বলে। যেভাবে পাপা দেয় আমি সেভাবে তোমার কাছে দিয়ে যাই। আমি একদিন প্যাকেট খুলেও দেখিনি।

মাসফি কপাল কুঁচকে আরানের দিকে তাকালো। আরানের মুখ দেখা বোঝা যাচ্ছে সে মিথ্যে বলছে না। তার চোখ দুটোও তা জানান দিচ্ছে। আর বোনের টেনশনে সে তো তার চাচার কথা ভুলেই গিয়েছিলো। তাহলে কি এসব তার চাচা করেছে?কিন্তু চাচাকে জিজ্ঞেস করতে আরানের নাম কেন বললো? নিজের ছেলেকে ফাঁসিয়ে তার কি লাভ? মাসফির এবার মনে হচ্ছে বিশাল বড় একটা ঘাপলা চলছে তার অগোচরে। এর সন্ধানে নামতে হবে। সবকিছু না জেনে চাচার কথায় আরানকে সে শুধু শুধু মারলো। এগিয়ে এসে আরানকে বুকে জড়িয়ে নিলো। আরান অভিমানী সুরে বললো,

— একদম ধরবে না আমায়। অনেক জোরে মেরেছো।

মাসফি অসহায় চোখে বললো,
— সরি রে ভাই। বোনের চিন্তায় মাথা ঠিক ছিলো না।

— তুমি ভাবলে কি করে আমি এমন কাজ করবো? কোনদিন কি অদিতি আপুকে আমি অন্য নজরে দেখেছি? তাকে আমি নিজের বোন মনে করি।

মাসফির এখন খারাপ লাগা শুরু করলো। বেচারাকে মেরে অবস্থা কি করেছে! দৌড়ে ফার্স্ট এইড বক্স এনে ভাইয়ের সেবা করতে লেগে পরলো। মনে মনে পণ করলো যে সবকিছুর পিছনে আছে তাকে সে খুঁজে বের করবেই। আরান এক দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু আগে ভুল বুঝে মেরে এখন নিজেই এন্টিসেপটিক লাগাচ্ছে। অবশ্য এই জায়গায় মাসফির বদলে অন্য কেউ হলে তাকে মেরে লাশ বানিয়ে ফেলতো আরান। কিন্তু মাসফির গায়ে সে হাত তুলে না। এই ভাই তার কাছে সব। বাবার চেয়ে বেশি সে মাসফিকে ভালোবাসে। বড় ভাইয়ের জায়গাটা যে তাকে দিয়ে রেখেছে।

তিন রাস্তার মোড়ের চিপা গলির সামনে দাঁড়িয়ে অরূপ এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। তার চোখে চোরা দৃষ্টি। সাবধানে সবদিকে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। হাতঘড়ির দিকে বারবার তাকিয়ে সময় দেখছে। তবে তার মুখে স্পষ্ট বিরক্ত ভাব। দাঁতে দাঁত চেপে বিরক্তি নিয়ে বিরবির করে বললো,

— আর কত সময় লাগবে? আসছে না কেন?

কার জন্য অপেক্ষা করছে কেন অপেক্ষা করছে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে সে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজে আসছে এমনই মুখের ভাব। দুপুরের রোদে তার মুখ ঘেমে-নেয়ে একাকার। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিলো। রুমাল রাখার আগেই মোবাইল বেজে উঠলো। মোবাইল বের করে দেখলো অর্ণবের কল। অরূপ কল রিসিভ না করেই জিহ্বায় কামড় দিয়ে বললো,

— এই রে বড় ভাই কল করেছে। কি বলবো এবার?

কিছু সময় ভেবে উত্তর তেরি করলো। রিসিভ করার আগেই কল কেটে গেলো। অরূপ নিজে কল করলো। কয়েক সেকেন্ড রিং হওয়ার পর অর্ণব ধরলো। স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— কোথায় আছিস তুই?

অরূপ এদিক সেদিক তাকিয়ে জায়গাটার নাম দেখে সেই নাম বললো। অর্ণব আদেশের সুরে বললো,

— যেখানে থাকিস সমস্যা নেই। বিকেলে অফিসে থাকা চাই।

— আচ্ছা বড় ভাই।

— আর শোন।

— হুম বলেন।

— একটু সাবধানে থাকিস। সময়মতো অফিসে চলে আসিস। দেরী করিস না।

অরূপ কিছু বলার আগেই কল কেটে গেলো৷ অরূপের কপালে চিন্তার ভাজ দেখা গেলো। হঠাৎ অর্ণব সাবধানে থাকতে বললো কেনো? এই ছোট বাক্যটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। তৎক্ষনাৎ কেউ পিছন থেকে তার মাথায় পিস্তল জাতীয় কিছু ঠেকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

— হ্যান্ডস আপ। একদম পালানোর চেষ্টা করবে না।

~~~যারা ছোট ছোট বিষয়ে খুশি, নারাজ হয়। তাদের মন কোমল স্বভাবের হয়🤗।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here