Wednesday, June 17, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প ইচ্ছের উল্টোপিঠ ইচ্ছের উল্টোপিঠ পর্ব-২৪

ইচ্ছের উল্টোপিঠ পর্ব-২৪

0
2407

#ইচ্ছের_উল্টোপিঠ
#পর্ব_২৪
#আভা_ইসলাম_রাত্রি

সময়ের কাটা “নয়” টার কাছাকাছি ঘুরছে। জুভান মাত্রই লাগেজ গুছিয়ে শাওয়ার নিতে গেলো। প্রায় আধা ঘন্টা পর জুভান বের হলো ওয়াশরুম থেকে। ভিজে চুল হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে এসে দাঁড়ালো আয়নার সামনে। একটা কালো টিশার্ট পরে তার উপর জ্যাকেট পড়লো। আর জিন্স। রেডি হওয়া শেষ হলে ফোন হাতে নিয়ে ঐশীকে কল দিলো। ওপাশ থেকে একটা মিষ্টি কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই জুভানের হার্টবিট বেড়ে গেলো দ্বিগুণ তেজে। জুভান চোখ বন্ধ করে লম্বা নিঃশ্বাস নিলো। নিজের অনুভূতি সামলে বললো,
–” পাঁচ মিনিটের ভিতর ডিনার সেকশনে দেখতে চাই। ”

ওপাশ থেকে ঐশী কিছু বলবে তার আগেই জুভান সুর ত্যাড়া করে বললো,
–” নো মোর ওয়ার্ডস, ওকে? ”

ঐশী কিছুটা রাগ লাগলো। যখন যা বলবে তাই করতে হবে নাকি! মগের মুল্লুক! কিন্তু কণ্ঠে যথাসম্ভব বিনয় প্রকাশ করে বললো,
–” ওকে স্যার। ”

জুভান ফোন কেটে পকেটে রেখে দিয়ে রুম লক করে বেরিয়ে গেলো।
____________________
জুভান ডিনার টেবিলে বসে আছে। হাতে ফোনের নীল স্ক্রিন ভাসছে। একটু পর ঐশী এসে বসলো সেই টেবিলে। জুভান ঐশীকে দেখে আবারও ফোন স্ক্রল করতে মশগুল হলো। নিচে তাকিয়েই বললো,
–” খাবার অর্ডার দাও। ”

ঐশী মুখ ভেংচিয়ে একজনকে ডেকে খাবার অর্ডার দিলো। জুভান এখনো ফোন স্ক্রল করছে। ঐশী এভাবে একা একা বসে থাকতে বিরক্ত লাগছে। তাই ও দাত দিয়ে নখ কাটছে আর আশেপাশে তাকিয়ে লোকজন দেখছে। জুভান ফোনের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারছে ঐশীর বিরক্তি। মনে মনে একটু হেসে নিলো সে। একটু পর খাবার এলে জুভান ফোন পকেটে রেখে খেতে শুরু করলো। ঐশী খাবারে হাত দিবে তার আগেই জুভান মুখের খাবার চিবুতে চিবুতে বললো,
–“তোমার তো পেট ভরে গেছে। আর খাওয়ার দরকার নেই। বসে বসে এখন আমার খাওয়া দেখো। ”

ঐশী এসব কথা শুনে ভ্রু কুচকে তাকালো জুভানের দিকে। অবাক হয়ে বললো,
–” মানে? আমি আবার কখন খেলাম ? ”
–” খেলে তো। এই মাত্রই জীবাণু , ব্যাক্টেরিয়া আরো কত ময়লা জিনিস খেলে। পেট ভরেনি? ”

ঐশী জুভানের এসব আজগুবি কথা শুনে বিরক্ত হলো। আঙুল কপালে ঘুরিয়ে বললো,
–” আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? কিসব বলছেন ? আমি কেনো এসব খেতে যাবো? ”
–” তাহলে দাত দিয়ে নখ কেটে কি করলে? এসব খাবারের জন্যেই তো মানুষ নখ খায়। ইজনট্ ইট ? ”

ঐশী এবার জিহ্বা কামড়ে ধরলো। মাথা চুলকে বললো,
–” আসলে আমার অভ্যেস তো। তাই একটু আকটু..”

জুভান খাবার খেতে খেতে বললো,
–” গুড হেবিট। আরো উন্নতি করো নিজের এসব অভ্যাসের। জীবাণু খাওয়ার ভবিষৎ উজ্জ্বল হোক তোমার।আমিন।”

ঐশী রেগে উঠলো। কিন্তু কথা বাড়ালোনা।এটা যে খারাপ অভ্যাস সেটা ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। তাই ও খাবার খাওয়ায় মন দিলো।
–” লাগেজ গুছানো শেষ ? ”

জুভানের প্রশ্নে ঐশী তাকালো। অবাক হয়ে বললো,
–” লাগেজ গুছাবো কেনো ? ”
–” আমরা এখন ঢাকায় চলে যাচ্ছি। ভুলে গেছো কথাটা? ”

ঐশী আবারও জিহ্বা কামড়ে ধরলো। ইশ! আসলেই তো! তন্ময়ের চক্করে পরে আজ চলে যাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেছে।
ঐশী ভাত মেখে মুখে দিয়ে বললো,
–” না। এখনো করেনি। খাওয়া শেষ হলেই করে নিবো। ”

জুভান কিছু বললো না। খাবার খাওয়া শেষ হলে ওরা যে যার রুমে চলে গেলো।

______________________

প্লেন ছেড়ে দিবে আর একটু পর। এমনিতেই অনেক লেট হয়ে গেছে। প্রায় অনেক্ষণ ধরে ওদের নাম ডাকা হচ্ছিল। একটু পর ঐশী আর জুভান তাড়াহুড়ো করে প্লেনে ভীতর প্রবেশ করলো। জুভান নিজের সিট বের করে বসে পড়লো। কিন্তু বিপাকে পড়লো ঐশী। ওর সিট জুভানের পাশে পড়েছে। কিন্তু ওর এক কথা। জুভানের পাশে সে বসবে না। জুভানকে বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি এখনো। জুভান সেসব পাত্তা না দিয়ে আরামসে বসে ফোন স্ক্রল করতে লাগলো। প্লেন ছেড়ে দিবে আর একটু পর। ঐশী দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছে কি করা যায়! তখন জুভান ফোনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
–” ওতো চিন্তা করে লাভ নেই। এটা প্লেন। বাস না যে সারা রাস্তা দাড়িয়ে দাড়িয়ে যাবে। ”

ঐশী তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো জুভানের দিকে। মুখ বাঁকিয়ে বললো,
–” থ্যাংক ইউ মনে করিয়ে দেবার জন্যে। আপনি না বললে আমি তো ভেবেছিলাম এটা ঠেলাগাড়ি। ”

জুভান কিছু না বলে মৃদু হাসলো। একটু পর ইয়ার হোস্টেস এসে ঐশীকে বললো,
–” ম্যাম, প্লিজ টেক ইউর সিট। ”

ঐশী অসহায় চোখে চারপাশে তাকিয়ে ঝট করে বসলো জুভানের পাশে। জুভান ঐশীর এমন শব্দ করে বসা দেখে ভ্রু কুচকালো।
ঐশী প্লেন অনেক ভয় পায় ছোটবেলা থেকেই। একবার ঘুরতে যাওয়ার সময় ওর বাবা প্লেনের টিকেট কেটেছিলেন। কিন্তু ঐশীর জেদ দেখে সেই টিকেট ক্যান্সেল করে বাসের টিকেট কাটতে হয়েছে।
সেই ভয় এখনো কাটে নি। প্লেন টেক অফ করা শুরু করলো। ঐশী ভয়ে একদম সেটিয়ে বসলো সিটের সাথে। প্লেন একটু নড়তেই ঐশী জোরে খামচে ধরলো জুভানের হাত। জুভান হঠাৎ পাওয়া ব্যাথায় ” উফফ ” করে উঠলো। ঐশীর দিকে রাগী চোখে তাকাতেই ঐশীর ভীত-সন্ত্রস্ত মুখ ভেসে উঠলো। জুভানের রাগ সেখানেই পানি হয়ে গেলো। মুচকি হেসে ঐশীর দিকে ফিরলো। বললো,
–” মিস,রণচন্ডি…”

ঐশী এই ডাক শুনে কড়া চোখে তার দিকে তাকালো। বললো,
–” কে রণচণ্ডী ? ”

জুভান চারপাশে একবার তাকিয়ে ঐশীর দিকে তাকালো। বললো,
–” আমার পাশে তুমি ছাড়া কি আর কেউ আছে? ”

ঐশী জোড়ে এক হাফ ছাড়লো। জুভানের খোঁচা মেরে কথা বলাটা শোধ সমেত ফিরিয়ে দিতে বললো,
–” আছে তো। আপনার ভুত। যেটা এখন আপনার মাথায় চড়ে আছে। যত্তসব। ”

বলেই ঐশী সামনে তাকালো। ততক্ষনে প্লেন ছেড়ে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঐশীর ভয় অনেকটাই কমে গেছে। হুট করে ঐশীর কিছু একটা মনে পড়লো। ও জুভানের দিকে ফিরে বললো,
–” আপনি এসব কথা আমার মাইন্ড ডিস্ট্রাক করার জন্যে বলেছেন, তাইনা ? ”

জুভান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। গলা হালকা ঝেড়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
–” হাও ফানি। তোমার মাইন্ড ডিস্ট্রাক করা ছাড়াও আমার আরো অনেক কাজ আছে। সো নিজেকে এত ইম্পর্ট্যানস দিয়ে লাভ নেই। ”

ঐশী হাসলো। যা বুঝার বুঝে ফেলেছে ও।জুভান প্লেনে উঠে মাস্ক খুলে ফেলেছে। কালো জ্যাকেটটা হাত দিয়ে পিছনে ঠেলে দিয়ে সিটে হেলান দিয়ে বসলো।
ঐশী আশপাশে তাকিয়ে লোকজন দেখছে। হঠাৎ শুনতে পেলো এক মেয়ে জুভানের দিকে আঙুল তুলে কিছু একটা বলছে পাশের জনকে। ঐশী ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো মেয়েটার কথা। কিন্তু লাভ বিশেষ হলো না। কিন্তু অবাক হলো যখন মেয়েটা সিট থেকে উঠে জুভানের পাশে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটা ওদের পাশে দাড়িয়ে আপ্লুত গলায় বললো,
–” এক্সকিউজ মি , ”

জুভান কান থেকে ইয়ারপড খুলে পাশে তাকালো। মেয়েটা খুশিতে প্রায় লাফাতে লাফাতে বললো,
–” ওয়ান অটোগ্রাফ প্লিজ, প্লিজ ,প্লিজ। ”

জুভান মৃদু হাসলো। মেয়েটার কাছ থেকে নোটবুক নিয়ে বাম হাতে সাইন করে দিলো। মেয়েটা নোটবুক হাতে নিয়ে বলতে লাগলো,
–” আই অ্যাম ইউর বিগ ফ্যান, স্যার। আপনার গান আমার অনেক পছন্দ। ( মাথা হেলিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে) সাথে আপনাকেও। ”
ঐশী হতবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকালো। এমন নির্লজ্জের মত ভালোলাগে কথাটা কিভাবে বললো ভেবে পেলো না ও। জুভান মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললো,
–” থ্যাংকস। ”

মেয়েটা আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই জুভান বললো,
–” একচুয়ালি আমি খুব টায়ার্ড। সো…”
–” ওকে ওকে। বায়। ”

মেয়েটা চলে গেলে জুভান জোরে এক হাফ ছাড়লো। এতক্ষণ ধরে মেকি হাসি হেসে সে বড়ই ক্লান্ত। এইজন্যেই সবসময় মাস্ক পরে থাকে। নাহলে যেখানে সেখানে এসব ফ্যান নামক অপদার্থদের খপ্পরে পড়তে হয়। আর এদের সাথে একটু উলটপালোট কথা বললেই সেটা নিউজ হয়ে যায়। রাবিশ! ঐশী মেয়েটার যাওয়ার দিকে একঝলক তাকিয়ে আবারও জুভানের দিকে তাকালো। উত্তেজিত হয়ে বললো,
–” আচ্ছা , একটা কথা জিজ্ঞেস করি? ”

জুভান কানে ইয়ারপড লাগাতে লাগাতে বললো,
–” হুম। ”
–” এই যে আপনার কাছে সবাই অটোগ্রাফ নিতে আসে ,আপনার অনেক ভালো লাগে, তাইনা ? ”

জুভান ভ্রু কুচকে নিলো। সাফসাফ বললো,
–” না। লাগে না। ”
–” কেনো, কেনো? ”
–” হুটহাট এসব বিরক্ত লাগে।”

ঐশী সিটে গা এলিয়ে দিয়ে বললো,
–” আমার খুব ভালো লাগে, জানেন। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার কাছে যদি কেউ অটোগ্রাফ চাইতে আসতো! খুব মজা হতো, তাইনা। সিলেব্রিটি, সিলেব্রিটি ফিল আসে। সো আমেজিং, ইউ নো। ”

জুভান ঐশীর পুলকিত চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। একটা জিনিষ লক্ষ করলো সে, ঐশী যখন খুব খুশি হয় তখন তার চোখ দুটি ছোটছোট হয়ে যায়। মুখের চারপাশে খুব সুন্দর স্মাইল লাইন পড়ে। জুভান গালে হাত রেখে তাকিয়ে আছে ঐশীর দিকে। ঐশী অনবরত কথা বলায় মগ্ন। তার এসবে খেয়াল নেই। জুভান চোখের পলক ফেলা বিনা ঐশীর মুখের পানে চেয়ে আছে। তখন ঐশীকে দেখতে কোনো মায়ারাজ্জ্যের অধিপতি মনে হয়। যার চোখে মুখে মায়ার নিদারুণ সম্ভার। তবে কি সে এই রণচ্চণ্ডী মেয়ের প্রেমে পড়েছে? যখন ঐশী ওর আশেপাশে থাকে তখন এমন মনে হয় কেনো? হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। মনে চায় বেহায়া হয়ে বারবার তাতেই মত্ত হয়ে থাকুক। আড়চোখে তাকে দেখে বুকে জ্বালাময় কাপন ধরুক। ঝলসে যাক অবাধ্য চোখজোড়া। জুভান বুঝতে পারে। হুম। সে প্রেমে পড়েছে! মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলেছে এই মেয়েকে। যার মায়ার সুতো আজীবনেও কেটে ফেলা সম্ভব না। জুভান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ঐশীর পানে।

#চলবে..

শব্দসংখ্যা -১৩০০+

আগের পর্ব
https://www.facebook.com/105343271510242/posts/194355872608981/?app=fbl

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here