Friday, May 1, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প আমি কাউকে বলিনি সে নাম আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ১৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ১৮

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ১৮
__________________________
সন্ধে নেমে গেছে , চারদিকে গাঢ় অন্ধকার জমতে শুরু করেছে ৷ নয়ন এসে দাঁড়িয়ে আছে তার বড় চাচীর কবরের পাশে ৷ কবরটা বাঁধাই করা হয়েছিল গত বছর ৷ সেই বাঁধানো কবরের পাশে লাগানো শিউলি গাছ ভর্তি হয়ে গেছে ফুলে ৷ মিষ্টি গন্ধে মাথাটা ঝিমঝিম করছে ৷ বাড়ি আসলেই আগে এখানে এসে বসে নয়ন ৷ মানুষটা চলে গেছে তিন বছর হয়ে গেলো ৷ তবুও এখানে এসে বসলে মনে হয় মানুষটাকে অনুভব করা যায় ৷

ঢাকা ইউনিভার্সাটিতে ভর্তি হবার পর প্রথম প্রথম ঘন ঘন বাড়িতে আসতো নয়ন ৷ সময়ের সাথে বাড়ির সাথে আরও দুরত্ব বেড়েছে ৷ দুটো কোচিং এ ক্লাস নেয় নয়ন , সাথে আরও দুটা টিউশনি … নিজের ছুটি হলেও স্টুডেন্টদের কারও না কারও পরীক্ষা থাকে ৷ আর আসা হয় না ৷ সে আসে না জন্য মা মন খারাপ করে , রূপা অভিমান করে ৷ কিন্তু বাস্তবতার কাছে সব তুচ্ছ হয়ে যায় ৷

—ভাইজান , বাড়িত চলেন , চাচী ডাকে

—কী রে তুই এখানে ! কিভাবে জানলি আমি এখানে ?

—আমি সবই জানি ৷

রহস্যময় হাসি হাসে রূপা ৷ এই মেয়েটা দ্রুত বড় হয়ে যাচ্ছে ! এ বছর এস এস সি পরীক্ষা দিলো ৷ রেজাল্টের অপেক্ষায় আছে ৷ নয়ন জানে রূপার রেজাল্ট খুব ভালো হবে না ৷ ওর পরীক্ষার আগে যখন বাড়ি এসেছিল , অংক করতে দিয়েছিল সে ৷ একটা অংকও পারেনি ৷ ইংলিশেরও ভয়াবহ অবস্থা ৷ অবশ্য এর জন্যে ওর বাবা মাও দায়ী ৷ কোন প্রাইভেটই দেয়নি ৷ নিজে নিজে যতটা পারে তাই পড়ছে মেয়েটা ৷

সেবার রতনের ঘটনার পর আলেয়া বেগম রূপাকে কোন পুরুষ মানুষের কাছে পাঠানোর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না ৷ সেদিন আলেয়া বেগম সময় মত না পৌছালে রূপার একটা ক্ষতিই হয়ে যেতো ৷ রতন হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল রূপাকে , ওর মুখে হাত দিয়ে চেপে রেখেছিল ৷ একবার সে হাত ছুটিয়ে শুধু একটা চিৎকারই দিতে পেরেছিল রূপা “ও চাচী গো, আমারে বাঁচান ! ” আলেয়া বেগমের কানে পৌছেছিল সে চিৎকার ! তারপর দৌড়ে এসে রতনকে দেখে হাতের কাছে থাকা আধখানা ইট তুলে ছুড়ে মেরেছিল তার দিকে ! তারপর ওকে মাটিতে ফেলে এলোপাথারি মেরেই চলেছিল পাগলের মত !

বিচার হয়েছিল রতনের ৷ আলেয়া বেগম ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে বিচার বসিয়েছিলেন ৷ বাড়ির কোন পুরুষই চায়নি বিচার হোক ৷ গাজী মিয়া বলেছিলেন “ওরে বিদায় কইরা দিতাছি , বিচারের দরকার নাই ৷ মাইয়্যারই মান যাইবো ” …. আলেয়া বেগম কারও কথা না শুনে দৃঢ় গলায় বলেছিল “বিচার হইবো , হইবোই ….” জেল খেটেছিল রতন , তারপর জেল থেকে বের হয়ে আর গ্রামে আসেনি ৷ তারপর থেকেই রূপাকে আরও চোখে চোখে রাখেন তিনি ৷

—ভাইজান , চলেন ৷ বইসা রইলেন যে !

—তোর রেজাল্ট দিবে আগামী সপ্তাহে জানিস ?

—হ জানি

—ফেলটেল করবি না তো ! যে অবস্থা দেখে গেছিলাম , পাশ করার তো কথা না

—ফেল হইলে ফেল হইবো ! আমার চেহারা ছবি সুন্দর আছে , ফেল হইলেও আমার বিয়া হইবো ৷

—বিয়া করতে চাস ?

—হ , বিয়া তো করা লাগবোই ৷ বাড়িত সকাল বিকাল ঘটক আসে ৷

—আচ্ছা ঘটক আটকাবার ব্যবস্থা করে যাবো ৷

—ক্যান ! ঘটক না আইলে বিয়া হইবো ক্যামনে ?

—বিয়া করা লাগবো না ! যা বাড়িত যা , আইতাছি …

রূপা হাসে ৷ তার বিয়ের কথা শুনলেই নয়ন রেগে যায় ৷ রেগে গেলে ওর কপালের দুপাশের রগ ফুলে উঠে , দেখতে মজা লাগে রূপার ৷ রূপাকে সে নিশ্চয় পছন্দ করে , তা না হলে এভাবে রেগে যাবে কেন ! এই মানুষটাকে রাগাতে খুব ভালো লাগে …

নয়নের সামনে অংক কষতে বসে ইচ্ছা করেই ভুল করতো সে ৷ যাতে আরও বেশি সময় একসাথে থাকা যায় ৷ নয়ন জানে না যে রূপা কী পরিমান মেধাবী ! কোন সাহায্য ছাড়াই সে খুব ভালোভাবে নিজের প্রস্তুতি নিয়েছে , পরীক্ষাও খুব ভালো হয়েছে ৷ রেজাল্ট নিয়ে তার কোন চিন্তা নাই সেজন্যই , যে পরীক্ষা দিয়েছে তার মন ঠিক জানে রেজাল্ট কী হবে ….

আজকাল নয়নের সাথে একদমই কম যোগাযোগ হয় তার ৷ বাড়ি না আসলে তো আর দেখা সাক্ষাতের সুযোগ মেলে না ৷ নয়ন অবশ্য আগের মতই আছে , উদাসীন ৷ তবে রূপার ব্যাপারে সে সবসময়ই মনোযোগ দেয় ৷ ছোট ছোট বিষয়গুলোর খেয়াল রাখে ৷ একবার শহর থেকে ফেরার সময় সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর নিয়ে আসলো , এই জিনিস তাদের গ্রামে পাওয়া যায় না ৷ রূপা তখন প্রায় মাসখানেক সেই ক্যালকুলেটর মাথার কাছে নিয়ে ঘুমিয়েছে ৷ একদিন স্কুলে রূপার এই অমূল্য সম্পদ চুরি হয়ে গেলো ৷ সে এমন কান্না করেছিল যে আলেয়া বেগম নিজে স্বামীকে শহরে পাঠিয়ে আরেকটা ক্যালকুলেটর এনে দিয়েছিল ৷ রূপা কাউকে বলতে পারেনি তার যে জিনিস হারিয়েছে সেটা আর কখনও পূরণ হবার নয় …সেটা ছিল অমূল্য … সেটা ছিল ভালোবাসার উপহার ! সব কথা কী বলা যায় ! সব নাম কী বলা যায় ! কিছু কথা কিছু নাম শুধু মনের গহীনে বদ্ধ করে রাখার জন্যই , বাইরে আনার জন্য নয় ৷

নয়ন এখনও কবরের কাছেই বসে আছে ৷ এখান থেকে তার উঠতে ইচ্ছা করছে না ৷ রূপার জন্য চিন্তা হচ্ছে ৷ এই মেয়েটা হাতে পায়ে বড় হচ্ছে ঠিকই কিন্তু বুদ্ধিসুদ্ধি হচ্ছে না ৷ এত কম বয়সে বিয়ে করলে কী কী পরিনতি হতে পারে সেসব একবারও ভাবছে না ৷ কী সুন্দর কথা ” ফেল করে বিয়ে করবে” ৷ অথচ লেখাপড়া শেখাটা কত বেশি জরুরি সেই জ্ঞানটাও ওর মধ্যে নাই ৷ নাহ , একবার মেয়েটাকে বোঝাতে হবে ৷

নাদের মিয়া মসজিদ থেকে এশার নামাজ পড়ে ফিরছে ৷ এশার নামাজের পর মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষন দোয়া খায়ের করে সে ৷ আজকে অন্ধকারে সে দেখলো কবরের পাশে কিছু একটা বসে আছে ! ভীষণ ভয় পেয়ে “ইয়া আল্লাহ বাঁচাও” বলে এক দৌড়ে সোজা বাড়ির ভেতর চলে যায় সে ৷ ঘরে বসে হাফাতে হাফাতে বলে

—বউ , বউ ! পানি দেও , পিয়াস লাগছে

লাকী ঘরে ঢুকে দেখে নাদের মিয়া দরদর করে ঘামছে ৷ তার হাতে পানির গ্লাস দিয়ে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলে

—কী হইছে আপনের ? ডড়াইছেন ?

—মায়ের কবরের কাছে কেডা জানি বইসা আছে বউ ?

—কবরের কাছে কেডা বইসা থাকবো ? আপনে ভুল দেখছেন ৷ চলেন আমার সাথে , বাতি নিয়া গিয়া দেইখা আসি ৷

—না , অত সাহসের দরকার নাই ৷ ভুল দেখলে ভুল দেখছি ৷ এইটা পরীক্ষা করতে যাবার দরকার নাই ৷

—দরকার আছে ৷ বাড়ির পাশেই কবর ৷ এমন কথা উঠলে বাড়িত টেকা মুশকিল হইয়া যাইবো ৷ আর পরীক্ষা না হলে আপনের মনে খচখচানি থাকবো ৷ আপনে রাত বিরাতে ফেরেন , মনের সাহস কইমা যাইবো ৷

—কিছু থাকলে সে কী আমগো লাইগা বইসা আছে ?

—না থাকলে নাই ৷ চলেন ৷

লাকীকে থামানো গেলো না ৷ একটা টর্চ লাইট হাতে সে একাই এগুতে থাকলো ৷ অগত্যা নাদের মিয়াকে পিছু পিছু যেতেই হলো ৷

টর্চের আলোয় একটু দূর থেকেই তারা দেখলো “সেই কিছু একটা” মানুষটা নয়ন …. লাকীকে থামিয়ে দিলো নাদের ৷ তারপর বললো “বউ আর যাইয়া কাম নাই…” খানিকক্ষন পর আবার বললো “নয়নের মত কইরা মায়েরে আমরা কেউ ভালোবাসতে পারি নাই … আমাদের ভালোবাসার মধ্যে দায় আছে , ওরটা খাঁটি ৷ সোনার চাইতেও খাঁটি …”

লাকী কথা বাড়ায় না ৷ তার নীরবতা বলে দেয় নাদের মিয়া ভুল বলেনি ৷

চলবে–

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here