Saturday, August 22, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১ আফসানা আশা

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১ আফসানা আশা

0
2

আমার মা একবার আমাকে চাচির কাছে রেখে ঢাকায় গেল। বলল, “উঠতি বয়স, মেয়েটাকে একটু দেখো!’
আব্বার কর্মস্থল ঢাকায়। একা থাকেন। আমরা থাকি মফস্বলে আব্বা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। দেখাশোনা করার কেউ ছিল না। মাকেই যেতে হলো। আমি ক্লাস টেনে। প্রিটেস্ট পরীক্ষা চলছিল। আমাকে সাথে নেওয়ার উপায় ছিল না।
আমাদের বাড়িটা বাজারের কাছে। রাস্তা দিয়ে বিভিন্ন বয়সের লোকের অবাধ যাতায়াত। বখাটেদের আড্ডাও বটে। মা বেশ টেনশনে ছিল। ছোটোচাচি মাকে আশ্বস্ত করে বলল, “টেনশনের কিছু নেই। এইসব ছেলেপেলেরা শুধু ভালো চেহারার মেয়ে দেখলেই বিরক্ত করে। আমাদের রুমকির দিকে ওরা ফিরেও তাকাবে না!”
না, চাচির মানসিকতার প্রমাণ দিতে আসিনি। আমি শুধু তার কথার নিক্তি বাটখারায় আমার চেহারাটা মেপে দিলাম। এহেনও সুরত নিয়ে আমি প্রেমে পড়ে গেলাম নিয়ন ভাইয়ের! রোসো, রোসো, এই নিয়ন ভাইয়ের পরিচয়টা দিই। কোরিয়ান সিনেমায় যে নায়কগুলোর প্রেমে পড়ে তোমরা হরহামেশাই মরে যেতে চাও, নিয়ন ভাই দেখতে ঠিক তেমনি। সেইরকম লম্বা আর তুষারস্নিগ্ধ গায়ের রঙ! ফিনিফিনে রেশমের মতো চুলগুলো সেই হার্টথ্রব নায়কদের মতোই তার কপাল ঢেকে দেয়।
আরেকটা পরিচয় আছে ওর, যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ও আমার চাচতো বোন আরশি আপুর দেবর। আরশি আপু মোটামুটি ধরণের সুন্দরী। চৌধুরী বাড়ি থেকে ওর বিয়ের প্রস্তাব আসাতে আমাদের চোখ কপালে উঠেছিল। চৌধুরীরা ভুতপূর্ব জমিদার। কুশিয়ারার পাড় ঘেষে বিস্তীর্ণ জমিদারি ওদের। জমিদারী প্রথা উঠে গেলেও সম্পদ আর প্রতিপত্তি রয়েই গেছে ওদের। মেয়ে দেখতে এলো যখন, সেই তখনই এলাহি কারবার! গাড়ির মিছিল এসে থেমেছিল আমাদের চৌহদ্দীতে। আমরা খুব ভয়ে ছিলাম, ওদের কোনো ভুল হলো কিনা মেয়ে পছন্দ করতে। হয় না, এক মেয়ে পছন্দ করে ভুল ঠিকানায় গিয়ে অন্য মেয়ে বউ করে নিয়ে এসেছে? তারপর আমরা ভয়ে ভয়ে থাকলাম, বিয়েতে কেউ ভাঙানি দেয় কিনা! আমাদের ঠিক পাশেই কুখ্যাত মায়মুনা কুটনির বসবাস। মায়মুনা কুটনিকে চিনেছেন তো? ওই যে, সোনার মদিনা! বিষাদ সিন্ধু বইয়ের মায়মুনা কুটনি! যার প্ররোচনায় পড়ে পত্নী জায়েদা বিষ দিয়েছিল স্বামী ইমাম হাসানকে, সেই! আমাদের পাড়ার কুটনি বুড়ি হলো মালেকা দাদী। এক পা বুড়ির কবরে, কিন্তু শয়তানি ওর শিরায় শিরায়! এই গ্রামে এমন কোনো মেয়ে নেই যার বিয়েতে ও বাগড়া দেয়নি অহেতুক ঝামেলা পাকায়নি!
আমাদের প্রিয় জনি আপু, টলটলে দিঘির মত একটা মেয়ে। কোন ছোটোবেলায় একবার বিয়ে হয়েছিল ওর, বর সে লোকটা, সেই ছোটবেলাতেই টাইফয়েডে দুনিয়া ছেড়েছিল। অনেক বছর চেষ্টায় ওর বিয়ের সম্বন্ধ জুড়েছিল। মিনাল চাচা আগের বিয়ের কথাটা চেপে গিয়েছিলেন এই পক্ষের কাছে। চাপবেনই না কেন, ওই বিয়ের কোনো দাম আছে এখন আর? এই কুটনী বুড়ির সইল না। বরযাত্রীর গাড়ি সারি সারি দাড়িয়ে আছে রাস্তাজুড়ে – সেগুলোরই এক ঘুপচিতে বরের এক বোনের কানে সেই বিয়ের কথা বলে দিলো। কথা রাষ্ট্র হতে দেরি হলো না, লঙ্কাকান্ড বাঁধতেও সময় নিলো না। বিয়েটা একরকম ভেস্তে যায়ই। কিন্তু বর মানুষটি ভীষন ভালো ছিল। বলল, বউ না নিয়ে ও ফিরবে না। আবার আসর বসল, বিয়ে হলো, মালেকা দাদীর নাকের পর দিয়ে শ্বশুরঘরে গেল জনি আপু!
কিন্তু অমন সুদিন তো প্রতিদিন আসে না। সবার বরও জনি আপুর বরের মতো হয় না।
তাই, কয়েকটা দিন আমরা পালা করে পাহারায় রাখলাম কুটনিটাকে।
তারপরও যেন বাড়ির লোকের শঙ্কা কাটে না। আরশি আপুর সাথে বিয়ে পাকা করে ওরা যদি আমাদের অন্য কোনো বোনকে পছন্দ করে ফেলে? রুপা আপু, নাজু, সীমানা তো ডাকসাইটে সুন্দরী। ওদেরকে রেখে আরশিকেই কেন পছন্দ করল ওরা? আরশি আপু আর রাজন ভাইয়ের তো কোনো গল্পও নেই, মানে প্রেমট্রেম নেই ওদের। ক্ল্যাসিকাল এক্সাম্পল অফ এরেঞ্জ ম্যারেজ। মধ্যম সুন্দরী আরশি আপু চৌধুরী বাড়ির বউ হবে, এ যেন আমরাই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সবদিকে নিরাপদ থাকতে আমাকেই বেছে নেওয়া হলো, ফিরানিতে আরশি আপুর সঙ্গী হতে। এই যে সাতখন্ড রামায়ন খুলে বসলাম, এবারে তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হলো তো?
মা আমাকে ননীর পুতুল করে বড় করেছে, ছোটো পাখির ছানাটি হয়ে মা পাখির ডানার নিচে লুকিয়ে রাখত আমাকে। অচেনা লোকের বাড়িতে আমার খুব সংকোচ হচ্ছিল। একলা ঘুমাতে দিয়েছিল। ঘুম আসছিল না। খিদে পেয়ে গেল হঠাৎ। যেমন তেমন খিদে নয় লা, না খেতে পেয়ে মরে যাব এমন খিদে! রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি, কোথাও কেউ নেই। বাতি-টাতি নিভিয়ে শুনশান অট্টালিকা! শুধু কে একজন টিভিরুমে অল্প সাউন্ডে খেলা দেখছে। আমি গিয়ে বসলাম। খানিক বাদে বললাম,
–বিস্কিট টিস্কিট কিছু পাওয়া যাবে?
ওটা ছিল নিয়ন ভাই। বিয়ের এইসব প্রোগ্রামে কয়েকবার দেখেছি ওকে। চিনি। ও বলল,
–খিদে লেগেছে? আমারও লেগেছে। অন্যদিন খাবার বানানো থাকে আমার জন্য। আজকে দেখছি না। সবাই বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। ইন্সট্যান্ট নুডলস খাবে?
আমি মাথা নাড়লাম।
ও টিভির থেকে মুখ না সরিয়েই বলল,
–তাহলে কিচেনে যাও। আমাকে এক বোল দিয়ে যেও।
আমি দ্বিধায় পড়লাম,
–তোমাদের কিচেন কোথায়, সেটাই তো আমি জানি না।
–ওই দরজা দিয়ে বের হও, টার্ন লেফট, গো স্ট্রেট, ইউ উইল ফাইন্ড ইট এট দ্য এন্ড। লাইটের সুইচ বাইরে।
খুব এক্সাইটিং ম্যাচ নিশ্চয়ই। ও টিভির বাইরে তাকাতেই পারছে না। আরশি আপুকে আংটি পরাতে যেদিন এবাড়ি থেকে লোক গেল, কারেন্ট চলে গেলে আমিই তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করেছিলাম। সেদিন ওরা আমাদের মেহমান ছিল, এখন তো আমি এই বাড়ির মেহমান।
পুরো বংশের সম্মান রক্ষার দায় আমার কাঁধে বর্তাল। খিদেটিদে উড়ে গেল। চুপচাপ ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। আধাঘণ্টা পরে দরজায় নক পড়ল। নিয়ন ভাই এসেছে। ধোয়াওঠা এক বাটি নুডলস আর কাঁটাচামচ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে দিলো। বলল,
–রুমঝুম, তুমি তো দুষ্টু আছ!
বিয়েবাড়ির ডামাডোলে আর তেমন একটা কথাবার্তা হলো না, কিন্তু আমার কিশোরী মনে বিরাট ছাপ ফেলে গেল। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারন ছাড়াই আমি মানুষটাকে উথাল-পাথাল পছন্দ করে ফেললাম!
একদিন শুনলাম, গ্রাজুয়েশন করতে যুক্তরাজ্য চলে যাছে নিয়ন ভাই। অন্তত এক দেশে তো ছিলাম! আমার বুক ফেটে কান্না পেল। গোয়েন্দাগিরি করে বড়োচাচির মোবাইল থেকে নিয়ন ভাইয়ের ফোন নম্বর জোগাড় করলাম। ভীষণ দুঃসাহস দেখিয়ে, এক রাতে ফোন করে বসলাম। ওই প্রান্তে যখন ফোনরিসিভ হলো, আমি কোনো কথাই বলতে পারলাম না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। দুই মিনিট পরে নিয়ন ভাই বলল,
–তুমি চাও, আমি না যাই?
আমি উত্তর দিলাম না। কথা বললেই তো ধরা পড়ে যাব। সে জেনে যাবে আমি কে।
নিয়ন ভাই বলল,
–আমি কয়েক বছর পরেই ফিরে আসব। আমার জন্য অপেক্ষা করে থেকো কিন্তু! আমি তোমার কাছে ফিরব, প্রমিজ!
কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললাম আমি। সে তো চেনেইনি আমাকে! এই সিমকার্ড তো রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই চোরাইভাবে কেনা! কাকে না কাকে কথা দিলো! এই প্রতিজ্ঞা রাখবে কীভাবে?
তারপর অনেক কিছু ঘটে গেল। আব্বু মারা গেল। কেবল এসএসসি দিয়েছি। সংসারটা আমার ঘাড়ে এসে পড়ল। উপায়ান্তর না পেয়ে আমি গার্মেন্টসে চাকরি নিলাম। সাধারন মেশিন অপারেটর। ন্যুনতম বেতন। ওভারটাইম করি। কোনোদিন নাইটও করি। বাড়ি ফিরে মোষের মতো ঘুমাই। দুই বছর হলো বাড়ির সামনের দিকে একটা দর্জির দোকান খুলেছি। মায়ের পুরোনো মেশিনটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন দুটো মেশিন আছে। মা আর আমি কাজ করি। সাধারণ কাজগুলো মা-ই করে। আমি সেলাইকোর্স করেছিলাম। ডিজাইনার কাজগুলো আমি করি। গার্মেন্টস ছুটির পরে আর শুক্রবার শুক্রবার নাক-মুখ গুঁজে কাজ করি।
আমার জীবন বলে আর কিছু থাকল না। নিয়ন ভাইকে আমি ভুলেই গেলাম। সে সামার ভ্যাকেশনে দেশে আসে, আমি আমার ব্যস্তজীবনে সেসবের কোনো খোঁজ নেওয়ারই ফুরসত পেলাম না। মাঝেমাঝে মা বিদেশি চকলেট ধরিয়ে দিতে দিতে বলে, আরশির দেবর এসেছিল বাড়িতে। সবার জন্য চকলেট এনেছে। আমি শুনি। আমার মনে কিছু হয় না। আমি খুব ক্লান্ত, পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি।
তারপর একদিন শুনতে পেলাম, চৌধুরী বাড়ি থেকে আবার আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব আসবে নাকি।
মা বলল,
–আরশির দেবরের জন্য মনে হয় সীমানাকে নিতে চেয়েছে। আরশি আর আরশির মা চায় না। শুনলাম বলতেছে, এক বাড়িতে দুই বোন দেওয়া ঠিক না। ওদিকে লাগলে এদিকে মন খারাপ, এদিকে মন কষাকষি হলে ওদিকেও যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তোর বড়োচাচির ভাবনাটা সঠিকই লাগছে। কিন্তু আসলে নারাজি হওয়ার কারণ এইটা না। আসলে, চৌধুরী বাড়িতে বিয়ে হওয়ায় আরশির অনেক দাম হইছে না? ও চায় না, সীমানা আর ও সমান সমান হয়ে যাক!
পরেরদিন সকালে কাজে যেতে হবে। সামান্য বিরক্ত হয়ে বললাম,
–দুনিয়ার সব কথা আমাকেই বলতে হবে তোমার? ঘুমাতে দাও। বাতি নেভাও। না ঘুমালে সকালে খুব মাথাব্যথা করে। আমি অসুস্থ হলে তোমাদের পেট চলবে না।
মা লাইট অফ করে দিয়ে আমার মাথার কাছে এসে বসল। নারকেল তেলের বোতল খুলে গেল, ঘ্রাণ পেলাম। আমার মাথায় সিঁথি করে দিয়ে তেল ঘষতে লাগল মা। ফিসফিস করে বলল,
–তুই ঘুমা।
আমি আরামে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
মা নরম গলায় বলল,
–শাফিনের মাকে আসতে বলব ভাবছি!
–উল্টোদিকের বাড়িতে থাকে। দিনে চৌদ্দবার আসছে-যাচ্ছে। বিশেষ করে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসতে হবে নাকি?
–তোদের ওই বিয়ের কথাটা বলব ভাবছি!
আব্বু আর রুহুল আংকেলের মধ্যে আমাদের বিয়ে নিয়ে কথা হয়েছিল। আব্বু অসুস্থ হলে বন্ধুর কাছ থেকে পাকা কথা আদায় করেছিলেন। সবাই জানে আমার সাথে শাফিনের বিয়ে হবে। কিন্তু শাফিনদের দিক থেকে কখনো কথা ওঠেনি। আমি বললাম,
–এতদিন সেটা মনে রেখেছে ওরা?
–সেটাই জানতে চাইব। তোর বাপের শেষ ইচ্ছা ছিল! ওরা ফিরাবে কীভাবে? গুণাহ হবে না? এই শুক্রবারে আসতে বলি ওদেরকে?
–হুম!
আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

চলবে…
মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১
আফসানা আশা
(নতুন গল্প শুরু করলাম। রিচ হলে সম্পূর্ণই ফেসবুকে আসবে। একটু শেয়ার টেয়ার করে দিয়েন!)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here