Saturday, August 22, 2026

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ২

0
2

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ২

সকালে বের হব, মায়ের সাথে এক পশলা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়ে গেল। ঠিক বেরুবার মুখেই বলল,
–বাজার টাজার করার সময় কি পাবি?
–কীসের বাজার? মাসের শুরুতে চাল, ডাল, তেল কিনে দিই। কাশেম চাচার মুদি দোকানে বাকির খাতা খোলা আছে, যখন তখন সওদা আনতে পারো।
–না, একটু মাছ-মাংস। শাফিনের মাকে দাওয়াত করলে একটু ভালো-মন্দ খাওয়ানো তো লাগে। বুধবার ছুটি নিতে পারবি?
–হ্যাঁ, পারব না কেন? তোমার বাপের গার্মেন্টস তো!
–এভাবে বলিস কেন?
–বলব না? হাজিরা কাটে সেটা তুমি জানো না? একশো তিন জ্বর নিয়েও আমি কাজে গেছি, সেটা তুমি ভুলে গেছ? আমি সারামাস হাড়ভাঙা পরিশ্রম করি, মা!
মায়ের মুখটা মলিন হয়ে গেল। অপরাধবোধে ভুগতে ভুগতে মহিলার শরীরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। মৃদুকণ্ঠে বলল,
–তাহলে কিছু টাকা দিয়ে যা। আমি কাউকে ধরেটরে বাজার করিয়ে আনি।
আমি হাত দিয়ে মায়ের আলমারি দেখিয়ে দিলাম,
–মাসের মাঝখানে আমি টাকা পাব কোথায়? যাতায়াত ভাড়া বাদে সবটাই তো তোমাকে দিয়ে দিই। ওই যে বাক্সে পুরে রেখেছ, ওখান থেকে নেও।
শান্তশিষ্ট মহিলার আসল চেহারা বেরিয়ে এলো। তেতে উঠে বলল,
–ওই টাকার দিকে তোর নজর কেন? কতবার বলেছি, এরমধ্যে যদি না আমি মরে যাই, ওই টাকায় হাত দিবি না।

আমি জানি। ওই টাকা আমার বিয়েখরচ। যৎসামান্য টাকা মিলেছিল আব্বার অফিস থেকে। তার থেকে কিছু সময়ে অসময়ে খরচও হয়ে গেছে। বাকিটা যক্ষের ধনের মত আগলে রেখেছে মা। সংসারের জন্য আমাকে নিঃশেষ হতে দেখতে তার বিরাট আপত্তি। নিরুপায় বলেই মেনে নেন। পরপর তিনটে বোন আমার। ঝুমকি, চৈতি আর নীলা। ঝুমের নাম আমার সাথে মিলিয়ে রাখার পরে আবার মেয়ে হলে মিল বাদ দেওয়া হয়। ওর নাম রাখা হয় চৈতি। ঝুম এবারে এইচএসসি দেবে। চৈতি এসএসসি। আর ছুটকিটা ক্লাস এইটে। এক বছরেই তিনটে পাবলিক পরীক্ষায় বসবে তিনজন। স্কুল-কলেজ, কোচিং, প্রাইভেট, বই-খাতা কেনার খরচ যেন পাহাড়ের সমান। তার নিচে পিষ্ট হচ্ছি আমি। ঝুম দুটো টিউশনি করত। নিজের খরচ নিজেই চালিয়ে নিচ্ছিল। পড়া নষ্ট হচ্ছিল বলে আমি মানা করেছি। এই বছরটা গেলে আমার মাথা থেকে অর্ধেক চাপ নেমে যাবে।
মাকে বললাম,
–আচ্ছা, দেখব। ওই বড়ো অর্ডারটার ডেলিভারি আছে আজ। অনেকগুলো টাকা পাওয়ার কথা।
মা আশ্বস্ত হলো। পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠল,
–তুই ভাতের প্লেটে হাতও দিসনি, রুমকি!
আমি অসহায় গলায় বললাম,
–সকালে ভাত খেতে ভালো লাগে না, মা! আমি যাওয়ার সময় একটা বনরুটি কিনে খেতে খেতে যাব।
–কতবার শিখিয়েছি, রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেতে নেই। ঘর থেকেই খেয়ে যাবি।
মা ভাতের প্লেট টেনে নিয়েছে। লোকমা বানিয়ে আমার মুখে দিতে দিতে বলল,
–ভাত পেটে থাকে। সেই কখন লাঞ্চ হবে! পেটপুরে খেয়ে গেলে বল থাকবে।
ভাতের ভেতর মাংসের স্বাদ পেলাম। বিস্মিত গলায় জানতে চাইলাম,
–মাংস পেয়েছ কোথায়?
মা হাসলো,
–তোর ছোটোচাচিরা ব্রয়লার রান্না করেছিল, একবাটি দিয়েছিল কাল বিকেলে। তুলে রেখেছিলাম তোর জন্য। সকালে তুই খেতে চাস না মোটেও! এক টুকরো করে তোকে দেবো।
–রেখে দিতে। ছুটকিটা মাংস পেলে দুটো ভাত খায়। ওর হাড়-মাংস বেরিয়ে গেছে!
মা উত্তর দিলো না। আমি খাওয়া শেষ করে মায়ের আঁচলে মুখ মুছলাম।
বললাম,
–তুমি যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো সেটা কি আমি তোমার বড়ো সন্তান বলে নাকি আমার পড়াশোনা হলো না বলে?
মুখরা মা মাঝেমাঝেই চুপ করে যায়। পেটে বোমা ফাটালেও তখন টুঁ শব্দটি করে না। রাস্তা পর্যন্ত আমার সাথে সাথে আসে মা। যতক্ষণ আমাকে দেখা যায় ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। আমি অদৃশ্য হলে চোখের জল মুছে ঘরে যায়। ছুটকির কাছ থেকে এসব খবর পাই আমি। আজকে রাস্তায় উঠে মাকে কাছে নিলাম। শাফিনদের আঙিনা দেখা যাচ্ছে। মায়ের কানের কাছে খুব ধীর গলায় বললাম,
–দাওয়াত করতে চাও, করো। কিন্তু বিয়ের কথাটা তুমি আগ বাড়িয়ে বলো না। ওরা বলুক। আমার কিছু নেই, মা। আত্মসম্মানটুকু থাকুক। ওইটুকুই তো শুধু আছে আমার!
মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।

**

ফ্লোর ইনচার্জ বেশ খানিকটা রাগ করল। আজকে ওভারটাইম করব না আমি। চারটে শার্ট সেলাই করেছিলাম। আমি নিজে সেটা ডেলিভারি করতে চাইছি। মা পারবে না। অন্য বোনদেরকে আমি দর্জিগিরি করতে দিতে চাই না। আমার জন্য অর্ডারটা বেশ বড়ো। চার সাতে আঠাশশো টাকা মিলবে পারিশ্রমিক। সবটাই আমার পরিশ্রম। কারিগর নেই। আমিই কাটিং মাস্টার, আমিই সেলাই করি। সুতার খরচ নেই, কেননা সুতাটা কাজের জায়গা থেকে চুরি করি। আমার বিবেকে বাধে না। সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে আমাকে অনেক বড়ো বড়ো কুরবানি দিতে হয়েছে। সবচেয়ে আগে ছেড়েছি সততাকে!
ফ্লোর ইনচার্জ আমাকে অত্যন্ত অপছন্দ করে। তার অধীনস্থ কেউ তার চাইতে বেশি শিক্ষিত সেটা সে মানতে পারে না। আমি সার্টিফিকেটধারী পাশ নই, জেলা মেরিট লিস্টে টপার ছিলাম। স্কুলের এচিভমেন্ট বোর্ডে আমার ছবি বড়ো করে লাগানো আছে। ইংরেজিতে সাবলীল ছিলাম বলে, স্কুলে পরিদর্শক এলে আমাকেই ডাকা হতো ইংরেজি স্পিচ দেওয়ার জন্য। ফিজিক্স ভালো বুঝতাম বলে মুন্সী স্যার বলতেন, তুই তো আইনিস্টাইন হবি!
আমি হয়েছি সেলাই দিদিমণি!
কলেজে আমি ফ্রি পড়তে পারতাম, এসিস্ট্যান্ট হেডস্যার বলেছিলেন, চেষ্টা করলে স্টাইপেন্ডও মিলবে। স্কুলের গভর্নিং বডিকে তিনি রাজি করাবেন। চাচারা নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ হলেও আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। তাতে আমার সংসারে ভাতের জোগান হতো না। আমি নিজের জন্য স্বার্থপর হতে পারিনি!
আগে আগে বাড়ি গেলে এসিস্ট্যান্ট হেডস্যারের সাথে কদাচিৎ বাজারে দেখা হয়ে যায়। আমি চোখ লুকাই, স্যারও আমাকে চিনতে না পারার ভান করেন। ওই একজনের সামনেই মাথাটা নিচু হয়ে যায় আমার। আর কাউকে আমি পরোয়া করি না।
বাইশ বছর বয়স আমার। মনসুর ভাই বলে, আমি বুড়ি বুড়ি ভাব করি। মনসুর ভাইয়ের কথা বলা হয়নি। বয়স ত্রিশ। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করতেন। তার দল ক্ষমতা হারালে তিনি আর ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। আমার মতোই ড্রপ আউট। এখন এলাকায় মাস্তানি করেন আর বাপের টাকা ওড়ান। ও জিনিস তার বাবার একটু বেশি পরিমাণেই আছে। মাথার উপর বাবার ছায়া থাকাটা অনেক বিশাল কিছু!
মনসুর ভাই সম্পর্কে আর বেশি কিছু বলার পাচ্ছি না। উনি এত গুরুত্বপূর্ণ কেউ না! যেদিন আমার নাইট থাকে সেদিন আমাকে বাড়ি পৌছে দেওয়ার দায়িত্বটা উনি কবে নিয়েছেন আমি মনে করতে পারি না!
ফ্লোর ইনচার্জের সাথে ঝগড়া করে আজকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছি। শার্টগুলো প্রাপককে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। উনি ড্রাইভার পাঠিয়েছিলেন। ড্রাইভার আবার ফিরে এসেছে অভিযোগ নিয়ে। স্যাম্পলের সাথে নামি মাপে মিলছে না। গজফিতে দিয়ে তাকে মেপে দেখিয়ে দিলাম। কোথাও চুল পরিমাণ পার্থক্য নেই। বলল,
–স্যার তো মানে না! বলে ফিটিং হয় না।
–আপনার স্যারকে আসতে বলবেন।
লোকটার চোখ কপালে উঠল,
–আমার স্যার কে জানেন? উনি এখানে এই দোকানে আসবেন?
আমি কড়া চোখে তাকিয়ে বললাম,
–উনিই আপনাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন, আমি কিন্তু যাইনি! দরকার হলে আমি সেলাই খুলে আবার কাজ করব। কিন্তু ওনাকে দেখিয়ে দিতে হবে কোথায় সমস্যা হয়েছে।
সিগারেটের বাজে গন্ধে আমার ছোটো দোকানঘর ভরে গেল। মনসুর ভাই এসেছে। সে ড্রাইভার লোকটাকে বলল,
–সন্ধ্যা থেকে খেয়াল করতেছি, তুমি এইখানে তিন বার রাউন্ড দিলা। কেস কী? ঠ্যাং ভাইঙ্গা হাতে ধরাই দেবো।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম,
–এর মধ্যে ঢুকবেন না। কাস্টমারের ড্রাইভার উনি।
–কোনো সমস্যা?
–আপাতত আপনি সমস্যা। কয়দিন গোসল করেন না কে জানে! ভকভক করে গন্ধ আসছে।
–এটা একটা ভুল কথা বললে, রুমকি। আমি আজকে দুপুরেই হেড এন্ড শোলডার পিপারমিন্ট দিয়ে গোসল করেছি।
–ভালো করেছেন, এখন যান। আপনি ঘন ঘন এই দোকানে আসা মানে আমার দোকান বন্ধ হতে বেশিদিন লাগবে না। আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা বাইরে টহল দেয়, তাদের জ্বালাতনে আপনি থাকা অবস্থায় মহিলারা কেউ এখানে আসে না। অর্ডার পাই না। মা ও রাগ করে।
বলতে বলতে ঝুমকি এসে গেল। মায়ের স্পাই। মনসুর ভাই এলেই মা ওকে পাঠায় আমার উপর নজরদারি করতে। মায়ের ধারণা মনসুর ভাইয়ের কুদৃষ্টি আছে আমার উপরে। ঝুমকি এসেই বলল,
–ছুটকি পড়তে দিচ্ছে না। আমি তোমার কাছে বসে পড়ি?
মায়ের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার কোনো কারণ নেই। ঝুমকি আর মনসুর ভাইয়ের সম্পর্ক খুবই ভালো। মনসুর ভাই আমাকে উদ্দেশ্য করে উদাসী গলায় বলল,
–তোমার কাস্টমার তো পুরুষ মানুষই দেখছি। মহিলা আসার কী দরকার? একটা শার্ট কত টাকা নাও তুমি?
–শার্ট সাতশো, প্যান্ট ছশো, পাঞ্জাবি আটশো। কাস্টমাইজ করলে দাম বাড়বে।
মানসুর ভাইয়ের চোখ কপালে উঠল,
–ওরে বাবা, তুমি তো ডাকাত। দুইদিনেই কোটিপতি হয়ে যাবা!
–কোটিপতি হলে আপনাকে ফ্রিতে একটা শার্ট বানিয়ে দেবো!
দোকানের কোণায় একটা চেয়ার রাখা আছে মনসুর ভাইয়ের নাম করে। কোনো এক অজানা কারনে ওই জায়গাটা তার জন্য বরাদ্দ রাখা আছে। ওই জায়গায় অন্য কেউ বসে না। চেয়ারে বসতে বসতে বললেন,
–আমার স্কুলটা চালু হয়ে গেলে, স্কুলের ইউনিফর্ম এর সব অর্ডার তোমাকে দেবো। তুমি কোটিপতি হয়ে যাবা। স্কুলের নাম দিয়েছি, ইস্টওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।
আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। অখ্যাত লালগতিবাজারের আরো অখ্যাত মহল্লায় ইন্টারন্যাশনাল স্কুল!
মনসুর ভাই আমার বিদ্রুপকে পাত্তা দিলো না। বলল,
–বুঝলে ঝুমকি, স্কুলের নামে খাতা ছাপাব। স্কুলে যারা পড়বে ওই খাতা ছাড়া স্কুলে অন্য খাতা নেওয়া এলাউড না। দশ টাকা খরচের খাতা বেচব আশি টাকা পার পিস। শুধু খাতা বেচেই কোটিপতি হয়ে যাব!
আমি কাপড়ে কেচি চালাতে চালাতে বললাম,
–বাহ, মনসুর ভাই তো আজকাল কোটি ছাড়া কথাই বলেন না। গরীবের দোকানে হাতির পায়ের নিচে আমি তো মাথা থেঁতলে মরেই যাব। আপনি বিদায় হন তো! রাত দশটা বেজে গেছে। আমাকে কাজ করতে দেন।
বিদায় নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই মনসুর ভাইয়ের মাঝে। তিনি ঝুমকিকে বললেন,
–ছোটো আপু, তুমি আমাকে ফাইন একটা লাল চা খাওয়াও তো!
ওয়াটার হিটার এবং চিনি, চা-পাতা মনসুর ভাইয়ের বন্দোবস্ত। কারেন্ট বিল বেশি আসে বলে আমি অভিযোগ করলে, দোকানের কারেন্ট বিল তিনিই দেন।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,
–ঝুমকি, তোমার আপা কি সবসময় এইরকম হেডমাস্টারনি ছিল?
ঝুমকিটা বড্ড মুখফসকা। হেসে খিলখিল করে বলল,
–আপনার মতো ছাত্র পেলে সবাই এরকম হেডমাস্টারনি হয়ে যাবে, মনসুর ভাই!
মনসুর ভাই মাথা নাড়েন,
–তুমিই আমার কদর বুঝলা!
ঝুমকি হঠাৎ করে বলে,
–একটা প্রশ্নের সত্যি উত্তর দেবেন?
মনসুর ভাইয়ের গায়ে হাফহাতা পোলো শার্ট, বেশ দামি ডেনিম প্যান্ট, পায়ে লোফার। মুখভরা চাপদাঁড়ি। প্রথম দেখাতে বখাটে মনে হলেও সে সুদর্শন। সাইড সিঁথি করে আঁচড়ানো চুলগুলোকে হাত চালিয়ে এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
–কী জানতে চাও, বলো?
ঝুমকি আবেগপ্রবণ গলায় প্রশ্ন করে,
–আমার আপু কি খুব অসুন্দরী?
মনসুর ভাই মারমার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেল, হাতে মুঠো পাকাতে পাকাতে বলল,
–কোন সুদানির ফুয়া বলেছে এই কথা?
–-আপনি প্রশ্নের উত্তর দেন।
মনসুর ভাইয়ের গলা তরল শোনায়, কাচের মতো ঝমঝম করে শব্দমালা,
–ওর মতো সুন্দর মেয়ে আমি আরেকটা দেখিনি, ঝুমকি!

চলবে…
আফসানা আশা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here