Saturday, August 22, 2026

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৯

0
3

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৯

আমি স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে যাচ্ছিলাম। আমার ধৈর্য আছে, মনোবল আছে, উদ্দেশ্যও পরিষ্কার। ভাঙা তরী নিয়ে ঠিকই পার হয়ে যেতাম এই জীবন সমুদ্রটা!
নিয়ন নামের উড়ো ঢেউ এই অকূল পাথারে ঝড় তুলে দিলো!
খুব সহসা এই অশান্তি থিতিয়ে যাবে না, সে আমি বেশ বুঝতে পারছি! অন্যদিন ভাত খেতে দশবার ডাকে মা। আজকে সব শুনশান।
রাত বারোটার দিকে দোকান বন্ধ করে ঘরে ঢুকতেই মা শুরু করল,
–ওর বাপ আমাকে শাস্তি দিতে এই দুনিয়ায় রেখে গেছে! না হলে এমন অবাধ্য মেয়ে দিয়ে যায়?
আমি চুপচাপ সহ্য করলাম। কথায় শুধু কথা বাড়বে!
মা শান্ত হলো না। বলেই গেল,
–তুই ওই বখাটের গলায়ই মালা দিবি? তা ডাক ওকে? কালকেই তোকে পার করব আমি!
আমি এই প্রসঙ্গে কথাই বললাম না। আস্তে করে বললাম,
–ভাত দেও মা!
মা মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করল,
–তোকে আমি ভাত দেবো না। আজ থেকে তোর ভাত বন্ধ!
–আচ্ছা!
রাগ করতে আমিও জানি। মুখ ফিরিয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ছুটকিকে বললাম,
–মশারি দিয়ে দিস!
মা উঠে এলো ভাতের কাঠি হাতে নিয়ে, আমার গালটিপে ধরে বলল,
–রাগ দেখাচ্ছিস কাকে? তোর খাই বলে তুই আমাকে চাকর পেয়েছিস?
আমি হতাশ হলাম। অনুনয় করে বললাম,
–তুমি একা কষ্ট পাচ্ছ না, মা, আমারও খুব কষ্ট হচ্ছে! অনুশোচনা হচ্ছে সবকিছুর জন্য। তুমি আমার কষ্টটা আর বাড়িয়ে দিও না!
মা হাতের অস্ত্র ফেলে দিলো,
–তোর কোনো কষ্ট নাই! কষ্ট থাকলে তুই এইটা করতে পারতি না! তোর দাদি মরার আগে, তোকে আমার হাতে দিয়ে গেছিল। বলছিল, রুমকির মা নাই, তুমি ওর মা হও! বিয়ের মেন্দি হাতে নিয়ে আমি তোকে বুকে নিছিলাম। আর নামাইনি কোনোদিন। মা হইতে চাইছি তোর। কিন্তু তুই আমাকে মা দেখিসিনি। আমি মমতা দিছি, তুই চাইছিস মমতার ঋণশোধ করতে। হয় না, রুমকি, মমতার দাম কোনোদিন চুকানো যায় না!
–আচ্ছা, চুকাব না। তোমার কাছে ঋণ থাকল আমার। এখন যাও, ঘুমাও।
মা নিজের পা বাড়িয়ে দিলো,
–না, আমি আর ঋণী হব না তোর কাছে।
–একেকবার একেক কথা বলছ। একবার বলছ, আমি তোমার কাছে ঋণী, আরেকবার বলছ তোমার ঋণ!
ছুটকি ফিক করে হেসে ফেলল আমার কথা শুনে। মা ফেলে দেওয়া ভাতের কাঠিটা কুড়িয়ে নিলো। ছোঁ মারল ছুটকির দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
–মায়ের সাথে ইয়ার্কি?
ভাতের কাঠি লেগে ছুটকির কপাল কেটে গেছে। ঘর নরকে পরিণত হলো। আমি উঠে গিয়ে ছুটকিকে ধরতে গেলে মা সামনে এসে দাঁড়াল,
–মরে যাক। সবগুলো মরে যাক। তোকে কিছু করতে হবে না। আমি ওদেরকে বিষ খাওয়াব। তারপর আমিও বিষ খাব!
ছুটকি কপাল চেপে বসে পড়েছে। চৈতি আর ঝুমকি ছুটে এসেছে ওর কাছে। আমি মেজাজ হারালাম। বললাম,
–বিষ খেতে হলেও আমার টাকায় খাওয়া লাগবে!
মা পা ঠুকে মেঝেতে বসে পড়ল,
–খাব না। তোর টাকার কিছু গলা দিয়ে নামাব না আমি! আজকে থেকে ভাতের দানা আমার আর আমার মেয়েদের জন্য হারাম!
হুমকি দিয়েই থেমে গেল না মা। ভাত তরকারি সব নিয়ে উঠানে কুকুরটার সামনে ঢেলে দিয়ে এলো।
আমি নতিস্বীকার করলাম। মায়ের কাছে এসে বললাম,
–আমাকে কয়েকটা দিন সময় দাও, মা!
–না। পাড়ায় কথা রটে গেছে। তোর বদনামে সয়লাব চারদিক। আমি আর অপেক্ষা করতে পারব না।
–কিন্তু বিয়ের পরই যদি আমাকে বিদেশ চলে যেতে হয়?
মা আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন বুঝে উঠল না। বিড়বিড় করে বলল,
–যাবি।
আমি হতাশার সুরে বললাম,
–আর কয়েকটা দিন, মা!
–মনসুরের কী এমন রাজকাজ বাকি আছে যে আরো অপেক্ষা করা লাগবে?
ঝুমকি মিনমিন করে বলল,
–মনসুর ভাই না। আপা যাকে বিয়ে করবে সে মনসুর ভাই না! অন্য কেউ। কে, সেটা আমরা কেউ জানি না!
মা কৌতুহলী হয়ে তাকাল আমার দিকে, রাজ্যের বিস্ময় জড়ো হয়েছে গলায়,
–কে সে, রুমকি? খুলে বল মাকে? কোথায় মুখ পুড়িয়েছিস তুই?
আমি ঠোঁট ফুলালাম। মায়ের কোলে মাথা গুঁজে দিয়ে বললাম,
–ও আসতে চেয়েছে, মা। তোমার কাছে আসতে চেয়েছে। আমিই এখন চাইনি। আমি আরেকটু গুছিয়ে নিতে চেয়েছি।
মা আমার মাথায় হাত রাখল,
–সব হবে, রুমকি। আল্লাহ যদি রিজিকে লিখে রাখে সব হবে। কিন্তু বদনাম রটে গেলে তা সহজে মুছবে না। তুই তোর মাকে আর জ্বালাসনে। বিয়েটা হয়ে থাকুক। আমার কলিজা জুড়াক!
আমি মাথা নাড়লাম। রাজি আছি আমি। বাইরে নিরন্তর সংগ্রাম করে বেড়ালেও, ঘরের ভেতর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না!
এই সময়ে এসে নিয়নকে খুব সঠিক এবং দূরদর্শী মনে হলো আমার। এখন মায়ের চাপে অনন্যোপায় হয়ে শাফিনকে বিয়ে করতে আমাকে রাজি হতেই হতো! যদি না…
মা বলল,
–এখনই ফোন দে?
–কালকে।
–না, এখনই তুই ফোন দিবি। বলবি, বাপ মাকে নিয়ে কালকেই যেন এই বাড়িতে আসে।
–কালকেই?
–হ্যাঁ। কালকেই।
মায়ের তর সইছে না। চৈতিকে বলল,
–আলমারি থেকে টাকার বাক্সটা আন। সকালে আমি বাজারে যাব। কাউকে কালকে প্রাইভেটে, কোচিংয়ে যেতে হবে না। হাতে হাতে গুছিয়ে দিবি। মেহমান আসবে। পাকা কথা কালই হবে। এই সপ্তাহেই তোদের বোনকে আমি বিদায় করব।
আমি নিয়নকে কল দিলাম। কল ঢুকল না। আবার দিলাম। এবারেও ঢুকল না। আমি কখনো ওর নম্বরে কল দিইনি। ওই দিয়েছে। শেষ কল করেছে এক ঘন্টা আগে। আটত্রিশটা মিসড কল হয়ে আছে। তারও আগে একবার কথা হয়েছিল। রাত নয়টার দিকে কল দিয়ে জানতে চেয়েছিল, বিয়েতে না করেছি কিনা। আমি রেগে গিয়েছিলাম। বাড়িতে কী গন্ডগোল হয়েছে, শাফিন চলে গেছে, বাড়িতে আমাকে নিয়ে বিচার বসেছে, সব জানিয়েছিলাম। ওকে বকেছিলামও। ওর জন্যই এতসবকিছু যাচ্ছে আমার উপর দিয়ে!
বললাম,
–এখন মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে। রাত দুটো বাজে। সকালে কল দেবো, মা!
মা শান্ত হলো। রাতে আবার চুলা জ্বলল। ভাত রান্না হলো। আলুভর্তা দিয়ে গরম ভাত খেলাম চুলার পিঠে বসে। চার বোন আমাদের মাকে নিয়ে মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমিয়ে গেলাম।
সকালে ফ্যাক্টরিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে গেলে মা মানা করল,
–আজকে ছুটি নে?
–ছুটি দেবে না!
–মা মরলেও দেবে না? বল, তোর মা মরে গেছে?
–আবার শুরু করছ?
–তুই ফোন দে ওই ছেলেকে? দুপুরে আসবে নাকি রাতে সেটা জানা আমাকে? আমি সেইমতোই তো রান্না করব।
আমি ফোন দিলাম নিয়নকে। কল ঢুকল না। এরকমই কি ও? আনরিচেবল? যখন ওর প্রয়োজন তখন ফোন করে, আমার দরকারে ফাঁকি?
মেজাজ উত্তপ্ত হতে শুরু করল। পুরোপুরি বিপর্যস্ত লাগল যখন পরের এক দুই ঘন্টাতেও নিয়নকে পেলাম না!
ঝুমকি ইয়ার্কি করে বলল,
–কার্মা, বুঝেছিস আপা? তোকে ফোন করে যখন পাই না, আমাদেরও এমন টেনশন হয়!
চৈতি বলল,
–শান্ত হয়ে বস। এত অস্থির হওয়ার মতো কিছু হয়নি। হয়তো ব্যস্ত। হয়তো ফোনে চার্জ নেই। হয়তো মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। কতকিছুর সম্ভাবনা আছে।
ঝুমকি বলল,
–এতগুলো হয়তো বলে তো রেড ফ্ল্যাগ উড়িয়ে দিলি। আপা, যে তোর কলের জন্য মোবাইল কোলে নিয়ে বসে থাকে না, সে হলো রেড ফরেস্ট! প্রাকটিক্যাল দেখাই, দাঁড়া?
ঝুমকি আমার মোবাইল নিয়ে ডায়ালপ্যাডে নম্বর দিলো। একবার রিং পড়তেই মনসুর ভাইয়ের গলা ভেসে এলো,
–রুমকি, সমস্যা কোনো? ফ্যাক্টরিতে যাও নাই?
আমি ফোন নিয়ে বললাম,
–না মনসুর ভাই। কোনো প্রব্লেম না। কোথাও কল যাচ্ছে না আমার মোবাইল থেকে। ভাবলাম, মোবাইলে সমস্যা কিনা!
–কল তো আসলো।
–তাহলে ঠিক আছে। রাখি।
সারাদিন অপেক্ষা করলাম আমি। না নিয়ন কল দিলো, না আমার কল ঢুকল। মায়ের মুখ থমথমে। রাতে বিছানায় বালিশে এপাশ ওপাশ করছি। মা এলো তেলের বোতল নিয়ে। আমার চুলে তেল লাগাতে লাগাতে বলল,
–বিপদ আপদ হইছে কোনো। আর কারো নম্বর নাই? ভাই বোন? বন্ধু? অফিসে কেউ? পরিচিত কেউ?
আমি মাকে নিয়নের পরিচয় খুলে বলিনি। এখনো বললাম না। আগে আমার বোঝাপড়াটা হোক!
ফ্যাক্টরিতে ছুটির শেষে খুব আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম গেইট ধরে। হয়তো নিয়ন আসবে! দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমার পা ধরে এলো। দারোয়ান চাচা বলল,
–এই ছেমড়ি, দাঁড়ায় আছিস কেন? বস একটু?
তার বসবার টুলটা ঠেলে দিলো আমার দিকে।
রাত বাড়ছে। নিয়ন এলো না। মনসুর ভাইয়ের হোন্ডা এসে থামল। আমাকে ডাকল,
–রুমকি, কী অবস্থা? আসো তাড়াতাড়ি!
আমি নড়লাম না।
মনসুর ভাই বাইকের স্ট্যান্ড নামিয়ে আমার কাছে এলেন। বললেন,
–মুখ এইরকম দেখাচ্ছে কেন? বাড়িতে ঝগড়া হয়েছে?
–আমাকে একজায়গায় নিয়ে যাবেন, মনসুর ভাই? একা যেতে ভয় লাগছে।
ঠোঁট চাটলাম আমি।
মনসুর ভাইয়ের সাথে কুশিয়ারা এলাম। নিয়নের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করলাম। সোমবারের রাত আমার জন্য প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছিল সেখানে! দুইদিনের মধ্যে এখানকার বাসিন্দা বদলে গেছে, ডেকোরেশন বদলে গেছে! নিয়ন নামে কাউকে চিনলই না এরা!
মাঝখানে দুটো দিন গেছে, আজকের দিন নিয়ে তিন দিন! তিন দিন আগে এখানে এসেছিলাম আমি। সারাদিন ছিলাম। সেই ঘর, সেই আসবাব, সেই জানালার পর্দা, সেই আলোআঁধারি – কিছু নেই, মানুষটারও নাম নিশানা মুছে গেছে!
আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। গলা শুকিয়ে গেল।
মনসুর ভাইয়ের শার্টের হাতা চেপে ধরলাম।
মনসুর ভাই অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করল ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদেরকে। ওরা আমার চাইতে বিস্মিত হয়ে উত্তর দিলো,
–দুই বছর ধরে এখানে আছি!
মনসুর ভাই বলল,
–তুমি ঠিক জায়গায় আসছ, রুমকি? ঠিকঠাক মনে আছে? চার তলাই তো নাকি? মনে করার চেষ্টা করবা? পাঁচ তলা হতে পারে না?
আমি পাগলের মত পাঁচ তলা ঘুরলাম, তিন তলা হাতড়ালাম। নেই, নিয়ন কোথাও নেই! আফ্রিদি ভাইকে ফোন দিলাম। দিতেই থাকলাম। সেই নম্বরও বন্ধ।
আরশি আপুকে কল দিলাম। কাঁপা কন্ঠে জানতে চাইলাম,
–তোমার দেবর কই, আপু?
–নিয়ন? দেশে ছিল তো এতদিন। চৌদ্দ পনেরদিন হলো চলে গেছে! কেন? কোনো দরকার?
–চৌদ্দ পনেরদিন? তুমি শিওর?
–না, মনে হয়! আমি বাড়ি গেলাম কবে?
আমি উদগ্রীব হলাম ওর উত্তর শুনতে,
–তেরদিন, তেরদিন। ওকে সি অফ করে আমি বাড়ি গিয়েছিলাম। ঝুমকি, চৈতি, ছুটকি সবার সাথেই দেখা হয়েছিল। তোকে তো পাওয়াই যায় না। কী করছিস আজকাল? তর দুলাভাইকে বলব একটা চাকরির জন্য? এদের তো কত ব্যবসা!
আমি ফোন রেখে দিলাম।
আবার ফোন দিলাম,
–নিয়ন ভাই কোন দেশে গেছে?
–ইউকেতেই জব পেয়েছে। সেটেল করবে ওখানেই।
–ইউকেতে পৌছেছে? তুই জানিস?
–হ্যাঁ। ওদের দুই ভাইয়ে তো প্রতিদিন কথা হয়। কী হয়েছে, রুমকি? তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
আমি জানি না আমার কেমন লাগছে। দুটো দিন কার সাথে কাটালাম আমি?
মনসুর আমাকে টেনে কুশিয়ারা হাউজিং থেকে নিয়ে এলো। একটা বেকারিতে বসলাম আমরা। সেভেন আপ আর কেক অর্ডার করল মনসুর ভাই। ঠান্ডা পানির বোতল খুলে দিলো।
আমি পানি খেলাম। খিদে পেয়েছিল। কেকটাও খেলাম। সেভেন আপের বোতলে চুমুক দিলাম।
মনসুর ভাই বলল,
–তোমারে মনে হয় নিশি ধরছে!
–নিশি কী?
–অন্য লোকের রূপ ধরে আসে। মানুষ না। অশরীরী!
আমি তাকিয়ে থাকলাম মনসুর ভাইয়ের দিকে। মনসুর ভাই আমাকে বেকারিতে বসিয়ে বাইরে গেল। সিগারেট টেনে এলো। ঠান্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে আমার পাশে বসে মোলায়েম গলায় প্রশ্ন করল,
–তোমার কাছে ওই ছেলের ছবিটবি নেই? তোমরা ছবি তোলো নাই? আজকাল তো প্রেম হলেই আগে ছবি তোলে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। স্টোরি দেয়।
–ওর কাছে আছে। ওর মোবাইলে ছবি তুলেছিল। আমার তো বাটনফোন!
মনসুর ভাই অনেকখানি আন্তরিকতা আর উদ্বেগ নিয়ে বলল,
–একটা হিন্দি মুভি দেখছিলাম। অনেক আগে। মাধহোশি নাম। বিপাশা বসু আর জন। টুইন টাওয়ারে যখন হামলা হলো, বিপাশা ফোনে ওর বোনের সাথে লাইনে ছিল, সেই সময়েই বিমান হামলায় ওর বোন মরে গেল। সেই আঘাতে বিপাশা অসুস্থ হয়ে গেল। তারপর তোমার মতোই কাহিনি। এইরকম একটা ফ্ল্যাটে জনকে কল্পনা করে নিলো ও। প্রেম, বিয়ে। তারপর একদিন দেখা গেল, জন বলে কেউ নাই। সব বিপাশার কল্পনা। সিজোফ্রেনিয়া ধরণের অসুখ। তোমার সাথেও এইরকম কিছু হইছে, রুমকি! এই যে জীবন তোমার, এটা তো তুমি চাও নাই। তুমি মানতেও পারো নাই এই জীবন। তাই তোমার সাবকনশাস মাইন্ড আরেকটা দুনিয়া তৈরি করে নিয়েছে, যেটাতে তুমি তোমার ইচ্ছামতন, তোমার স্বপ্নের জীবন যাপন করো!
–তাই? এইরকম কি আসলেই হয়?
–পৃথিবীতে কতকিছু হয়! কত ধরনের মানসিক অসুখ আছে, কত শত ডিজঅর্ডার!
–আপনি বলতে চাইছেন, সব মিথ্যা, সব আমার ভ্রম? আমি সিজোফ্রেনিক?
–আমার পরিচিত ডাক্তার আছে। আমি তোমাকে নিয়ে যাব। সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি আবার প্রশ্ন করলাম,
–আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, মনসুর ভাই?
–সেইরকম না! মাথা অনেক সময় ঝামেলা করে। মানুষের ব্রেইন অনেক জটিল জিনিস। মাঝেমাঝে একটু জট লাগিয়ে ফেলে। আবার নিজেই খুলে দেয়।
–নিয়ন মিথ্যা? শুক্রবার দিনটা আমার কল্পনা? আর শনিবার সন্ধ্যা? সব আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা? নিয়ন কখনো আসেনি? আমাদের কখনো দেখা হয়নি?
মনসুর ভাই চুপ করে থাকল।
আমি ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করলাম। বললাম,
–এটা না থাকলে আমি বিশ্বাস করতাম, আমি পাগল!
মনসুর ভাই কাগজটা নিলো আমার হাত থেকে। কাগজের ভাঁজ খুলতে খুলতে জানতে চাইল,
–কী এটা?
–শুক্রবার সন্ধ্যায় কুশিয়ারা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা কাজি অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। এটা রেজিস্ট্রি পেপারের কপি। মেইন কপি তিনদিন পরে দেবে। এটা নিয়ন তখনই চেয়ে নিয়েছিল। আমাকে এক কপি দিয়েছিল, নিজের কাছে এক কপি রেখেছিল।
মনসুর ভাই সাথে সাথে কাজি অফিসে ফোন করল।
ফোন রেখে মনসুর ভাই বিড়বিড় করল,
–কাজি তো বলতেছে, এই নামের পাত্র-পাত্রীদের আসলেই বিবাহ হয়েছে! রেজিস্ট্রিও হয়েছে!
আমি অল্প হাসলাম।
এবারে মনসুর ভাইকে বিভ্রান্ত দেখাল। চোখমুখ শক্ত করে বলল,
–একটা অচেনা মানুষকে বিয়ে করে নিলে?
–সাত আট ঘন্টায় আমরা এত এত কথা বলেছিলাম, মনসুর ভাই! এক জীবনের সব কথা হয়ে গিয়েছিল আমাদের। আমার মনে হয়েছিল, ওর চাইতে বেশি চেনা আর কেউ নেই আমার! এর চাইতে বেশি কাউকে চেনা লাগে না ভেবেছিলাম! ভেবেছিলাম, আর কাউকে চিনবার দরকার কোনোদিন হবে না!
–তাহলে এখনকার ঘটনার কী ব্যাখ্যা তোমার কাছে?
–আমি কিছু জানি না! কিছু বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকু আইডিয়া করতে পেরেছি, আমি সর্বনাশ করে ফেলেছি!
মনসুর ভাই দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
–সুদানির ফোয়া!

চলবে…
আফসানা আশা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here