Saturday, August 22, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১০

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১০

0
3

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১০

শাফিনের দিয়ে যাওয়া মোবাইলটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করলাম। ঝুমকি, চৈতি, ছুটকি সবাই মিলে নিয়নের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আরও কী কী সোশ্যাল একাউন্ট খুঁজতে চেষ্টা করল। কখনো সালমান ফারসীকে খুঁজল, কখনো নিয়নকে। নিয়ন নামের বানান আই দিয়ে, ই দিয়ে, ওয়াই দিয়েও সার্চ করল। হাজার হাজার প্রফাইল। অথচ, নিয়ন নামে আমি শুধু একজনকেই জানতাম! তার মধ্যে কতকগুলো আবার লকড আইডি! ছেলেদের আইডিতে কী মণিমুক্তা, হীরে জহরত লুকানো থাকে যে সেটায় তালা ঝুলিয়ে রাখতে হবে? আশ্চর্য!
আমি আরশি আপুকে ফোন দিলাম,
–নিয়ন ভাইয়ের ইউকে ফোন নম্বরটা দেবে?
–ওকে তোর কী দরকার, বল তো? কয়েকদিন আগেও খুজেছিলি?
–খুব দরকার রে, আপু। শুধু একবার কথা বলাটা খুব দরকার!
আরশি আপু একটু থেমে থাকে। তারপর করুণ গলা করে বলে,
–আমাদের তুলনায় ওদের অবস্থা তো জানিসই। এখানে আমাকে সবসময় ছোটো হয়ে থাকতে হয়। তার উপর তুই যদি কোনো ঝামেলা করিস, আমার তো এখানে সংসারটা করা কষ্ট হয়ে যাবে…
আমি অনুনয় করি,
–আমি কোনো ঝামেলা করব না। আমি শুধু একবার কথা বলব। আমি তোর বাড়িতে আসি? না হয় তুই আয়? তোর মোবাইল দিয়ে একবার কলে ধরিয়ে দে? সর্বোচ্চ দশ সেকেন্ড!
–আমরা তো ঢাকায় চলে এসেছি!
আমি ফোন রেখে দিই। গোলকধাঁধায় ঘুরি। কোনো সমাধান খুঁজে পাই না!
সারারাত ঘুমাতে পারি না!
একটা মানুষ বাতাসে মিলিয়ে গেল? হয় কখনো?
নাকি, স্বপ্ন ছিল?
স্বপ্ন কীভাবে এক টুকরো কাগজ ফেলে রেখে গেল আমার কাছে?
ঘর ছেড়ে বেরোই আমি। রোয়াকের উপর বসে থাকি। আমার ঘুম আসে না। ওখানেই গুটিশুটি হয়ে শুয়ে থাকি। মা এসে বসে মাথার কাছে। বলে,
–ঘুমালি না একটুও?
আমার ঠোঁট ফোলে। কাঁদতে পারি না। কাঁদবার চেষ্টায় আমার মুখ বিকৃত হয়ে যায়।
মা আমার মাথায় হাত বুলায়।
আমি বলি,
–আমি অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছি, মা!
মা উতলা হয় না। শান্ত গলায় বলে,
–যদি মনে করিস, ওটা ভুল ছিল। তাহলে ভুলই। ভালোবাসা না। আর যদি মনে করিস, তুই ভালোবাসছিস, তাহলে এমন অনুতাপ করবি কেন? ভালোবাসায় কোনো ভুল নাই। যদি কেউ ভুল করে থাকে সেটা নিয়ন করেছে, তুই না। নিজেরে জিজ্ঞাসা কর। মনে কর, আল্লাহ তোরে আবার ওইদিনে ফেরত নিছে। তুই কুশিয়ারা গেছিস। সেইদিন যা করছিলি, আবার কি সেইটা করবি? নাকি, নিয়নরে ফিরায়ে দিবি এইবার?
আমি উঠে বসলাম। মায়ের দিকে তাকালাম। আমার সাদামাটা গৃহিনী মা। বাচ্চাগুলো কী খাবে, কী দিয়ে কী রান্না করবে – সেটা ছাড়া যার দুনিয়ার অন্য কোনো ভাবনা নেই। অতি অল্পশিক্ষিত এই মা একটা ভয়াবহ কথা বলে ফেলেছে। চোখে নামিয়ে মায়ের হাত মুঠোয় নিলাম। বিড়বিড় করলাম,
–আমি মনে হয় আবার একই ভুল করব! আবার, আবার, বারবার একই ভুল করব!
মা থেমে থাকল কয়েক সেকেন্ড। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। বলল,
–তাইলে পিঠ সোজা কর। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বল। সারা দুনিয়ার চোখে চোখ রেখে কথা বল।
আমি মাথা সোজা করলাম। মেরুদণ্ডও।
থানায় চলে এলাম কাবিননামা নিয়ে। দায়িত্বরত ওসি এই হাসেন তো সেই হাসেন। কটুক্তি করে বললেন,
–ছেমড়ি, সিনেমা একটু কম করে দেখ! আয়নায় চেহারা দেখেছিস?
আমি শক্ত মুখ করে বলি,
–সে আমি দেখে নেবো। কাজি অফিসের আশেপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। আপনি দেখেন, নিয়ন ওইদিন এখানে ছিল। আপনি চৌধুরী বাড়ি যান। নিয়নের ফোন নম্বর এনে যোগাযোগ করেন। আমাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে দেন। আমাকে প্রমাণ করে দেন, আমি সব মিথ্যা বলছি। এর চাইতে বেশি কিছু চাই না আমি! আমি মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হতে চাই।
হাজারটা কটু কথা শুনেও আমি গ্যাট হয়ে বসে রইলাম। নাছোড়বান্দা আমকে ছাড়াতে ওসি সাহেব নিয়নের মাকে ফোন করলেন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে আমাকে বললেন,
–ম্যাডাম বলতেছে, তার ছেলে দেশে নাই অনেকদিন। সেই ছেলের পিছনে অনেক মেয়েই লাইন দিয়ে পড়ে আছে। এইসব ‘সিলি’ লাগে তার কাছে। সিলি মানে বুঝিস? খুচরা আলাপ। খুচরা টাকার যেমন দাম নেই, তোর মতো গার্মেন্টস ওয়ার্কারেরও দুই টাকার দাম নেই তাদের কাছে। টিস্যু কাগজেরও দাম আছে। তোর সেই দামও নেই। বাড়ি যা। কাজ করে খা। ম্যাডাম মানা করে দিছে, এইসব নিয়ে যেন তাকে আর ডিস্টার্ব না করি। ঝামেলা বাড়াস না। মেয়েমানুষ, পুলিশের চক্করে পড়লে জীবন শেষ! এরকম করে তাদেরকে বিরক্ত করলে, সম্মানহানির মামলা খাবি। চৌদ্দপুরুষ জেলের ভাত খেতে হবে নইলে ভিটায় ঘুঘু চড়বে!
আমি ব্যর্থ মনে বাড়ি ফিরি। বাড়িতে আবার ঝগড়া লেগেছে। বড়োচাচি বাড়ি মাথায় তুলেছেন। আমার মুখ টেনে ধরলেন, ব্যথা দিয়ে বললেন,
–তুই নাকি আরশির দেবরের নামে থানায় কেস করছিস?
তিল থেকে তাল হয়ে গেছে। সেই তালে তুলকালাম।
মাথা নেড়ে বললাম,
–না। কেস করিনি। আমি শুধু ওকে খুঁজতে চেয়েছি।
–খুঁজতে হবে না। সে যেখানে থাকে থাকুক। আরশির শাশুড়ি ফোন করে একগাদা কথা শোনাল। আমি বাপু, তোর জন্য আমার মেয়ের সর্বনাশ হতে দেখতে পারব না।
মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–এই মেয়েকে এখনো যদি পার না করিস, তোর তিনটে মেয়েরও বিয়ে দিতে পারবি না! কী কথা হচ্ছে, জানিস?
বড়োচাচি গলা চাপাল,
–মালেকা চাচি এদিক সেদিক সারা লালগতিবাজারে বলে বেড়াচ্ছে, রুমকির পেট হয়েছে!
ছুটকি ফিসফিস করল,
–পেট হওয়া মানে কী?
আমি সবার মুখের দিকে তাকাই। আমাকে মাথা উঁচু করে চলতে বলা মায়ের চোখ মাটির দিকে। আমিও মাটিতে মিশে যেতে থাকি!
বড়োচাচা ধমক দিলেন স্ত্রীকে। কিন্তু নিজেও বললেন,
–রুমকির বিয়েটা হয়ে যাওয়া দরকার! রুহুলের ছেলের সাথে তো আর হবে না! ওরা আর রুমকিকে নেবে না। তোমার বড়োজা যে সম্বন্ধটা আনছে, সেইটাই চেষ্টা করি? মেয়ে তো অনেকগুলো। পার তো করা লাগবে।
বড়োচাচি উৎসাহী হলেন,
–আজকেই ডাকি ওদেরকে? বিয়েটা হয়ে যাক। তাহলেই সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে। স্বামী-সংসার পেলে রুমকিও আরশির দেবরের জন্য এরকম পাগলামি বন্ধ করে দেবে। স্বপ্নেরও সীমা আছে। কই সে ছেলে আর কই এই রুমকি! এই মেয়েরে তাড়াতাড়ি ঘাড় থেকে নামাও। তারপর মিলাদ দেও। তোমার হাড়ে বাতাস লাগুক! আজকেই সন্ধ্যা বেলাতেই আসতে বলি ওদেরকে। খেজুর, বাতাসা দিয়ে বিয়ে হয়ে যাবে।
মা মাটির দিকে তাকিয়েই জবাব দিলো,
–আমি রুমকির সংসার চাইছি। ওকে ঘাড় থেকে নামাইতে চাই নাই। ওর ইচ্ছা ছাড়া কোনো বিয়ে হবে না।
বড়োচাচি ক্ষিপ্ত হলেন,
–তোমার কথায় কী হবে? তুমি তো ওর মা না! বাপের অবর্তমানে চাচাই গার্জিয়ান। আমরাই ওর বিয়ে দেবো।
মা জোর গলায় উচ্চারণ করে,
–আমি মা হই বা না হই, রুমকির মত ছাড়া কোনো বিয়ে হবে না।
–রুমকির মত আছে। কি রুমকি, বিয়ে করবি না? বারোভাতারী হবি? এই বোনগুলোর জীবনও শেষ করবি?
মা ঠান্ডা গলায় বলল,
–রুমকি মত দেবে না। ও বিয়ে করবে না। আজ না, কাল না, কোনোদিন না। ওর বিয়ে হয়ে গেছে!
–তুইও সর্বনাশা কথা বলিস? লজ্জা করে না?
বড়োচাচি হায় হায় করে উঠলেন,
–সবাই মিলে আমার আরশির পিছনে লেগেছে! ওরে সংসার করতে দেবে না! ওর কপালে সুখ কারো সহ্য না। সবাই আমার মেয়েটারে হিংসা করে!
মা শক্ত গলায় বলল,
–আরশিকে বলো, নিয়নের সাথে রুমকিকে একবার কথা বলিয়ে দিতে। তাহলেই তো সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়। ও একবার নিজের মুখে রুমকিকে বলুক, রুমকিকে ও বিয়ে করেনি! রুমকির সাথে ওর দেখা হয়নি। দেখা হয়নি, কিছু হয়নি! তারপর, আমিই আমার মেয়ের চার হাত পা বেঁধে ঘরে ফেলে রাখব। কাউকে কষ্ট করতে হবে না।
বড়োচাচি মাথায় হাত দিলেন,
–তোদের কি জ্ঞানবুদ্ধি কিছু নেই? এরকম লজ্জার কথা সেই ছেলেকে বলা যায়? মান-সম্মান থাকবে কিছু?
মায়ের গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
–বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ালে হাত পোড়ে, কপালও পোড়ে। আমাদের সাধ্যে যা, তার বেশি চাওয়া উচিত না। রুমকির বিয়েটা দিয়ে দিলে, মাথা থেকে এসব কোথায় চলে যাবে! আমাদের যায়নি? ছোটোবেলায় সিনেমার নায়ককে বিয়ে করতে চাইতাম, কল্পনায় নায়কের সাথে সংসার করতাম। সেসব কখনো সত্যি হয়? কত মেয়ে শুনি, প্রিয় নায়কের বিয়ে হয়ে গেলে বিষ খায়। সেসব আশকারা দেওয়া কি মায়ের কাজ? মা হয়েছিস, মেয়ের হিসাবমতো, মাপমতো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিবি।
–আমার কোনো তাড়া নেই রুমকির বিয়ে দেওয়ার!
বড়োচাচি ফুঁসে উঠলেন,
–তাহলে ভিন্ন হতে হবে। বাড়িতে আরও মেয়ে আছে। তোদের নষ্টামির কারণে তো সবার কপাল পোড়াতে পারি না!
–আমরা ভিন্নই। আলাদা হাড়িতে ভাত খাই।
–বাড়ি ভিন্ন হবে!
এতদিন এক উঠোন ছিল আমাদের। রাতারাতি বাঁশের বেড়ার পাঁচিল উঠে গেল মাঝখান দিয়ে। আমার তিন বোন আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে।
আমার হতাশ লাগে। কাজে মন দিতে পারি না। ভুল সেলাই দিয়ে কিউসি ম্যানেজারের ঝাড়ি খাই! বারবার ভুল হয়। অগত্যা চাকরিটা চলে গেল!
দোকানে আস্ত থান লম্বালম্বি কেটে নিয়ে বসে থাকি!
রাতে দোকানের ঝাঁপ নামানোর আগে মনসুর ভাইকে বললাম,
–বাড়ি যান। আমি দোকান বন্ধ করব।
–তুমি যেভাবে দুঃখবিলাস করতেছে, তাতে খুব তাড়াতাড়ি তোমার দোকান বন্ধ হবে। আই মিন, লাটে উঠবে!
–উঠুক। আমি তো পাগল। পাগলের কাছে কে জামা বানাতে আসবে?
মনসুর ভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমার হাত ধরে বললেন,
–চাকরিটা গেছে, দোকানও যাবে! স্বাভাবিক হও, রুমকি! জীবন এইভাবে থেমে থাকে না। তোমার মা কিছু বলে না তোমারে?
আমি মুখ ফিরিয়ে নিই। আমার কাঁদতে ইচ্ছে করে, কিন্তু চোখে জল নামে না।
ঝপ করে দোকানের শাটার নেমে গেল। আমি চমকে বললাম,
–ঝুমকি তুই? চাবি আনতে গিয়ে কোথায় হারিয়েছিলি? আমি দোকানের ভেতর। না দেখেই শাটার নামিয়ে দিলি? এত ব্যস্ত তুই?
ঝুমকি না।
আমি রেগে গিয়ে বললাম,
–ছুটকি নাকি? এটা কী ধরনের ইয়ার্কি?
ঝুমকিও না, ছুটকিও না। বড়োচাচির গলার আওয়াজ পেলাম। চিৎকার করে লোক ডাকছেন। হাতেনাতে ধরেছেন আমাকে। দোকানের ভেতরে কুকর্ম করছিলাম!
বাজারের কাছে বাড়ি আমাদের। লোক জড়ো হতে মিনিটখানেক লাগল। হতভম্বভাব কাটিয়ে মনসুর ভাই তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে কল দিলেন। ওরাও ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে। যতক্ষণে ওরা দোকানের শাটার আবার তুলেছে, একগাদা চোখ এই ছোটো দোকানঘরের ভেতর আমাকে আর মনসুর ভাইকে নিভৃতে, গোপনে আবিষ্কার করল।
কেউ বলল, ‘এইজন্যই রুহুলের ছেলেরে বিয়ে করতে রাজি হয় নাই!’
কেউ বলল, ‘বাপ মরার পরেও মেয়েগুলা এত ঝাক মাইরা চলে কেন এবারে বুঝলাম। আসলে, চামড়া বেচে খায়!’
কেউ বলল, ‘গার্মেন্টসে কাজ করা মেয়ের চরিত্র আর কত ভালো হবে!’
কেউ বলল, ‘আসল ব্যবসা তাইলে এটাই! সবগুলো মেয়ে পতিতা!’
আমি অনেক যাতনা সয়েছি, এমন কটুকথা আমাদেরকে বলার স্পর্ধা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি! মনসুর ভাই হয়তো লাথি মেরে চলে যেতে পারতেন, এসব বদনাম থোড়াই পরোয়া করেন তিনি। কিন্তু আমার পাকে তিনিও জড়ালেন। হাতেপায়ে পড়া অবস্থা হলো তার। জনে জনে বলতে লাগলেন, এসব ষড়যন্ত্র। আমরা দুজন নিষ্পাপ!
কেউ বিশ্বাস করল না। আমাদের কুকাজের অনেক প্রত্যক্ষদর্শী! বড়োচাচি এতদিন দেখে আসছিলেন, সহ্য করতে না পেরে আজ প্রতিবাদমুখর হয়েছেন! তার পক্ষে অনেক লোক।
জটলা বড়ো হচ্ছে। উত্তেজনা বাড়ছে। মানুষের রাগ চড়ছে। মনসুর ভাই তাদের উদ্দেশ্য না। তাদের আক্রোশ আমি। একা মেয়েমানুষ সহজ শিকার। আমাকে দোকানসহ আগুনে পুড়িয়ে দিলে তাদের মহল্লা পাপমুক্ত হবে। জসীম ভাই, মনসুর ভাইয়ের ডানহাত। ধাম করে ছুরি বের করল। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলো। ওর ছুরির কয়েক পোচ খেয়ে লোকের উত্তেজনা আর উল্লাস আরো বেড়ে গেল। মায়ের চিৎকার শুনছি, বোনেদের কান্নার আওয়াজ আসছে কানে। একগাদা রক্তচক্ষু হায়েনার সামনে আমি নিরস্ত্র, একা!
বড়োচাচা রামদা হাতে ভীড় ঠেলে বেরিয়ে এলেন আমাকে উদ্ধার করতে,
–আমার মেয়ের গায়ে ফুলের টোকা দিয়ে দেখ, কার এত সাহস দেখি?
বড়োচাচি ভীড়ের আগে ছিলেন। বললেন,
–মনসুর আর রুমকিরে বিয়ে করায় দেও। যা করার ঘরে গিয়ে করুক! বিয়ে দিলে মানও থাকবে, ধর্মও থাকবে। ওদেরও পিরিত করতে আদারে বাদারে ঘোরা লাগবে না।
মনসুর ভাইয়ের বাপ-ভাইয়েরা এসেছেন। তাদেরকে দেখে লোকজন শান্ত হলো। এলাকার মুরব্বিরা বসলেন আমাদের বাড়ির উঠানে। ফয়সালা দেবেন তারা। সর্বসম্মত রায় বড়োচাচির পক্ষে গেল। কেলেংকারী থেকে উদ্ধারের এই একটাই উপায়। আমার আর মনসুর ভাইয়ের বিয়ে!
আজকে আর মায়ের আওয়াজ করার মতো অবস্থা নেই। আমি আগুনে পুড়ে মরিনি তাই তার জন্য অনেক। আমাকে বুকে নিয়ে বসে থাকল। একটাও কথা বলল না।
কিন্তু মনসুর ভাই বাগড়া দিলেন,
–আমি তোমাদের এই বিচার মানি না! রুমকি কোনো দোষ করে নাই! যা দোষ আমার। আমি আসছি ওর দোকানে। ও আমার কাছে যায় নাই। আমাকে ডাকেও নাই। আর আমার সাথে বিয়ে দেওয়া যদি ওর শাস্তি হয়, আমি মনসুর রুমকির শাস্তি হতে পারব না!
বড়োচাচি বললেন,
–তাহলে আর কোনোদিন এই বাড়ি, দোকান, রুমকির ত্রিসীমানায় আসতে পারবা না তুমি!
–আসব না!
পুরুষের জন্য দোষ কাটানোর অনেক উপায় আছে। মুরব্বিরা বললেন,
–বিয়ে না করলে তোমাকে জরিমানা দিতে হবে।
–আমার আব্বা তো থাকল। আমার জন্য অনেক টাকা গচ্চা গেছে তার। আরো যাবে।
মনসুর ভাই দলবল নিয়ে চলে গেলেন! তাকে আটকানো গেল না।
দারুণ একটা সিনেমা মিস হলো সবার। অনেকদিনের চটকদার আলাপের রসদ ফুরিয়ে গেল। মুরব্বিরা আমাকে নতুন শাস্তি দেওয়ার আইন খুজলেন। বললেন,
–এই মেয়েগুলোকে সমাজে মিশতে দিলে সমাজ তো নষ্ট হয়ে যাবে। কেউ এদের সাথে মিশবে না। এই দোকানে কেউ আসবে না। লালগতিবাজারের কোনো বাড়িতে এরা যেতে পারবে না।
আগে মনে হয়, এটাকেই বলত একঘরে করা!
আমার দুঃখের মুকুটে আরো কয়েকটা পালক জুড়ে গেল!
মনসুর ভাইও এদিকে আসা বন্ধ করে দিলেন। হয়তো সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করছেন। তিনি এলেন কয়েকদিন পরে।
–রুমকি, ঝটপট আমার সাথে চলো একজায়গায়। সুদানির ফোয়ারে পাইছি!
আমার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।
–আমি ঝুমকিকে বলে আসি।
বাইকে উঠে জানতে চাইলাম,
–আমাকে ফোন করলেই তো চলে আসতাম। নিতে এলেন কেন?
–পুরান জেটিঘাটে যাব। জায়গাটা তো খুব একটা ভালো না। একা গেলে বিপদ হতো। আমি তোমারে বিপদে ক্যামনে ঠেলি?
আমার ভাবতে ভালো লাগে না কিছু। শো শো করে বাইক চলছে। মনসুর ভাইয়ের পিঠে মাথা রাখলাম। এরকম একটা কাঁধে ঠাই খুঁজে নিয়ে সমস্ত দুঃখ জমা রাখতে পারা যেত যদি!
জায়গাটা গুণ্ডাদের ঠেক। লোকজনের দৃষ্টি ভালো না।
আফ্রিদি ভাইকে একটা ঘরে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। চোখে পট্টি, মুখেও কাপড় গোঁজা।
আমি জানতে চাইলাম,
–এভাবে বেঁধে রেখেছেন কেন?
–অনেক জ্বালাতন করছে। গুড বয় হয়ে আমার সাথে তোমার কাছে যাইতে বলছিলাম, রাজিই হইলো না। চিল্লাপাল্লা, কান্নাকাটি করে লোক জানান দিতেছিল। মুখ বন্ধ করা লাগছে।
–আপনি ওকে পেলেন কোথায়?
–তোমার দোকানে যেদিন অকারণে ঘুরাফিরা করছিল, সেইদিনই ওর ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করে রেখেছিলাম। তোমার বিপদ হইতে পারে সেই জিনিসের চিহ্নও আমি তোমার আশেপাশে থাকতে দেবো না। জান বাজি রাখব তোমার জন্য। এই সুদানির ফোয়ার বাড়িতে জিন বাইন্ধা রাইখা আসছিলাম। ও বাড়ি যায় নাই এই কয়দিন। পলায় বেড়াইতেছিল। আজকে গেছে আর ক্যাক করে ধরে আনছি!
জসীম ভাই আফ্রিদির চোখ খুলে দিলো। মুখের বাঁধন খুলে দিলো। আফ্রিদি আমাকে দেখে তাকিয়ে থাকল। তারপর মোচড়ামুচড়ি শুরু করল। আমি বললাম,
–আফ্রিদি ভাই, আপনার স্যার কোথায়? কোথায় গেছে সে?
–আমি আপনারে চিনি না। কী বলতেছেন, বুঝতেছি না!
সাথে সাথে মনসুর ভাইয়ের আড়াই কেজি ওজনের থাপ্পড় পড়ল ওর গালে। চেয়ারসহ উলটে পড়ে গেল।
জসীম ভাই চেয়ারটা সোজা করে তুলে দিলো ওকে। বলল,
–রুমকি আপু যা বলতেছে ঠিকঠাক সেটার জবাব দে।
বলে প্যান্টের পেছন থেকে আধাহাত সাইজের একটা ছুরি বের করল। টিমটিমে বালবের আলোর নিচে জং ধরা ছুরির ফলায় ধার ঝিলিক দিয়ে উঠল!
আফ্রিদি কেঁদে ফেলল,
–আমারে ছেড়ে দেন, আপা। আমি কিছু জানি না।
আমি একটা চেয়ার টেনে ওর মুখোমুখি বসলাম। শান্ত গলায় জানতে চাইলাম,
–আমাকে তো চেনেন, তাই না?
আফ্রিদির মাথাটা উপর-নিচ হলো। ওর চোখে আতঙ্ক। দুই চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরছে। আশ্বাস দিয়ে বললাম,
–আপনাকে সুস্থ অবস্থায় বের করে দেবো আমি। আমাকে শুধু সত্যিটা বলে দেন। আমি কাউকে কিছু জানাব না।
সময় নিয়ে প্রশ্নটা করলাম,
–নিয়ন কোথায়?
আফ্রিদি হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। কান্নাবিকৃত গলায় বলল,
–ম্যাডাম আমাকে মেরে ফেলবে!
আম হতাশ গলায় বললাম,
–আমি কথা দিলাম তো, কাউকে কিছু জানাব না।
–ম্যাডাম জেনে যাবে। তার অনেকগুলো চোখ, অনেক হাত-পা। তারা অনেক পাওয়ারফুল।
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম,
–তাহলে তো তিনি এটাও জেনে যাবেন, আপনাকে এরা এখানে তুলে এনেছে।
–হুম। জানবে।
–আপনি কথা বললে ম্যাডাম আপনাকে মেরে ফেলবে, আর কথা না বললে এরা আপনাকে মেরে ফেলবে। এখন কোনটা করবেন আপনি?
আফ্রিদি চারিদিকে তাকাল। জেটিঘাট লোকালয় থেকে দূরে। বখাটেদের আস্তানা হিসেবে পরিচিত। সাধারণ লোকজন তো আসেই না, পুলিশের সাথেও এদের বন্দোবস্ত আছে – পুলিশও এখানে পাড়া দেবে না।
আত্মসমর্পন করতেই হলো আফ্রিদিকে। নাক টেনে টেনে বলল,
–শনিবার রাতে স্যারকে ধরে নিয়ে গেছে!
–কে?
–ম্যাডামের লোকেরা।
–কোথায় নিয়ে গেছে? বাড়িতে? বাড়িতে একটা লোককে এভাবে আটকে রাখা যায়? নিয়ন তো ছোটো শিশু না!
আমি বাঁকা হাসলাম,
–আর নিয়ন বাড়িতে আটক থেকে এতদিনেও আমার সাথে যোগাযোগ করছে না? এত সহজ? আপনি সত্যি কথা বলেন। সঠিক উত্তর না জানা পর্যন্ত আপনাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা এদেরকে আমি বলব না। আমি মানুষ ছোটো কিন্তু দুনিয়া অনেকটা দেখে ফেলেছি!
আফ্রিদি আবার কাঁদল। বলল,
–বাড়িতে নেয় নাই। ধনীদের হিসাব বোঝা এত সহজ না, ওরা সহজ মানুষ না। ওদের মানসম্মান বাঁচাইতে হয়, স্ট্যাটাস ঠিক রাখতে হয়। অনেক জটিল হিসাব। স্যারেরে রিহ্যাবে নিসে। রিহ্যাবের লোকেরা আসছিল।
গতকয়েকদিনের ঘটনা পরিক্রমায় আমার অবাক হওয়ার ক্ষমতা নষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু বিস্ময়ে আমার চোখ কপালে উঠে গেল,
–রিহ্যাবে? ড্রাগস নিলে যেখানে চিকিৎসার জন্য নেয়, সেই রিহ্যাবে? নিয়ন এডিক্টেড?
–আমি কোনদিন স্যারেরে নেশা করতে দেখি নাই। তবে, আমি তো আর এইগুলা বুঝি না! রিহ্যাব থেকে লোক আসছে, নিয়ে গেছে। আমি দেখছি।
–নিয়ন বাধা দেয় নাই?
–রিহ্যাব মনে করেন, থানারই মতো। কেউ সোজাসোজা হেটে যায়, কাউকে বেঁধে নিয়ে যাওয়া লাগে। স্যারেরে বেঁধেই নিছে। আওয়াজ করতে পারে নাই। সেই রাতেই আরেক দল লোক আসছে, বাসার চেহারা বদলাই দিছে তারা। নতুন বাসিন্দাও রাতারাতি বসায়ে গেছে। ম্যাডাম আমাকে তিন মাসের বেতন দিয়ে বলছে, কেউ যেন কিছু না জানে! মোবাইলও বন্ধ রাখতে বলছে। আমি অন্য সিম নিয়ে মোবাইল চালাই। আগেরটা বন্ধ!
আমি বললাম,
–আমি বিশ্বাস করি না। নিয়ন আমার সাথে যোগাযোগ কেন করছে না তাহলে?
উত্তরটা জসীম ভাই দিলো,
–রিহ্যাব কি তোমার বাসার মতো? ওইখানে সবাই যাবজ্জীবন আসামী! চাইলেই কেউ বাইরে যোগাযোগ করতে পারে না, বাইরের কেউ চাইলেই সেখানে যেতে পারে না! পেশেন্টের অবস্থার উন্নতি দেখলে বা অবনতি দেখলে, ডাক্তাররা মাঝেমাঝে বাড়িতে কথা বলার অনুমতি দেয়। সেইটাও টাইম বান্ধা থাকে। এক মিনিট কি দুই মিনিট। আমি বছর দুই আগে রিহ্যাব ঘুরে আসছি। আমার ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স আছে।
একগাল হেসে বলল,
–বউ বলছে, বাবা না ছাড়লে এইবছর আবার পাঠাবে। কাউরে বন্দী করতে চাইলে এর চাইতে ভালো জায়গা তো আর নাই! রিহ্যাবে অনেক পোলার সাথে আমার পরিচয় হইছে, এই লাভকেস থেকে সরাইতে বাপ মা ছেলেরে ওইখানে আটকায়ে রাখছে। শালীর মেয়ে আরো আগেই আমারে হান্দাই দিতো, টাকার জোগাড় হয় নাই বলে দেয় নাই। চৌধুরীদের তো টাকার অভাব নাই। রিহ্যাব দুইটা ওদেরই আছে কুশিয়ারায়। সব বিজনেস, বুঝছ রুমকি আপু? সব বিজনেস! গরীব মারা টাকা!
হাতের ছুরিটার ধার পরীক্ষা করার ভান করল ও। বলল,
–একদিন সব শালার টাকার ভুড়ি গালায় দিবো আমি!

জেটিঘাট থেকে বেরিয়ে এলাম। নদীর পাড়ে খোলা মাঠ। বাতাসের ঝাপটা এসে মুখে লাগল। আকাশের কোণায় চাঁদ ঝুলছে। আমার অনেক হালকা লাগছে!
মুখ তুলে মনসুর ভাইয়ের দিকে তাকালাম,
–আপনার হাইপোথিসিস ভুল হলো, মনসুর ভাই! আমি
সিজোফ্রেনিক না! পাগল হইনি এখনো, তাই না?
মনসুর ভাই বিষন্ন একটুখানি হাসলো প্রত্যুত্তরে,
–আমি চাই, জীবনে তুমি যেন কোনো দুঃখ না পাও, রুমকি! কিন্তু দুঃখ তো তোমার পায়ে পায়ে ঘোরে, তোমারে জড়ায়ে ধরতে চায়! এত কথায় তুমি গুরুত্বপূর্ণ একটা লাইন মিস করে গেছ। ছেলেটা নেশাখোর! তুমি না জেনেশুনে এই দুঃখ কীভাবে মাথায় নিলে?
–আমার বিশ্বাস হয় না, মনসুর ভাই!
–বিশ্বাস করো, রুমকি! বিশ্বাস করতে শুরু করো। তাতে দুঃখ একটু কম পাবা। কয়দিন চেনো তুমি ওকে? কয়দিন জানো? চিন্তা করে দেখো, ওর মা শুধুশুধু কেন ছেলেকে রিহ্যাবে দেবে? রিহ্যাব কি আরামের জায়গা? লাইফলেস করে দেয় ওখানে। জীবনের আর কিছু থাকে না কারো! অনেক কষ্ট দেয় ওখানে! এত কষ্ট দেয় যেন কেউ দ্বিতীয়বার রিহ্যাবে যাওয়ার ভয়ে আর নেশার জিনিসে হাত না দেয়! কোন বাপ মা অকারণে ভালো ছেলেরে কষ্ট সহ্য করতে রিহ্যাবে দেবে? কেউ দেবে না!

চলবে…
আফসানা আশা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here