Saturday, August 22, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প """মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১১

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১১

0
3

মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ১১

চৌধুরী বাড়িতে আগে কয়েকবার আসা হয়েছে আমার। আরশি আপুর বিয়ের সময় রাজন ভাইকে হলুদ দিতে এসেছিলাম প্রথমবার, তারপর বিয়েতে এলাম, থাকলাম! এরপরেও কী কী অনুষ্ঠানে বারকয়েক এসেছি। শুরুতে বাড়িটাকে হুলস্থুল ধরণের প্রাসাদ মনে হতো। কয়েক বছরের ব্যবধানে আমার পৃথিবী খানিকটা বড়ো হয়েছে। এখন সাদামাটা ধরনের ধনীবাড়ি মনে হলো। তবে, বদলায়নি এ বাড়ির কিছুই। একতলা বিরাট বাড়ি। অনেকগুলো ঘর। এক মানুষ উঁচু সিঁড়ি ভেঙে বাড়িটার অন্দরে প্রবেশ করতে হয়। তারপরে টানা প্যাসেজ। ডানে বামে ড্রয়িং রুম, খাবার ঘর, গেস্ট রুম। এর আগে আমার বিচরণ এদিকটাতেই ছিল। অতিথি হয়ে এসেছিলাম, বাইরের লোকের মতোই থেকেছিলাম। ভেতরে উঁকি দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, কেমন একটা ভয় ভয়ও লাগত। এই বাড়ির দেওয়ালগুলোতে অদ্ভুত লাগল বিষন্নতা জড়িয়ে থাকে। এটা কৃত্রিম আলোআধারির কারণে নাকি অন্য বাড়ির পরিবেশই এরকম, বুঝি না!
আজকে সোজা এসে ঢুকেছি এই বাড়ির কর্ত্রীর বেডরুমে! অবশ্য এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে হয়েছে। এই ঘরটা তুলনামূলক সাদামাটা। প্রচুর আলো। জানালার ঠিক পরে একটা বরই গাছের ডাল এসে অলস ঝিমিয়ে নিচ্ছে। রোদ্দুর টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়েছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে ঘরের আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। আসবাবও খুব সাধারণ। বড়ো বিছানা আর ছোটো কয়েকটা সিটার। মাঝখানে গোল তেপায়া।
ভদ্রমহিলা এলেন পুরো এক ঘণ্টা পরে। ঘরের মতোই সাদামাটা পোশাক ওনার পরনে। কাফতান বলে এই পোশাকটাকে। বাড়তি কোনো আভরণ নেই গায়ে, তবুও ভীষণ ব্যক্তিত্ববান মনে হচ্ছে। চোখেমুখে দারুণ আত্মবিশ্বাস! আপ্যায়নের ট্রে নিজেই বয়ে এনেছেন। ট্রেতে শরবত, বাহারি কুকি, ফল-মিষ্টি। ছোটো টেবিলের উপর ট্রেটা রেখে চুলে হাতখোঁপা করে নিলেন। বসতে বসতে বললেন,
–খুব গরম পড়েছে না? এসি ছাড়ব?
আমি মাথা নাড়লাম।
উনি খুব আন্তরিক গলায় বললেন,
–তুমি নাকি খুব ভালো সেলাই করছ। আরশি বলেছিল। আমাকে কয়েকটা ব্লাউজ বানিয়ে দিও তো? আমার টেইলর এমন ডিজাস্টার করে রেখেছে আমার ডিজাইনার ব্লাউজগুলোতে, ক্লজেট খুললেই আমার কান্না পায়!
–আচ্ছা! কাপড় পাঠিয়ে দিয়েন। আমি বানিয়ে দেবো। একটা বানিয়ে দেবো, দেখবেন ভালো ফিট করে কিনা!
–তোমার বিয়ের খবর শুনেছিলাম। কংগ্রাচুলেশনস…
আমি হাসি থামানোর চেষ্টাই করলাম না। হেসে হেসে বললাম,
–নিজের ব্যর্থতায় অভিনন্দন জানাচ্ছেন?
সারিকা চৌধুরী উঠে গেলেন। বিছানা পাশ থেকে চশমা নিলেন, চশমা চোখে গলিয়ে আবার আমার সামনে এসে বসলেন। চশমার ভেতর দিয়ে আমাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। বললেন,
–তুমি আমার কাছে কেন এসেছ?
–আপনি কিছু না জানার ভান করবেন না, প্লিজ। আমি জানি আপনার সময় অনেক দামি। আমিও খেটে খাওয়া মানুষ, সময় আমার কাছেও মূল্যবান। আপনি অভিনয় করবেন, আমি আপনার মুখোশ টেনে খুলব, এত টানাহেঁচড়া না করে, ফেস করেন আমাকে?
ভদমহিলা কাঁধ নাচালেন। বললেন,
–আমি শুনেছিলাম, ইউ আর ঠু স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড! ভুল শুনিনি। ইউ আর ব্লান্ট!
একটু থামলেন, তারপর বললেন,
–বলো তাহলে, আমি শুনছি! তবে, সময় খুব কম!
আমি হাসলাম,
–আমি জানি, সময় খুব কম। খুব বেশিদিন নিয়নকে রিহ্যাবে আটকে রাখা যাবে না! নিয়নের বাবা সেটা করতে দেবেন না! আপনি সেটা আমার থেকেও ভালো জানেন। তাই, আমার বিয়ে নিয়ে আপনি এত ডেসপারেট!
ভদ্রমহিলা সোজাসাপটা বললেন,
–নিয়ন এডিক্টেড!
–অসম্ভব!
সারিকা আন্টি নাক চুলকালেন। হাসতে হাসতে বললেন,
–সাত আট ঘণ্টায় মানুষ চিনে ফেলা যায়?
একইরকম হাসিটা ফেরত দিলাম আমি। সময় নিয়ে তীর্যক বাক্য ছুড়ে দিলাম,
–চেনার জন্য ত্রিশ বছরও যথেষ্ট হয় না, মিসেস চৌধুরী! ঠিক বললাম না?
ওনার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো,
–তুমি কী বলতে চাও?
–কিছু বলতে চাই না। শুধু আলো ফেলতে চাই।
–হুম হুম, কন্টিনিউ, আই এম অল ইয়ারস!
–আপনার লাভ ম্যারেজ। বিয়ের পরে অনেক চেষ্টা করেও আপনার সন্তান আসেনি। বিষন্ন স্ত্রীকে সন্তানসুখ দিতে আপনার হাজব্যান্ড এতিমখানা থেকে দুটো বাচ্চা এনে আপনার কোলে দিলেন। আপনি সুখী ছিলেন রাজন এবং নিয়নকে পেয়ে, স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন। আদর, যত্ন, কোনোটারই কমতি রাখেননি। একদিন আবিষ্কার করলেন, আপনার স্নেহ-মমতায় বেড়ে ওঠা নিয়ন আপনার স্বামীরই ঔরসজাত সন্তান! আপনি এই প্রতারণা মানতে পারলেন না। প্রতারক স্বামীর প্রণয়লীলার প্রমাণ চোখের সামনে আপনার অসহ্য হলো! স্বাভাবিক। যে কোনো নারীর জন্যই সেটা অসহ্য। কিন্তু আপনি তো যে কোনো কেউ নন। আপনার স্ট্রং ব্যাকগ্রাউন্ড, ইম্প্রেসিভ ক্যারিয়ার – আপনি খুবই সাকসেসফুল উম্যান। আপনার উচিত ছিল, জাহেদ চৌধুরীকে এক্সপোজ করে তাকে ডিভোর্স দেওয়া। কিন্তু সেটা করলেন না আপনি। মিসেস চৌধুরী টাইটেলটা ছাড়তে পারলেন না। নিজের না পারার শোধ তুললেন এই পুরো কান্ডে যে একমাত্র নিরাপরাধ তার উপর দিয়ে। আপনি টার্গেট করলেন নিয়নকে। মমতার মুখোশে ওর উপর নির্মম অত্যাচার করেছেন দিনের পর দিন। আপনি বস্তির রমনি নন। আপনি ওকে হাতে মারেননি, আঘাত করেননি। আপনার অস্ত্র ছিল, ওকে বঞ্চিত করা, ওকে সর্বহারা করা। ওর অধিকার কেড়ে নেওয়া। ওকে অসহায় করে দেওয়া। শুরুতে ও বুঝতে পারত না। যে মা এত আদর করেছে, সেই মমতাময়ী মা কীভাবে বদলে গেল? কারণ খুঁজতে খুঁজতে সত্যিটার কাছে পৌঁছে গেল একদিন!
সারিকা আন্টি নড়েচড়ে বসলেন,
–আচ্ছা, ভালো তো। নিয়ন তাহলে ক্লেইম করেনি কেন?
–যে কারনে আপনি ওকে ঘৃণা করেন, সেটাই! ও ওর বায়লজিক্যাল বাবা মায়ের নাজায়েজ সম্পর্কের সন্তান। এর চাইতে এতিম পরিচয়টাই ওর কাছে গর্বের!
ভদ্রমহিলা ছোটো দুটো হাততালি দিলেন। তাতে আওয়াজ হলো না। বললেন,
–সুন্দর গল্প বানিয়েছ! আর কিছু?
আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, মহিলা অত্যন্ত বলিষ্ঠ, উনি সহজে মচকাবেন না।
আমি বলতে থাকলাম,
–আপনি রাজন ভাইয়ের জন্য সাদামাটা আরশিকে পছন্দ করেছিলেন, কারণ ও কোনোদিকে আপনার সমকক্ষ না, না রূপে, না যোগ্যতায় আর না ঐশ্বর্যে। কখনোই কিছুতে আপনাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না ও। আমার বড়োচাচির বাপের বাড়ি আর আপনার বাবার বাড়ি পাশাপাশি। সেই সূত্রে আরশি আপুকে চেনাজানা আপনার। আমাকে নিয়নের বউ করতেও আপনার মাথাব্যথা হতো না, যদি আমি আপনার অনুমোদিত হতাম। বরং, লো ক্লাস গার্মেন্টসওয়ার্কার রুমকিকে নিয়নের পাশে স্ত্রী হিসেবে দেখতে আপনার প্রতিশোধ পূর্ণ হতো। কিন্তু, সমস্যা হয়ে গেল, নিয়ন যখন ওর পছন্দের কথা আরশি আপুকে জানিয়ে দিলো। আপনিও জেনে গেলেন, নিয়ন কাউকে ভালোবাসে। আপনার প্রেম, বিয়ে বা পুরো জীবনেই নিয়ন জ্যন্ত তামাশার নাম! ওকে সুখে থাকতে দেওয়া মানে, জাহেদ চৌধুরীর অবৈধ সম্পর্ককে জিতিয়ে দেওয়া, তার প্রতারণাকে জিতিয়ে দেওয়া! তাই আপনি নিয়নকে আটকে ফেললেন। মিনহোয়াইল, আমাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সবরকম চেষ্টা করলেন! আমার বিয়ে হয়ে গেলে নিয়ন প্রচন্ড কষ্ট পাবে, আর আপনি স্যাটিসফেকশন, তাই না? আমি ঠিক বলছি না? কখনোই ওকে ওর প্রিয় মানুষকে পেতে দেবেন না আপনি, ও জানত সেটা। তাই ও অত মরিয়া হয়েছিল, অত অধৈর্য হয়েছিল, অত জলদি ছিল ওর! কিন্তু আপনি এতখানি ড্রাস্টিক স্টেপ নেবেন সেটা ও আন্দাজ করতে পারেনি!
সারিকা চৌধুরী মোটেও বিচলিত হলেন না। এক পায়ের উপর অন্য পা তুলে বললেন,
–ওকে! প্রুভ এভ্রিথিং!
আমি হাসলাম। সোজা হয়ে বসলাম। নিয়নের মায়ের চোখে চোখ রেখে বললাম,
–সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এখন অনেক ক্ষমতা, জানেন তো!
ভদ্রমহিলা মুখ নাড়ালেন,
–যাস্ট কিছু লোক গ্যাদার হবে, একটা ওয়েভ। কিছুদিন লোকে কথা বলবে, তারপর থেমে যাবে!
আমি ব্যাগ থেমে কাবিননামার কাগজটা বের করে দিলাম।
ভদ্রমহিলার ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল। বললেন,
–এক্সাক্টলি এজ আই এক্সপেক্টেড! এই ছেলেটা টোটাল সাইকো! নো ওয়ান্ডার, হিজ মাদার ওয়াজ আ প্রস্টিটিউট!
–এই রিমার্কস আপনার কাছ থেকে এক্সপেক্টেড আমার।
সারিকা চৌধুরী কাবিননামাটা ছুড়ে দিলেন আমার দিকে। হেলাফেলায় বললেন,
–এটা দিয়ে তুমি কোনোকিছুই প্রমাণ করতে পারবে না। যাও? চেষ্টা করো?
–আমি নিয়নের পরিচয়ও রিভিল করব।
–কে বিশ্বাস করবে তোমাকে?
–বিশ্বাস করতে হবে কেন? ডিএনএ টেস্ট করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে, জাহেদ চৌধুরীর একমাত্র উত্তরাধিকার তার ছেলে নিয়ন!
ভদ্রমহিলা জোরে হেসে ফেললেন,
–ডিএনএ টেস্ট কি ছেলের হাতের মোয়া? তুমি চাইলে আর প্যাটার্নিটি টেস্ট হয়ে গেল? এত সহজ? এর প্রসিজার সম্পর্কে তোমার কোনো ধারনা আছে? হোয়াটেভার! যথেষ্ট মাথাব্যথা দিয়েছ। আর না। এখন তুমি আসতে পারো!
ওনার হাসির তালে আমার হাসিও লম্বা হলো। আমি আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিলাম ওনার দিকে,
–এটা আমার আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট! আমি প্রেগন্যান্ট! বলেন, এটা কি যথেষ্ট হবে না? সোশ্যাল মিডিয়ায় নিশ্চয়ই সাড়া পড়ে যাবে! কী বলেন?
এতক্ষণ পরে এসে মহিলার চোখে বিস্ময় দেখলাম আমি। অবিশ্বাস নিয়ে রিপোর্টটা উল্টেপাল্টে দেখছেন। কাগজটা টেনে নিলাম আমি। ব্যাগে রাখলাম। হাত পা ছেড়ে আরাম করে বসলাম। শান্ত গলায় বললাম,
–আপনার জায়গায় আমি থাকলেও মনে হয় একই কাজ করতাম। জীবনসঙ্গীর প্রতারণাও কখনো কখনো আমরা মেনে নিই। কিন্তু সেই প্রতারণার সন্তানকে আদরে-মমতায় রাখা অনেক কঠিন। আপনি কঠিন কাজটা করে উঠতে পারেননি। তার জন্য আমি আপনাকে দোষ দেবো না। আমিও আজকে জাহেদ চৌধুরীর স্ত্রী সারিকা চৌধুরির কাছে আসিনি। আমি এসেছি নিয়নের না হয়ে ওঠা মায়ের কাছে। নিয়ন যদি এই সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার না করে, আমার একে পরিত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকবে না। না আমার মানসিক শক্তি আর একটুখানিও অবশিষ্ট আছে, না আছে বাবার পরিচয় ছাড়া সন্তান লালনপালনের আর্থিক সক্ষমতা! আপনার বুভুক্ষ মাতৃহৃদয় ঠিকই এই হবু মায়ের আহাজারি অনুভব করতে পারবে! নিয়নের মা না হতে পারলেও এই বাচ্চাটার দাদি কি আপনি হতে পারবেন না? আমি দুদিন অপেক্ষা করব। এর মধ্যে যদি নিয়ন ফিরে না আসে, আমি বাচ্চাটা রাখব না! সম্ভব হবে না আমার পক্ষে! আমি অন্য এক মায়ের মমতার উপরে আমার সন্তান বাজি রাখলাম! আমি কি হেরে যাব, আন্টি?
সারিকা চৌধুরীর হাতদুটো দুই হাতে চেপে ধরলাম আমি। সর্বস্ব দিয়ে দেওয়ার পরে আজ আমার চোখের জল বাধনহারা হলো!
সারিকা চৌধুরী আমার হাত ছাড়িয়ে নিলেন। কথার উত্তর দিলেন না। বসে রইলেন প্রতিমার মতো হয়ে।
এখানে আসবার সময়ে মাথা উঁচু করে রেখেছিলাম, এখন নুইয়ে পড়তে চাইছে। শরীর যেন মাথাটার ভার আর বইতে পারছে না – বড্ড ওজনদার হয়েছে ওটা!
ধীর পায়ে বেরিয়ে এলাম!
জীবন ভয়াবহরকম অনিশ্চিত। এর মোড়ে মোড়ে যে কতশত গোপন ব্যথা, আর ভয়ের গাঁথা লুকোনো থাকে! দীর্ঘনিঃশ্বাস সংখ্যায় বাড়তে থাকল!
আর আমার প্রাণে সইছে না!
এত দুঃখ কেন এক জীবনে?

চলবে…
আফসানা আশা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here