Thursday, April 16, 2026
Home Uncategorized আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ৩০

আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ৩০

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ৩০
_________________________

মুরুব্বির নাম সোবহান মির্জা , রাজনীতি করেন সক্রিয়ভাবে ৷ এলাকার যত মাস্তান টাইপের ছেলে , সবাই তার পোষ মানা ৷ দাপটের সাথে এলাকায় তার বসবাস ৷ কেউ তার সাথে বিবাদে যায় না , সবাই বোঝে তার উক্তিই অলিখিত আইন ৷

সোবহান মির্জার সামনে বসে আছেন নয়নের বাবা আর নাদের মিয়া ৷ নয়নের নাম্বার থেকে রাতেই তাদের কল করে ডাকা হয়েছিল ৷ নয়নের বাবার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ভয়ার্ত শীতল স্রোত নেমে যাচ্ছে ৷ তার বুক কাঁপছে ৷ বাড়িতে আলেয়া বেগমও সারা রাত চিন্তায় আর কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে গেছে ৷ ঠিক কোন কারণে তাদের এখানে ডাকা হয়েছে এটা এখনও জানা যায়নি ৷

নাদের মিয়া অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে , “আমাদের আসলে কী জন্য ডাকা হইছে কইলে ভালো হইতো না ? আর নয়ন রূপা ওরা কই ?”

সোবহান মির্জা কুৎসিত করে হাসে ৷ তারপর ইশারা দিয়ে একজনকে বলে নয়ন রূপাকে নিয়ে আসতে ৷

সোবহান মির্জা একটা পরীক্ষা করার জন্যই এত আয়োজন করে বসে আছেন ৷ এভাবে প্রেম করা ছেলে মেয়ে ধরে নিয়ে এসে বিয়ে দেবার কাজটা তিনি আগেও করেছেন ৷ তার এই কাজটা ভালো লাগে ৷ কিন্তু প্রত্যেকবার তিনি দেখেছেন মেয়ে বিয়েতে রাজী থাকলেও ছেলে বেঁকে বসে ৷ একবার তো একজন কিছুতেই বিয়ে করবেই না , শেষমেষ তার লাইসেন্স করা বন্দুকটা মাথায় ঠেকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন ৷ বিয়ের সময় ছেলেগুলোর মুখ যে আমসির মত হয়ে যায় না , এটা তার খুবই ভালো লাগে দেখতে ৷ প্রেম করতে খুব মজা লাগে , আর বিয়ে করার কথা বললেই চেহারা পাল্টে যায় ৷ প্রেমের সময় সোনা , ময়না আর বিয়ের কথা বললেই শালীরে আমি চিনি না … সোবহান মির্জা হেসে উঠে ৷

কেউ কারও মাথার ভেতরটা দেখতে পায় না ৷ আপনার সামনে হাসিহাসি মুখ করে বসেই কেউ যদি মনে মনে আপনার গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলে আপনি ঘুনাক্ষরেও টের পাবেন না ৷ সোবহান মির্জার মাথার ভিতরে চলা নিউরণের অনুরণন নয়নের বাবা আর ভাইয়ের জানা না হলেও মুখে দৃশ্যমান বাঁকা হাসিটা ঠিকই দৃশ্যমান হয় ৷ তারা সে হাসির অর্থ বোঝে না , বুঝতে চায়ও না ৷ তারা শুধু নয়ন আর রূপাকে সহি সালামতে দেখতে চায় ৷

নয়ন আর রূপাকে সবার সামনে আনা হলো ৷ দুজনকে বসিয়ে সোবহান মির্জা উঁচু গলায় বললেন “ওরে কাজীসাব কদ্দুর ? হালারপোর এত সুময় লাগতাছে ক্যান ? ”

তারপর হাসিমুখে নয়নের বাবার দিকে তাঁকিয়ে বলেন

—শোনেন ভাইসাব , এলাকায় আমার নিজের কিছু আইন আছে ৷ সেই আইন আমি ভাঙতে দেই না বুচ্ছেন না ?

—ভাইসাব , ওরা আসলে কী করছে ? ওরা ছোট মানুষ , ওগো মাফ কইরা দেন ৷

—ভাইসাব , মাফ পাওয়ার মতন অপরাধ হইলে আগেই মাফ কইরা দিতাম ৷ আমরা মুসলমান না কন ? মুসলমানের বাচ্চা হইয়াও এরা শরীয়ত বিরোধী কাজ করছে ৷ প্রকাশ্যে রাস্তার মধ্যে জড়াজড়ি ছি ছি ছি ! তারপর আবার সারারাত একলগে একঘরে এক বিছানায় কাটাইছে ৷ এরা তো জেনা করছে ভাইসাব ! এরার কী মাফ দেওয়া সম্ভব আপনেই কন ! জিগান ওগো , ওরা একলগে রাত কাটাইছে কী না ?

নয়নের বাবার মাথা নিচু হয়ে আছে লজ্জায় ৷ দুজনই তার সন্তানের মতো ৷ এরা এমন কিছু করতে পারে তিনি স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারেননি ৷ এত অপমানিত তিনি কোনদিনও হননি ৷ মনে হচ্ছে কেউ যেন জুতা খুলে তার গালে বাড়ি দিয়েছে ৷

নাদের মিয়ারও কান ঝা ঝা করছে ৷ সোবহান মির্জার কথাগুলো কানে না ঢুকে সরাসরি যেন মাথায় ঢুকে চাবুকের মত আঘাত করছে ! তারপরও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে

—তাইলে আপনার কী ফয়সালা চাচা মিয়া ?

—ফয়সালা আর কী ! কাজীসাব অক্ষনি আইসা পড়বো ৷ এরারে বিবাহ দিয়া দিবো ৷ কন্যার তো শুনলাম বাপ মাও নাই , আপনেরাই অভিভাবক ৷ ঠিক আছে , মিমাংসা তো করাই লাগবো ৷ বিয়া হইলে আপনাগোই ইজ্জত থাকবো ৷ কী কন ?

— আমরা ওগো বিয়া দিমু , কিন্তু আইজ না ৷ এরারে বাড়িত নিয়া যাই , আত্মীয় স্বজন আছে সবাইরে নিয়া বিয়া দিমু ৷ আপনারাও আসবেন ৷

—তা তো হইবো না ! বিয়া আইজই হইবো ৷ আমার শ্যাষ কথা ৷ আমি তো আপনাগো নাও ডাকতে পারতাম ৷ সম্মান দিয়া ডাকছি , এখন সম্মান রাখতে চাইলে কথা বাড়াইয়েন না ৷ নাইলে অন্য ব্যবস্থাও আমি জানি বুচ্ছেন না ! হে হে হে !

নাদের মিয়া কথা বলে না ৷ চারদিকে পিনপতন নিস্তব্ধতা ৷ হঠাৎ নয়ন উঠে দাঁড়ায় ৷ তারপর বলে

“রূপার লগে আমি কোন খারাপ কাজ করিনি ৷ একঘরে আপনারাই আমাগো রাখছিলেন বাইরে শিকল দিয়া ৷ ওর সাথে আমার কোন অনৈতিক সম্পর্ক হয় নাই ৷ আমি বিয়াতে রাজী না ৷ আমারে জোর কইরাও লাভ নাই ৷ বিয়া আমি করমু না এটাই ফাইনাল কথা ৷ আমরা একে অন্যরে ভালোবাসি , সময়মতো বিয়া করমু আল্লাহ যদি আমাগো জোড়া ঠিক কইরাই রাখে ৷ আজ আমার পক্ষে বিয়া করা সম্ভব না , কিছুতেই না ”

সোবহান মির্জা খিকখিক করে হাসে অশ্লীল ভঙ্গিতে ৷ তার চিন্তা মিলে গেছে ৷ এই ছেলেও বেঁকে বসেছে ৷ সবাই হাসিখুশিভাবে রাজী হলে ব্যাপারটা ঠিক জমে না , ছেলে বেঁকে বসেছে এবার মজা শুরু হবে ৷ প্রয়োজনে তার লাইসেন্স করা যন্ত্রটাতো আছেই ৷ তার মনে আজ খুব আনন্দ হচ্ছে ৷ জীবনে বাঁচতে হলে আনন্দের দরকার আছে ৷ কারও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে টলটলে জল খাওয়ায় আনন্দ , কারও আনন্দ জলঘোলা করে কাঁদামাখা জল খাওয়ায় আনন্দ ৷ সব আনন্দই সমান , ক্ষেত্রবিশেষে শুধু পরিস্থিতি আলাদা ৷

এত উত্তেজনার মধ্যে একটা মানুষ খুব নিশ্চুপ ৷ সে রূপা ৷ এই মুহূর্তে তার চোখে মুখে চরম অবিশ্বাস ৷ এতক্ষন যা কিছু হচ্ছিলো তাতে তার কষ্ট হয়েছে , অপমানিত বোধ হয়েছে ৷ কিন্তু এখন যা হচ্ছে তার নাম তুফান ৷ ভেতরে এক ভয়ঙ্কর তুফান চলছে ! তার ভালোবাসার মানুষটা , কৈশোরের আবেগের মানুষটা বলছে তাকে বিয়ে করবে না ! তাহলে এতদিনের দেখা স্বপ্ন কি মিথ্যে ছিল ? সে কী আসলেই শুধু তার সাথে ছলনার প্রেম করেছে ? ভালো যদি বাসবেই তবে কেন অস্বীকৃতি জানাচ্ছে বিয়েতে ! কেন স্পষ্ট গলায় জোর দিয়ে বলছে সে বিয়ে করবে না …

সোবহান মির্জার রাজত্বে অপরাধীর মতামতের মূল্য নেই ৷ তার হাতে চকচকে রিভলবার ৷ গুনে গুনে ছ’টা বুলেট তাতে ভরা ৷ বুলেট খরচ করার কোন ইচ্ছে তার নেই , যন্ত্র মাথায় ঠেকলে বুলেট খরচের দরকার পড়ে না ৷ অথচ নয়ন রিভলবারের নিচে দাঁড়িয়েও একই কথা বলতেই থাকলো ৷ সোবহান মির্জার ইশারায় একজন এসে সজোরে চপোটাঘাৎ করলো নয়নের গালে ৷ এক চড়েই ঠোঁট কেটে রক্ত ঝড়তে শুরু করলো ৷

রূপা একদম নিশ্চুপ ৷ এই নয়নকে সে চেনে না ৷ তার মনে হচ্ছে অচেনা একজন মানুষের সাথে তার বিয়ে হচ্ছে ৷

অবশেষে তিন লক্ষ একটাকা দেনমোহরানা নির্ধারণ করে বিয়ে হয়ে গেলো রূপা আর নয়নের ৷ দুজনই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত ৷ অথচ গল্পটা ভিন্ন হবার কথা ছিল ৷

*****

চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here