একটু_একটু_ভালোবাসি পর্ব ৯

0
2180

#একটু_একটু_ভালোবাসি
#পর্বঃ০৯
লেখিকাঃ #শাদিয়া_চৌধুরী_নোন

পরদিন সকাল থেকেই সিরাতের অস্থিরতা বেড়ে গেলো। তার মনে হচ্ছে, এইবার আর কোন রক্ষা নেই৷ বাবা বোধহয় রাজি হয়েই যাবে। ভাবতেই ঠোঁট উল্টে কাঁদার উপক্রম হলো সিরাতের। গতকাল রাতেও এইসব নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুম হয়নি। ছেলে আসবে শোনে, কোনো কারণ ছাড়াই সিরাত লজ্জা পাচ্ছে। ছেলের সামনে আসতে বললে কি হবে? আলাদা কথা বলতে দিলে কি হবে তখন, এসব মাথায় নিয়ে সে লজ্জায় একেবারে নুইয়ে পড়ছে। তানিশা সিরাতের এমন অবস্থা দেখে তানিশা হেসে কুটিকুটি। হাসতে হাসতে সে বললো,
—– তোকে কি প্রথমবার পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে নাকি? কিছুক্ষণ আগে দেখলাম কাঁদছিস, এখন দেখছি লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেছিস কি ব্যাপার হুম?

সিরাত তানিশাকে জড়িয়ে ধরলো,
—– আন্টি! এইবারের ব্যাপারটা আলাদা। আব্বু মত দিয়ে দিয়েছে। সব ঐ মহিলার দোষ। আন্টি, উনারা একটুপরই চলে আসবে। আমি কি করবো?

তানিশা বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো,
—- সবই তো বুঝলাম কিন্তু তোর ঐ সাইকো’টা কোথায়? আমি যা বুঝেছি, এতো সহজে কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নয় সে।

সিরাত আবার গাঁইগুঁই করে বললো,
—- উফফ আন্টি! এসব বলে ভয় আর বাড়িও না। ঐ লোকটার নাম শুনেও আমার ভয় করে। কখন কিভাবে কোথা থেকে, হুট করে সামনে চলে আসে আমিও নিজেও ঠাহর করতে পারি না। সবসময় রাত!রাত!রাত-পাত কি সব নামে ডাকে আমায়। ওওও আন্টি! আমি বিয়ে করবো না। প্লিজ কিছু করো।

তানিশা আবার বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো,
—- আমি তোর আন্টি, তুই আমার ভাতিজী। তাইনা?

—- হুম৷

—– ছেলে যদি সুবিধার মনে না হয়, এখানেই লেং মেরে ফেলে দেবো। বুঝেছিস? কোন ছেলে কেমন হয় জানা আছে আমার। খালি আসতে দে, আমি আর ইফতি মিলে ছেলেটাকে এমন অবস্থা করবো না! সব ভদ্রগিরি আমি ছুটিয়ে দেবো। বলে কিনা প্রথম দেখায় ভালোবাসা (মুখ ভেঙিয়ে) কচুর ভালোবাসা ছুটিয়ে দেবো।

সিরাত খানিকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে চিন্তিত মুখ করে বসে রইলো। তানিশা মিথ্যে কথা বলে না। গ্রামের সকল ছেলের কাছে তানিশা মানেই ভয়। আস্ত একটা ছেলেদের গ্যাং নিয়ে ঘুরতো একসময়।

অন্যদিকে সিরাতের মা আজ সকাল থেকে রান্নাঘরে। উনাকে দেখে মনে হবে, রাঁধতে রাঁধতেই উনার জীবন অবসান হবে আজ। মুখ ঘামে একাকার। শাড়ির আঁচলে মুখ মুছছেন বারবার। সিরাত সাহায্য করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তিনি ধমক মেরে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন৷ সিরাতকে আজ কোনো কাজই করতে দেননি তিনি। একটু আগেই নিজ হাতে সিরাতকে লাল শাড়ি পড়িয়ে দিয়ে মোটামুটি একটা পুতুল বানিয়ে রেখে এসেছেন। তানিশা সাজিয়ে দিয়েছে ঘরোয়া সাজে। হেঁটে হেঁটে সিরাত যখন একটু আগে রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে গেলো, তা দেখেই উনার যেন সমস্ত ক্লান্তি উবে গেলো। মনে হলো যেন, আস্ত একটা পুতুল গুটিগুটি পায়ে হাঁটছে। শাড়ি সামলাতে গিয়ে তার অবস্থা নাজেহাল৷ মেয়েটাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। লাল রঙটা খুব মানিয়েছে। তিনি আবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে গেলেন। দুপুরের দাওয়াত। এক্ষুনি এসে পড়বে হয়তো। উফফ! সিরাতের বাবাটা সেই কখন দোকানে গেলো মিষ্টি কিনতে। এখনো এলো না! ইফতিটাও গেছে বাপের সাথে। গরমে নিশ্চয় এতক্ষণে ঝুল হয়ে নাক-মুখ লাল করে ফেলেছে। কি করছে কে জানে……

ঠিক দুপুর বারোটা বাজে বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠলো। কলিংবেলের টোন পুরো ঘরময় প্রতিধ্বনিত হলো। সিরাতের গায়ে যেন কে কাটা মারলো। নিশ্চিত ওরা এসে গেছে। বিছানার চাদর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে, অস্থির পায়ে নিজের রুমে পায়চারি করতে লাগলো। তানিশা একটু দূরে বসে একটা মিষ্টি মুখে পুরে সিরাতের কান্ড দেখছে। ইফতিও সিরাতের পেছন পেছন হাঁটছে। একটা মিষ্টি হাতে নিয়ে বোনকে বললো,
—- আপু আজ না তোমার বিয়ে? ধরো মিষ্টি খাও। আমি আর আব্বু অনেক দূর থেকে এই মিষ্টি এনেছি। খাও।
বিয়ে করলে মিষ্টি খেতে হয়।

সিরাত হাঁটা থামিয়ে ইফতির দিকে ভয়েভয়ে তাকিয়ে রইলো। তানিশা দিলে এক ধমক,
—- দিবো একটা চটকানা। ইফতিয়া! তোকে আজ তেতুল তলায় দিয়ে আসবো। তেতুল গাছের রাক্ষসীর সাথে তোকে বিয়ে দেবো। সাথে একটা মিষ্টির প্যাকেটও নিয়ে যাবি। দুজন মিলে ভাগ করে খাস। চল….

ইফতি বেচারা মিষ্টিটা হাতে নিয়ে নাদুসনুদুস শরীরে দৌড়ে পালিয়ে গেলো। ছেলেটা একটু আগেই গোসল করে এসেছে। তার মায়ের ধারণায় ঠিক, ঠিকই গরমে ঘামে ভিজে নাক-মুখ লাল করে এসেছে। ওরা দুই ভাইবোনই একরকম। ফলস্বরূপ আবার গোসল করতে হলো।

সিরাতের মা অথিতি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। মাত্রই গোসল সেড়ে স্বামীর সাথে কি একটা বিষয়ে আলাপ করছিলেন। কলিংবেলের শব্দ শুনে এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন। মাহফুজা আইভি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন। পরণে ভারী জামদানী শাড়ি। গতকালের মতো উনার চেহারায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই। উনাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিরাতের মা বললেন,
—– ভাবী, জামাই বাবা কোথায়?

জনাবা আইভি ভীষণ খুশি হলেন। ছেলেকে “জামাই” সম্বোধন করায় তিনি অনেককিছুই বুঝে গেলেন।
—- বেয়াইন, আপনার জামাইবাবা একটুপর আসবে। আমাকে এখানে নামিয়ে দিয়ে মহাশয় গেছে আড়িয়াল ঘের থেকে মিষ্টি কিনতে। জানেন তো ওখানকার জিনিস আমাদের শহরে একনামে পরিচিত।

—- এতদূর যাওয়ার কি দরকার ছিল?
সিরাতের মা হাসতে হাসতে বললেন। মুখে এমন বললেও মন খুশিতে ভরে গেলো। মিষ্টি তো স্থানীয় দোকান থেকেও কেনা যেতো। নিশ্চয়ই ছেলেটা ভালো। তিনি জনাবা আইভিকে নিয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসলেন। ইফতি সালাম দিয়ে দরজার কোণা ধরে দাঁড়িয়ে রইলো।

—- আমি বললে সে যেতো না। আজ নিজ দায়িত্বে গেলো। যেটা যখন মনে আসবে তাই করবে সে, কারো কথা কানে নেবে না।হবু শ্বশুরবাড়ি বলে কথা।

তারা কথা চালিয়ে যেতে লাগলো। একসময় সিরাতের মা তানিশাকে জোরে ডাক দিয়ে বললেন,
—- তানিশা!!! টেবিলে জোসের ট্রে টা রেখেছি। সিরাতকে নিয়ে এখানে আয়।

এদিকে সিরাতের ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। শাড়ির আঁচলটা মাথায় দিয়ে সে ধীরপায়ে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। রীতিমতো দাঁতে কিরমির করছে সে। তানিশা ট্রে হাতে নিয়ে ফিক করে হেসে দিলো।
—- তোর মতো কনে আমি এই জীবনে দেখিনি। পাগলী একটা! এতো ভয় পাওয়ার কি আছে?

তানিশা এতকিছু বোঝালো তারপরও সিরাত, মৃগীরোগীর ন্যায় কাঁপতে লাগলো। জনাবা আইভিকে সে পায়ে ধরে সালাম করে মায়ের পাশে মাথা নিচু করে বসলো। নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আড়চোখে আশেপাশে তাকালো। কি ব্যাপার?ছেলে আসেনি না-কি? স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। এতোকিছুর পরও তার একটা বিষয় ভালো লাগলো। সামনে বসে থাকা ভদ্রমহিলা তাকে অন্যদের মতো হেঁটে দেখাতে বলেননি, চুলে হাত দেননি, খুব বেশি প্রশ্নও করলেন না। ভদ্রমহিলা বেশ আধুনিক মনমানসিকতার, কথার ধরন শুনেই বোঝা যায়।

হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো। জনাবা আইভির মোবাইলে কল এলো, তাঁর ছেলে নিচে এসেছে। মিষ্টি নিয়ে উপরে আসছে। কলিংবেল বাজার পর সিরাত তানিশার হাতটা শক্ত করে ধরলো। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ আওয়াজ হচ্ছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সিরাতের মা বললেন,
—- সিরাত তুই যা, দরজাটা খুলে দিয়ে জামাই বাবাকে নিয়ে ভেতরে নিয়ে আয়।

মাহফুজা আইভিও তাল মেলালেন,
—- হ্যাঁ মা, তুমিই যাও৷

সিরাতের চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। তার মা ইচ্ছে করে এটা করেছে বেশ বুঝতে পারছে সে। তানিশার দিকে তাকাতেই, তানিশাও একটা চোখ টিপ দিয়ে বেস্ট অফ লাক জানালো। অতঃপর সিরাত শাড়ির কুচি সামলিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। দেখে মনে হচ্ছে, যুদ্ধে যাচ্ছে সে। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজা খুলে দিতেই, তার দিন দুনিয়া উল্টে পড়ার উপক্রম হলো।

#চলবে
#Sadiya_Chowdhury_Noon

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here