জোনাকিরা ভীড় করেছে পর্ব ১৪

0
880

#জোনাকিরা ভীড় করেছে
#পর্ব-১৪
#সিফাতী সাদিকা সিতু

ফয়সালের দেয়া হলুদের শাড়িটা পরার পর থেকে মেঘলার কান্নাগুলো দলা পাকিয়ে উঠছে।মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর জ্বলছে তার।সে বাথরুমে ঢুকে কাঁদলো কিছুক্ষণ। বাইরে থেকে মালিহা বেগম তাড়া দিচ্ছেন তাড়াতাড়ি বের হওয়ার জন্য। তবুও বের হলো না সে,কেঁদেই চললো।যখন আমরিনের গলা পেল তখন কিছুটা সস্তি পেল।দ্রুত চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হলো।

মালিহা বেগম এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করলেন।অবাক হলেন এটা ভেবে যে,আমরিন আসায় মেঘলার চোখে মুখে যে সস্তি ফুটলো তা এতক্ষণ মোটেও ছিলো না।গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আচ্ছা, তিনি কোনো ভুল করছেন, নাতো?মোমেনা বেগমের থেকে মেয়েটাকে দূরে রাখতে পারলেই তার তার সমস্ত চিন্তা দূর হবে।আদিব নিঃসন্দেহে ভালো ছেলে। কিন্তু ভালো দিয়ে কি জীবন চলে?বাস্তবতা যে বড় কঠিন!অনেক সহ্য করেছেন আর নতুন করে কোনো ঝামেলায় পড়তে চান না।আদিব এখনো পড়াশোনা শেষ করেনি।ইন্জিনিয়ারিং শেষ হতে আরও বছর খানেক সময় লাগবে।আর মেঘলা মুখে যতই বলুক নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মা,ভাইয়ের দায়িত্ব নেবে, সবটাই মুখের কথা,স্বপ্নের কথা।সমাজ একটা মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করার রাস্তাটা মোটেও মসৃণ রাখেনি।অভিভাবকহীন মেয়ের জন্য সমাজ হাজারটা দোষ তৈরী করবে!মেঘলা যা করতে চায় করুক না,তবে সেটা বিয়ের পর।যতই আধুনিক যুগ হোক না কেন,একটা মেয়ের বিয়েতেই সব সমাধান।ছেলে হোক, মেয়ে হোক,বিয়ে তো করতেই হবে।এটা তো আমেরিকা নয় যে বিয়ে ছাড়া সব সম্ভব। তাহলে দেরী করে কি লাভ।রেবেকার জন্যই ভরসা পেয়েছেন তিনি।তা না হলে,এতদ্রুত বিয়ের ব্যাপারটা মাথায় নিতেন না।মেঘলার কলেজ শেষ হলো,এরপর ভার্সিটির পর্ব আসবে,টাকা পয়সা বেশি লাগবে।মেঘলা কিভাবে সেসব সামলাবে?শুধু টিউশনি পড়িয়ে কি এসব খরচা চালানো যায়?

আন্টি, আপনি তো প্রথম হলুদ লাগাবেন,আসেন।

আমরিনের ডাকে চমকে উঠলেন মালিহা বেগম।চোখ মুখে বললেন,আমি না দিলে হয় না?

আপনি না দিলে তো আপু মন খারাপ করবে।

আচ্ছা, চলো।

বসার ঘরের সোফা গুলো সরিয়ে ফ্লোর ফাঁকা করে সেখানে হলুদের আয়োজন করা হয়েছে।মালিহা বেগমের ভাই, ভাবীরা এসেছে।আশে পাশের বাড়ির কয়েকজন এসেছে।ঘরটা ভরে উঠেছে।মনিরা শাড়ি পরেছে,ভারী মেকআপে নিজেকে সর্বোচ্চ সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করছে।এসব সাজগোজের পেছনে বড় একটা কারণ আছে!

আমরিন হলুদ রংয়ের লেহেঙ্গা পরেছে।মেয়েটাকে দেখতে মিষ্টি লাগছে।মেঘলা ভাবলো বিয়ের পর এই মেয়েটাকেও সে ঠিকমতো দেখতে পারবে না,কথা বলতে পারবে না।অল্প কয়েকদিনেই যে খুব আপন হয়ে গেছে আমরিন।মালিহা বেগম দূর্বল শরীর নিয়ে কোনোরকম হেটে এসে বসলেন মেঘলার পাশে।কাঁপা হাতে হলুদের ছোঁয়া লাগিয়ে দিলেন কপালের কিছু অংশে।মেঘলার মনে হলো বুকটায় কে যে খামচে ধরলো তার।ঠোঁট কামড়ে ফুপিয়ে উঠলো সে।মালিহা বেগম মেয়ের পাশে বসে নীরবে চোখের জল ফেললেন। মাহিমকে আসতে দেখে দ্রুত উঠে ঘরে চলে গেলেন।মাহিম আপার কাছে উঠে বসলো। কিন্তু দরজার দিকে মারুফের সাথে আদিবকে দেখে নেমে গেল আবার।মেঘলা ডাকলো কিন্তু আদিবকে দেখে তার কথা মাঝখানেই বন্ধ হয়ে গেল।আদিব কেন এসেছে? কি চাইছে ও, মেঘলা কষ্ট না দিলে কি হচ্ছে না?মেঘলা আমরিনের দিকে জিজ্ঞেসু দৃষ্টিতে তাকালো।আমরিন শুধু মিটিমিটি হাসছে।

মোমেনা বেগম আদিবকে দেখে খুশি হলেন।মনিরাকে ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন। মেয়েটা বড্ড চটপটে। আদিব এসে সরাসরি দাঁড়ালো মেঘলার সামনে। হলুদ শাড়িতে অন্যরকম সুন্দর লাগছে মেঘলাকে।মুখে হাসির ছিটে ফোঁটা নেই।মেঘলার শুকনো মুখ দেখে আদিবের কষ্ট লাগলো। আদিব তো জানে মেঘলা ইচ্ছের বাইরে সবকিছু করছে।মেঘলার মা যদি একটু বুঝতো?আদিব একটু ঝুঁকে মেঘলার গালে হলুদ লাগিয়ে দিলো।কেঁপে উঠলো মেঘলা।চোখ জোড়া বন্ধ করে ফেললো সে।আদিব সবার আড়ালে মেঘলার হাতে ভাজ করা কাগজ গুঁজে দিয়ে সরে এলো।

মোমেনা বেগম মনিরাকে ইশারা করলেন,আদিবকে জুস এনে দিতে।

মনিরা তাই করলো,এক গ্লাস জুস হাতে আদিবের সামনে এসে দাঁড়ালো। বললো,কষ্ট পাবেন না, মেঘলা আপনার যোগ্য নয়?

আদিব কপাল কুঁচকে তাকালো মনিরার পানে।কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই সে বুঝে গেল মোমেনা বেগমের দাওয়াত দেয়ার কারণটা।বাঁকা হেসে মনিরার হাত থেকে জুসটা নিয়ে বললো,ঠিক বলেছ,সবাই কি আর সবকিছুর যোগ্য হতে পারে?আমি কষ্ট পাচ্ছি কে বললো তোমায়?কষ্ট পেলে কি আর তোমার বোনকে হলুদ দিতে আসতাম?

তা ঠিক ভালই করেছেন আপনি।চলুন না ওই দিকে গিয়ে বসি?

আদিব সম্মতি জানালো।মনিরা মনে মনে কয়েকবার লাফিয়ে নিলো।মা তাকে খারাপ বুদ্ধি দেয় নি তাহলে?

আদিব ঠোঁট টিপে হাসলো মনিরার মনের ভাব বুঝতে পেরে।মনিরার সাথে একটু দূরে গিয়ে বসলো।মেঘলা মনিরা আর আদিবকে পাশাপাশি চেয়ারে বসতে দেখে করুন চোখে তাকালো।দুচোখ ততোক্ষণে জলে ভরে উঠেছে!

৩১.
“নিজের ভালবাসার থেকে তোমার জীবনের মূল্য আমার কাছে অনেক মেঘলা।সবসময় তোমার ভালো চেয়ে এসেছি এবং সারাজীবন তাই চাইবো।তোমার সাথে কিছু খারাপ হোক তা আমি কিছুতেই মানতে পারবো না।ফয়সালকে আমি স্কুল জীবন থেকেই চিনি।আমার জীবনের সবথেকে ভালো বন্ধু ছিলো সে।ছোট বেলায় আমি খুব বোকা ছিলাম জানতো,সেজন্যই বোধহয় ফয়সালের মনের ভাব কখনোই বুঝতে পারিনি।তবে পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম।প্রতি ক্লাসে ফাস্ট হতাম। ফয়সাল পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলো না।আমার সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর ফয়সাল পড়াশোনায় মনযোগী হয়েছিল।দুজনের বন্ডিংটা খুব ভালো ছিলো। টিফিন ভাগ করে খেতাম,ও স্কুলে না আসলে আমিও আসতাম না।এভাবেই চলছিলো।কলেজ উঠলাম এক সাথেই।সব ঠিকঠাক চললেও ফয়সাল হঠাৎ এক মেয়েকে পছন্দ করে ফেলে।মেয়েটা আমাদের ক্লাসমেট ছিলো।কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি মেয়েটা আমায় পছন্দ করতো ফয়সালকে নয়।ফয়সাল যখন ওকে প্রপোজ করে তখন মেয়েটি সরাসরি না করে দেয় এমনকি তখন বলে দেয় মেয়েটি আমায় ভালবাসে।ফয়সাল এতে অপমান বোধ করে।এই সামান্য কারণে ও আমার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক শেষ করে দেয়।আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না।খুব ভেঙে পরেছিলাম ফয়সালের এমন করায়।সেই থেকে।ফয়সাল হয়ে ওঠে আমার চরম শত্রু।আমি এখনো ভেবে পাই না এই সামান্য বিষয়ে কেউ কিভাবে বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিতে পারে? তুমি যখন ফয়সালের কাছে প্রাইভেট পরতে তখন আমিও।মাঝে,মাঝে যেতাম।ভাবিনি কখনো ফয়সালের সাথে আমার দেখা হবে এভাবে।ফয়সাল সহজেই বুঝে গিয়েছিল তোমায় আমি ভালবাসি।সেই থেকে ওর টার্গেট তুমি!বিশ্বাস করো ওকে আমি অনুরোধ পর্যন্ত করেছিলাম কিন্তু ও শোনেনি।তোমায় ব্যবহার করে ও আমায় কষ্ট দিতে চায়।কিন্তু ফয়সাল যে বিয়ে পর্যন্ত এগোবে আমি বুঝতে পারিনি।মেঘলা প্লিজ তুমি তোমার মাকে বোঝায়,ফয়সাল মোটেও ভালো ছেলে নয়।তোমাদের সবাই বিপদে পরবে।তুমি ভালো থাকবে না মেঘলা।আর ফয়সাল সেটাই চায় তুমি খারাপ থাকলে আমার অবস্থা কি হবে সেটা হয়ত তুমি জানে।এখনো সময় আছে একবার শুধু বলো তুমি ফয়সালকে বিয়ে করবে না,দেখ আমি সবটা সামলে নেব।আমার কথা না হয় নাই ভাবলে।তোমার নিজের কথা ভাবো,তোমার পরিবারের কথা ভাবো,মাহিমের কি হবে?শুধু একবার বলে দাও তুমি ফয়সালকে বিয়ে করবে না!আমি তো জানি, তুমি আমায় কতটা ভালবাসো!আমাদের ভালবাসাকে হারিয়ে দিয়ো না ফয়সালের নোংরামির এই খেলায়।”

মেঘলা কাগজটা হাতে মুচড়ে ধরে স্থির হয়ে বসে রইলো।তার মাথা ঘুরছে,এসব কি বলছে আদিব?ফয়সাল আর আদিব দুজনে বন্ধু ছিলো!মেঘলা এখন কি করবে?মাকে এসব বলে কিছু হবে না?মা কখনো এই কথা গুলো বিশ্বাস করবে না।আদিবের একটা কথাই শুধু তার মনে ঝড় তুলছে,”আমাদের ভালবাসাকে হেরে যেতে দিও না।” আচ্ছা,সে এখন কি করবে?

৩২.
আনাফ সকাল সকাল চলে এসেছে আমরিনদের বাড়িতে,আদিবই তাকে ডেকেছে।মেঘলার বিয়ে আজ!আনাফ ভয় পাচ্ছে এই ভেবে যে আদিব চুপচাপ মেঘলার বিয়েটা হতে দিচ্ছে বলে।কারণ,আদিব মেঘলাকে প্রচন্ড ভালবাসে।ফয়সালের মতো একটা বেয়াদবের সাথে মেঘলার বিয়েটা কি করে হতে দিচ্ছে,আদিব?আদিব এখন গোসল করছে,আজ শুক্রবার তাই জুম্মার নামাজ আছে।আনাফ,আদিব,আনোয়ার সাহেব এক সাথে নামাজে যাবে।পুরো বাড়িতে থমথমে ভাব বিরাজ করছে।আনাফের সত্যি খুব খারাপ লাগছে।আদিবের সাথেই এমন হতে হলো?

আমরিন ভাইয়ের ঘরে ঢুকে আনাফকে বসে থাকতে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।

কিরে,তোরও দেখছি মন খারাপ?

তা খারাপ হবে না বুঝি।আচ্ছা, আনাফ ভাই তুমি কিছু করতে পারবে না?যাতে মেঘলা আপুর বিয়েটা না হয়।

আনাফ দীর্ঘশ্বাসটা গোপন করলো।বললো,পাগলি জীবনটা তো সিনেমা নয়,সবকিছু তো মুখে বললেই হয় না।মেঘলা নিজে থেকে কিছু না করলে আদিবের এখানে কিছুই করার নেই।আদিব মেঘলার প্রেমটা যদি সরাসরি হতো তাহলে আদিব হয়ত অনেক কিছু করতে পারতো।

মা ঘর থেকে বের হচ্ছে না।আমি কিভাবে যাই বলতো মেঘলা আপুর কাছে?

তুই যাবি?

যাবো। জানতো, আমার মন বলছে ভালো কিছু হবে আজ।কোনো একটা মিরাকল ঘটবে!

হ্যাঁ,বুঝতে পেরেছি।আজে,বাজে সিনেমা দেখে তোর মাথাটা গেছে।

আমরিন মুখ ভেংচি দিয়ে চলে গেল।

আদিব নামাজ শেষ করেও মসজিদে বসে রইলো।আকুল হয়ে সে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইছে।চোখ দিয়ে নীরবে পানি পরছে।আনাফ কিচ্ছু বলতে পারছে না।ভয় হচ্ছে আদিবের না কিছু হয়ে যায়!

মেঘলাকে সাজিয়ে দিচ্ছে মোমেনা বেগমের ভাতিজি। লাল বিয়ের শাড়িতে অসাধারণ লাগছে মেঘলাকে।মালিহা বেগমের বিয়ের টুকটাক গহনা ছিলো যেগুলো সব দিয়ে দিয়েছেন।ভারী মেকআপ নিতে গিয়ে বসে থাকতে মেঘলা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।এরা কি জানে এসব বাইরের রংয়ে মেঘলার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে? আমরিনকে দেখে মাথা নামিয়ে ফেললো সে।বড্ড কান্না পাচ্ছে। কিন্তু কান্না করাও যাবে না, মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে।কবুল বলার আগ পর্যন্ত নিজেকে পুতুল বানিয়ে রাখতে হবে।আচ্ছা তার মুখ দিয়ে ফয়সালের জন্য কবুল বের হবে তো?

মাহিম ঘরের এক কোণে গুটিশুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে।এত লোকজন দেখে সে ঘাবড়ে গেছে। তার আপার কাছে যেতে পারছে না।ভাইয়ের দিকে তাকালেই মেঘলার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আজকের পর কি করে থাকবে মাহিমকে ছাড়া।মা কি ঠিকঠাক যত্ন নিতে পারবে?নামাজবাদ বর যাত্রী রওনা হবে।মালিহা বেগম অসুস্থ শরীর নিয়েও খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা দেখছেন।ফয়সাল বারবার বলে দিয়েছে খাওয়া দাওয়াটা যেন ঠিকঠাক থাকে।ফয়সালের ব্যবসায়িক কিছু লোকজনও আসবে।

চলবে..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here