পর্ব_১৭ #অসমাপ্ত_প্রনয় #মিঃনাহিদ_হাসান

0
120

#পর্ব_১৭
#অসমাপ্ত_প্রনয়
#মিঃনাহিদ_হাসান

অন্ধকারের মধ্যে ছাদের এক কোনায় থেকে বেরিয়ে আসলো কবীর, চাঁদের আলোয় তার রাগি মুখটা পুরোটা দেখা যাচ্ছে….
ছাদের দরজার পিছনে থেকে আসলেন জুবিয়া বেগম..
আম্মা এইখানে এতো রাতে..!আর কবীর তুমি এইখানে কেমনে আসলা..? নাফিসা অবাক হয়ে গেছে দুইজন কে দেখে..!

রাতে ঘুম আসতাছিলো না, খুব মনে পড়তাছিলো তোমার কথা,তাই চলে আইছি.. দূর থেকেই ছাদে তোমারে দেখছি,তাই গাছ বেয়ে,ছাদে আইছি.. তখন যে ছাদে ধপ করে পড়ার শব্দ শুনছো,ওইটা আমিই ছিলাম..!যা ঘটনা শুনলাম, মাথায় এখন আগুন লাগছে…

আম্মা তুমি এতো রাতে ছাদের ক্যান.??
আমি তোকে রুবেলের সাথে ঘর থেকে বের হতে দেখলাম_আমার কেমন খটকা লাগলো,তাই তোদের কথা শুনার জন্য দরজার আড়ালে ছিলাম, আমি সব শুনেছি, জুবিয়া বেগমের কন্ঠটা কেমন ভেজা ভেজা মনে হইলো…?

আম্মা এইসব কি সব সত্যি কথা,ভাইয়া কী সত্যিই এমন করছে..?
জুবিয়া বেগম কিছু বললেন না,জল ছলছল চোখে অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন…!

কবীর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা রুবেল ভাইয়া আপনে মন্ডল বাড়ির পিছনে রেন্ট্রি বাগানের ব্যাপারে কতোটুকু জানেন…! আমাদের একটু বললে ভালো হইতো..?

রুবেল দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো….?
রুমা মা*রা যাবার পর আমি যখন ছন্নছাড়া,নেশা আমার নিত্যদিনের সঙ্গী, একদিন ডাক পড়লো আমার রেন্ট্রি বাগানে..? কোনদিন ওইদিকে যাওয়া হয় নি, রায়হান এসে আমাকে নিয়ে গেলো…

জঙ্গলের ভেতর ঢুকে আঁকা বাঁকা রাস্তায় কিছু দূর যেতেই সামনে পড়লো একটা গুহা মুখ..
আসলে এই গুহা মুখ হলো নিচে যাবার রাস্তা,গুহার সামনে দুইজন পাহারাদার পাহারা দিচ্ছে…
আমি রায়হানের সাথে গুহার মুখে প্রবেশ করলাম, নিচের দিকে নামতে শুরু করলাম,নিচের দিকে লম্বা সিঁড়ি নেমে গেছে….!
কিছু সময় যাওয়ার পর আমি একটা বিশাল হল রুমের মতো জায়গায় চলে আসলাম, চারিদিকে অনেক কয়টা ঘরের দরজা দেখা যাচ্ছে, চারদিকে দিনের মতো আলো চকচক করছে…

একটা ঘরে থেকে বেড়িয়ে কিছু লোকজন সাথে নিয়ে
মন্ডল চাচা আমার সামনে এগিয়ে আসলেন, বললেন আইজ থিকা এইখানে কাম করবা, তোমার কোন কিছুর অভাব হইবো না..? কিন্তু একটা কথা মনে রাখবা,যদি এই জায়গার খবর কাক পক্ষিও যানে , তাইলে কিন্তু জানে বাচবা না…আহো আমার সাথে, এই যে বিশাল প্রাসাদে দেখতাছো না, এইটা আমার রাজত্ব, এইহানে আমার হুকুম চলে,কেউ কথা না শুনলে লাশ হইয়া নদীতে ভাইসা যায়…

মন্ডল চাচার সাথে এই পাতাল পুরীর প্রতিটা ঘর ঘুরে দেখতে লাগলাম মোট ছয়টা ঘর দেখলাম..
দুই সাইরে তিনটা করে মোট ছয়টা ঘর…
প্রথম ঘরে ঢুকেই আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, একটা মেয়ে শুয়ে আছে অর্ধ নগ্ন অবস্থায়…
পরের ঘরে তিনজন মেয়ে বসে আছে, তাদের চোখের করুণ চাহনি দেখে মায়া লাগে…
মন্ডল চাচা বললো ওদের রানির মতোই রাখছি, কোনো কিছুর কমতি নাই, শুধু একটা সমস্যা ওরা মুক্ত পাখি হয়ে কখনো আকাশে উড়তে পারবো না,মন্ডলের শয়তানি হাসি শুনে আমার গা জ্বালা করতে শুরু করলো, কিছু না বলে সামনে এগিয়ে গেলাম…

তৃতীয় ঘরটায় ভিতর দরজা বন্ধ, শুধু শুনতে পাওয়া যাচ্ছে গোঙানির আওয়াজ…?কোন নরপশু হয়তোবা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে কোন এক বাবার রাজকন্যাকে…!

আমার কিছুই করার ছিল না, চুপচাপ দ্বিতীয় সাড়ির ঘর গুলোর দিক এগিয়ে যেতে লাগলাম….
মন্ডল চাচা প্রথম ঘরের দরজা খুললেন, দেখলাম নানা ধরনের মাদক দ্রব্য দিয়ে ঘরটা ভরা, এইটা যেন ইয়াবা ফেনসিডিল ড্রাগের একটা গোডাউন…!

পরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম, অনেক গুলো বিছানায়,যেন কোন অতিথি শালা, একসাথে অনেক মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা আছে এই ঘরে,যারা এই দলে কাজ করে তারাই এইখানে থাকে মনে হয়…

তৃতীয় ঘরটায় আমাকে নিয়ে গিয়ে,মন্ডল চাচা একটা চেয়ারে বসলেন, বললেন এইটা আমার ঘর, এটাই আমার হেড অফিস বলতে পারো…!

চাচা ওই মেয়েরা কারা ওদের ক্যান ধরে রাখছেন…!

ওই ধারের ঘর তিনটার নাম দিছি পাতাল-পতিতালয়, অনেক দূরের গ্রাম থাইকা, অসহায় মেয়েদের ধরে আইনা ওদের পতিতা বানিয়ে আমি আজ বড়ো টাকা ওয়ালা ব্যাবসায়ী হা হা হাহা…
মন্ডলের হাসিটা আমার কানে বিষের মতো মনে হচ্ছে,ইচ্ছা করতেছে_ওর গলা টিপে দেই..
সমাজের অসহায় মেয়েদের ওরা ধরে আনে,যাদের গরীব বাবা মা আছে, আবার কারো সেটাও নেই..আর থেকেও বা কি লাভ,তারা কিছুই করতে পারে না…আইন তাদের সাহায্য করে না, খোঁজার নাম করে চুপচাপ বসে থাকে, কয়দিন পর যখন নদীতে লাশ ভাইসা যায়,তখন একটু পুলিশের টনক নড়ে, কিছু দিন একটু চিল্লাচিল্লি করে, আবার চুপ হয়ে যায়, বলে কোন প্রমাণ নেই স্বাক্ষী নাই,আমরা কী করতে পারি, সুন্দর করে কেসের খাতা বন্ধ করে রাখেন..!

আর কতো অসহায় মেয়ের বলিদান যাইবো, পতিতালয় এই ঘর গুলোতে তারাই আসেন তারা সমাজের মান্য গন্য ব্যাক্তি,যাদের সবাই সম্মান প্রদর্শন করে…
তারাই এই ঘর গুলোতে নিজের লালসা মেটায়, টাকায় কিনে একটা দেহ, সারা রাত অত্যাচার করে নিজেদের খায়েস মিটায়,অন্যের কষ্ট তাদের অনুভব হয় না,হবেই বা কেমনে,টাকায় কিনে নিয়েছেন তো একটা ফুলের মতো দেহে,এখন তো নিজের নোংরা থাবা দিতেই হবে….

কতো শত নিরীহ প্রাণ ঝড়ে গেছে এই পাতালপুরীর ঘরগুলোতে, নরপশুদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ওই পাড়ে পাড়ি জমিয়েছে কতো ফুল, ভাবতেই চোখের কোনে জল চলে আসে…!
আমার বোন কি এইখানে বন্দি ছিলো, অনান্য মেয়েদের মত ওর অবস্থাও কী একই হয়েছিল,ওই নরপশু রা কি আমার বোনের কোমল অঙ্গে সিগারেটের আগুনের সেকা দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে, ফুলের মতো শরীরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে, আহ্ আমার বোনের কতো কষ্ট হয়েছিল…? কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমাদের ছেড়ে গেছে,ওর পরিনতি ও অন্য মেয়েদের মতো নদীর জলে ভেসে যাওয়া হয়ে ছিলো…?
এইসব ভাবতেই মাথা ধরে আসে, দুই হাতে মাথা চেপে চিৎকার দেয় রুবেল, এইসব হতে পারে নাআআআ…

কিরে রুবেল কোন সমস্যা…?
না চাচা মাথাটা কেমন করতাছে…!
আজকে বাসায় যা,কাল থেকে এই জায়গার পাহারাদার তুই…?

——–

রুবেল চোখের পানি মুছলেন,জুবিয়া বেগম কাঁদছেন, তিনি জানেন তার স্বামীর সব অপকর্মের কথা, কিন্তু তিনি নিরুপায়,মুখ বুজে তাকে সব সহ্য করতে হয়..?
নাফিসা দুই পা এগিয়ে এসে মায়ের কাঁধে হাত রাখলো,
এভাবে আর কতোদিন চলবে আম্মা,আর কতো সহ্য করবা, মানুষের জীবন নষ্ট হইতে দেখবা…?
মাদক দিয়ে যুবসমাজ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে,আর গরীব মেয়েদের তুলে এনে নিখোঁজ ঘোষণা করে, পতিতালয় খুলে নিছে..? আম্মা তুমি শুধু সাথে থাকো, আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা..এই পাপের মহল ধ্বংস করবো, অসহায় সব মেয়েদের উদ্ধার করবো..মাদক ব্যবসায়ী শেষ করবো,মাদক মুক্ত সমাজ গড়বো ইনশাআল্লাহ..!

সবাই একসাথে বলে উঠল ইনশাআল্লাহ…!
এটা যেন সবার এক কঠিন দৃঢ়তা…!
কবীর রাগে গজগজ করছে,যেন এখনি পাতালপুরীতে আগুন লাগিয়ে দিবে…?

জুবিয়া বেগম জোর কন্ঠে বললো,তোরা এগিয়ে যা..
আমি তোদের সাথে আছি….
চারজন মানুষ এখন জ্বলছে কঠিন প্রতিশোধের আগুনে, আকাশে চাঁদ মিটিমিটি আলো ছড়িয়ে হাসছে,হয়তো এই গ্রামের মানুষও হাসতে চলছে খুব তাড়াতাড়ি….

——-

মালিক আপনার ছেলে ঘরে নাই,এখন খাবার দিতে যাইয়া দেখি ঘরের একটা জানলা ভাঙ্গা,ও ঘরে নাই, পালিয়ে গেছে…
বারেক খন্দকারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, দৌড়ে ঘরে গেলেন, ভাঙ্গা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে,তার বুকটা কেঁপে উঠলো, আজকে ক্যান জানি ছেলের জন্য একটু বেশিই মায়া হচ্ছে…
সারা ঘর খুঁজা খুঁজি করে, একটা চিঠি পেলেন..
চিঠির ভাঁজ খুলেই কেমন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো,পড়ার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না…
কাঁপা কাঁপা হাতে পড়তে শুরু করলেন…!

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here