প্রেমের_ভেলা পর্ব ১

0
5834

তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো এক বৃষ্টির দিনে। ঝুম বৃষ্টির মাঝে যখন আমি ভিজে জুবুথুবু অবস্থায় হেটে যাচ্ছিলাম ঠিক তখনি কোথা থেকে সে দৌড়ে এসে আমার মাথার উপর ছাতা ধরেছিলো। অবাক বিষ্ময় নিয়ে আমি তার পানে তাকিয়েছিলাম। সে তার ঠোঁট দুটো মেলে দন্ত কেলিয়ে বলেছিলো, ‘এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর আসলে আন্টির অনেক টেনশন হবে। উনি তো তুমায় ভীষণ ভালোবাসেন।’

আমি আমার অবাক করা চাহনী নিয়ে সেদিন কিছু বলতে পারি নি। শুধু চেয়েই রয়েছিলাম। একটা অজানা অচেনা ছেলে কিভাবে আমার মাকেও চিনে তা আমার বোধগম্য হচ্ছিলো না। আমার বাচ্চা মন বলছিলো নিশ্চই ছেলেধরা হবে। ভুলিয়ে ভালিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়ার পায়তারা করছে। মুখে কুলুপ এটে এক ধাক্কায় তাকে সরিয়ে দিয়ে ভো দৌড় দিয়েছিলাম। পিছনে তাকানোর মত দুসাহস দেখাতে পারি নি। তখন মনে হয়নি একবারের জন্যও যে ছেলেটি আমার পানে কি অবাক চোখেই তাকিয়েছিলো?

ক্লাস থ্রিতে পড়া এক বাচ্চা মেয়ের মুখে ছেলে ধরার কথা শুনে সকলেই অবাক হয়ে তাকিয়েছিলো। কিন্তু কেবল আমার মা’ই ফেচফেচ করে কেদেছিলো। এমনকি পরের দিন থেকে আমার স্কুলে যাওয়ার জন্যও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো। আমার বাবা উনাকে কোনো ভাবেই এটা বলে বুঝাতে পারেনি যে এটা কোনো সলিয়ুশন নয়।

এভাবেই দিন পনের কেটে গেলো। আমার বার্ষিক পরীক্ষার রুটিন নিয়ে বাবা বাসায় এসে মা’কে দিয়ে বলেছিলো। অন্তত আমাকে যেনো পরীক্ষাটা দিতে দেয়। এক জোড়া শিক্ষিত দম্পতির মেয়ে কি মূর্খ হয়ে থাকবে! সুন্দর করে বুঝানো থেকে শুরু করে কড়া কথা শুনাতেও বাবা বাদ রাখে নি। কিন্তু আমার মায়ের এক কথা উনি আমাকে উনার কোলছাড়া করবে না। আমার বাচ্চা মনের খুশি আর দেখে কে! পড়াশুনা আর করতে হবে না এই ভেবেই যেনো মনের মধ্যে আনন্দের জোয়ার ভাসছিলো।

মা মাঝে মাঝেই বিকাল বেলা পাশের বাসার এক আন্টির বাসায় বেড়াতে যান। আমার ছোট খালা তখন আমাদের বাসায় এসেছিলো গ্রাম থেকে। মূলত মা’ই উনাকে এনেছিলো। পাশের বাসার এক আন্টির সাথে মায়ের তখন বেশ খাতির। আন্টির ভাইয়ের সাথে খালার সম্মন্ধও মোটামোটি মা বেশ খানিকটা এগিয়ে দেখাদেখির ডেট ফিক্সড করলো। তখন আমার খুশি স্কয়ার টু দা পাওয়ার ইনফিনি পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো। একে তো পড়ালেখা নেই তার উপর খালার বিয়ে। ছোট মনে খুশির জোয়ার বয়ে যাচ্ছিলো।

যেদিন পাত্রপক্ষ মানে আন্টি উনার মা বাবা আর ভাইকে নিয়ে খালাকে দেখতে আসে। সেদিন আমিও দুই ঝুটি বেধে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক দিয়ে খালার সাথে সাজার পাল্লা দিয়েছিলাম। কেবল মাথায় একটা ঘোমটার কমতি ছিলো। সেদিন যদি মাথায় ঘোমটা দিতাম উড়নার নিচে দুটো শিং বেশ উচু হয়ে থাকতো। কথাটা ভাবলেই ভীষণ হাসি পায়। আমি মায়ের সাথে টুকটুক করে হেটে বসার ঘরে গিয়ে তিনশত ষাট বোল্টের শক খেয়ে এক চিৎকারে সবার কান ফাটার অবস্থা করে দিয়েছিলাম। কারণ আমার মাথায় তখন একটা কথাই আসছিলো যে ‘ছেলেধরাটা আমার বাসার ড্রয়িং রুমে কিভাবে আয়েশ করে বসে শরবতের গ্লাসে চুমুক দিতে পারে!’

আমার চিৎকারে মা বাবা ভীষণ রকমের ভয় পেয়ে যায়। বাবা আমাকে তাড়াতাড়ি কোলে নিয়ে বার বার জিজ্ঞাসা করতে থাকেন আমার ভয় পাওয়ার কি কারণ। কান্নার কারণে আমি কিছুই বলতে পারছিলাম না। কোনোমতে তুতলিয়ে ছেলেটার দিকে আঙুল তাক করে বলেছিলাম ‘ছেলেধরা’। এইটুকুতেই আমার বুদ্ধিমান বাবার মাথায় আমার সেদিনের সেই ছেলেধরার কাহিনীর বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। আর কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আমার মায়ের উপর। উনার দৃষ্টি সেদিন একথাই বুঝাচ্ছিলো, ‘বলেছিলাম বাচ্চা মেয়েটা আমার ভুল বুঝেছে, তাই বলে তুমিও বাচ্চা হলে?’

ব্যাস সেদিনের পর আমার মাথায় তুফান আয়লা সিদর সব একসাথে পরে। এর পরের দিনই ছিলো আমার ম্যাথ এক্সাম। যেখানে আমাকে পড়াতে বসাতে বাবার পকেট খালি করতে হত সেখানে এত দিন পড়াশুনার বাইরে থেকে পরীক্ষা দেয়ার ফলাফল হলো শূণ্য। জি হ্যা বাকি পরীক্ষায় কোনো ভাবে টেনে টুনে পাশ করলেও আমার ম্যাথ পরীক্ষার খাতার উপর বড় বড় করে লেখা থাকে শূণ্য।
সেদিন ইচ্ছে হচ্ছিলো ঐ ছেলেটার মাথার সব কয়টা চুল ছিড়ে প্রতিশোধ নেই। তার জন্যই আমাকে স্কুলে যেতে হয়েছিলো।

খালার বিয়েটা ঘরোয়া ভাবেই হয়ে যায়। ছেলে ব্যাবসায়ী। ভালো ইনকাম হওয়ায় আমার নানীও আপত্তি করেন নি। তাছাড়া নানা না থাকায় বাবার উপরই উনি সমস্ত দায়িত্ব ছেড়ে দেন। খালার বিয়ের উপর আন্টিদের সাথে মায়ের সখ্যতা আরো বেড়ে যায়। মা সামান্য পুটি মাছের ঝোল রান্না করলেও আন্টিকে ছাড়া খেতেন না। এমন গলায় গলায় ভাব ছিলো। একদিন মা আমার হাতে পায়েশ দিয়ে বলেছিলো আন্টির বাসায় দিয়ে আসতে।
আমিও টুকটুক করে বেনি নাড়িয়ে নাড়িয়ে হেলে দুলে হেটে গিয়ে উনাদের দরজার সামনে দাড়িয়েছিলাম। কিন্তু বিপত্তি বাধলো তখন যখন কলিংবেলের নাগাল আমার মত পিচ্চি একটা মেয়ে কিছুতেই পাচ্ছিলো না। সেই মুহুর্তে মায়ের উপর আমার রাগ হয়েছিলো ভীষণ রাগ। আর আমার রাগের বহিঃপ্রকাশই হলো কান্না। ফলস্বরূপ পায়েশের বাটি হাটে নিয়েই নাক টানতে শুরু করেছিলাম। আমার কান্নার শব্দ এতটাই প্রখর ছিলো যে ছেলেটার কান অবদি হয়তো পৌছে গিয়েছিলো। আর তাইতো বিনা কলিংবেল বাজিয়েই কপট খুলে গিয়েছিলো। আন্টি আমাকে দেখেই তাড়াতাড়ি পায়েশে বাটিটা ছেলের হাতে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাতিগ্রস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন আমার কান্নার কারণ। কি জানি আমার বাচ্চা মনে কি উকি দিয়েছিলো। ছেলেটার পানে তাকিয়ে ভীষণ লজ্জা বোধ করছিলাম। যার ফলস্বরূপ কান্না থামিয়ে দৌড়ে বাসায় চলে এসেছিলাম। আন্টি পেছন থেকে অনেকবার ডাকলেও সেদিকে কান দিলাম না।

এরপর থেকে মা হাজার বার বললেও ভুলেও আন্টির বাসায় পা দিতাম না। এতটুকুর বাচ্চার এতখানি লজ্জা কিভাবে এসেছিলো তা ভাবতেই অবাক লাগে। আবার ভীষণ হাসিও পায়।

একদিন আন্টি একগাদা চকলেট হাতে করে এনে আমায় দিয়ে বলেছিলেন,
‘দেখো সিয়া তুমার জন্য আন্টি কতগুলা চকলেট নিয়ে এসেছি’
আমার বাচ্চা মন সেদিন আন্টির প্রতি এত খুশি হয়েছিলো যা বলার বাহিরে।

আন্টি বেশ দুঃখের সাথে মাকে বলছিলেন, ‘আমার কত সখ ভাবী বাচ্চাদের এটা সেটা রান্না করে খাওয়ানোর। আর বাচ্চারা তো মিষ্টি জাতীয় খাবারই পছন্দ করে তাই না! অথচ আমার শুদ্ধটাকে দেখুন! মিষ্টি কিছু দিলে তার মনে হয় যেন বিষ দিয়েছি। মুখেই তুলে না’

বেচারা আন্টির জন্য সেদিন আমার মন ভীষণ খারাপ হয়েছিলো। তাইতো আমি মাথা কাত করে ফোকলা দাতে আন্টিকে বলেছিলাম, ‘সব মিষ্টি আমায় দিয়ে দিও আন্টি!’

আন্টিও একটু গদগদ একটা ভাব এনে আমার গালে লালামিশ্রিত একটা চুমু দিয়েছিলেন। সেদিনের পর থেকে আমি আন্টির থেকে হাজার খানেক দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম। এই চুমু জাতীয় জিনিশটাই আমার কাছে ভীষণ রকমের বাজে মনে হয়। ছিঃ থুথু লাগিয়ে দেয়!

এভাবেই বছর যেতে লাগলো। এর মাঝে খালাও প্রেগন্যান্ট। এই সময়টাতে মা খালাকে আমাদের বাসায়ই এনে রাখতেন। খালার হাসব্যান্ড মানে আংকেল খালাকে চোখে হারাতো আর তাইতো উনিও দুদিন পর পর আসতেন। আর উনি আসলেই খালাকে নিয়ে উনার বোনের বাসায় চলে যেতেন মানে আমাদের পাশের বাসায়। আন্টিদের বাসায়।

একদিন বাবা আমাকে স্কুল থেকে বাসায় ড্রপ করে অফিসে ব্যাক করছিলেন। আর আন্টি উপর তলার বারান্দা থেকে চিৎকার করে বলছিলেম, ‘এই শুদ্ধ চিনি কিন্তু ২কেজি আনিস, কিপ্টামি করিস না বাপ। তোর চায়ে আর কখনো চিনি দিব না’

কথাটা শুনে আমার ভীষন রকমের হাসি পেয়েছিলো। কোনো রকমে হাসিটা চেপে রেখে বাসায় এসে ডোর বেল বাজালাম। মায়ের আগেই দরজা খোলার আওয়াজে পেছনে ঘুরে দেখি আন্টি দরজা খোলে আমার দিয়ে তাকিয়ে বললেন….

চলবে কি?

প্রেমের_ভেলা
পর্ব ১
লেখায়- Anjum Tuli
.
.
[অনেকদিন পর লিখতে বসেছি, লিখতে মন চাইলো খুব। সো ভুল ত্রুটি মাফ করবেন।ভালোবাসা]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here