প্রেমের_ভেলা পর্ব ২

0
4347

প্রেমের_ভেলা
পর্ব ২
লেখায়- #Anjum_Tuli
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
.
.
মায়ের আগেই দরজা খোলার আওয়াজে পেছনে ঘুরে দেখি আন্টি দরজা খোলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘সিয়া দেখো ত মা কেমন হয়েছে’

উনার হাতে ছিলো একটি বাটি। কিন্তু অরেঞ্জ কালারের এটা কি তা আমার ছোট্ট মাথা ধরতে পারছিলো না। আমাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আন্টি আবারো বললেন, ‘গাজরের হালুয়া বানিয়েছি মা, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে চিনি কম হয়েছে। একটু খেয়ে বলত। শুদ্ধটা ত মিষ্টি জিনিস খায়ই না এর মাঝে গাজর তার দু-চোক্ষের বিষ।’
আন্টির কন্ঠে একরাশ দুঃখের বহিঃপ্রকাশ।

আমার বাচ্চা মন সেদিন বুঝতে পারে নি আমার ডাইরেক্ট বলা ‘না’ শব্দটি আন্টির হৃদয় ব্যাথিত করে দেবে। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেদিন ছেলেধরাটার সাথে আমার এই জিনিশটা মিলে যায়। মা হাজার চেষ্টা করেও আমাকে কখনো গাজর খাওয়াতে পারে নি। সেখানে আন্টির কথায় খাওয়ার তো কোনো প্রশ্নই আসে না।

আমার না শুনে আন্টি মুখটাকে পান্সে করে উলটো ঘুরে চলে যান। আমাকে কিছু বলার মত উনার ডিকশনারিতে হয়তোবা কোনো শব্দ অবশিষ্ট ছিলো না!

দেখতে দেখতে খালার ডেলিভারীর ডেইট এগিয়ে এলো। প্রচন্ড ব্যাথায় যখন খালা ছটফট করছিলো বাসায় তখন খালার সাথে কেবল আমিই ছিলাম। কি করবো না করবো এই ব্যাপারে যখন আমি দিশেহারা ঠিক সেই মূহুর্তে মাথায় একটা কথাই এসেছিলো ‘শুদ্ধ’। কারণ মা আন্টিকে নিয়েই বেড়িয়েছিলেন। আর উনার ফোনও বার বার আনরিচেবল আসছিলো। খালার অবস্থা আস্তে আস্তে এতটাই খারাপ হচ্ছিলো যে উনি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। সেই মুহুর্তে আমার বাচ্চা মনে হানা দেয় ভয়। কাপা কাপা হাতে সদর দরজা খুলে জোড়ে জোড়ে ডাক দিতে থাকলাম, ‘শুদ্ধ ভাইয়া শুদ্ধ ভাইয়া’ কিন্তু না হয়তোবা বাসায় কেউ নেই। আর নাহলে দরজা কেনো খুলছে না!

যেই না ঘুরে বাসায় ফিরে আসবো অমনি পেছন থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘আরে সিয়া, ডাকছিলে কেনো’

প্রথমবারের মত সেদিন শুদ্ধ ভাইয়াকে আমি যেমম ডেকেছিলাম। ঠিক তেমনি শুদ্ধ ভাইয়ার মুখেও প্রথম বারের মতই আমার নামটা শুনেছিলাম। মস্তিষ্ক অত কিছু না ভেবেই কেবল কাপা ঠোঁটে বলেছিলাম, ‘খালার যেন কি হয়ে গেছে’

আমার কথা শুনে শুদ্ধ ভাইয়ার কপাল কুচকে গেলো। তা চিন্তায় না কি আমার কথার মর্মার্থ ধরতে ব্যার্থ সেজন্য তা আমি বুঝতে অক্ষম ছিলাম। মাথা নিচু করে যখন চোখের পানি মুছতে ব্যাস্থ তখন শুদ্ধ ভাইয়া আংকেলকে নিয়ে দ্রুত আমাদের বাসায় ঢুকে গেলো।

চোখের পলকে যেনো সবকিছু হয়ে গিয়েছিলো সেদিন। শুদ্ধ ভাইয়া আর আংকেল বাসায় ঢুকেই দিকবেদিক না দেখে আন্টিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন। আমি কেবল দেখছিলাম। যাবার আগে শুদ্ধ ভাইয়া আমার ডান হাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, ‘চলো সিয়া’

আহ সেই স্পর্শ। হ্যাঁ আমার প্রেমিক পুরুষের প্রথম স্পর্শ আমিত সেদিনই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম।হালকা কাপন ধরাতে পারে নি আমার হৃদয়ে সেদিন যা এখন উনার কথা ভাবলেই হয়।

তবে হাসপাতালে পৌছুলেও লাভের লাভ কিছুই হয় নি। খালার অবস্থার কেবল অবনতিই হচ্ছিলো। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সেদিন খালা বেচে গেলেও বাচ্চাটাকে বাচানো যায় নি। সবাই কতকিছু বলাবলি করছিলো তার কিছুই আমার মস্তিষ্কে জায়গা করে নিতে পারে নি। আমার মনে তখনো সেই ভয়টাই গেথে গিয়েছিলো। আমি বার বার কেবল চোখের পানি মুছছিলাম। বাবা এসে মা’কে যা নয় তাই বলে অপমান করা শুরু করলেন। মা’র কিছু বলার ভাষা ছিলো না কেবলি চোখের পানি ফেলা ছাড়া। সবার মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ছিলো তা হলো খালাকে নিয়ে। হলোও ঠিক তাই। খালার জ্ঞান ফেরার পর থেকে কেবল বাচ্চার কথাই জিজ্ঞেস করছিলো। আমি সেদিন দেখেছিলাম দুচোখ ভরে এক প্রেমিক জোগলকে দেখেছিলাম। যেখানে আংকেল আন্টির দুহাত মুঠো করে কিভাবে শান্তনা দিচ্ছিলো। বাচ্চা না আসার ব্যাথা ত নিশ্চই৷ আংকেলকেও দুর্বল করেছিলো কিন্তু না তা তিনি বুঝতে দেয় নি। বুঝতে দেয় নি উনার প্রিয়তমাকে। আংকেলের দিকে তাকিয়ে সবাই চুপ ছিলো। যেখানে সন্তান হারিয়ে বাবা কাউকে দোষারোপ করছেন না। উলটো স্ত্রীর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এ বিরল দৃশ্য দেখে সবার ঠোঁট এটে গেলেও চোখের অশ্রুগুলো বিনা বজ্রপাতে ঝড়ের মত অঝর ধারায় ঝরেছিলো।

এভাবেই দিন কাটতে লাগলো, বছর পেরুতে লাগলো।কিভাবে কিভাবে যেনো আন্টিদের সাথে আমাদের সম্পর্ক এত গভীরে চলে গেলো যে ক্লাস এইটের একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য আন্টি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। শুদ্ধ ভাইয়ারা দু-ভাই। শুদ্ধ ছোট আর মুগ্ধ বড়।
আমার সাথে মুগ্ধ ভাইয়ার বয়সের তফাতটা একটু বেশিই। তবুও জানি না মা’বাবা আন্টির আনা প্রস্তাবটা ফেলতে পারেন নি। আন্টিকে কথা দিয়ে দিলেন মেয়েকে উনি আন্টির ঘরেই পাঠাবেন। বাবা’র মুখেও ছিলো চৌড়া হাসি। ছেলে যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

শুদ্ধ ভাইয়া ইন্টার ফাইনাল দেয়ার পর আন্টি ডিসিশন নিলেন শুদ্ধ ভাইয়াকেও মুগ্ধ ভাইয়ার কাছে পাঠিয়ে দিবেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ঘোর বিরোধিতা করলেন শুদ্ধ ভাইয়া। উনি কিছুতেই উনার মা’কে একা ফেলে যাবেন না। আন্টি আর মুগ্ধ ভাইয়া চালাকি করে শর্ত দিলেন যদি সরকারী ভার্সিটিতে চান্স পায় তবেই শুদ্ধ ভাইয়াকে দেশে থাকতে দিবেন। শুদ্ধ ভাইয়ার জেদের কাছে সবাইকে হারতে হলো। হ্যাঁ শুদ্ধ ভাইয়া ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলেন।

আমার আজও মনে আছে মেডিকেল এডমিশনের আগের দিন রাতে শুদ্ধ ভাইয়া আমার বাবা মা’কে সালাম করতে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘আমি পারবো তো সিয়া?’

কি জানি আমার কি হয়েছিলো সেদিন। আমি গভীর আবেগ মিশিয়ে বলেছিলাম, ‘পারবে ভাইয়া তুমি নিশ্চই পারবে’

জানি না কি কারণে কি বুঝে আমার অবুঝ মন ভাইয়াকে তুমি করে বলেছিলো। সেই মুহুর্তে ঠিক সেই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছিলো শুদ্ধ ভাইয়া আমার ভীষণ আপন ভীষণ।

শুদ্ধ ভাইয়ার ক্লাস শুরু হয়ে গেলো। উনিও পড়াশুনা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। যখনি উনার বাসায় উকি দিতাম মুখের উপর বই নিয়ে বসে থাকতেন। আর বিড়বিড় করে পড়তেন। এক পলক তাকাতেনও না। আমি তো উনাকে একটি বার চোখের দেখা দেখতেই নানা বাহানা দিয়ে যেতাম। সেদিন থেকে আমার মনে হয়েছিলো আমি উপলব্ধি করেছিলাম। আমি প্রেমে পরেছি। এবং ভীষণ বাজে ভাবে পরে গেছি। শুদ্ধ ভাইয়াকে এক পলক দেখার জন্য সারাদিন মন আকুপাকু করতো। কখনো বারান্দা দিয়ে উকি দিয়ে। কখনো সময়ের আগে স্কুলের জন্য বের হয়ে। কিংবা কখনো রাত বিরাতে রান্না ঘরের পাতিল থেকে তরকারী নিয়ে আন্টিদের বাসায় হানা দিতাম। এভাবেই দিন যাচ্ছিলো। শুদ্ধ ভাইয়া আমার দিকে যখনি তাকাতো তার সেই মনকাড়া হাসিতে আমাকে ঘায়েল করে ফেলতো। হাসি দিলে উনার গালে আবার টুলও পরে। ইস! সেই টুল পরা হাসির প্রেমে আমি হাবুডুবু খেয়ে অবস্থা তখন শোচনীয়।

শুদ্ধ ভাইয়া ব্যাগ পত্র গুছিয়ে হোস্টেলে রৌনা দিচ্ছিলো আর আমার মনে এমনকি চেহারায়ও বিষাদের ছায়া হানা দিয়েছিলো। কি কান্নাটাই না করেছিলাম সেদিন। লাজলজ্জার মাথা খেয়ে শুদ্ধ ভাইয়ার রুমে গিয়ে উনাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। ইস! ভাবতেই লজ্জা লাগছে। এভাবে উনাকে জড়িয়ে ধরবো তা হয়তো তিনি কল্পনায়ও কল্পনা করতে পারেন নি হাহাহা। কিন্তু আমি করে দেখিয়েছিলাম। আমি যখন আমার চোখের পানি নাকের পানি দিয়ে শুদ্ধ ভাইয়ার শার্ট ভিজাতে ব্যাস্ত তখন তিনি আমার মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘পাগলি!’

ব্যাস একটা শব্দ! সেই একটা শব্দই আমার মনে টর্নেডো বয়িয়ে দিয়েছিলো। উনার মুখে পরবর্তী আর কোনো শব্দ শুনার মত অবস্থায় আমি ছিলাম না। চোখ বন্ধ করেই দৌড়ে বাসায় চলে এসেছিলাম। উফ! সেই মুহুর্ত। আজও চোখ বন্ধ করলে আমি উপলব্ধি করতে পারি। শুদ্ধ শুদ্ধ শুদ্ধ। আমার শুদ্ধ। আমি ভালোবাসি, আজও ভালোবাসি তাকে। তার অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমি। আমার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উনি কখন আসবেন আর কখন আমার হৃদয়ের মনিকোঠায় ভালোবাসার ফুল ফুটাবেন। এই অপেক্ষার দিন যেনো কেবল বেড়েই চলেছে সাথে সেই চিরপরিচিত বুকের ধুকবুকানি। চোখ বন্ধ করলেই আমি তার টুল পরা গালের মনোমুগ্ধকর হাসিটা দেখতে পাই।

সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে চললেও আমার এস এস সি পরীক্ষার রেসাল্ট দেখে বাবা চরম হতাশ হয়ে পরেছিলেন। এত গুলা প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে মেয়ে কিভাবে ফেল করে তা উনি কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। তাও একটা না তিন তিনটা বিষয়ে। পড়াশুনায় ভালো না বলে বাবা আমাকে সাইন্স পড়তে দেয় নি। কিন্তু আমি বাবাকে কি করে বুঝাই সাইন্স আর্টস না ওসব পড়াশুনাই আমার মাথায় ঢুকে না। এত পড়ে হবে টাই বা কি! সেই তো সংসার করতেই হবে। কিন্তু না আমার বাবার এক কথা উনি মেয়েকে পড়াবেনই। আবার সেই শুদ্ধ! হ্যা বাবা শুদ্ধ ভাইয়াকে অনেক রিকুয়েস্ট করে রাজি করিয়েছিলেন অন্তত সপ্তাহে একদিন যেনো আমাকে একটু দেখিয়ে দেন। আর নয়তো আমি আবারো ফেল করবো।

শুরু হলো যুদ্ধ। শুদ্ধর যুদ্ধ। উনি যখন আমাকে পড়াতেন একবারের জন্যও আমার দিকে তাকাতেন না। মাথা নিচু করে বুঝিয়েই যেতেন। আর আমি! আমি বেহায়া বেশরমের মত উনার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একটা সপ্তাহ পরে উনাকে দুচোখ ভরে দেখতাম। তাও আমার দেখার তৃষ্ণা মিটতো না।

একদিন শুদ্ধ ভাইয়া একটু কেশে বললেন, ‘আমাকে সারাজীবন দেখা যাবে। কিন্তু পরীক্ষায় ফেল করলে তা সম্ভব হবে না।’

আমি মুহুর্তে অবাক বিষ্ময় নিয়ে বেহায়া
হয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম,
‘তাহলে… তাহলে কি আমাকে তুমি বিয়ে করবেনা শুদ্ধ ভাইয়া!’

ভাইয়া আমার কথা শুনে একটুও অবাক হয়নি। একটুও বিষ্মিত নয়নে আমার পানে তাকায় নি। বরং আমাকে অবাকে শীর্ষ পর্যায়ে পদার্পণ করিয়ে হুহা করে হেসে দিয়েছিলেন। জানি না কেনো, তবে আমার ভীষণ রাগ হয়েছিলো শুদ্ধ ভাইয়ার উপর। আর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে আমি দু-সেকেন্ড সময়ও ব্যয় করি নি। আর যা হবার তাই হলো আমার অশ্রু গুলো বিনা বাধায় ঝড়তে থাকলো।

চলবে…

*প্রথম পর্বের লিংক কমেন্টে

[আপনাদের ভালো লাগছে কিনা জানাবেন প্লিজ!]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here