প্রেমের_ভেলা পর্ব ৩

0
4167

প্রেমের_ভেলা
পর্ব ৩
লেখায়- #Anjum_Tuli
.
.
শুদ্ধ ভাইয়া আমার কান্না দেখে ঘারড়ে গেলেন। মোলায়েম কন্ঠে বলেছিলেন,
‘পাগলি! শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছো বুদ্ধিতে না। তুমি হাজার বার ফেল করলেও আমার মা তুমাকে আমাদের বাড়িতেই নিবেন।’

আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলাম শুদ্ধ ভাইয়ার দিকে। আর তার ঠোঁটের কোনে ছিলো মুচকি হাসির রেখা। তার এই কথার মর্মার্থ আমি বুঝতে চেষ্টা করি নি! নাকি বুঝি নি জানি না। তিনি বলেছিলেন আন্টি আমাকে উনাদের বাড়ির বউ করবেন। একবারের জন্যও বলেন নি ‘তুমি শুদ্ধর সিয়া তুমি শুদ্ধরই থাকবে। শুদ্ধর বউ হবে’

এর পরের সপ্তাহেই এক নতুন শিক্ষক নিয়ে হাজির হলেন শুদ্ধ ভাইয়া। এবং বাবাকে রাজি করিয়েও ফেললেন ঐ ভূড়িওয়ালা লোকটাই আমাকে পড়াবেন। পড়ানো বলতে কেবল গাইড করা। শুদ্ধ ভাইয়া যাস্ট পড়া দিয়ে যেত আর ধরতো। মোট কথা আমি কমপ্লিট করি কিনা চ্যাক করার জন্য। বাট এই ভূড়িওয়ালা লোকটা কি আমাকে মারবে! এ নিয়ে যেমন ভয়ে ছিলাম আবার শুদ্ধ ভাইয়া আর আসবেন না তা বুঝতে পেরে ব্যাথিত ছিলাম।হলোও তাই এর পর থেকে শুদ্ধ ভাইয়া আমাকে আর পড়াতে আসেন নি। নিজের প্রতি সেদিন এত রাগ হয়েছিলো। কেনো ভাইয়াকে বলতে গেলাম এসব কেনো!

একদিন আন্টির সাথে বসে গল্প করছিলাম আর শুদ্ধ ভাইয়ার ফোন আসলো। আন্টি হাসি মুখে কথা বলে ফোন রেখে আমাকে বললেন, ‘জানিস সিয়া এখান থেকে চলে গেলে আমার একটুও সময় যাবে না রে। তুই তো আমার মেয়ে। কিভাবে যে তোদের ছাড়া থাকবো!’

আমি আন্টির বলা কথা কিছুতেই বুঝতে সক্ষম হচ্ছিলাম না। তাই বলেছিলাম, ‘মানে!’

আন্টি বিষন্ন মুখে তখন বললেন, ‘ওমা তুই জানিস না সিয়া! শুদ্ধ মেডিকেলের পাশেই নতুন একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে। মুগ্ধটাও তো চলে আসবে আর বেশিদিন কই। এ ফ্ল্যাটে ত হবে না মা। তাই সব কিছু ভেবেই আমরা এই ফ্ল্যাটটা বিক্রি করে দিয়েছি’

আমি কাদু কাদু মুখ নিয়ে বললাম, ‘এত কিছু! এত কিছু করে ফেললে আর আমাকে একবার বলার প্রয়োজনবোধ টুকুও করলে না! আমি এতটাই পর? যাবো না তুমার ছেলের ঐ নতুন বাড়িতে আমি কোনো দিনও যাবো না।’

আমার কথা শুনে আন্টি কেবল একটা মলিন হাসি দিয়েছিলেন।
মা গাইগুই করে ঠেলে আমাকে আন্টির কাছে পাঠালেন ঠিক যেদিন আন্টিরা মালপত্র নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। আমি দরজার কোণায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শুদ্ধ ভাইয়া আমার কাছে এসে বললেন,
‘একি সিয়া এখনো তৈরী হও নি! যাবে না আমাদের সাথে! বাসাটা ঘুরে এলে।’

শুদ্ধ ভাইয়ার পানে তাকিয়ে দেখলাম উনি হেসে হেসেই কথা বলছেন। উনার মনে এত সুখ কেনো তা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। আরে এবারে যে আর দেখাই হবে না এতে কি উনার মনে এক ফোটা দুঃখও উকি দিচ্ছে না নাকি! প্রচন্ড রাগ আর ক্ষোভ নিয়ে আমি শুদ্ধ ভাইয়ার মুখের উপর বলে দিয়েছিলাম,
‘যেদিন বউ করে নিয়ে যাবেন ঠিক সেদিনই আপনার বাড়িতে পা দেব এর আগে নয়’

কথাটা বলে আর একদন্ডও অপেক্ষা করি নি। বড় বড় পা ফেলে রুমে এসে দরজা এটে দিয়েছিলাম। যাবো না ঐ হৃদয়হীন মানুষের কাছে। আর ভাববোও না তার কথা। যার জন্য আমার মনে এক সাগর প্রেম ভালোবাসা। তার ভিতর তো আমার জন্য একটু মায়াও নেই। কেনো নেই! সে কেনো আমায় বুঝে না তা ভাবতেই আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। পরীক্ষার পর ভেবেছিলাম এবারেও ফেল করবো। নাহ ফেল আসে নি। ভাগ্য আমার সাথে ছিলো হয়তোবা! পাশ করে যাই। শুদ্ধ ভাইয়া এমনকি উনার মায়ের সাথেও আমার আর কোনো ধরনের যোগাযোগ থাকে না। মা মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলেন। জানি না শুদ্ধ ভাইয়া কেমন আছেন। বাবা অনেক রিকুয়েস্ট করে একটা কলেজে শেষমেষ আমাকে ভর্তি করাতে সক্ষম হলেন। প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসা করেই দিন পার হচ্ছিলো। ফার্স্ট ইয়ারে পরীক্ষা চলছিলো তখন আমার। কলেজ থেকে ফেরার পথে হুট করেই ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি নামলো। ভীজতে শুরু করলাম। ভালো লাগছিলো। হঠাৎ করে আসা এই বৃষ্টিটা যেনো আমার মনের দুঃখ গুলোকে মুছতে সক্ষম হচ্ছিলো। বাড়ির গলিতে ঢুকতেই সেই চিরচেনা কন্ঠটা শুনতে পেলাম। কেউ তার কন্ঠে হাজার কেজি মধু ঢেলে ডাকছিলো,
‘সিয়া ভিজে যাচ্ছো তো! ছাতার নিচে আসো!’

ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে লোকটাকে আইডেন্টিফাই করার প্রয়োজনবোধ করি নি। এ কন্ঠ তো আমার পরিচিত। আমার আপন। এত আমার কিশোরী বয়সের প্রেমিক পুরুষের কন্ঠস্বর। এখন মধুর সাথে এতে একটু গম্ভীর্যতা সংযুক্ত হয়েছে কেবল। আমি দাড়িয়েই রইলাম। পেছনে তাকাতেও হয়নি। সেই এসে তার ছাতাটা আমার মাথার উপর রাখলো। হাটতে লাগলাম দুজন। ঠিক সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিলো ইস! রাস্তাটা যদি দশ মাইলের হত কতই না ভালো হতো। চাই না সে আবার চলে যাক আবার হারিয়ে যাক। কতদিন ঠিক কতদিন পর তার কন্ঠ শুনতে পেলাম। কতদিন পর একবারের জন্য তার দর্শন পেলাম। আমাকে বাড়ির গেইটে ঢুকিয়ে বলল,
‘আসি সিয়া। ভালো থেকো।’

আমি কাপা কাপা কন্ঠে বলেছিলাম, ‘শুদ্ধ ভাইয়া’

কি জানি কি হয়েছিলো আমার। টুক করে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়েছিলো। শুদ্ধ ভাইয়া আমার কান্নার কারণ হয়তোবা জানত। তাই তো বলেছিলো, ‘আবার দেখা হবে সিয়া। খুব শীঘ্রই দেখা হবে। মন দিয়ে পড়াশুনা করো’

ব্যাস এই টুকুই। তারপর চোখের পলকে চলে গেলো। তবে আজ বুঝতে পারি সেদিন শুদ্ধ ভাইয়া মিথ্যা বলেছিলো। আমাকে অপেক্ষায় রেখে সে হারিয়ে গিয়েছিলো। সে তার কথা রাখেনি। আমাকে আবারো বিষন্নতার শহরে রেখে চলে গিয়েছিলো সে।

আমার এইচএসসি এর রেসাল্ট বের হয়। ৪.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। বাবার খুশি আর দেখে কে! এত ভালো রেসাল্ট করবো তা যেন ভাবনাতীত ছিলো। শেষের দিকে খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করি। আমার পড়াশুনায় এত মনোযোগ দেখে বাবা মা বেশ অবাক হয়েছিলেন। খুশিও হয়েছিলেন বেশ।

আমার রেসাল্টের পর খালা আসেন বাসায়। সাথে আংকেলও। উনাদের দেখলে আমার মনে হয় ইশ! কবে আমি আর শুদ্ধ ভাইয়াও এমন ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হবো! কেবলি মনে হত, ‘আচ্ছা শুদ্ধ ভাইয়াও আমাকে এভাবে আগলে রাখবে তো!’

খালার আর বাচ্চা হয় নি। নিসন্তান জীবনই কাটিয়ে দিচ্ছেন দুজন মিলে। ওদের দেখলে কেউ কখনো বুঝবেই না যে এনিয়ে তাদের কোনো দুঃখ আছে। খালাকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আচ্ছা খালা তুমি আংকেলকে কতটা ভালোবাসো’

খালা আমার কথায় হেসেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘আমি জানিনা আমি তোর আংকেলকে কি দিতে পেরেছি আর কি না! আর কতইটুকুই ভালোবাসতে পেরেছি। কিন্তু আমি জানি আমি বিশ্বাস করি তোর আংকেল আমাকে ঠিক ততখানি ভালোবাসে যতটা ভালোবাসলে কখনো ভালোবাসার কমতি পরবে না।’

কতজন স্ত্রী আত্মবিশ্বাসের সাথে এই কথাটা বলতে পারবে তা আমার জানা নেই। তবে এই দুটো লাইন আমার মনে এক প্রশান্তি বয়ে গিয়েছিলো। খালা সুখে আছে। খুব সুখে। তা উনাকে দেখলেই আমি বুঝতে পারি। আংকেলকে দেখলেই আমার শুদ্ধ ভাইয়ার কথা মনে হয়। যেনো আংকেলের প্রতিচ্ছবি সে।

সেদিনের পর থেকে শুদ্ধ ভাইয়ার প্রতি ভালোবাসাটা যেনো আমার আরো বেড়ে গেলো। তাকে এক পলক দেখার জন্য মন ছটফট করতে লাগলো। কবে অফিসিয়ালি ভাইয়া ডাকটা মুছে যাবে। বাবা আমার রেসাল্টের পর একটা নতুন ফোন গিফট করলেন। তাকে দেখার আশা যেনো ৪০বোল্টের বাতির মত জ্বলজ্বল করে জলতে লাগলো। ফেইসবুক একাউন্ট খুলে সার্চ দিতে সবার প্রথমেই নামটা ভেসে এলো তা হলো, ‘রাফসান আহমেদ শুদ্ধ’

এপ্রোন গায়ে মন কাড়ানো এক প্রোফাইল পিক দেয়া। ইস এই একটা ছবির দিকে তাকিয়েই তো আমি জনম কাটিয়ে দিতে পারবো। আর কিছু না ভেবেই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম।

রাত পেরিয়ে দিন এলো এভাবে কেটে গেলো প্রায় সপ্তাহ খানেক। কিন্তু শুদ্ধ ভাইয়া আমার রিকুয়েস্ট আর এক্সেপ্ট করলেন না। এরই মাঝে একদিন হাজার খুজেও শুদ্ধ ভাইয়ার আইডি পেলাম না। হারিয়ে গেলো শুদ্ধ ভাইয়া। হারিয়ে গেলো আমার ভালোবাসা। আমি উনাকে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিলাম। এটাই কি আমার দোষ ছিলো? হারিয়ে গেলো সে হারিয়ে গেলো আমার থেকে। কিন্তু আমার মনে তার জন্য জমিয়ে রাখা ভালোবাসা হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়ে সাথে এক আকাশ সমান কষ্ট দিয়ে। সেদিন কেদেছিলাম। খুব কেদেছিলাম। এ কষ্ট আমার সহ্য হচ্ছিলো না কিছুতেই। ঠিক সেদিন ঠিক করলাম আমি মুখোমুখি হবো। শুদ্ধ ভাইয়ার মুখোমুখি হবো। আমাকে জানতে হবে কেনো সে আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে কেনো!

পরের দিন মায়ের ফোন থেকে আন্টিকে অনেকগুলা কল দেয়ার পরও আন্টির ফোন কেবল আনরিচেবল আসছিলো। শেষমেষ বাধ্য হয়ে মায়ের থেকে ঠিকানা নিয়ে বেড়িয়ে পরেছিলাম। গন্তব্য শুদ্ধ ভাইদের বাসা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যখন বাসাটা খুজে পেলাম তখন মনে হয়েছিলো এ জীবন সার্থক। খানিকটা আফসোসও হচ্ছিলো এতদিন মায়ের সাথে না আসার জন্য। আগে আসলে হয়তোবা এতটা কষ্ট করতে হত না। গেইটের সামনে যাওয়ার পর দারোয়ান শুদ্ধ নামের কাউকেই চেনেন না জানায়। এমনি এ বিল্ডিংয়ে এই নামের কেউ থাকে না সেটাও বলে। তাদের দুই ভাইয়ের নাম বলার পরও লাভ হলো না। ঠিক সেই সময়টাতে আমার মনে হয়েছিলো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরেছে। দিকবেদিক শূণ্য হয়ে এলোমেলো পায়ে হাটতে লাগলাম। মাথায় কেবল একটা কথাই বাজতে থাকলো,’আমার শুদ্ধ কি আর কখনো আমার হবে না?’

চলবে…

*গত পর্বের লিংক কমেন্টে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here