প্রেমের_ভেলা পর্ব ৪

0
4400

প্রেমের_ভেলা
পর্ব ৪
লেখায় – #Anjum_Tuli
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]

উষ্টামামা আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো কাছে যাবে এটা কল্পনাতীত। তাইতো আমার পায়ের বুড়ি আঙ্গুলটাকে নিশানা বানিয়ে ঝাজড়া করে দিলো। এমনিতেও মনটা বিক্ষিপ্ত এর মাঝে উষ্টা খেয়ে ব্যাথায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো। তাড়াতাড়ি হেটে এক বোতল ঠান্ডা পানি কিনে পায়ে ঢালতে লাগলাম। আর মনে মনে শুদ্ধর গুষ্টি উদ্ধার করলাম। মনে মনে সেদিন বিরাট এক পণ করে ফেললাম। শাস্তি দিব। শুদ্ধ ভাইকে ভালোবাসার দায়ে নিজেকে কষ্ট দিবো। কোনো কিছু না ভেবেই এই পা নিয়ে হাটা ধরলাম। যতদূর পারা যায় হেটে যাবো। প্রখর রোদে তীব্র ব্যাথা নিয়ে হাটতে লাগলাম। গন্তব্য বাসা। বেশ অর্ধেক জায়গা এগুনোর পর পা আর চলছিলো না মুহুর্তেই কোথা থেকে যেনো বাবা এসে উপস্থিত। আমাকে এ অবস্থায় দেখে বাবা ভয় পেয়ে যান। তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠান। এর পরে কি হয়েছিলো তা আমার জানা নেই। কারণ সে মুহুর্তেই জ্ঞান হারাই।

জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে নিজের রুমে আবিষ্কার করি। হাতে ক্যানোলা লাগানো। পা ব্যান্ডেজ। প্রচন্ড দুর্বল। আবারো সেই মায়ের ফ্যাচফ্যাচ কান্না। আমার পাশে বসেই তিনি বিলাপ করছেন। বিরক্ত লাগলেও হেসে দিলাম। হাত বাড়িয়ে মাকে কাছে এনে জড়িয়ে ধরলাম। আর বললাম, ‘কাদছো কেনো মা! এই একটু অসুস্থ হলেই কাদতে হয়?’

মায়ের তো সেই এক কথা, ‘মায়েদের চিন্তা তুই কি বুঝবি’

সেদিন মনে মনে অনেক হেসেছিলাম।ঠিকিত আমি কিভাবে বুঝবো!

এভাবেই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো। সুস্থ হয়ে উঠলাম। মা আমাকে কোনো ভাবেই বাহিরে বের হতে দিচ্ছিলো না। কিন্তু কিভাবে বুঝাই শুদ্ধ ভাইকে খুজে বের করতে আমার বাহির হতেই হবে।

একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে বাবা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন। পরের মাস থেকে ক্লাস শুরু। ভর্তির দিন ভার্সিটি থেকেই বাবাকে বিদেয় করিয়ে দিলাম। মনে মনে ঠিক করলাম আজই শুদ্ধ ভাইয়ের খোজে যাবো। মেডিকেলের সামনে গিয়েই মাথায় বাজ পরলো। আরে শুধু নাম দিয়েই কিভাবে শুদ্ধ ভাইকে খুজবো! উনি কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন অথবা কোন ইয়ার কোনো কিছু সম্পর্কেই তো আমার বিন্ধু মাত্র ধারণা নাই। আঙ্গুলে সাল গণনা করে হিসেব করতে লাগলাম। অংকে কাচা আমি কোনো মতে আবিষ্কার করলাম হয়তোবা তিনি এবার ইন্টার্নি করছেন। ইন্টার্ন ডাক্টারের খুজে পুরা মেডিকেল এরিয়া টার্ণ মারলেও লাভের লাভ কিছুই হলো না। যাকেই জিজ্ঞাসা করি সে ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়েই থাকে। অতি কষ্টে চোখ ফেটে কান্না চলে এসেছিলো সেদিন।

মেডিকেল থেকে বের হয়ে উবার ডেকে বাসায় ফিরে এলাম। সদ্য ছ্যাকা খাওয়া প্রেমিকার ন্যায় বিদ্ধস্ত অবস্থায় বাসায় ফিরে কোনো দিকে না তাকিয়ে রুম লক করে বসে থাকলাম। রাতে মা খাবারের জন্য ডাকলেও নিষেধ করলাম। কাদলাম সারারাত খুব কাদলাম। আমি জানি মা বাবারও সে রাতে ঘুম হয় নি। একমাত্র মেয়ে আমি তাদের। আর আনডাউটলি আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। নিজেকে নিজেই বকা দিলাম। কেনো শুধু শুধু নিজেকে বেকুবের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছি! কেনো নিজের সাথে বাবা মাকেও কষ্ট দিচ্ছি! কেনো! এই কেনোর উত্তর আমি আজও পেলাম না। কারণ আমি আজও শুদ্ধ ভাইয়ের অপেক্ষার প্রহর গুণছি। আমার শুদ্ধ ভাই। আমার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা।

ভার্সিটিতে পুরো দমে ক্লাস শুরু। আমি আবার আগের আমিতে ব্যাক করলাম। পড়াশুনায় কোনো ভাবেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। সব ভাবেই ব্যার্থ। তার ফলাফল প্রথম সেমিস্টারে ফেল। এ রেসাল্টে আমার বিন্দু মাত্র মন খারাপ না হলেও আমার বাবা’র সম্মানে বেশ লেগেছে। আমাকে এই ভার্সিটিতেই আর যেতে দেন নি। এমনকি আমার সাথে কথা বলাও বন্ধ করে দেন। আমার পড়াশুনার ব্যাপারে বাবার ঠিক কতটা আগ্রহ আমি সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। আমি কোনো ভাবেই বাবার সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। কোনো না কোনো ভাবে বাবা আমাকে এভোয়েড করে যাচ্ছিলো। শুদ্ধ ভাইয়ের চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে বাবাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমার বাবা আমার সাথে কথা বলে না। জিনিসটা আমি কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না। কোনো ভাবেই না। মায়ের মনটাও খারাপ থাকতো। বাসাটা যেনো একটা মরা বাড়ির রুপ ধারণ করছিলো। খাবার টেবিলে সবাই যখন নিরবে খাবার গ্রাস করছিলো। সেদিন সকল নিরবতার অবসান ঘটিয়ে আমি বাবাকে বলেছিলাম,
‘বাবা আমি সরি, আর কখনো এমন হবে না। তুমি আমার সাথে কথা বলবে না?’

এই দুটো লাইন বলতেই আমার গলা ভেঙ্গে যাচ্ছিলো। আমি কোনো ভাবেই অশ্রুকে আটকাতে পারি নি সেদিন। জানি না ঠিক কি কারণে আমার বাবার মন আমি গলাতে পারি নি। আমার বাবা আমার কথার প্রেক্ষিতেও কোনো কথা বলে নি। চুপচাপ খেয়ে উঠে গিয়েছিলেন। হুহু করে কেদে দিয়েছিলাম সেদিন। মা দুহাতে আমাকে আগলে নিয়ে শান্তনা দিচ্ছিলেন,

‘তোর বাবাকে আমি দেখে নিবো। কতবড় সাহস আমার মাটাকে কাদায়। তোকে আর পড়তে হবে না মা। এই ঢের। এবারে আমি পুতুলের মত বর দেখে বিয়ে দিবো আমার মাকে।

কথাটা কর্ণপাত হতেই আরো জোরে কেদে দিলাম। আমার পুতুল বরের সন্ধানও যে আমি পাচ্ছি না তা আমি মা’কে কিভাবে বুঝাই!

এর পরেই বাবার সাথে আমার চুক্তি হলো। হ্যা ঠিকি বাবা আমার কোনো রকমের কথাই শুনছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে চিঠি লিখেছিলাম বাবাকে। আর মাধ্যম ছিলো মা। চিঠিটা ছিলো ঠিক এমন,

প্রিয় বাবা,

তোমার গাধী মেয়ে কিভাবে চিঠি লিখে তাও জানে না। আমি জানি এতে আমার বাবা কিছুই মনে করবে না। আমি জানি আমার বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে। আর এটাও জানি আমার সাথে কথা না বলে আমার চেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট পাচ্ছে। তাই আমি এর একটা সলিউশন বের করেছি। কি ভাবছো তুমার গাধী মেয়েটা কিভাবে বুদ্ধিমতি হয়ে গেলো? আসলে বাবা আমি না বুদ্ধিটা মা দিয়েছে। তাই বলে মা’কে বকাবকি করতে পারবে না।

আমি পড়াশুনা করবো বাবা। খুব মন দিয়ে করবো। তুমার ইচ্ছা পূরণ করবো। আমি গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করবো। তবে আমার একটা শর্ত আছে। গ্রাজুয়েশন কমপ্লিটের আগে আমাকে তুমার থেকে দূরে পাঠানোর বিন্দু মাত্র চিন্তাও মাথায় আনতে পারবে না। আমি পড়াশুনায় একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট মনোনিবেশ করতে চাই। আমার এই আর্জি কি আমার প্রিয় বাবা গ্রহণ করবে? যদি গ্রহণ করে তারাতারি এসে আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবে বাবা? আমার না ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

ইতি তুমার অবুঝ মেয়ে
.
.

আমি জানি বাবা আমার চিঠি পড়ে হেসেছে। আর হলোও ঠিক তাই। চোখে পানি ঠোটে হাসি রেখেই বাবা দৌড়ে রুম থেকে বেড়িয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। সেদিনের কান্নাটা ছিলো খুশির। আমি বুঝেছিলাম খুব ভালো ভাবেই যে অবুঝ আমি না অবুঝ তো আমার বাবা মা। কিভাবে আমার কথা মেনে নিলো! একবারো কাঠগড়ার দাঁড়ানো আসামীর ন্যায় জেরা করলো না!

সন্ধ্যা বেলায় বাবার কোলে মাথা রেখে পপকর্ণ খাচ্ছিলাম। আর মাথায় চলছিলো শুদ্ধ ভাইয়ের খোজ পাওয়ার চিন্তা। বাবাকে হুট করেই বলে ফেললাম,
‘আচ্ছা বাবা শুদ্ধ ভাইয়ের সাথে তুমার কথা হয়? কিংবা আন্টি? আমি আর মা কতদিন থেকে আন্টিকে কল দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু আনরিচেবল’

মনটা একটু খারাপ করেই কথাটা বললাম। বাবা আমার কথা শুনে কপাল কুচকে ফেললো। বলল, ‘তাই নাকি!’

বুঝলাম বাবার সাথেও যোগাযোগ নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না তখন।

নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে বেশ কিছু নতুন বন্ধু বান্ধব হলো। ভালোই সময় যাচ্ছিলো। সারাদিন ভালো গেলেও রাতের আধারে কেবল শুদ্ধ ভাইয়ের কথাই মনে হতো।

একদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার সময় রিক্সা উলটে পরে যাই। এতে পায়ে মারাত্মক ব্যাথা পাই। ফ্রেন্ডের সাহায্যে হাসপাতালে যাই। হাসপাতাল থেকে বাবা বাড়িতে নিয়ে আসেন। এক পা খুড়িয়ে বাসায় প্রবেশ করতেই শুরু হয় মায়ের জিজ্ঞাসা আর কান্না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কি সব গুণ বাদ দিয়ে মায়ের কান্নাটাই পেয়েছি?

সেদিন বাসায় ঢুকেই অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলাম যখন দেখলাম আন্টি হাসিমুখে সোফায় বসে আছেন। আমাকে দেখে আন্টি ব্যাতিগ্রস্থ হয়ে উঠে এসে আমাকে ধরে নিয়ে সোফায় বসান। আন্টিকে দেখে অবাকের সাথে সাথে আমি অনেক খুশি হয়েছিলাম। ফাইনালি আমি শুদ্ধ ভাইয়া পর্যন্ত পৌছুতে পারবো এই ভেবে।

আন্টির ফোন অফ কেনো ছিলো আর বাসাই বা কোথায় তা জিজ্ঞেস করবো এর আগেই আন্টি আমার থুতনিতে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘ইস! মুখটা কেমন শুকিয়ে আছে মেয়েটার। আর দূরে দূরে রাখবো না। এবার ঘরের লক্ষী ঘরে নিয়ে যাবো’

আন্টির কথা শুনে আমার ভীষণ লজ্জা লেগেছিলো। মুচকি হেসে মাথা নামিয়ে ফেলেছিলাম লজ্জায়।

আমার লজ্জার বারোটা বাজিয়ে আমাকে অতল সমুদ্রে ডুবিয়ে দিয়েছিলো আন্টি। যখন বলেছিলো, ‘এবারে আমার মুগ্ধর বউ করে নিয়ে যাবো তোকে। সময় এসে গেছে যে’

তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, ‘মুগ্ধ এ মাসের ১৫ তারিখেই ফিরছে। আর শুদ্ধও পরের মাসে চলে যাবে বাইরে হায়ার ডিগ্রির জন্য। তাই এ মাসের ভেতরেই আমি আকদ টা করে রাখতে চাইছি ভাই’

কথাটা শুনে লাজলজ্জা বাদ দিয়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে আন্টির দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার মস্তিষ্ক কাজ করা পুরোদমে বন্ধ করে দিয়েছিলো। সেই ক্লাস এইটের মুগ্ধ ভাইয়ের সাথে বিয়ের ব্যাপারটা যে কতটা সিরিয়াস ছিলো তা তখন বুঝতে পারছিলাম।

বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি বাবাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে অসহায় ভাবে। কি হবে কি হবে এই ভেবেই আমার হাত পা যেনো অবস হয়েগিয়েছিলো…

চলবে…

[গল্পটা কেমন লাগছে বলতে ভুলবেন না, আপনাদের কমেন্টই লেখার আগ্রহ বাড়ায়😊]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here