প্রেমের_ভেলা পর্ব ৭

0
3019

প্রেমের_ভেলা
পর্ব ৭
লেখায়- #Anjum_Tuli
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
.
.
ক্যাচক্যাচ শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। তাকিয়ে দেখি মা জানালার কপট খুলে গেছে। আর সেখানেই দুটো চড়ুই মনের আনন্দে দাঁড়িয়ে প্রেম করছে। এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। আমারই সামনে আমার জানালায় বসে প্রেম করছে সহ্য হলো না দিলাম ধাওয়া। মুক্ত পাখিগুলো ডানা মেলে উড়ে চলে গেলো। কিন্তু একটা আরেকটার পিছু ছাড়লো না। ইস! কত সুন্দর। সবাই আগলে রাখতে জানে কেবল শুদ্ধ ভাই ছাড়া।

শুদ্ধ ভাইদের বাসা পেরিয়ে আমাকে ভার্সিটি যেতে হয়। গাড়ির কাচ সরিয়ে এক দৃষ্টিতে তাদের বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনের কিঞ্চিৎ ইচ্ছা। যদি তাকে দেখতে পাই। বরাবরের মতই হতাস।

মনে মনে পন করে নিলাম দেখা দিবো না তাকে। দিবো না। কিছুতেই না। সে আমার মন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে। কষ্ট দিয়েছে আমায়। ভালোবাসার ভেলায় ভাসিয়ে দিয়ে উড়াল দিয়েছে। বিদেশের হাওয়া গায়ে লাগিয়ে দেশে ফিরছে। তার পছন্দ তো হবে বিলেতি চামড়া আমি নই! নিজে নিজে সমস্ত কিছু ভেবে নিজেই দুঃখ পাচ্ছি। আহ! শুদ্ধ শুদ্ধ শুদ্ধ। মস্তিষ্ক একটুও ক্লান্ত হয়না এই নাম জপতে। আমি ক্লান্ত। অপেক্ষার ভেলা এত কঠিন! তিন বছরে শত সহস্রাধিক স্বপ্ন দেখেছি। কল্পনায় শুদ্ধ ভাইয়ের ছবি একেছি। শুদ্ধ ভাইকে নিয়ে ভালোবাসার অথৈ সাগরে ডুব দিয়েছি। কেবলি কল্পনায়। জানি না আদৌ আমার ভবিষ্যতে শুদ্ধ ভাই আছে কিনা। তবে আমি চাই শুদ্ধ ভাই ফিরুক। দুহাত মুঠো ভরে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিক। এক গাল হেসে বলুক, ‘সিয়া ভালোবাসিত’

সন্ধ্যায় কলিংবেলের বিরক্তিকর আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। ইস! কত সুন্দর স্বপ্নটাই না দেখছিলাম। শুদ্ধ ভাই হাটু মুড়ে বসে আমাকে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ দিয়ে ভালোবাসি বলছেন। সবকিছুতে পানি ঢেলে দিলো।

কানে বালিশ চাপা দিয়ে কিছুক্ষন ঝিম মেরে শুয়ে থাকলাম। নাহ! অনবরত বেজেই যাচ্ছে। আশ্চর্য মা কি শুনতে পাচ্ছে না নাকি! টিয়া টাই বা কোথায় গেলো? অহহো টিয়া হলো আমাদের হ্যাল্প হ্যান্ড। ওর মা আমাদের বাসায় কাজ করতো। গত বছর টিয়ার মা মারা যাওয়ার পর থেকে মা ওকে আমাদের এখানেই পার্মানেন্টলি নিয়ে আসেন।

শুদ্ধ ভাইয়ের দেখা না পেয়ে বিরহ মন নিয়ে ভার্সিটি যাওয়ার ইচ্ছে আর হলো না। তাই তখনি গাড়ি ব্যাক করে বাসায় এসে ঘুম দিয়েছিলাম। ঠিক কতটুক সময় ঘুমিয়েছি তা ঘড়ির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম। এখন বাজে সন্ধ্যা সাতটা বেজে বিয়াল্লিস। নাকে পোলাওয়ের সুমধুর ঘ্রাণ লাগলো। আজ কি কোনো বিশেষ দিন? ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না। আমার কার্যকলাপে মা বাবা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন যে এখন আর কিছুতেই কিছুর জবাবদিহিতা করতে হয় না। বাবা কেবল একটা নির্দেশই জারি করে রেখেছেন। গাড়ি ছাড়া বের হওয়া যাবে না। আমার জন্যও এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা ঘুরা মাস্তি ওসব ব্যাপার মোটেও আমার সাথে যায় না। কেউ কেউ তো বলেই তুই না বড্ড সেকেলে। তখন ভীষণ হাসি পায়। আমার সমস্ত কিছু জোরেই তো আমার শুদ্ধ ভাই। তাকে পেলেই আমার ঢের আর কিছুর প্রয়োজন নেই। কিচ্ছুর না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে গেলাম। কেউ দরজা খুলছে না কেনো?

বিরক্ত হয়ে ব্রু কুচকে দরজা খুলেই ৪৪০বোল্টের শক খেলাম। এ আমি কি দেখছি? কাকে দেখছি! সেই মন কাড়ানো হাসি। আমার কল্পনার থেকেই অনেক বেশি সুন্দর কেউ! এ কি করে সম্ভব। আমি আবারো কল্পনায় বসবাস করছি নাতো? আমি কি জেগে আছি? নাকি ঘুমেরা আমার পিছু এখন অব্দিও ছাড়ে নি! মাথাটা কেমন হ্যাং মেরে গেলো। ওমা হাতে আবার এক গুচ্ছ গোলাপ। এবারে আমি নিশ্চিত আমি এখনো ঘুমের মধ্যেই আছি। ধরাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। বুকের মধ্যে যেনো এই মুহুর্তে কেউ হাতুরি পেটা করছে। আমার হাত অনবরত কাপছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। বসে গেলাম। টিয়া দৌড়ে এসে বলল, ‘ এ কি আফা দরজা ভিড়াই(লাগিয়ে) দিলেন কে!’

আমি টিয়াকে ভালো করে দেখলাম। তারপর হাতে একটা জোড়ে কামড় দিলাম। টিয়া গলা ফাটানো চিৎকার দিয়ে মাকে ডাকতে লাগলো, ‘ও খালাম্মা গো আফারে জিনে ধরছে গো!’

মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। হাতে খুন্তি। ব্যাতিগ্রস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হয়েছে’

টিয়া এক দমে বলে দিলো, ‘আফারে জিনে আছড় করছে গো খালাম্মা। দেখেন কেমনে তাকায় আছে। আবার আমার হাতে কামড়ও মারছে’ এই বলে তার হাত দেখাতে লাগলো। মায়ের কপালে চিন্তার ভাজ পরলো। মা ভয়ে ভয়ে আমার কাছে এসে আমার কপাল ছুলেন। মায়ের হাতেও কামড় দিয়ে পরীক্ষা করলাম আসলেই আমি বাস্তবে আছি কিনা! হ্যাঁ মাও চিৎকার দিলেন। আমি কনফার্ম হলাম যে আমি বাস্তবেই আছি।

এরই মাঝে আবারো কলিংবেল বেজে উঠলো। মা টিয়াকে বললেন আমাকে রুমে নিয়ে যেতে। টিয়া ভয়ে আমাকে স্পর্শ করলো না। আমি দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আচ্ছা আমার হ্যালোসিলেশন হয়নি তো!

মা দরজা খুলেই হাসি মুখে আন্টির সাথে কথা বললেন। ভেতরে আসতে বললেন। কড়া চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি উঠে চলে যাওয়ার জন্য ইশারা করলেন নাকি! কিন্তু না আমি উঠে যাওয়ার মত শক্তি পেলাম না। কি জানি কি হয়ে গেলো। আন্টির পেছনে মুগ্ধ ভাই ঢুকলেন তারপর ভাবী। তারপর একটা মেয়ে। খুব মডার্ন। কে জেনো? হ্যা মনে পরেছে এই তো সেদিনের মেয়েটা যে মেয়েটার সাথে শুদ্ধ ভাইয়ের… গলা শুকিয়ে এলো। মেয়েটার পিছু পিছু শুদ্ধ ভাই ঢুকলেন। মুখটা গম্ভীর। এবারে আমি আর বসে থাকতেও পারলাম না। মাথাটা ঘুরে এলো। আর যা হবার তাই হলো আমি জ্ঞান হারালাম।

চোখ পিটপিট করে তাকিয়েই সোজা শুদ্ধ ভাইয়ের দিকে চোখ পরলো। কপাল কুচকে চিন্তিত মুখ নিয়ে বসে আছেন। আমাকে চোখ মেলে তাকাতেই তিনি ঠোটের কোণে মন কাড়া হাসি দিলেন। বললেন, ‘মাই গড সিয়া। ঠিক তেত্রিশ মিনিট তুমার সেন্স ছিলো না। তুমি তো সাংঘাতিক উইক। খাওয়া দাওয়া করো না নাকি?’

ব্রু উচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। কথাটা ভালো লাগলো না। মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। খেয়াল করলাম শুদ্ধ ভাই এক দৃষ্টিতে আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। আশ্চর্য এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? ওমা আবার আমার বেডেও বসে আছেন। তাও এক পা তুলে! কত বড় বেয়াদব! এতদিন পর এসে এখন ঢং দেখানো হচ্ছে তাই না! ঢং ছাড়িয়ে দিবো বজ্জাত ছেলে। আমাকে জালানোর প্রতিশোধ গুণে গুণে তুলবো।

বাবা এসে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘খাওয়া দাওয়া না করলে হবে? এমন কেউ করে। এসে যে ঘুম দিয়েছিস আর উঠার নামই নাই। ভাবীরা আসবেন কথাটাও বলতে পারি নি। ‘
তারপর একটু দম নিয়ে শুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাও বাবা তুমার আন্টি খাবারের ব্যাবস্থা করেছেন একটু নাস্তা করো!’

শুদ্ধ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আচ্ছা’

শুদ্ধ ভাই উঠে চলে গেলেন। মা এসে জুস দিলেন আর বলে গেলেন ড্রেস চ্যাঞ্জ করে ফ্রেশ হতে। চটপট উঠে গেলাম। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই লজ্জা পেলাম, ছি! শুদ্ধ ভাই আমাকে এভাবে দেখে নিয়েছে? জামা কুচকে আছে। চোখে মুখে ক্লান্টি। চুল এলোমেলো। দেখা দিলাম তো দিলাম এভাবে? হাত পা ছড়িয়ে কাদতে ইচ্ছা হলো। ছিহ!

একটা লাল কুর্তি পরে চুল আচড়ে ডাইনিংয়ে গেলাম। শুদ্ধ ভাই খেয়ে উঠে গেছে। ভাবী বসে আছেন। সাথে দিশা। দিশার খাওয়া হয়ে গেলে, সেও উঠে শুদ্ধ ভাইয়ের কাছে গিয়ে বসলেন। বসার ঘরে। রাগে আমার গা রি রি করে উঠলেও একটুও রা করলাম না। আড়চোখে দেখতে লাগলাম ওদের। ওমা শুদ্ধ ভাই কি যেনো বলছেন আর দুজনেই মিটিমিটি হাসছেন। এই মুহুর্তে আমার সামনের পাস্তার বাটিটাকে খন্ড বিখন্ড করে দিতে মনে চাইলো।

কোনো মতে গিলে উঠতে গেলেই ত্রয়ী ভাবী বলে উঠলেন, ‘দিশা মেয়েটা বেশ ভালো। আজকালকার মেয়ে হয়েও কতটা মার্জিত’

কথাটা আমি হজম করতে পারলাম না। আশ্চর্য আমি কি মার্জিত না? ঐ দিশার মত এত আল্ট্রা মর্ডান ড্রেসও পরি না। এদের চোখে কি আমি পরি না? ভাবীর গাত্র জালানি হাসি দেখে আমার ভীষন রাগ হতে লাগলো। কোন জনমের শত্রুতা উনার সাথে আমার? এভাবে প্রতিশোধ নিচ্ছেন। গুটিগুটি পায়ে হেটে শুদ্ধ ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাড়ালাম।

সামান্য কেমন আছেনটাও উনাকে জিজ্ঞাসা করতেও পারলাম না। কথাগুলো গলায় এসে দলাপাকা হয়ে গেলো। আমাকে কিছুই বলতে হলো না। শুদ্ধ ভাইই জিজ্ঞেস করলো, ‘কেমন আছো সিয়া?’

আমি কিছু বলবো এর আগেই আবারো বললেন, ‘মিট দিশা, মাই ফিয়ন্সে’

বার বার কেনো শুদ্ধ ভাই এভাবে আমাকে আঘাত করে! কেনো? আমি কি মানুষ হিসেবে খুব খারাপ? আমার মনের সুপ্ত অনুভূতি কি শুদ্ধ ভাই ধরতে পারেন না? কিসের ডাক্তারি পড়েছেন উনি! অহ আমি তো গাধী। পড়ালেখায়ও ডিম। উনার হয়তো ডাক্তারি বউই পছন্দ। বুকের ভেতরে ক্রমান্বয়ে জ্বালা বাড়তে লাগলো। সেই সাথে সদ্য টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত মন বলতে লাগলো, ‘আর কত বেহায়া হবি সিয়া আর কত? তোর বেহায়া মনের ভালোবাসা তোর মতই ইউসলেস কারো জন্য হওয়া উচিত। শুদ্ধর মত কারো সংগে নয়।’

নিজেকে সংযত করে কোনো মতে বললাম, ‘কংগ্রেচুয়েলেশন’

আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। চলে এলাম। আমাকে ক্রস করে বাবা ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন। সাথে সাথে কানে বেজে এলো এক অকল্পনীয় বাক্য! এ আমি কি শুনলাম। কান্না গুলো শব্দ আকারে বহিঃপ্রকাশ ঘটালো। আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না। হাটুমুড়ে বসে মুখে হাত দিয়ে হুহু করে কেদে দিলাম।

চলবে….

[মন্তব্য করতে ভুলবেন না]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here