অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤পর্ব_১১

অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤পর্ব_১১
#কায়ানাত_আফরিন

ঘুম থেকে উঠার পরপরই আফরা অনুভব করলো আজ রুমটা প্রচন্ড ঠান্ডা। জানালা দিয়ে বাতাস বয়ে আসছে হু হু করে। আকাশটাও খানিকটা মেঘলা। আফরা তড়িঘড়ি করে ঘুম থেকে ওঠে পূব দিকের বারান্দায় গেলো। ঘড়ির কাটা তখন সাতটা ছুই ছুই। কিন্তু মেঘের আড়ালো রৌদ্র যেন হারিয়ে গিয়েছে। পুব আকাশটা ভারী অন্ধকার। হয়তো ভারতের সীমান্তে ঝমঝম করে বৃষ্টি চলছে। আফরা বুদ হয়ে রইলো বাড়িটার পেছনে গভীর ঢালটির দিকে। ওই ঢালে স্পষ্ট কাউকে দেখা যাচ্ছে। আৎকে উঠলো আফরা। এই সকাল সকাল ওখানে আবার কে?অল্পক্ষণ পরই সেই মানুষটার চেহারা দেখে মৃদু অবাক হলো সে। ফারহান আছে ওই ঢালটিতে। হাতে কোদাল। পরনে সাদা হাফ হাতা টিশার্ট, কোমড়ের কাছে বেধেঁ রেখেছে নীল চেক শার্ট। এমন ভয়ঙ্কর পথে ফারহান কি করছে? ছেলেটার কি নিজের জানের ভয় নেই?আফরা একবার ভাবলো ডাক দিবে পরক্ষনেই মত পাল্টে নিলো। এখান থেকে কথাবার্তা না বলে সরাসরি কথা বলাটাই ভালো হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। আফরা তাই অল্প মুহূর্তেই ব্যবধানেই দাঁত ব্রাশ করে নিচে চলে গেলো।
ঘরের ভেতরে যেই ঠান্ডাটা না লাগছিলো বাইরে সেই ঠান্ডাটা আরও ব্যাপক লাগছে আফরার। ভেজা স্যাঁস্যাতে মাটিতে পা রাখতেই সে অনুভব করলো চা পাতার কড়ালো ঘ্রাণ। ছোট ছোট টিলার ওপর কার্পেটের ন্যায় আচ্ছাদিত চা পাতা চমৎকার লাগছে। আফরা দ্রুতপায়ে ঢালের দিকে গেলো। ইলা ওকে এখানে আসতে নিষেধ করলেও সেসব কোনো পরোয়া করলো না। ফারহানকে দেখতে পেয়ে চেচিয়ে বলে ওঠলো,

-ও হ্যালো মিঃ কমরেড!

স্নিগ্ধ প্রভাতের এই প্রহরে মেয়ের মিষ্টি কন্ঠে ‘মিঃ কমরেড’ নাম শুনে চমকে উঠলো ফারহান। শব্দের উৎস খোঁজার জন্য কোদাল ছেড়ে মাথা উচু করতেই দেখলো ঢালের একেবারে ওপর প্রান্তে আফরা দাঁড়িয়ে। ভ্রু জোড়া বাকিয়ে ফেললো ফারহান। এই মেয়ের হঠাৎ এখানে আসতে ওর স্নায়ু যেন কাজ করছে না। আফরাকে তাই সে প্রশ্ন করলো,

-‘আপনি? এত সকালে এখানে কি করছেন?’

ফারহান কল্পনাও করতে পারবে না যেই আফরা নামের এই মেয়েটা ওর গম্ভীর মুখে ‘আপনি’ সম্বোধনটা শুনলে ঠিক কতটা উৎফুল্ল হয়। কেন হয়, তা আফরার নিজেও অজানা। মেয়েটা শুধু এতটুকুই জানে যে ফারহানের আকর্ষণীয় কন্ঠনালি দিয়ে যখন ‘আপনি’ শব্দটা আফরার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আসে সেটা অনেক মনোমুগ্ধকর।ফারহান এখনও তাকিয়ে আছে আফরার দিকে উত্তরের আশায়। কিন্ত আফরা নির্বিকার। ফারহান ভাবলো এই ভয়ঙ্কর ঢালে দাঁড়িয়ে মেয়েটার সাথে কথোপোকথন চালানো বিপদজনক। পা ফসকে নিচে পড়লে জান যাওয়ার সম্ভাবনা তো আছেই আর যদি বর্ডারের কাছে ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীরা ওকে দেখে ফেলে সাথে সাথেই শ্যুট করে খাল্লাস!তাই ওপরে উঠে এলো ফারহান।

আফরা এবার জিজ্ঞেস করলো,

-ওখানে কি করছিলেন আপনি?

-আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যে আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবো?

ফারহানের সন্দিহান কন্ঠ। আফরা মুখ ছোট করে ফেললো। তারপর জড়ানো গলায় বললো,

-বারান্দা দিয়ে আপনাকে ওখানে দেখেছিলাম। তাই কৌতুহল দমাতে না পেরে এখানে আপনাকে দেখতে এসে পড়ি।

আফরার কথায় বিব্রত হয়ে গেলো ফারহান। মেয়েটা কত স্বতস্ফূর্তভাবেই না বলে ফেললো ওর মনের কথা যে ফারহানকে দেখার জন্যই সে এখানে এসেছে। ফারহান অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই মেয়েটা অন্যরকম। কথাবার্তায় কোনোরূপ কোনো জড়তা নেই, সবকিছুতেই প্রণোচ্ছলতার ভাব। ফারহান এখনও জানে না আফরার সম্পূর্ণ পরিচয়। আর এই মেয়েটা দুদিনের মধ্যেই ওর সব তথ্য জোগাড় করে ফেলেছে। ফারহান এবার বললো,

-আমার প্রতি আপনার এতই ইন্টেরেস্ট যে আধঘুমেই সাত সকাল এখানে চলে এলেন?

-হুম। তো বলুন ! কি করছিলেন ওখানে?

আফরার সহসা উত্তর শুনে ঠোঁট টিপে হাসলো ফারহান। তারপর বলে ওঠলো,

-বর্ষার মৌসুম তো, তাই পানি নামানোর জন্য নিচে রাস্তা করে দিচ্ছিলাম। নাহলে এখানে পানি জমে গেলে নিচের থেকে জোঁক এসে পড়ে।

-জোঁক?

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আফরা। ফারহান সাথে সাথেই বললো,

-হ্যা জোঁক। শুধু জোকঁ না এখানে অজগর সাপও আসে মাঝে মাঝে। আপনি আসার দু’দিন আগে এই এলাকার লোকরা সীমানাপ্রাচীরের সামনে অজগর মেরে এসেছিলো।

আফরার চোখ মুখ কিছুটা গম্ভীর, এককথায় প্রতিক্রয়াহীন। ফারহান বুঝতে পারলো না যে আফরা আদৌ ভয় পেয়েছে কি-না। তবুও আগ বাড়িয়ে সে বললো,

-তবুও আপনার ভয় পাওয়ার সমস্যা নেই। চাচু আগেই আমায় দিয়ে এখানে কার্বোলিক এসিড ছিটিয়ে দিতে বলেছিলো যাতে সাপ ত্রিসীমানায় আর না আসে। সুতরাং ভয় পাবেন না।

-আপনি নিশ্চিত যে কার্বোলিক এসিড দিলে সাপ আসেনা?

আফরার নির্লিপ্ত প্রশ্ন। কথা আটকে আসলো ফারহানের । তাই জিজ্ঞেস করলো,

-হঠাৎ এ প্রশ্ন করলেন যে?

আফরা ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে মলিন হাসলো। তারপর বলা শুরু করলো,

-এনাকন্ডা মুভি দেখেছিলেন?সেখানে সাপ আসাতে সবাই অনেক কার্বোলিক এসিড ছিটিয়েছিলো কিন্ত কোনো লাভ হয়নি। তাই কার্বোলিক এসিড ছিটালে যে সাপ চলে যায় এটা ভ্রান্ত ধারনা। তবে এটা সত্যি এর স্মেল সাপ বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেনা।

-তা নাহয় হবে।আমরা শ্রীমঙ্গলের মানুষ এ সাপ জোঁকের ব্যাপারে অভ্যস্ত। আপনি না। তবুও টেনশন নেয়ার দরকার নেই। বাড়ির দোতলায় সাপ জোঁক ওঠবে না।

-আর আপনার ক্ষেত্রে?

আফরার কথাটি বুঝতে পারলো না ফারহান । তাই অবাকস্বরে বললো,’মানে?’

-আপনি তো থাকেন ঢালের পাশে ছোট এই কাঠের নিচতলা ঘরে। আপনার যদি কিছু হয়ে যায়?

আফরার তটস্থ কন্ঠ। ফারহান বিস্ময় নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো আফরার দিকে। ঘর্মাক্ত বুকের দ্রিম দ্রিম শব্দটা ক্রমশই অনুভব করতে পারলো সে। এই প্রথম……..২৯ বছর বয়সের এই জীবনে দাদুর পর প্রথম কেউ ওর কথা চিন্তা করলো। তটস্থ কন্ঠে বললো,’যদি কিছু হয়ে যায়?’ ফারহানের কাছে আপন মানুষের ভালোবাসার অভিজ্ঞতা কম। তাই সদ্য কিছুদিন যাবৎ পরিচিত এই ভিনদেশি বাঙালি মেয়ে ছোট একটি কথা দ্বারা ফারহানের মনে কিরূপ প্রভাব ফেলেছে তা দুজনের কাছে যেন এক বিল্ময়। ফারহান মৃদু হেসে বললো,

-আমার আর কি হবে? এট এনি চান্স যদি কিছু হয়েও যায় তাহলে দেখার মতো কেউই নেই। কারন আমি মানুষটাই নিঃস্ব।

ফারহানের কথা শুনে ওর খানিকটা কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো আফরা। সম্মোহনী দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে ফারহানের ক্লান্তিমাখা মুখটার দিকে। ফারহানের চুলগুলো এলোমেলো। হাতে সামান্য মাটি লেগে আছে। নাকের কাছে জমে আসে ঘাম। তবুও মানুষটা কি সুন্দর। ছেলেটার চওড়া বুকের ঘামে ভেজা টিশার্টটা সহসাই কাউকে আকর্ষণ করতে পারবে। আফরা গম্ভীর গলায় বললো,

-কেউ কখনও একা পৃথিবীতে আসে না। ওপরওয়ালা প্রত্যেক মানুষের জন্যই একজন না একজনকে না একজনকে পাঠায়। হয়তো আপনার সেই অজানা কেউ হুট করে এসে আপনার বুকে বাসা বেধেঁ ফেলবে। দূর হয়ে যাবে সেই সব নিঃসঙ্গতা!

আফরা শুধু দেখতেই সুন্দর না……কথাবার্তাও সুন্দর। একটা অন্যরকম টান আছে মেয়েটার মধ্যে। ফারহান আফরার সম্মোহনী কথার প্রতিউত্তরে কিছু বললোনা। তবে নিজের জীবনের এক গোপন বিষয় আবিষ্কার করলো ফারহান। ওর অবচেতন মনের ধারনা ছিলো যে সে হৃদয়হীন মানুষ। অনুভূতি, আবেগ এসব ফারহানের জন্য না। কিন্ত আফরা এসে ওর ধারনাকে ওলট পালট করে দিলো। অজান্তেই মেয়েটার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে ফারহান। অজান্তেই এই প্রথম রাজনীতির বাইরে একটা নতুন জগত আবিষ্কার করেছে।

আফরা হঠাৎ বললো,

-আপনি এমন কেনো?

-কেমন?

-এইযে গম্ভীর ধাঁচের। বেশ কয়েকদিন তো হয়েই গেলো আপনাদের এখানে আমি এসেছি অথচ আপনি আমার সম্পর্কে কিছুই জিঙ্গেস করলেন না। আর না আপনার হন্টেড হাইসে আমায় দাওয়াত দিয়েছেন।

-হন্টেট হাউস?
ফারহানের চোখ-মুখে বিস্ময়। আফরা বিরক্ত হলো ফারহানের মুখে বিস্ময় দেখে। তাই একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে বললো,,,,,,

-নাহলে কি বলবো হ্যাঁ? ভালো করে দেখুন। অনায়াসেই এখানে একটা হলিউড মুভির শুটিং করা যাবে।

-আই সি। তো কি করতে পারি আপনার জন্য মিস আফরা?

ফারহানের বিদ্রুপ কন্ঠ। আফরা মেকি হেসে বললো,

-বেশি কিছু না। জাস্ট আজ রাতে আমায় ডিনারের জন দাওয়াত দিবেন। আর আপনি তো আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আমার মনেও হয়না যে আপনার জানার বিষয়ে কোনো আগ্রহ আছে। তাই ডিনারের সময় আমি নিজ থেকে আমার সম্পর্কে আপনার কাছে সব বলবো।

-সব?

-জ্বি হ্যাঁ।তো সারাদিন মানুষের সেবা করুন মিঃ কমরেড। রাতে কিন্ত এই অতিথির অ্যাপায়ন করতে হবে।

ফারহান ঠোঁট চেপে হাসলো এবার। মাথা দুলিয়ে বললো,’ঠিক আছে।’

শীতল বাতাস। বাতাসের তালে মাথার ওপর ধূসর মেঘের আস্তরণ সাঁ সাঁ করে ছুটে চলতে মগ্ন। এসকল দৃষ্টি নান্দনিক দৃশ্য থেকেও আফরার কাছে অপরূপ লাগলো ফারহানের ঠোঁট চাপা হাসি। উহ ! ডিনার না বলে ব্রেকফাস্ট বললেই মনে হয় ভালো হতো। তাহলে আরও কিছুক্ষণ মানুষটার সৌন্দর্য হয়তো উপভোগ করা যেতো।
.
.
.
#চলবে………ইনশাআল্লাহ

ভুলক্রুটি ক্ষমাসুলভ চোখে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here