অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤ পর্ব_১২

অতঃপর_প্রেমের_গল্প❤
পর্ব_১২
#কায়ানাত_আফরিন
ফারহানের সাথে কথা শেষ করে বাড়িতে প্রবেশ করতেই মিসেস নাবিলার মুখোমুখি হলো আফরা। খানিকটা সন্দিহান চোখে উনি তাকিয়ে আছেন আফরার দিকে। সময়বিলম্ব না করে আফরাকে প্রশ্ন করলেন,

-এত সকালে ওখানে কেনো গিয়েছিলে আফরা?ওই জায়গায় যে যাওয়া নিষেধ , ইলা তোমায় কিছু বলেনি?

ইলা বলেছিলো আফরাকে কথাটি । তবে সে কর্ণপাত করেনি। আফরা তাই বললো,

-আসলে আন্টি………ফারহানকে ওই ঢালের মধ্যে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তাই সেখানে চলে যাই কথা বলতে। এছাড়া আর কিছু না।

-বলো কি? ফারহান তো আমাদের ওর জায়গার ধারপাশেও ঘেষতে দেয় না। আর তোমায় কিছুই বলেনি?,,,,,,,,,স্ট্রেন্জ!

মিসেস নাবিলার তাচ্ছিল্যেভরা কন্ঠ। আফরা থেমে থেমে একটু ভেবে জিজ্ঞেস করলো,

-উনার জায়গার ধারপাশে ঘেষতে দেয়না মানে?এগুলো সম্পূর্ণটা আপনাদের জায়গা না?

-সেটা নাহয় ফারহান থেকেই জিজ্ঞেস করে নিও।

আফরা মৌন থাকলো। মিসেস নাবিলার মনে ক্ষোভ থাকলেও প্রসঙ্গটি এড়িয়ে দিতে চাইলেন। তাই ঠোঁটে মলিন হাসি ফুটিয়ে বললেন,

-এখন নাস্তা করবে…..?

-আসলে , আন্টি…….আমি এই সময়টা একটু বাইরে ঘুরতে যেতে চেয়েছিলাম।নাস্তা করেই যাবো তবে কেউ গাইড দিলে ভালো হতো। ফারহানকে বলবো কি না ভাবছি……..

মিসেস নাবিলার মনে একটি আশার সঞ্চার হলো। তাই উৎফুল্ল হয়ে বলে ওঠলো,

-ফারহান কেনো ,,,আমার ছেলে ফাহিম আছে না?আজ ওর অফ ডে। ব্রেকফাস্ট করে ওর সাথেই নাহয় সারাদিন ঘুরো।

আফরা সম্মতি জানালো । ওর কাছে ঘুরাটাই মুখ্য। ফারহান বা ফাহিম কে আসবে এ নিয়ে ওর মনে কোনো মাথাব্যাথা নেই। তবে মিসেস নাবিলার এ নিয়ে প্রচন্ড সমস্যা আছে। তিনি কিছুতেই ফারহান আর আফরার এত মেলামেশা মেনে নিতে পারছিলেন না।আফরা মেয়েটাকে তিনি মনে মনে পছন্দ করে রেখেছেন ফাহিমের জন্য। একে তো মেয়ে অ্যামেরিকার সিটিজেন। ফাহিমের সাথে বিয়ে হলো ফাহিম আর ইলা দুজনেরই ভবিষ্যত উজ্জল হয়ে যাবে। তবে এসব ভাবনা তিনি একান্তেই মনে পুষে রেখেছেন। তিনি আগে চাইছেন যে ফাহিম আর আফরা একান্তে কিছু সময় কাটাক, তবে বাঁধ সেজেছে ফারহান। এই কিছুদিনে ফারহান আফরার সাথে যেভাবে কথাবার্তা বলছে মিসেস নাবিলার মনে হয়না ফারহান আদৌ কোনো মেয়ের সাথে এতটা সময় কাটিয়েছে। আর যাই হোক , ফারহান সম্পত্তির ভাগ নিয়ে জিতলেও এবার মিসেস নাবিলা আফরার ক্ষেত্রে কোনো হেলফেল করবে না।

——
ব্রেকফাস্ট শেষে আফরা রেডি হয়ে নিয়ে এসে দেখলো ফাহিম সোফায় বসে আছে। আগের মতো ফর্মাল লুক নেই। একটা চেক টিশার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স। গলার কাছে সানগ্লাস ঝুলছে। আফরাকে দেখেই সে হাসি ঝুলিয়ে বললো,

-তো…….রেডি মিস?

-হ্যাঁ।

-চলুন তাহলে। আগে বলুন তো , আপনি কোথায় যেতে চান?

-বিডিতে আমি থাকি নাকি আপনি থাকেন,,,,,,, যে জায়গার না ভালোমতো বলতে পারবো?

ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো আফরা। বিনিময়ে ফাহিম বিদ্রুপ হাসি হাসে। ফর্সা মুখে হাসিটা আবছা ভাবে ফুটে ওঠেছে। আফরা একমনে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অজিন্তেই ফাহিমের চেহারাটি এরিকের সাথে মিলে যায়। পার্থর্ক্য একটাই, এরিকের আই লেন্স ব্লু আর ফাহিমের ব্ল্যাক। ফাহিম আফরাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললো,

-এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?

-আপনার চেহারা আমার ফ্রেন্ড এরিকের মতো।

আফরার কাট কাট উত্তর। ফাহিম চোখ ছোট ছোট করে বললো,

-শুধুই ফ্রেন্ড নাকি বয়ফ্রেন্ড?

-উহু! জাস্ট ফ্রেন্ড।তবে সে আমায় ভালোবাসত। ইভেন এখনও বাসে। তবে আমার মনে ওর প্রতি কোনো ফিলিংস না থাকায় আর এগোয়নি।

ফাহিম মলিন হাসলো। আফরা মেয়েটাই এমন যাকে সহজেই সবাই পছন্দ করতে পারে।

-তো চলুন তাহলে। আজকে একটু দূরে হোটেল সাইটে যাই। সেখানে অনেক সুন্দর সুন্দর ভিউ পয়েন্ট আছে। ঘুরাঘুরি শেষে লাঞ্চও সেড়ে আসতে পারবেন কোনো অ্যামেরিকান রেস্টুরেন্ট থেকে।

আফরার চোখ চকমক করে ওঠলো। এখানে কিছুদিন যাবত বাঙালি খাবার খেয়ে ভালো লাগলেও এগুলোতে সে অতটা অভ্যস্ত না। মুচকি হেসে এবার বললো,

-আচ্ছা তাহলে বের হই।

——–

আকাশে রৌদ্রের ছটাক নেই বললেই চলে। ধীরে ধীরে কালো মেঘগুলো পূর্ব দিকে ঘনীভূত হচ্ছে। কালো রঙের প্রাইভেট কার এগিয়ে চলছে ভিউ পয়েন্টের দিকে।আফরা গাড়ির কাচ নামিয়ে দিলো এবার। গাড়ির হিমশীতল এসির হাওয়া থেকে প্রকৃতির ঠান্ডা বাতাস ওর গায়ের লোম তুলে দিচ্ছে। আহা! এ যেন এক অনাবিল সৌন্দর্য। আফরা পূব দিকে তাকিয়েই ফাহিমের উদ্দেশ্যে বললো,

-সকালেও দেখেছিলাম ওখানে এত মেঘ জমে থাকতে। এখনও সরছে না যে?

-কারন ওই সাইটে ভারতের চেরাপুঞ্জি নামের একটা বিখ্যাত এরিয়া আছে। বলা বাহুল্য সাউথ এশিয়ায় গড়ে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় চেরাপুঞ্জিতে । তারপর হলো শ্রীমঙ্গল।

-সীমান্তবর্তী এলাকায় থাকার এটাই একটা মজা। একাধারে দু দেশের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

ফাহিম মুচকি হেসে গাড়ির গতিপথ পাল্টে নিলো এবার। চা বাগানের ঢাল দিয়ে আকাবাকা পথগুলোর বাকে ভালোলাগছে অনেক।মাঝে মাঝে বিশাল বড় বড় গাছের কয়েকটি বন দেখা যাচ্ছে। আফরা সেই সৌন্দর্যে বুদ হয়ে ফাহিমকে প্রশ্ন করলো,

-ফাহিম এটা কি?

-কাঠবন।

-বাহ! কাঠবন তো বেশ চমৎকার। আচ্ছা, অন্যবন আর কাঠবনের পার্থক্য টা কেমন যেন বুঝলাম না। বিস্তারিত বলেন তো!

ফাহিম ঠোঁট ভিজালে মৃদুভাবে। আফরার দিকে তাকিয়ে ছোট প্রতিউত্তরে বললো.

-কাঠবন তো কাঠবনই । এর থেকে বেশি আর কি ডিসক্রাইবলি বলবো?

মনক্ষুন্ন হলো আফরার। ফাহিমের কাছ থেকে এমন প্রতিউত্তর সে আশা করেনি।আফরা ঠোঁট কামড়ে সিটে মাথা এলিয়ে দিলো। ফাহিম মজার মানুষ হলেও প্রকৃতি আর ভ্রমণপিপাসু বিষয়টা ওর মধ্যে নেই। আফরার একবার মনে পড়লো ফারহানের কথা। ফারহান মানুষটা গুরুগম্ভীর বটে , তবে তার সাথে কথাবার্তায় আফরা এক অনাবিল শান্তি অনুভব করে।

মোবাইলের রিং বাজাতে আফরার ভ্রু কুচকে এলো। স্ক্রিনে ওর মম এর নম্বর ভেসে ওঠছে। আফরা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো এতে। এতদিন পর তাহলে ওর কথা মনে পড়েছে। আফরা কল কেটে মেসেজ করে দিলো,’বাইরে আছি মম! এখন কল দিও না।’

টেক্সটটা সেন্ড করেই আফরা মোবাইল ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলো। মম এর কথা বিন্দুমাত্র ভাবতে চায়না সে।

——
ফারহানের মাথাটা যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে। কপালের রগ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে রইছে।ফারহানের এই অবস্থা দেখে ওর বিশ্বস্ত দুই মানুষ শামসু আর সাব্বির চুপ হয়ে রইলো। শুকনো ঢোক গিলছে বারবার।
কিছুক্ষণ আগে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এক নেতার লোকের সাথে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে ফারহানের। বিষয়টা ছিলো সরকারের টাকাকে কেন্দ্র করে। এবার বৃষ্টিপাতের হার বেশি থাকাতে সমগ্র সিলেটে বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাই প্রত্যেক গ্রামপ্রধান সরকারের কাছে আবেদন করেছে টাকার জন্য যাতে বাঁধ বাধিয়ে পানি নিয়ন্ত্রনে আনতে পারে। সেই টাকা নিয়ে জালিয়াতি করেছে ইউনিয়ন পরিষদের লোকজন। বাজেটের তিনভাগের একভাগ ব্যয় করে বাকি দুইভাগ নিজেরা গ্রাস করে নিয়েছে। ফারহানের কানে এ ব্যাপারে দুটো কথা আসতেই ফারহান প্রতিবাদ করতে গেলো। অতঃপরই শুরু হলো সংঘর্ষ। এক পর্যায়ে ফারহানকে শামসু আর সাবহবির টেনে হিচড়ে নিয়ে আসে। কেননা ফারহানের বিরুদ্ধে অলরেডি স্টুডেন্ট স্ট্রাইকের জন্য চারটা কেস পড়েছে। আরকেটা কেস পড়লে পুলিশ এবার ওকে জেলে ঢুকিয়েই নিস্তার পাবে।তাই ফারহানকে নিয়ে এলো তারা। এবার ফারহান গাড়ির পেছনের সিটে শরীর এলিয়ে বসে আছে। ড্রাইভিং সিটে রয়েছে সাব্বির আর পাশে শামসু।শামসু তটস্থ গলায় বললো,

-ভভ-ভাই আপনি শান্ত হন। ওই বদমাশ নেতাগুলার লেইগা আপনি চেইতা আছে ক্যান? মানুষগো দিয়ে ওগুলারে মাইরা আমি শান্ত হোমু। শালা খবিসের বাচ্চা কোথাকার!

বিরক্ত হলো ফারহান। তাই শান্ত গলায় বললো,

-আমার সামনে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করবে না শামসু।

শামসু নীরব হয়ে গেলো। সাব্বির এবার বললো,

-আচ্ছা ভাই আপনারে ঠান্ডা করবার জন্য এক জায়গায় নিয়া যাই।বিলাতি হোটেল। খাওনের যেই স্বাদ,,,, আঙুল খাইয়া ফেলতে ইচ্ছা করে। আমি আপনারে খাওয়াবো নে।

ফারহান হ্যাঁ না বলার আগেই সাব্বির গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে গেলো সেখানে।

—–
আজ অনেকদিন পর বিফ স্টেক মুখে দিয়েছে আফরা। যদিও স্বাদ একদম নিউ ইয়র্কের সেই বিফ স্টেকটার মতো হয়নি তবে এত মন্দও হয়নি। আরামে খাচ্ছে সে। সামনেই মুখোমুখি বসে আছে ফাহিম। ও অ্যামেরিকান হোয়াইট পাস্তা খাচ্ছে। আশেপাশে অনেক ট্যুরিস্টদের সমাগম। ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্ট না হলেও বেশ জনপ্রিয় আর এদের সার্ভিসও ভালো। আফরা এক বাইট নিয়ে ফাহিমকে বললো,

-লাঞ্চটা কিন্ত দুর্দান্ত হয়েছে। থ্যাংক ইউ ফর ইউর ট্রিট।

এরই মধ্যে একই রেস্টুযেন্টে প্রবেশ করলো সাব্বির শামসু আর ফারহান। দুপুর টাইম হওয়াতে একটু চাপটা বেশি। এককোণে খালি পেয়ে তিনজন সিটে বসে পড়লো। অর্ডার দিলো সাব্বির। ফারহান সেগুলো পরোয়া না করে মোবাইলে কার সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপণে মশগুলো।হঠাৎ সাব্বিরের চোখ গেলো হেসে ওঠা এক সুন্দরী রমনীর ওপর। দাঁত কেলিয়ে সে বললো,

-ওই শামসু! মাইয়্যাটা সুন্দর না!

শামসুও তাকালো সেদিকে। সেও জোর লাগিয়ে বললো,
-আসলেই তো! হাসি তো ঝইড়া পড়তেসে।

ফারহান এসব কথা বরাবরই এড়িয়ে চলে। চোখ গরম করে সে বলে ওঠলো,

-এখানে এসব লেইম কাজ করার জন্য আসছো স্টুপিট?চুপচাপ বসো…….

-আরে ভাই! আপনি একবার দেখেন তো।

ফারহান সেখানে তাকাতেই অবাকের প্রান্তে পৌছে গেলো। চোখ ছোট হয়ে এসেছে ক্রমশ। আফরা আছে সেখানে। একটা ছেলে সাথে আছে। ওর চেহারা সাব্বির-শামসু কেউই দেখেনি। তবে ফারহান নিশ্চিত এটা ফাহিমই হবে। ফারহান বিড়বিড়িয়ে বললো,’আফরা এখানে হঠাৎ কি করে?’
.
.
.
.
#চলবে……..ইনশাআল্লাহ

আপনাদের কমেন্টের অপেক্ষায় থাকবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here