আনন্দ_অশ্রু পর্ব_১

কাক ভেজা হয়ে অফিস থেকে ফিরে বাসার কলিং বেল চাপতেই সাথে সাথে দরজা খুলে দেয় তীব্রতা। ভিতরে ঢুকে ডাইনিং টেবিলে হরেকরকম খাবার সাজানো দেখে চোখে তৃপ্তির সাথে পানিরও আগমন ঘটে। সম্পুর্ন ঘর সুন্দর করে সাজানো। বিয়ের ছয় মাসে এই প্রথম বেল চাপার সাথে সাথে এমন তারাতাড়ি দরজা খুলেছে তীব্রতা তাই একটু অবাক ও হলাম। সাধারণত কলিং বেল চাপার অনেক পরে ও এসে দরজা খুলে, আর আমার অনেক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় বাহিরে। এই ছয় মাসে তীব্রতা কখনো রান্না করেনি আমার জন্য। আমি প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে রান্না করে রেখে যায় আবার অফিস থেকে ফিরে রান্না করি।

তাই আজকে এতো আয়োজন দেখে চোখে পানি চলে এসেছে। আসলে ছোট বেলা থেকে কখনোই আমার জন্য এই ভাবে খাবার সাজিয়ে কেউ অপেক্ষা করেনি। একা একা বড় হওয়ার ফলে ফেমিলি কি বুঝতে পারিনি তাই ফেমিলির প্রতি আমার বড্ড লোভ তাদের ভালোবাসা পাওয়ার। আমি সপ্ন দেখতাম আমারও একটা ফেমিলি হবে। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সেখানে খুব ভালো থাকবো। কিন্তু বিয়ের এই ছয় মাসের মাঝে তীব্রতা আমার সাথে তেমন ভালো করে কথাই বলেনি। মনে হাজারো কষ্ট নিয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু আজ হঠাৎ
তীব্রতার কি হয়েছে বুঝতে পারলাম না।

‘ আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন আমি অপেক্ষা করছি আপনার জন্য। মাথাটা ভালো ভাবে মুছে নিবেন নয়তো জ্বর আসতে পারে।

তীব্রতার কথায় আমার ভাবনার আদলে ছেদ ঘটে। আমি তীব্রতার দিকে তাকিয়ে আরেক দফা অবাক হলাম কি সুন্দর লাগছে তীব্রতাকে। পারপেল কালারের শাড়ি পড়েছে সাথে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়েছে ঠোটে চোখেও হালকা করে কাজল দিয়েছে। আজকে সেজেছে তীব্রতা আমার জন্য। সব সুন্দর মেয়েদের সাজলে আসলে মানায় না কিন্তু তীব্রতাকে প্রচন্ডরকমের ভালো লাগছে কেন জানি। এর আগে আমি ওকে সাজতে দেখিনি এমনটা না তবে একবারই দেখেছি আমাদের বিয়ের দিন তাও কান্না করে তা নষ্ট করে ফেলেছিলো।

‘ রাযিন কি হলো? কি ভাবছেন দাঁড়িয়ে? আমি অপেক্ষা করছি আপনি আসুন। আজকে আপনার পছন্দের সব খাবার রান্না করেছি। আর ব্যাগটা আমায় দিন আমি গুছিয়ে রাখছি।

‘ হুম একটু অপেক্ষা করো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

রাযিনের পুরো শরীর ভিজে গেছে। একটু শীত শীত লাগছে তবুও গোসল করার জন্য
শাওয়ার অন করলো। আজকে কেন যেন ভালো লাগছে ভীষণ তবুও কোথাও একটা দুটানায় টানছে মনটাকে। তীব্রতা আজ এতো পরিবর্তন কেন সেটাও বুঝতে পারছে না। বুঝতে চাইছেও না সে, কারন এটাই তো চেয়েছিলো রাযিন। জন্মের সময়ই মা মারা যায় রাযিনের । কিছু দিন পরেই বাবা আরেকটা বিয়ে করে। দাদি থাকায় দাদির কাছেই তেরো বছর পর্যন্ত থাকে রাযিন। এর পর দাদিও মারা যায়। মায়ের ভালোবাসা কি না বুঝলেও রাযিন দাদিকে মায়ের মতোই ভালোবাসতো। দাদিকে হারিয়ে আরো অসহায় হয়ে পড়ে রাযিন।

সৎ মা রাযিনকে সহ্য করতে পারতো না কোন মতেই। কত বেলা না খেয়ে কাটিয়েছে রাযিন তার নিজেরই মনে নেই। বন্ধুরা সব জেনে প্রথমে সিমপাথি দেখালেও পরে আবার বিরক্তবোধ করতো। কখনো কোন বন্ধু খাওয়ালে ভীষণ খুশি হতো রাযিন। সৎ মা সারাদিন বাবার কাছে এই সেই নিয়ে বিচার দিতেই থাকতো এক সময় রাযিনের বাবাও বিরক্ত হয়ে যায় রাযিনের প্রতি। রাযিন যখন ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করে রাযিনের আব্বু রাযিনকে এই ফ্ল্যাটটা কিনে দেয় আর আলাদা থাকতে বলে। আর সৎ মাকে বলতে বলে এই খানে ভাড়া থাকবে সে। রাযিন হাতে পায়ে ধরেছিলো বাবার যেন তাকে সাথেই রাখে কিন্তু তার বাবা শোনেনি ওর কথা।

সেই থেকেই রাযিনের একার পথচলা শুরু হয়। নিজের সব কিছু নিজে করতো ছোট বেলা থেকেই, তাই বিরক্ত লাগতো না তীব্রতাকে রান্না করে খাওয়াতেও। তীব্রতার আর রাযিনের বিয়ে পারিবারিক বা প্রেম করে হয়নি। হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই। রাযিনের কলিগের বোনের বিয়েতে রাযিনকে দাওয়াত দেয় তার কলিগ তৌসিফ। রাযিন না যাওয়ায় এক পর্যায়ে রাযিনকে এসে অফিস থেকে নিয়ে যায় তৌসিফ। এক সাথে চাকরি করার সুবাদে ভালো বন্ধু হয়ে উঠে ওরা। দুপুরে হঠাৎ বরের বাড়ি থেকে ফোন আসে বর পালিয়েছে বাড়ি থেকে। তাই ওরা বর যাত্রী নিয়ে আর আসবে না, অনেক ক্ষমাও চাইছেন। এই দিকে তৌসিফের আব্বু এই সব শুনে অসুস্থ হয়ে পড়ে। রাযিনেরও এই সব দেখে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো তৌসিফের ফেমিলির জন্য, এক সময় তৌসিফ এসে মাথা নিচু করে হাত জোর করে রাযিনকে অনুরোধ করতে শুরু করে যেন তীব্রতাকে বিয়ে করে নেয়। না হয় ওর আব্বু মারা যাবে শোকে। মেয়ের বিয়ের দিন মেয়েকে বিয়ে দিতে না পারা অভিশাপ মনে করে আজো বাঙালি পরিবার। রাযিন ওদের এমন অবস্থা দেখে আর না করতে পারেনি। এর পরই বিয়ে হয়ে যায় তীব্রতা আর রাযিনের। অচেনা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায় দুজন।

বাথরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তীব্রতা ডাক দেয় রাযিনকে।

‘ এখনো হয়নি?

রাযিন ভাবনা রেখে তীব্রতাকে নরম সুরে
‘ এইতো হয়ে গেছে তুমি যাও আমি আসছি।

রাযিন ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসে অবাক না হয়ে পারলো না, সব ওর পছন্দের খাবার বেগুন ভর্তা, চিংড়ি মাছের দোপেয়াজা, বড় মাছের মাথা দিয়ে মাসকলাইয়ের ডাল, আর গরুর মাংস ভুনা সাথে পোলাও। কিন্তু কথা হচ্ছে এই সব যে রাযিনের পছন্দ তা কি ভাবে জানলো তীব্রতা? তীব্রতা তো ভালো করে কথাও বলতো না রাযিনের সাথে তাই পছন্দ জানার প্রশ্নই উঠে না।

রাযিন দুহাত ঘসতে ঘসতে
‘ সবই তো আমার প্রিয় খাবার তুমি জানলে কি ভাবে এসব আমার প্রিয়?

তীব্রতা মুচকি হেসে রাযিনের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বললো
‘ কারণ এই গুলো আমি এই ছয় মাসে অনেক দিন খেয়েছি আর এই খাবার গুলো খাওয়ার সময় আপনার খাওয়ার ভংগী দেখে বুঝেছি। যে ভাবে চেটেপুটে খেতেন তা দেখেই।

রাযিন না হেসে পারলো না তীব্রতার কথায় মেয়েটার মাথায় বুদ্ধি আছে অনেক। রাযিন তৃপ্তির সাথে খাচ্ছে আর তীব্রতা তা দেখে আনন্দে চোখের অশ্রু ফেলছে। রাযিন তীব্রতার দিকে তাকিয়ে দেখে তীব্রতা আগে থেকেই তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাযিন একটু হেসে

‘ তুমি বসনি যে? এক সাথে খাওয়ার মজাই আলাদা তুমিও বসে পড়।

‘ আপনি খেয়ে নিন আগে আমি পরে খাবো। আপনার খাওয়া দেখতে ভালো লাগছে আমার। আমি খেতে বসলে দেখতে পারবো না।

রাযিন তীব্রতার কথায় হেসে আবার খেতে শুরু করলো৷ খাওয়া শেষে রাযিন বসে খেলা দেখছিল আর তীব্রতা কি যেন করছে রুমে বার বার কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হচ্ছিলো তাই রাযিন রুমের দিকে অগ্রসর হয় তীব্রতা কি করছে দেখার জন্য, রাযিন রুমের ভিতরে গিয়ে ছোট্ট একটা ধাক্কা খায় পায়ের সাথে কিছু লেগে। রুমের দিকে তাকিয়ে আরো অবাক হয় রাযিন , ফুল দিয়ে চমৎকার ভাবে রুমকে সাজিয়েছে রুমটা। মনে হচ্ছে অচেনা রুমে চলে এসেছে রাযিন। এক সাইড থেকে দৌড়ে এসে রাযিনকে জড়িয়ে ধরে তীব্রতা। খামছে ধরে পিঠের কাপড় ছোট্ট ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে

‘ আমাদের সময় শেষ হবার আগেই আমি আপনার হতে চাই। আমাকে নিজের করে নিন।

রাযিনও খুশিতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তীব্রতাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে নেয় নিজের সাথে। পরম যত্নে চুমু একে দেয় তীব্রতার কপালে, তীব্রতাও রাযিনের দুগালের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ধরে রাযিনের কপালে ঠোঁট ঠেকায়।

সকালে

রাযিনের ঘুম ভাঙতেই দেখে তীব্রতা পাশে বসে রাযিনের দিকে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক চোখে,
বিন্দু বিন্দ পানি ঝরছে তীব্রতার চুল থেকে।
রাযিন উঠে বসতেই তীব্রতা একটা কাগজ সামনে এগিয়ে দিয়ে

‘ আমাদের ডিভোর্স পেপার সাইন করে দিন।

চলবে…….

আনন্দ_অশ্রু
পর্ব_১
#তাহসিনা_ইসলাম_অর্শা

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here