Thursday, April 30, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প এক শহর ভালোবাসা❤ এক শহর ভালোবাসা পর্ব_৩৬

এক শহর ভালোবাসা পর্ব_৩৬

0
1589

#এক_শহর_ভালোবাসা
#পর্ব_৩৬
#সুরাইয়া_নাজিফা

“হেই সোহা কেমন আছো? ”
হঠাৎ ঐশীর কথা শুনে আমি মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে আমার চোখের পানি মুছে নিলাম। নিজেকে সামলে আস্তে আস্তে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম। শানও আমাকে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো। আমি মুখে এক চিলতে হাসি ফুঁটিয়ে বললাম,

“এইতো ভালো। তুমি কেমন আছো? ”
ঐশীও হেসে বললো,
“ভালো। তবে তুমি ওখানে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলে কেন? ”
ঐশীর কথা শুনে শান ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকালো।আমি আড়চোখে একবার শানের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললাম,
“তোমরা কথা বলছিলে তাই বিরক্ত করতে চাইনি। ”
তখনই ঐশীকে একটা মেয়ে ডাক দিলো। ঐশী মেয়েটাকে “আসছি” বলে আমাদের দিকে ফিরে বললো,
“আচ্ছা আমি এখন আসি তোমরা দুজনেই কিন্তু আমাদের বাসায় যেও নিমন্ত্রণ রইল। ”
আমি মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বললাম,
“তোমারও নিমন্ত্রণ রইল।”

ঐশী চলে গেল। আমি সামনের দিকে চেয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“চলো আমাদেরও যেতে হবে। ”

শানের কথা শুনে আমি চোখ ফিরিয়ে শানের দিকে কটমট চোখে তাকালাম। কোনো কথা না বলে হনহনিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়লাম। শান সোহার ব্যবহার দেখে পুরা তাজ্জব হয়ে গেল,
“অদ্ভুত এর আবার কি হলো? ”

শান গিয়ে গাড়িতে বসল। শান সোহার দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু সোহা মাথানিচু করে রইল। শান সোহার একগালে হাত দিয়ে বললো,
“কি হয়েছে তোমার? ”

আমি একবার উনার হাতের দিকে তাকালাম এই হাত দিয়ে এতক্ষন উনি ঐশীর হাত ধরে ছিলেন। আমি আমার গাল থেকে ওনার হাতটা সরিয়ে দিলাম। আর চোখ বন্ধ করে বললাম,
“কিছু হয়নি বাসায় যাবো গাড়ি স্টার্ট দিন। ”
শান আবারও আমার হাতের উপর হাত রেখে বললো,
“কি হয়েছে তোমার মন খারাপ কেন? পরীক্ষা খারাপ হয়েছে? ”
আমি অগ্নিদৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“একবার বলেছি তো কিছু হয়নি আপনি গাড়িটা স্টার্ট দেবেন না আমি নেমে যাবো। ”

শান বুঝতে পারছে না হঠাৎ সোহার কি হলো। এমন ব্যবহারের কারণ কি? শান সোহার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল সোহা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে রইল শান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিলো। শান গাড়ি চালাচ্ছে ঠিকই কিন্তু বারবার সোহার দিকে তাকাচ্ছে। শানের বুকের ভিতর অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে সেটা কি সোহা বুঝতে পারছে না। কিছুটা যাওয়ার পর শান আবার প্রশ্ন করল,
“কিছু খাবে? ”

আমি মুখে কিছু বললাম না শুধু ডানে বামে একবার মাথা নাড়ালাম।সোহার এমন মৌনতা শানকে বড্ড বিরক্ত করছে শান আর কথা না বলে একমনে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিলো।


কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা বাড়িতে পৌছে গেলাম।শান নেমে এসে আমার সাইডের দরজা খোলার আগেই আমি দ্রুত গাড়ির দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলাম। শানের বিরক্তিটা এবার রাগে রূপ নিলো। কি হয়েছে কেন বলছে না মেয়েটা সরাসরি তাহলে কি ঐশীকে দেখে ভুল বুঝল? শান ভাবল এই বিষয়ে সরাসরি সোহার সাথে কথা বলে নেবে।

আমি বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই পুষ্প দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ভূমিকা আপুও পুষ্পর পিছনে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে আসল।উনি পুরো হাপিয়ে গেছে,
“কি ফাজিল মেয়ে দুইটা ভাত খাওয়ানোর জন্য পুরো বাড়ি ঘুরিয়ে মারছে আমাকে। ”

আমি পুষ্পের পাশে বসে বললাম,
“কি হয়েছে সোনা? ”
পুষ্প ইনোসেন্ট ফেস করে বললো,
“আমি খেতে চাই না। মা জোর করে খাওয়াচ্ছে। ”

আমি পুষ্পকে কোলে তুলে বললাম,
“এমন বললে হবে সোনা তুমি না বড় হয়ে গেছো বড় মেয়েরা কখনো এমন করে তাহলে তো সবাই তোমাকে বাচ্চাই বলবে। ”
পুষ্প কপাল কুচকে বললো,
“আমি বাচ্চা না। ”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
“তাহলে তো সবগুলো খাবার খেতে হবে।খাবে তো? ”

পুষ্প “হ্যাঁ সূচক “মাথা নাড়ালো।আমি হাসলাম। বাচ্চাদের কখনো কোনো কাজের জন্য বাধ্য করা যায় না শুধু ভালোবেসে একটু ট্রিকস অবলম্বন করলেই যথেষ্ট। আমি পুষ্পকে সোফায় বসিয়ে ভূমিকা আপুকে বললাম,
“দেও আমি খাইয়ে দিচ্ছি। ”
ভূমিকা আপু আমার হাতে খাবার দিয়ে বললো,
“তুমি আর মা ছাড়া পুষ্পকে কেউ সামলাতে পারে না। ”

তখনই মা এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো।
“তাহলে বলতে হয় আমাদের সোহা একজন উপযুক্ত মা হবে কি বলো ভূমিকা। ”
ভূমিকা আপু হেসে বললো,
“তা আর বলতে বাকি আছে। তা কোনো প্লান করেছো বেবীর।”

উনাদের কথা শুনে আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম শান পিছন থেকে এসে বললো,
“এসব ছাই পাশ কথা ওর মাথায় ডুকিও না তো যে নিজেই এখনও বাচ্চা সে বাচ্চার কি বুঝবে। ”

শান এসে আমার পাশে বসল। আমি রেগে ওনার দিকে তাকালাম।মা পুষ্পকে হাতে ধরে আমার হাত থেকে খাবারের প্লেটটা নিয়ে ওখান থেকে চলে গেলেন। ভূমিকা আপু হাসতে হাসতে বললো,
“কে বাচ্চা? তুমি চাইলে যে কোনো সময় বাচ্চার মা হয়ে যেতেই পারে। এখন কথা হলো তুমি কি চাও। ”

একদিকে শানের কথা শুনে আমার রাগ হচ্ছে অন্যদিকে ভুমিকা আপুর কথায় লজ্জায় মাথা কাঁটা যাচ্ছে। আমি মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিতে বললাম,
“আচ্ছা আপু ছাড়ো না এসব কথা। ”

“নাহ কেন ছাড়ব আমাদের কি ইচ্ছা হয় না চাচি ডাক শুনার।এখন তোমরা বলো কবে শুনাবে। ”

শান বললো,
“দেরী আছে এখনও ছোট ও আর কয়েক বছর যাক ভেবে দেখবো। ”

কি একটা অস্বস্থিকর পরিস্থিতি আমি হুট করে উঠে দাঁড়ালাম,
“আচ্ছা আমি ফ্রেস হয়ে আসছি। ”
ভূমিকা আপু হেসে বললো,
“পালাচ্ছো পালাও কিন্তু যেভাবে পারো শানকে ম্যানেজ করো। সুখবরটা কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি শুনতে চাই। ”

আমি দ্রুত উপরে চলে গেলাম।উফ আর কিছুক্ষন ওখানে থাকলে নির্ঘাত এদের কথায় লজ্জা পেয়েই আমি মরে যেতাম। রুমে এসে একটা ড্রেস নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলাম। সোহা যাওয়ার কিছুক্ষন পর শান ও ওখান থেকে উঠে রুমে চলে গেল।আমি ওয়াররুম থেকে বেরিয়ে দেখি শান আমার সামনেই দাঁড়িয়ে। আমি দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কেঁটে সরে গেলাম।

“কি হয়েছে তোমার? ”

শানের কথা শুনে আমি উনার দিকে তাকালাম কপাল কুচকে বললাম,
“কি তখন থেকে ভাঙা রেকর্ডের মতো একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন।কি হবে আমার?”

“সেটা তো তুমি বলবে? বলছো না কেন আমার সাথে?”

“কথা বলছি না মানে তাহলে এগুলা কি বলছি। ”

উনি আমার বাহু ধরে আমাকে উনার কাছে টেনে নিয়ে বললেন,
“লিসেন সোহা তোমার স্বাভাবিক কথা বলা আর এভাবে কথা বলা সেটা আমি বুঝি। তাই ভনিতা না করে বলো কি হয়েছে? ”

আমি কোনো কথা না বলে ছলছল চোখে একদৃষ্টিতে উনার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।

উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললো,
“তোমাকে বলেছিলাম একদিন আমার প্রতি যদি তোমার কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সেটা কখনো মনে চেপে রাখবে না। একটা ভুল ধারণা মনে চেপে রাখার জন্যে অনেক ভালো ভালো সম্পর্কও নষ্ট হয়ে যায়। শুধু দুজন দুজনকে না বুঝার জন্য। আমাদের মধ্যে এমন কিছু হোক সেটা আমি চাই না। কোনো সমস্যা হলে আমার মনে হয় দুজন কথা বলে সেটা মিটিয়ে নিতে পারি তাই প্লিজ বলো। ”

আমি নিজের নাকের পাটা ফুলিয়ে অনেকটা অভিমান নিয়েই বললাম,
“আমি তো বাচ্চা তাই যে মেয়ে আপনার উপযুক্ত তার হাতে হাত রেখে তার সাথে গিয়ে সুখ দুঃখের কথা বলুন । আমার সাথে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। ”

কথাটা বলেই আমি নিজের হাত দিয়ে উনার হাতটা সরিয়ে দিলাম আমার বাহু থেকে। তারপর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলাম রুম থেকে। শান হা করে সোহার দিকে তাকিয়ে রইল। তাহলে ওর ধারণাই ঠিক সোহা ঐশীকে দেখেই ভুল বুঝেছে। ওহ নো যে করেই হোক মেয়েটাকে বুঝাতে হবে যে ও যেটা ভাবছে তেমন কিছুই নয়।


আমি রান্নাঘরে এসে দেখলাম মা আর আপু রান্না করছে। আমি গিয়ে উনাদের পাশে দাঁড়ালাম।
মা বললো,
“তোর পরীক্ষা কেমন হলো?”
“ফার্স্ট ক্লাস। ”
“তো এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস এতোদিন রেস্ট নিতে পারিসনি এখন রেস্ট নে গিয়ে। ”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
“এতোদিন অনেক রেস্ট নিয়েছি আর না। দেখি সরো আজকে আমার পরীক্ষা অনেক ভালো হয়েছে সেই খুশিতে আজকে সব রান্না আমিই করব। ”

কথাটা বলেই আমি কাজ করতে আরম্ভ করলাম। মা বললো,
“তুই এতো কাজ একা পারবি না দে আমিও সাহায্য করে দিচ্ছি। ”

আমি রেগে বললাম,
“না তেমার শরীর অসুস্থ তুমি গিয়ে রেস্ট নেও।আর আমি একা কই আপু আছে রহিমা আন্টি আছে ওরা হেল্প করে দিবে। ”

ভূমিকা আপু একটু হেসে বললো,
“হ্যাঁ মা তুমি যাও আমরা পারবো। ”

মা আমাদের দুজনকে কপালে দুইটা চুমু দিল।
“মাঝে মাঝে মনে হয় তোরা আমার ছেলের বউ না আমার মেয়ে। আমার মেয়ে না থাকার অভাবটা পূরণ করে দিছিস। ”

আমি আর ভূমিকা আপু মাকে জড়িয়ে বললাম,
“আর তুমিও আমাদের শ্বাশুড়ী না আমাদের মা। যে আমাদের মাকে ছেড়ে আসার অভাবটা পূরণ করে দিয়েছে। ”

কিছুক্ষন পর আমাদের কানে হঠাৎ ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কান্নার আওয়াজ কানে এলো। আমরা ভয় পেয়ে পিছনে ঘুরে তাকাতেই দেখলাম রহিমা আন্টি কান্না করছে। আমরা তিনজনই ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম।

মা বললো,
“কি হয়েছে তোমার রহিমা? ”

উনি কোনো কথা না বলে কাঁদতে লাগলো। আমি উনার চোখের পানি মুছে বললাম,
“কি হয়েছে আন্টি আপনি কাঁদছেন কেন? কেউ কি কিছু বলেছে আপনাকে? ”

রহিমা আন্টি নিজের শাড়ীর আঁচল দিয়ে মুখ মুছে বললো,
“না কেডায় কি কইবো। আপনাগো পরিবারের হগল মানুষ এতো ভালা।কতো পরিবারে পোলার বউগো লগে কত জামেলা থাকে শ্বাশুড়ীর। বউরা সহ্য করতে পারেনা শ্বাশুড়ীরে। আবার অনেক জায়গায় শ্বাশুড়ী সহ্য করতে পারেনা পোলার বউরে।আমার কপালডাই তো এমন। ওইখানে আপনাগো পরিবারের শ্বাশুড়ী বউগো এতো ভালোবাসা দেখলে চোখ জুড়াইয়া যায় যে আইজকাইলকার সময়েও এহনো এতো ভালা মানুষরা ভালা পরিবাররা আছে।ঘরে ঘরে এমন বউ শ্বাশুড়ী থাকলে প্রতিটা ঘরই স্বর্গের মতো হইত। ”

রহিমা আন্টির কথা শুনে আমাদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো অন্যদিকে ওনার কথা ভেবে খারাপও লাগলো ওনার ছেলের বউ ওনাকে সহ্য করতে পারেনা বলে উনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে সেই থেকে উনি এখানেই থাকে। কিন্তু আমরা সবসময় চেষ্টা করি উনার পরিবারের কথা উনার না মনে পড়তে কিন্তু যতোই যা হোক নিজের পরিবার তো নিজেরই হয়। আমাদের সমাজে সব মানুষ খারাপ হয় না শুধু কিছু কিছু খারাপ মানুষের কারণে ভালো মানুষদেরকেও আমরা একই পাল্লায় মাপতে বাধ্য হই।

মাকে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা নিজেদের মতো কাজ করতে লাগলাম। তখনই পুষ্প এসে বললো ও গেমস খেলবে কিন্তু গেমসটা ওপেন হচ্ছে না সেটা একটু ঠিক করে দিতে তাই ভূমিকা আপু পুষ্পর সাথে চলে গেল। কিছুক্ষন পর রহিমা আন্টিও চলে গেলো ওনাকে নাকি মা ডাকছে তাই। আমি একটু অবাক হলাম আজব একসাথে সবার কি হলো কেউ না কেউ ডাকছে উনাদের। কিছুক্ষন ভেবে আবার কাজ করতে শুরু করলাম। তখনই শান এসে আমার পাশে দাঁড়ালো।আমি না দেখার ভান করে আমার কাজ করতে লাগলাম।

উনি আমার দিকে মুখ করে বললেন,
“এই মেয়ে শোনো তোমাকে এমন মুখ ভাড় করে থাকলে মোটেও ভালো লাগে না। ”

উনার কথা শুনে আমার হাত থেমে গেল।আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্রিজের কাছে গিয়ে চিকেন বের করে আনলাম।

শান আবারও বললো,
“আচ্ছা একজন আমাকে সবসময় বলে অতিরিক্ত রাগ করা ভালো না। অতিরিক্ত রাগ করলে মানুষ নাকি ঠিক ভুলের পার্থক্য করতে ভুলে যায় তাহলে সেই এখন আমার উপর এতো রাগ করে আছে কেন বলতে পারো? ”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
“আমার কানের কাছে এসে প্যাঁচাল পাড়ছেন কেন যে আপনাকে বুঝে তার কাছেই যান না। ”

উনার পাশ থেকে দূরে সরতে নেবো তখনই উনি আমাকে টেনে উনার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল,
“তার কাছেই তো এসেছি কিন্তু সে না বুঝে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে।”

আমি নিচের দিকে তাকিয়ে ওড়নার খোঁট চেপে ধরে ছিলাম।

উনি আবারও আমার কানের কাছে এসে বললেন,
“ভালেবাসি তো সুইটহার্ট । ”
আমি মুখ ফিরিয়ে বললাম,
“আমি বাসি না। ”
উনি আমার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখটা তুলে
বললো,
“আমার চোখে চোখ রেখে বলো কথাটা। ”
“বলেছি একবার। ”
“উহুম এখন আবার বলো আমার দিকে তাকিয়ে।”

আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। উনি আমার কানের লতিতে হালকা ঠোঁট ছুইয়ে বললো,
“পারবে না কারণ তুমি আমাকে অনেক ভালোবাসো তবুও এতো অভিমান কিসের। অভিমানের চাঁদর একটু সরিয়ে দেখো সেখানে ভালোবাসার বৃষ্টি দিয়ে তোমায় ভিজিয়ে দেবো। ”

“ছাড়ুন আমাকে কাজ আছে আমার। ”
“একবার বলেছি না যখন আমি তোমার কাছে থাকব তখন আমি ছাড়া কোনো কাজ নেই তোমার। ”

আমি মাথা নিচু করে রইলাম।মনে হয় এখনই আমার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়বে। ঠোঁট কাঁপছে। আমি আমার ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলাম। উনি আমার মাথাটা শক্ত করে উনার বুকের সাথে চেপে ধরে বললেন,
“hey sweetheart why are you crying. তুমি জানো না আমি তোমার চোখে পানি দেখতে পারি না।অনেক জ্বালাপোড়া করে বুকে। ”

আমি মাথা তুলে উনার দিকে তাকালান উনার কথা গুলো কেমন অসহায়ের মতো লাগছে।

উনি আবারও ইনোসেন্ট লুক নিয়ে বললো,
“কেন ভুল বুঝছো আমাকে?ঐশী ওর কাজিনের সাথে দেখা করতে এসেছিল সেই সুবাদে দেখা। ঐশী আর তিমিরের বিয়ে হয়ে গেছে তাই ওকে কনগ্রাচুলেশন জানাচ্ছিলাম এর বেশী কিছু না। ”

আমি চমকে উঠে বললাম,
“ঐশী আর তিমির বিয়ে করেছে কই জানায়নি তো?”

“হয়তো ওদের কাউকে জানানো পছন্দ না তাই জানায়নি। কিন্তু তুমি এই সিম্পল বিষয় নিয়ে ভুল বুঝবে আমাকে সেটা ভাবিনি আমি। ”

আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“ভুল বুঝিনি আমি আপনাকে। আপনার কি মনে হয় আপনার সম্পর্কে ভুল ধারণা থাকলে আপনি আমাকে খুজে পেতেন এতক্ষনে। আমার অভিমান হয়েছিল।হওয়াটা কি স্বাভাবিক নয়।ঐশী আপনাকে ভালোবাসত হয়তো আপনি বাসতেন না তাতে কি তার মনে তো একটা সফট কর্ণার থেকেই গেছে না আপনার জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে আমাকে যদি ওই দৃশ্য দেখতে হয় কতটা খারাপ লাগে আপনি বুঝেন।”

শান কিছু না বলে শুধু ড্যবড্যাবে নজরে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।

উনার হতটা ধরে বললাম,
“এই হাতে ঐশীর হাত ধরেছিলেন না। ”

আমি দ্রুত গিয়ে একটা বাটিতে গিয়ে পানি নিয়ে আসলাম। তারপর উনার হাত আবার ঘসে ঘসে ধুয়ে দিলাম। তারপর উনার হাত আমার গালে রেখে বললাম,
“আপনার এই হাত শুধু আমাকে ছাড়া আর কোনো মেয়েকে স্পর্শ করবে না বুঝলেন সেটা যেই কারণেই হোক না কেন।আপনি শুধু আমার কারো সাথে আপনাকে ভাগ করতে পারবো না আমি। ”

শান মুচকি হেসে স্লো ভয়েসে বললো,
“কোথাও কিছু পুড়ছে মনে হয়না। তাহলে কি আমার জন্য কারো মন পুড়ছে। ”

আমি চোখ ছোট ছোট করে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“হ্যাঁ পুড়ছে আর বেশ হয়েছে। সেদিন আমি শুধু বলেছিলাম আমি আবার বিয়ে করব তখন আপনি কি করেছিলেন সেখানে আপনি তো একটা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাহলে আমার পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার কথা নয় কি। ”

শান আমার কোমড় ধরে আমাকে আরেকটু ওনার কাছে টেনে নিলো,
“তাহলে অবশেষে আমার ভালোবাসার জাদু তোমার উপর হয়েই গেলো বলো।”
“কি করবো বলুন ভালোবাসা এতো ভয়ংকর ছোঁয়াছে অসুখ যে ছড়াতে সময় লাগে না। ”
শান আমার কপালের সাথে উনার কপাল ঠেঁকালো আমার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।


আমার পরীক্ষা শুরু হওয়ার সময়ই বিয়ের কার্ড বানাতে দেওয়া হয়েছিল সাথে বিয়ের সব আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা করা হয়ে গেছিল। এখন শুধু বিয়েটা হওয়ার অপেক্ষা। দুদিন পর এঙ্গেজমেন্ট এরপর পরপর সব নিয়ম কানুন মেনে বিয়েটা সম্পন্ন হবে। আজকে আব্বু আম্মু এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে। যেহেতু বিয়েটা আবার নতুন করে হচ্ছে তাই আব্বু আম্মু চায় তাদের দুই মেয়েকে একসাথে একই বাড়ি থেকে বিদায় দিতে। আমার শ্বশুরবাড়ীর সবাইও মতামত দিয়েছে কিন্তু বেঁকে বসেছে শান।

“আমাদের বিয়েটা তো হয়ে গেছে তাহলে সোহা কেন ওই বাড়িতে যাবে এখানে থেকে বিয়েটা হলে ক্ষতি কি? ”

শানের কথা শুনে সবাই মুখ টিপে হাসছিলো তবে এতে উনার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না উনি উনার মতোই বলে যাচ্ছে।

শ্বশুরমশাই বললো,
“এটা কি বলছিস তুই বেটা আমরা ছেলেপক্ষ তাহলে সোহা এখানে কি করে থাকবে বিয়েটা তো ওরও হচ্ছে তাই নয় কি? ”

“বাট বাবা আমাদের বিয়েটা তো হয়ে গেছে তাহলে ও এখানে থাকলে কি সমস্যা?”

“ধরে নেও যে বিয়ে হয়নি।এখন নতুন করে হচ্ছে। ”

শান অবাক হয়ে বললো,
“হোয়াট? ”
“ওরা চাইছে ওদের দুই মেয়েকে একই সাথে একই বাড়ি থেকে বিদায় দেবে তাই ওদের ইচ্ছাটাকেও আমাদের প্রাধান্য দিতে হবে তাই নয় কি। ”

শান কিছু না বলে চুপ করে রইল। শ্বশুরমশাই বললো,
“মা তুই গিয়ে জামা কাপড় গুছিয়ে নে। কিছুক্ষন পর বের হতে হবে। ”

শান বলে উঠল,
“আঙ্কেল আন্টি চলে যাক আমি নাহয় কালকে সোহাকে দিয়ে আসব। ”
“আরে না কালকে থেকে ওদের বাড়ি আত্মীয়রা আসতে শুরু করবে কালকে গেলে কি করে হবে আজকেই যেতে হবে। ”

শান আর কথা না বলে উপরে চলে গেল। আমিও রুমের দিকে পা বাড়ালাম। রুমে গিয়ে দেখলাম শান নিজের ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। আমি কোনো কথা না বলে আমার ট্রলি ব্যাগ বের করে জামা কাপড় গুছিয়ে নিতে থাকলাম। বারবার শানের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলাম বাট উনি একবারও আমার দিকে তাকায়নি।আচ্ছা উনি কি আমাকে বায় বলবে না?

আমি জামা কাপড় গুছানো শেষ করে গুটি গুটি পাশে উনার কাছে গিয়ে একটু গলা খাঁকারি দিলাম,
“বলছি আমি আসি। ”

উনি কোনো রেসপন্স করলেন না। আমি আবারও বললাম,
“আমি চলে যাচ্ছি বাই বলবেন না? ”

উনি কিছু বলছে না দেখে আমি ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবো। তখনই উনি আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন।
“সবাইকে বলতে পারছো না যে তুমি যাবে না।”
“সবার মুখের উপর কিভাবে বলব যাবো না সবাই কি ভাববে?”
“যা খুশি ভাবুক। আমি কি করে থাকবো এতোদিন তোমাকে ছাড়া আমার তো ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম এখনই। ”
আমি উনার দিকে ফিরে বললাম,
“কিছুদিনেরই তো ব্যাপার।আমিও কি খুব ভালো থাকবো আপনাকে ছাড়া কিন্তু কি করবো যেতে তো হবেই। ”
উনি রেগে বললো,
“সব তোমার এই উটকো আবদারের কারণে হয়েছে কি দরকার ছিলো আবার বিয়ে করার। ”
উনার কথা শুনে আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম,
“তাহলে আপনি পূরণ করলেন কেন না করলেই ভালো হতো। ”
“এখন তো সেটাই ভাবছি । ”
“পরে ভাবেন এখন আমাকে বাই বলে সময় যাচ্ছে। ”
উনি আমার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“খুব তাড়া মনে হচ্ছে যাওয়ার। ”
আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিলে বললাম,
“কই না তো। ”
শান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার আমাকে জড়িয়ে ধরল,
“শোনো সবসময় ফোনটা হাতের কাছে রাখবে। সকালে আর রাতে ঘুম থেকে উঠার আগে আর ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন আমাকে ফোন করে আমাকে গুড মর্নিং আর গুড নাইট বলবে এক ঘন্টা পর পর ফোন করব তাই ফোন তোমার হাত থেকে যেন না যায়। অবশ্যই ভিডিও কলে। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবে। তোমার কাজিন ব্রাদারদের সাথে বেশী কথা বলবে না। আর যা যা বললাম সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। ”

আমি হা হয়ে গেলাম উনার কথা শুনে। তারপরও কোনো কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালাম। উনি আমার কপালে গালে উনার ঠোঁটের স্পর্শ দিলেন তখনই আমার ফোনে ভূমিকা আপুর কল এলো। বুঝতে পারলাম যেতে হবে। আমি বললাম,
“আচ্ছা আসি তাহলে? ”

উনি মুখ গোমড়া করেই বললো,
“হুম। ”
আমি এগোতে নিলাম উনি আবারও হাত ধরে বসল আর ইনোসেন্ট লুক নিয়ে বললো,
“যাওয়াটা কি খুব জরুরী। ”
আমি উনার একগালে হাত দিয়ে বললাম,
“আমি এখন যাচ্ছি সারাজীবনের মতো আপনার কাছে চলে আসবো বলে। কিছুদিনের বিচ্ছেদ যদি সারাজীবনের জন্য আমাদের এক করতে পারে তাহলে আমার মনে হয় আপনার হাসি মুখে আমাকে বিদায় দেওয়া উচিত। ”
শান মাথা নাড়ালো।আমি হেসে বললাম,
“তাহলে এবার হাসুন একটু। ”
উনি মুখ গোমড়া করে রইলেন।
“প্লিজ হাসুন না। ”
উনি অনিচ্ছাকৃত একটা হাসি দিলেন।আমি আস্তে করে বললাম,
“আসি। ”
উনি উনার গালে রাখা আমার হাতটা উনার হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে একটা চুমু দিয়ে বললেন,
“আই মিস ইউ সুইটহার্ট। ”
আমি ধরা গলায় বললাম,
“আই মিস ইউ টু। ”

কথাটা বলেই উনার থেকে হাত ছাড়িয়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। আমার চোখ থেকে একফোঁটা পানি পড়ল আমি চাইনা আমার চোখে পানি দেখে উনি দূর্বল হয়ে পড়ুক। নিচে নেমে বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিলাম। পুষ্পকে নিয়ে সাম্য ভাইয়া বাহিরে গেছে কারণ পুষ্প থাকলে আমার সাথে যাওয়ার বায়না ধরত তাই। সবার থেকে বিদায় নিয়ে আমি সামনের দিকে এগোলাম। শানকে আরেকবার দেখার জন্য মন ছটপট করছিলো তাই পিছনে তাকালাম শান নিচে আসেনি। দুই তলা থেকে দাঁড়িয়ে অসহায় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল আমি চোখ ফিরিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম।
.
.
চলবে

বিঃদ্রঃ রিচেক দেওয়া হয়নি ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।আর আপনাদের অনুভূতি জানাতে ভুলবেন না। ধন্যবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here