কোনো_এক_শ্রাবণে পর্ব-১১

কোনো_এক_শ্রাবণে

পর্ব-১১

-শাহাজাদী মাহাপারা (জোহুরা খাতুন)

শফিক সাহেব তার রুমের বেলকনিটায় বসে আছেন। আকাশের তারাগুলোর দিকে চেয়ে আছেন। কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার ভারাক্রান্ত মনটা তার উচাটন করছে কন্যার জন্য। তার প্রথম কন্যা সন্তান দোলা। এবং সন্তানদের মাঝে ২য় সে। শফিক সাহেবের এই মেয়েটি শান্ত,ভদ্র। আর বাকি মেয়েদের মতো না। যথেষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে সে ছোট বেলা থেকেই। তার মনে পড়েনা কখনো দোলাকে শাসন করেছেন কিনা বা বকাও দিয়েছেন কিনা? তার এই শান্ত মেয়েটির ছোট মায়াকারা চোখের দিকে চাইলে যে কেউ তার মায়ায় পড়তে বাধ্য।অথচ আজ তার এই মেয়েটি তার থেকে ২য় বারের মতো দূরে। শেষ বার দোলার সাথে রাগ করেছিলেন যখন দোলা তার বিরুদ্ধে গিয়ে তার অফিসের একজন এম্পলোয়ির ছেলেকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। তাদের ভিতর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। ছেলেটার কোনো এ্যাব নুকস তার চোখে পড়েনি। সমস্যা একটাই ছিলো ছেলেটি বেকার।ছেলে একান্নবর্তী পরিবারে থাকে। এবং সেই বিশাল পরিবারের দায়ভার ছেলের বাবার উপর। একটা সাধারণ অনার্স কলেজ থেকে বাংলায় এম.এ পাস করেছে।এবং নিঃসন্দেহে ছেলেটা চাকরী পাওয়ার পর পুরো পরিবার তার ঘাড়ে চাপবে। এছাড়া ছেলেটার পরিবারের সাথে হয়তো দোলা খাপ খাওয়াতে পারবেনা।
সেই দোষেই তিনি তার প্রথম কন্যা সন্তানকে তার বিজনেস এসোসিয়েটদের একজনের ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। এবং প্রথমে ৬ মাস সে সম্পর্ক সুন্দর টিকলেও দোলা সন্তান সম্ভবা হবার পর থেকেই শুরু হয় তার ওপর মানসিক এবং পাশবিক অত্যাচার।কিন্তু দোলা কখনোই কাওকে কিছু বলতো না এ ব্যাপারে। তাই কারো কিছু করার ছিলোনা। তার প্রথম সন্তান পৃথিবীতে মৃত জন্ম নেয়। বাবার প্রতি একপ্রকার অভিমানেই সে আর কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি। এরপর তার ২য় সন্তানকে গর্ভেই হত্যা করেছিলো পিশাচ টা। এই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই দোলা তার ভাই নাফির সাথে যোগাযোগ করে। দোলার বিয়ের সময় নাফি উপস্থিত ছিলোনা। সে তখন ইউকে তে। নাফি এই চরম হিংস্র ঘটনা জানার পরেই হল্লা করলো। এরপর সে বাড়ি থেকেই চলে গেলো। কিছুদিন কারো সাথেই যোগাযোগ করলোনা। এরপর যখন বাড়ি ফিরলো তখন দোলাকে দিয়ে ডিভোর্স ফাইল করালো। জানা গেলো ওই ছেলের আরো একটা কিপ আছে। দূর্ভাগ্যবসত যেদিন কোর্টে শেষ শোনানি ওদিনই কোর্টে আসার সময় সড়কদূর্ঘটনায় মারা যায় মাহির, দোলার স্বামী।
রুবাবা পাশে এসে বসলেন শফিকের।
স্মৃতির সুর কেটে গেলো শফিক সাহেবের, পাশেই দেখলেন রুবাবাকে। তার হাতটা শক্ত করে ধরে আছেন তিনি ।
—————————————————————-

রাতের ২য় প্রহর চলছে।শীত যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। চাঁদ টা বার বার লুকোচুরি খেলছে। চাঁদের মৃদু নীল আলো নিপার গাল বেয়ে পড়া অশ্রুর উপর পড়তেই আবরার চট করে তাতে চুমু দিয়ে বসল। হতভম্ব হয়ে নিপা আবরারের দিকে চেয়ে রইল। অমন আধো আলোতেই নিপা দেখলো আবরার লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কি মনে করে যেন সে হেসে উঠলো। উচ্চ হাসির শব্দেই আবরার ভয়ে কেঁপে উঠলো। কে বলবে এই ছেলে ইউকে রিটার্ন ! আবরার সবাই উঠে যাবে সেই ভয়ে নিপার মুখ চেপে ধরলো। নিপা ওই অবস্থাতেই হিচকী তুলে তুলে ফুক ফুক করে হাসছে। এবং কোনোভাবেই তার হাসি থামছেনা। আবরার মুখ থেকে হাত সরাতেই নিপাকে অধরবন্দি করলো। যখন ঘোর ভাঙলো নিপার আবরারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো সে কিন্তু পারলোনা। আবরার ধরেই রাখলো নিপাকে। হঠাৎ নিপার নিলয়ের কথা মনে পড়তেই ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। আবরার দুহাতে তাকে জাপটে রইলো। বেলকনিতে শীতের জন্য যেনো দুজনেই উষ্ণতা খুঁজছে দুজনের মাঝে।

————————————————————

দোলা ডিভানে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছে গোসল করেছে সে কিছুক্ষণ আগেই ভেজা চুল গুলো মুছে ছড়িয়ে রেখেছে ডিভানের উপর। পাশের ছোট কেবিনেটের উপর রাখা কফি মেশিন থেকে এক কাপ কফি করে নিয়ে বসেছে সে। সামনে বিছানায় জাদিদ এলোমেলো হয়ে ঘুমুচ্ছে। হালকা হলদে রঙের আলোর ল্যাম্প জ্বলছে রুমে। স্ট্রীট ল্যাম্পের মতো দেখতে লাইটগুলো।ইটালি থেকে আমদানিকৃত মোট চারটে লাইট ঘরের চারকোনে রাখা। মৃদু আলোয় দোলা দেখলো জাদিদ ঘুমের মাঝেই হাসছে।স্বপ্ন দেখছে হয়তো।প্রান ভরে নিশ্বাস নিলো দোলা। কি নরম আর সুন্দর সে হাসি। দোলা দূর থেকেই থুথু দিলো। কি সুন্দর ভালোবাসাময় মুহূর্ত কেটেছে কিছুক্ষণ আগে।

রুমে এসেই যখন ওরা শোকরানার নামাজ পড়ে নিলো জাদিদ কি দারুন মোনাজাত ধরলো। এবং সে প্রতিজ্ঞা করলো দোলার প্রতি অবহেলা করবেনা, কখনো না। মোহরানা হাতে হাতেই নগদ পরিশোধ করলো জাদিদ। তারপর !

তারপর জাদিদের প্রতিটা স্পর্শ জেনো তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিলো। প্রেম এমনও হয়? যার স্পর্শে নিজের মাঝেই জেনো থাকেনা মানুষ। নেশাগ্রস্থের মতো ধীরে ধীরে ডুবে গিয়েছিল তারা একে অপরের মাঝে।
রাতের স্মৃতি কথা মনে করতে করতে দোলা ডিভানের উপরই ঘুমিয়ে পড়লো।নিশ্চিন্ত গভীর ঘুম।
———————————————————–

ঋতুর আজ মন খারাপ। দুপুরের ঘটনাটা নাফি লুকানোর চেষ্টা করেছিলো কিন্তু খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। সালেহা বান্ধবীদের কাছে এ নিয়ে গল্প করছিলো তখনই শুনে নিয়েছিলো সে। নিশ্চুপ রাত তার পাশে নির্ভান ঘুমাচ্ছে। ঋতু একবার নির্ভানের দিকে চাইলো এরপর আবারও সিলিং এর দিকে চাইলো।
ঋতু উঠে বসলো। এ ঘটনাটা ভাবতেই সে শিউরে উঠছে বারবার। কি হতো যদি জাফর ধরা না পরতো তাহলে? “নির্ভান!” ভয়ে সিটিয়ে গেলো ঋতু।
ঋতু নির্ভানের জন্য দুধ বানাতে উঠলো। পাশের রুমের দরজা খোলার শব্দ এলো তারকানে। “এতরাতে দোলার রুমে কে? মাহাপারা কি জেগেছে?”ঋতু বের হয়ে উঁকি দিলো দোলার রুমে। দরজা হাট খোলা দেখে ঋতু ভিতরে উঁকি দিলো। রুমের সাথে লাগোয়া ঝুল বারান্দায় বসে আছে নাফি। রুমে মাহাপারা নেই। এতরাতে গেলো কই মেয়েটা? ভিতরে গিয়ে নাফিকে পিছন থেকেই ডাকলো ঋতু।
“আপনি এতরাতে?ঘুমাচ্ছেন না যে? মাহাপারা কোথায়?” “ও আজ নিপার রুমে ঘুমুচ্ছে। দোলার কথা মনে পড়ছে খুব।”
নাফির ব্যথিত চোখে অশ্রু টলটল করছে। ঋতু নাফির পাশে এসে বসতেই নাফি ভাবুক হয়ে উঠলো। এই মূহুর্তে তার হয়তো একটা কাঁধের খুব প্রয়োজন ছিলো। ঋতু তার কাঁধে ভরসার হাত রাখতেই যেনো সে স্বস্তি পেলো। জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলো। পুরুষ মানুষ কাঁদে না বলেই জানতো ঋতু। আজ তার সেই ভুল ভেঙে গেলো। নাফিকে শান্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠলো ঋতু। অদ্ভুত তার চোখ বেয়েও পানির শ্রোত উপচে পড়ছে।

এক মূহুর্তের জন্য ঋতুরও মনে হলো নাফিই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল আর ভরসা, বিশ্বাস ও ভালোবাসার স্হান। যে স্হানকে সে সবার উপর প্রাধান্য দিবে।

———————————————————-

ছাদে এসে মাহাপারা দেখলো বেয়াজিদ দোলনাটায় একা বসা। তার হাতে আইপড, কানে ইয়ার বাডস। সুয়িং করছে সে। মাহাপারার গায়ে রোব পরা সাদা রঙের, এর উপর একটা কাস্মিরি পশমিনা চাদর ওড়ানো। মাহাপারা এসেছে তা টের পেয়েছে বেয়াজিদ।

“ডিডন্ট স্লিপ ইয়েট?”(ঘুমাওনি এখনো?)

“উহুম। আনেবল টু স্লিপ।মিসিং হার।”(না। আপার কথা মনে পড়ছে খুব ঘুম আসছে না)

“হোয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়া এট দিস টাইম?”(ছাদে কি করছো এতরাতে?)

“রুমস আর অকিউপাইড।”(রুম সব ব্যস্ত।)

“মিনজ?”(মানে?)

মাহাপারা খানিক হেসে দোলনায় বসলো বেয়াজিদের পাশে।
রুমে রুমে লাভ বার্ডস।
বেয়াজিদ মাথা নেড়ে হাসলো। মাহাপারা এতক্ষণ গার্ডেনে পায়চারি করেছে নিপার রুম থেকে চলে এসে। কারো চোখেই যেন ঘুম নেই আজ তাদের। কিছুক্ষণ পর গিয়ে দেখলো বারান্দায় আবরার নিপাকে বিশেষভাবে জড়িয়ে বসে আছে। নিপা কাঁদছে আবরারের বুকে পড়ে। সে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো তাদের স্পেস দিতে। দোলার রুমে গিয়ে দেখলো নাফি ডুকরে কাঁদছে। প্রথমে অবাক ই হলো সে। তার এত শক্ত বাঘের মতো ব্যক্তিত্বের বড় ভাই শিশুদের মতো কান্না করছে। সে বারান্দায় যাবার প্রস্তুতি নিতেই দেখলো ঋতু রয়েছে সেখানে। মৃদু হেসে সে ঋতুর রুম থেকে নির্ভানকে নিয়ে এসে বিছানায় শুয়িয়ে দিলো। ফিডারটাও রেখে গেলো নিঃশব্দে।

মাহাপারার কথা শুনে হাসলো বেয়াজিদ।

“আমার ছুটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে মাহাপারা।”
চমকে উঠলো মাহাপারা। মানুষটা দূরে চলে যাবে তার থেকে। এমনিতেই মন খারাপ ছিলো আরও বেশি খারাপ হয়ে গেলো জেনো এখন।অদ্ভুৎ রকমের কষ্ট জমা হলো তার গলার কাছে।পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মাহাপারাকে জিজ্ঞেস করলো বেয়াজিদ ” গান শুনবে?” মাহাপারা মাথা নিচু করে না করলো। বেয়াজিদ বললো “চলো নাচি তবে। তোমার মতো না পারলেও কিছুটা পারবো আই গেস।” বলেই চোখ টিপলো। হেসে দিলো মাহাপারা। তার পায়ের ব্যথাটা এখন নেই তেমন। সে একবার পায়ের দিকে চাইলো।
বেয়াজিদ চমৎকার হাসি দিলো মাহাপারার দিকে তাকিয়ে যার মানে “ট্রাস্ট মি”।

“কিন্তু গান?”
বেয়াজিদ তার বিহীন ওয়ারলেস ইয়ার বাডস একটা মাহাপারার এক কানে দিয়ে আইপডটা দোলনায় রেখে মাহাপারা দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। মাহাপারা হেসে হাতটা ধরলো। আইপডে গান বাজছে ডেনা গ্লোভের শ্রেক-4 এনিমেশন মুভির –

There is something that I see
In the way you look at me
There’s a smile, there’s a truth
In your eyes

But in an unexpected way
On this unexpected day
Could it mean this is where I belong

It is you I have loved all along
It’s no more a mystery, it is finally clear to me
You’re the home my heart searched for so long
And it is you I have loved all along…

ওয়ালটজ বেজে চলেছে।বলরুমের নৃত্যের মতো তালে তালে দুলছে মাহাপারা আর বেয়াজিদ। রাত গভীর থেকে গভীরতম হচ্ছে। চাঁদের আলোয় দুটো দেহ ছন্দে ছন্দে নেচে উঠছে আর দুজোড়া চোখ জেনো হারিয়ে যাচ্ছে একে অপরের মাঝে।

————————-

ফাল্গুনী বাতাসের মুহুর্মুহু বহেয়মানতা শেষের দিকে প্রায়। কাঠফাটা চৈত্রের আগমনীবার্তা প্রকৃতি জুড়ে। বসন্তের মধ্যকাল। কোকিলার কুহু কুহু ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত। শীত গিয়ে গ্রীষ্মের আভাস। এরমাঝেই দোলা বসে আছে তাদের বাসার এই এক চিলতে বারান্দায়। জাদিদ সেই প্রথম দিনের মতো আজও এলোমেলো হয়ে ঘুমুচ্ছে। তারপাশে হুমায়রা ঘুমিয়ে। আজ সে বাবার সাথেই ঘুমিয়েছে। দোলা প্রায় নিথর দেহের মতো বারান্দার ছোট কাউচটায় পড়ে আছে৷ তার হাতে মুঠোবন্দি করা ৩ টা প্রেগ্ন্যাসি টেস্ট স্ট্রিপ। দোলার মনে পরে আজ থেকে ৬ বছর আগের ঘটনা।

দোলা যেদিন প্রথমবার জানতে পেরেছিলো সে সন্তান সম্ভবা তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ একি সাথে বেদনার দিনও ছিলো সেটি। মা হতে পারার অনুভূতিটাই অন্যরকম আনন্দ আর অজানা ভয় দুটোর মধ্যেই পাল্লা চলে কে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে তা নিয়ে। কিন্তু দোলা যখন মাহিরকে তার বাবা হবার সুসংবাদ জানালো মাহির সাথে সাথে বিরক্তি প্রকাশ করলো। মাহিরের মতে এখন তাদের জীবনকে উপভোগ করার দিন৷ বিয়ে করেছে তার মানে এই না যে ৬-৭ মাসের মাথায় বাচ্চা ফুটিয়ে সংসারী হতে হবে। তাছাড়া দোলা কেনো সতর্ক ছিলোনা এই ব্যাপারে এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিলো। দোলা ভেবেছিলো তার শশুরবাড়ির সবাই শুনলে হয়তো খুশি হবে আর মাহিরকেও বোঝাবে। কিন্তু সেদিন দোলা জীবনের প্রথম বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলো। তার শাশুড়ী নিজের দাদী হবার ঘটনায় বেশ আহত হয়েছিলেন। তার মতো সোসিয়াল উইমেন এর জন্য এখনি দাদী হয়ে যাওয়াটা একটু বেখাপ্পাই মনে হয়েছে। তার ধারণা তাকে এখনো দেখতে ৩৫ বছরের পৌড়া মনে হয়। আর এই আকর্ষণীয় দেহের অধিকারী নারীকে কেউ দাদী বলে ডাকবে তা ভাবতেই নাকি তিনি শিউরে উঠছেন। তারপর বিচার পরামর্শের পর তারা মানে দোলার স্বামী এবং তার মাতা মিলে ঠিক করলেন কেউ জেনে যাবার আগেই বাচ্চাটাকে আবর্ট করতে হবে।
এবং তারা দোলার থেকে জানতে চাননি যে দোলা কি চায়? তারা তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন।

তবুও দোলা সুযোগ বুঝে একটা চেষ্টা করেছিলো শুধু। সোসিয়াল মিডিয়া আর তার মা। এ দু জায়গায় জানান দিয়েছিলো যে সে নিজের দেহে নতুন প্রাণ ধারণ করছে। প্রথমে ভেবেছিলো এতে হয়তো তারা থামবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। সেদিন রাতেই তার স্বামী তার উপর পাশবিক নির্যাতন শুরু করলো। এবং একসময় ঠিক করলো বাচ্চা আবর্ট করে তা মিসক্যারেজ এর নামে চালিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিলো। অলরেডি দোলার ১৬ সপ্তাহ চলছিলো। এবং কোনো হাসপাতালেই টাকা দিয়েও এই আবর্শন করানো গেলো না। কারণ এতে দোলার লাইফ রিস্ক ছিলো। মারা গেলে ক্যালেঙ্কারি হবে সেই ভয়ে শাশুড়ী তার সুপুত্রকে আটকেছেন৷ দোলা ভেবেছিলো হয়তো এ যাত্রায় বাঁচা গেলো। কিন্তু না দিন দিন অবস্থা বেগাতিক হচ্ছিলো৷ দোলার মনে পড়ে এমনও দিন গিয়েছে গর্ভবতী অবস্থায় তার স্বামী নামক কাপুরুষটা রাত ভর তাকে নিজের লালসা মেটানোর বস্তু বানিয়েছিলো। রীতিমতো ধর্ষিতা হয়েছে সে তার পরম আস্থার মানুষটির কাছে। এমনও দিন গিয়েছে বাসার সমস্ত কাজ এত চাকর- বাকর থাকতেও তাকে করতে হয়েছে। প্রায় দিন তার শাশুড়ীর মেহমানরা আসতো দল বেধে এবং ভারী ভারী ডেকচিতে রান্না করতে হতো এবং সে সকল কাঙালদের খাওয়ানোর দায়িত্বও তার পরতো হাড়ি চুলো থেকে নামানো উঠানোর কাজটাও তার করা লাগতো। কাজের লোক গুলোও তার কষ্ট সইতে না পেরে সাহায্যের হাত এগিয়ে দিতো কিন্তু তাদের উপর এক প্রকার নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় কেউ কিছু করতে পারতোনা। দোলার মনে পড়ে তার ৭ মাসের সময় তার রসমালাই আর ভুনাখিচুড়ি খেতে চেয়েছিলো। ও ভুলেই গিয়েছিলো অমানুষের সাথে বসবাস তার। সেদিনের পর থেকে তিনদিন খাওয়ার মতো কিছু পায় নি। পানি খেয়েই নিশ্বাস নিয়েছিলো। তার পরিবারকে জানানোর সকল উপায় বন্ধ ছিলো। দোলার মনে আছে শুরুর কিছুদিন যখন অনেক ঝড় ঝাপ্টা যেতো সে তার বাবাকে বলেছিলো তার দূরাবস্থার কথা এবং তার শিক্ষিত বাবা তাকে মানিয়ে নিতে বলেছিলো লোক লজ্জার ভয়ে। শুধু মাত্র অভিমান থেকেই আর সে যোগাযোগ রাখেনি কোনো। আর ৫ টা গর্ভবতী মেয়েদের মতো তার সুযোগ হয়নি সেবা নেয়ার কারো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেক আপ করানোর কিংবা আল্ট্রাসোনোগ্রাফির সময়ে তার সন্তানের হার্ট বিট শোনার। তার সন্তান ভূমিষ্ট হবার দিনও তাকে হাসপাতালে নিতে চায়নি তার নিষ্ঠুর পাষাণ স্বামী। শাশুড়ীতো ফরেইন ট্রিপে দেশের বাহিরে। কোনো রকম চাকরদের হাতে পায়ে ধরে হাসপাতালে যাবার ব্যবস্থা করেছিলো। কিন্তু ততক্ষণে বহু দেরি হয়ে গিয়েছে। এত সংগ্রামের পরও সে তার প্রথম কন্যা সন্তানকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে ভূমিষ্ট করাতে পারেনি৷ শুধু মনের জোরেই হয়তো বেঁচেছিলো নাহলে কবে সে মরে যেতো। নাহ কাউকে জানায়নি৷ তার শাশুড়ী ঘটনা শুনে নাকি কান্না করে সারা দুনিয়া জানিয়েছিলেন দোলা তার সন্তানের খুনি, তার দোষেই তার সন্তান বাঁচেনি। একজন সদ্য সন্তান হারা মায়ের আকুতি কেউ শোনেনি।রুবাবা নিজে মা হয়েও তার মেয়ের কষ্ট বুঝেননি। তিনিও মুখ ফিরিয়ে নেন। তারপর! তারপরও সেই মানুষ রূপী পষুটার সাথে দিনের পর দিন থাকতে হয়েছে তার। দিনের পর দিন সে ধর্ষিত হয়েছে শুধু শারীরিক নয় মানসিকভাবেও। এমন কি তার সো কলড স্বামী তার সামনেই তার বিছানায় কিপ নিয়ে লীলাখেলা করেছিলো। তাও সইতে হয়েছে। এরপর যখন সবাই জানতে পারলো দোলা আবার গর্ভবতী তার বাচ্চাকে একপ্রকার তার অজান্তেই তার গর্ভে শেষ করার মতো ঘৃণ্যতম কাজটিও করেছে তার স্বামী কারণ সে তখন তার নতুন কিপ এর প্রেমে মজেছিলো । সন্তান নামক আরেকটি ঝামেলা পোহাতে চায়নি সে। তাই তার অনাগত সন্তানকে এবার খুন করেছে।
হাসপাতাল থেকে একজন নার্সের থেকে মোবাইল চেয়েই সে নাফির সাথে যোগাযোগ করে এবং সেই জাহান্নাম থেকে মুক্তির পথ বের করে। তার বাবা মা তাদের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হন। কিন্তু তাতেও দোলা নির্বিকার ছিলো। এক প্রকার মানসিক রোগী হয়ে গিয়েছিলো সে।

জাদিদ ঘুম থেকে উঠে দেখে দোলা বারান্দায় বসা। সে উঠে এসে দোলার মাথায় পিছন থেকে দাঁড়িয়ে চুমু খায়। পাশে গিয়ে বসে। দেখে দোলা আকাশের দিকে চেয়ে আছে। তার হাতে কিছু একটা মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় আছে। জাদিদ তার দিকে চেয়ে হাত থেকে জিনিসগুলো নিতেই তার চেহারার রং পাল্টে যায় কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে সে আদ্র কন্ঠে দোলাকে ডাকে। দোলা তার বুকে আছড়ে পড়ে কান্না জুড়ে দেয়। চোখ ভিজে ওঠে জাদিদেরও। আজ আর বাতাসে সেই দমবন্ধ ভারী ভাব নেই। আজ বাতাসে শুধু ভালোবাসারা এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে। বারান্দা জুড়ে উড়ছে সুখ পাখিরা তাদের রং বেরঙের ডানা ঝাপটে।
——————————————————–
পুরো বাড়ি জুড়ে ছুটে বেড়ায় নির্ভান ঘুম থেকে উঠেই তার ছুটোছুটি শুরু হয়। বাড়িতে সবার আদরের। সবার বলতে তার তিন ফুপি, বড় ফুফা, আবরার মামা, কামাল মামা, নসিমা মামী, মালিসা, রিউপার্ট, চেলসি আর ডাডা । তার আবদারের জায়গা সব এখানেই৷ দাদা দীদারাও তাকে আদর করে আম্মু বলেছে। সে বড় হলে বুঝবে। এখনোতো সে কত ছোট! মাত্র ২বছর ৪ মাস৷ সে স্পষ্ট করে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু শব্দগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। ডাডাকে সে জুলু জুলু চোখে দেখে সকাল বেলা তার কপালে চুমু খেয়ে আম্মুর কপালে চুমু দিয়ে অফিসে যায়। ডাডা ভাবে সে ঘুমুচ্ছে কিন্তু সে তখন ঘুমের ভান করে থাকে। সারাদিন ছোটাছুটি করে। আম্মু আর নসীমা মামি খাবার নিতে কত দৌড়ায় তার পেছনে। সে এলো মেলো পা ফেলে গার্ডেনে চলে যায়। কামাল মামা তাকে দিনের বেলা গাড়িতে বসিয়ে ঘুরতে নিয়ে যায় মাঝে মাঝে। নিফু তাকে কত সুন্দর সুন্দর ড্রেস কিনে দেয়। তার কাছে একটা ছোট্ট ব্যাটম্যান ড্রেস ও আছে। মাহাফু তাকে কত খেলনা কিনে পাঠায়। তার একটা রুম আছে যেখানে সব খেলনা আম্মু সাজিয়ে রেখেছে।ডাডা বিকেলে এসে তাকে কাধে নিয়ে ঘোরায়৷ তার সাথে কথা বলে, খেলে, হাসে, তারা দুষ্টুমিও করে। আম্মু মাঝে মাঝে রাগ করে। কিন্তু ডাডা ম্যানেজ করে নেয়। রিউপার্ট, মালিসার বেবি চেলসি। ওরা সবাই ছুটির দিন সকালে ওয়াকে বের হয়। এই বিশাল দেহি হাস্কি গুলোর উপরে শুয়ে থাকতে খুব আরাম লাগে তার। মাঝে মাঝে খেলতে খেলতে ক্লান্ত লাগলে সে আর চেলসি মালিসা আর রিউপার্টের উপরেই ঘুমিয়ে পড়ে। এরপর তারা সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। ডুফি আর জাফু যখন বাসায় আসে তখন তাদের সাথে হুমায়রাও থাকে। হুমায়রাকে সে খুব পছন্দ করে। হুমায়রার তার সাথে খেলা করে সারাদিন থাকে। হুমায়রা তাকে রাইমস ও শোনায়।সে খুব হ্যাপি তার সুইট ফ্যামিলি নিয়ে।

——————————————————–
দোলার বিয়ের ৭ দিনের মাথায় নাফি ঋতুকে বিয়ে করে। ২ বছর হয়েছে তাদের, এতদিনে নাফির প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা একফোঁটা কমেনি তার।এখনও সে ভাবে কল্পনার মতো তার সাজানো সংসারটার কথা।
এক প্রকার জোর করেই যখন রুবাবা ঋতু আর নির্ভানকে এ বাসা থেকে চলে যেতে বলেছিলো আর সূচনার সাথে তার বিয়ে ঠিক করেছিলো সেটা নাফি মেনে নিতে পারেনি। সালেহা রুবাবাকে বুদ্ধি দিয়েছিলো জেনো আপাতত বাসায় কাজি এনেই কাবিন করে ফেলা হয়। কয়েকমাস পর নাহয় অনুষ্ঠান করে নেয়া যাবে৷ নাফিকে বিয়েতে রাজি করাতে না পেরে রুবাবাও বাকি সব টিপিকাল মায়েদের মতো তাকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। এবং শুরু হয় ঋতুকে অভিশম্পাতের মতো অমানবিক নির্যাতন৷ এবং এটি কাজেও দেয়। নাফি রাজিও হয় বিয়েতে। যা ঋতুর জন্য রীতিমতো ধাক্কার মতো ছিলো। বিয়েতে কারোরই মত ছিলোনা। কিন্তু রুবাবার হটকারিতার জন্য রাজি হয় নাফি৷ শফিক সাহেব প্রকাশ না করলেও মনে মনে তিনিও চাইতেন জেনো নাফির বিয়েটা ভালো পরিবারে হয়। সূচনার মতো মেয়ের সাথে। কিন্তু তার মধ্যে দোলার সাথে করা অপরাধের গ্লানি থাকায় সে কিছু বলেন নি। তবুও রুবাবার সাথে সায় দিয়েছেন। এবং দিন তারিখ ঠিক হয় বিয়ের। বিয়ের আগের দিন দোলা এসে নির্ভান আর ঋতুকে তার বাসায় নিয়ে যায়। ঋতুর জেনো দিশেহারা অবস্থা৷

তবে এতো তদবিরের পরও সুবিধা করতে পারেনি সালেহা রুবাবার কেউই। সূচনা বাড়ি থেকে পলায়ন করে৷ তার খ্রিস্টান বয়ফ্রেন্ড তাকে নিতে সূদুর অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসে। এবং সে রাতেই তারা পালিয়ে যায়। এরপর নাফি বিয়ের আসর থেকে উঠে দোলার বাড়িতে চলে আসে কাউকে না জানিয়েই। সে রাতেই ওই একই কাজিকে ডেকে বিয়ে পড়ানো হয় ঋতু আর নাফির। শুনেছে সূচনা নাকি এখন ভালোই আছে অস্ট্রেলিয়াতে। তার একটা পুস্যিও হয়েছে কিছুদিন আগে। বিয়ের কিছুদিন পর রুবাবা সন্দেহ করে সূচনাকে পালিয়ে যেতে ঋতু সাহায্য করেছে। ঋতুই দূর থেকে কলকাঠি নেড়েছে। এবং রুবাবা এ কথা জানার পর থেকেই ঋতুকে সহ্য করতে পারেন না। বলতে গেলে নাফিকে নিজেদের থেকে আলাদা করতে চান না তাই ঋতুকে তাদের মেনে নিতে হয়েছে। কিন্তু তারা মন থেকে ঋতু আর তার সন্তানকে মেনে নিতে পারেন নি।

এ নিয়ে ঋতুর খুব একটা আফসোস হয় না। কারণ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা সবসময় তার পাশে আছে তার হাতটা শক্ত করে ধরে। ব্যস জীবন থেকে সে এর চেয়ে বেশি কিছু আশাও করেনা। সে সুখী বড্ড সুখী। তার এ বাড়ির প্রতি দায়িত্বগুলো সে পালন করে। কিন্তু তার এত পরিশ্রমের পড়েও তারা তাকে মেনে নিতে পারেনি। হয়তো কোনোদিন মেনে নিবে। সেদিনের অপেক্ষাতেই রয়েছে সে।

চলবে…!

Shahazadi Mahapara’s Inscription

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here