ধ্রুব অরিত্রিকা আহানা পর্বঃ৯

# ধ্রুব
অরিত্রিকা আহানা
পর্বঃ৯

মা রোজই আমাকে বিয়ে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করছে। আমার সেসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। বাবা যাকে বলবেন, যখন বলবেন, বিয়ে করে নেবো ব্যস। এর বেশি আর কিছু জানার দরকার নেই। আমি আমার মত ভালো থাকার চেষ্টা করছি। ধ্রুবর ব্যাপারে নিজেকে শক্তভাবে হ্যান্ডেল করছি। ধ্রুবর সাথে জড়িত কোন চিন্তা মাথায় এলেই সেটাকে সাথে বন্ধ করে অন্য কাজে মন দিচ্ছি। তাতে করে যে লাভ হয় নি তা না। এখন আর আগের মত কষ্ট লাগে না। আগের চাইতে অনেক ভালো আছি।
চেহারার আগের লাবন্য ফিরে এসেছে। আত্মীয়স্বজনরা কেউ বাসায় এলেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। বিয়ের আগে নাকি মেয়েরা সুন্দর হয়ে যায়। আমি এসব শুনে মনে মনে বিরক্ত হলেও মা কিন্তু এসবে বেজায় খুশি।

দিন সাতেক বাদে একদিন রাত্রীবেলা সুলতানাকে নিয়ে ছাদে উঠলাম হাওয়া খেতে। হাঁটতে হাঁটতে গান শুনছিলাম। হঠাৎ দুটো ছায়ামূর্তি দেখে আমাকে থমকে যেতে হলো। অন্ধকারেও একজনকে চিনতে আমার কোন অসুবিধে হয় নি। বেশ ভালো করেই বুঝতে পারলাম মেয়েটা তরু। কিন্তু তরুর সাথে পুরুষ মানুষটিকে চিনতে পারলাম না! কে ইনি? ধ্রুব দেশে ফিরছে শুনেছি, কিন্তু লোকটার শারীরিক গঠন দেখে তো মনে হচ্ছে না ধ্রুব। এত রাতে তরুই বা এই লোকের সাথে ছাদে কি করছে? আমি নিচে চলে যাবো কি না ভাবছিলাম। তরু আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো। আমাকে অবাক করে দিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,”কেমন আছো নিশাত?”
আমি বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম।জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললাম,”ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?”

তরুর বেবি বাম্প স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। পেটে হাত ছুঁইয়ে হাসিমুখেই বললো,”আমি ভালো আছি। মাঝে মাঝে একটু ভারী মনে হয় এই যা!”
আমি সরু চোখে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। তরুর হাবভাব কেমন যেন অন্যরকম। আজকে হঠাৎ আমার সাথে এত ভালোভাবে কথা বলছে কেন? তরু আমার রিয়েকশনের অপেক্ষা না করে বললো,”শুনলাম তোমার নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে?”

আমি ভদ্রতাসূচক হাসি দিলাম। তরুর সাথে থাকা পুরুষ লোকটি হাঁটতে হাঁটতে ছাদের অন্যপাশে চলে গেলো। তরু আমাকে চিমটি কেটে বলল,”অন্ধকারেও বেশ বুঝতে পারছি তুমি বেশ সুন্দরী হয়ে গেছো। বিয়ের আনন্দে?”

আমি ওর ঠাট্টায় যোগ না দিয়ে ঐ লোকটাকে ইঙ্গিত করে কাঠ কাঠ গলায় প্রশ্ন করলাম,”ইনি কে?”

আমার মুখভঙ্গি দেখে তরু বিব্রত হলো। তবে প্রশ্নের উত্তর দিলো। কিন্তু ও যা বললো তা শুনে আমার কান খুলে মাটিতে পড়ে যাওয়ার দশা। প্রবল ধাক্কা লাগলো বুকের ভেতর। চোখ বড়বড় করে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। তরু হাসিমুখে জানালো ঐ লোকটা তার স্বামী।

—“তুমি কি আমার সাথে মজা করছো? ঐ লোকটা তোমার স্বামী হলে ধ্রুব কে?”

—“ধ্রুব ভাইয়ার সাথে তো আমার বিয়ে হয় নি! তুমি জানো না?”

আমি হতভম্ভ কন্ঠে বললাম,”কি? ধ্রুবর সাথে তোমার বিয়ে হয় নি?”

—“না। সবাই জানে অথচ তুমি জানো না?

জানবো কি করে আমি তো হস্পিটালে ছিলাম। হস্পিটাল থেকে ফেরার পর ভেবেছিলাম ওর বিয়ে হয়ে গেছে। তাই ওর ব্যাপারে কোন খোঁজখবর জানার চেষ্টাও করি নি। কিন্তু সেই কথা তরুকে বললাম না। ওর মুখ থেকে সব শোনার অপেক্ষায় চুপ করে রইলাম। তরু মুখ কালো করে বললো,

—“সেদিন হস্পিটাল থেকে ফেরার পর ধ্রুব ভাইয়া সাফ সাফ জানিয়ে দিলো সে আমাকে বিয়ে করতে পারবে না। কারো কথা শুনলো না। ফুপির কথাও না। তাঁর নাকি আমাকে অসহ্য লাগে। আমি নাকি সেল্ফিস, আমার নাকি মানবতা বোধ নেই, আমি নাকি খালি নিজের টাই বুঝি! এসব বলে আমাকে বিয়ে করতে মানা করে দিলো।

তরু বলে যাচ্ছিল আমি কেবল অবাক হয়ে তার কথা শুনে যাচ্ছিলাম। ওর কথা শেষ কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,” সেদিন ধ্রুব ভাইয়ার ওপর আমার খুব রাগ হয়েছিলো। ভেবেছিলাম আর জীবনে ওর সাথে কথা বলবো না। কিন্তু বিয়ের পর ঐ বাড়ি থেকে ধ্রুব ভাইয়া আর ফুপু যখন আমাকে আনতে গেলো আমি না করতে পারলাম না। ওরা ছাড়া আমার আপন জন আর কে আছে বলো? ”

—“কিন্তু তোমার বিয়ে?”

—“ধ্রুব ভাইয়া বিয়ে করতে রাজী না হওয়ার ভেবেছিলাম গলায় দড়ি দেবো , তখন ইনিই আমাকে উদ্ধার করেন। ধ্রুব ভাইয়ার কলিগ!”

—“তাই নাকি। ধ্রুবর সাথে ভাইয়া ডাকটা কি বিয়ে পরে যোগ হয়েছে? আগে তো নাম ধরে ডাকতে?”

—“অফকোর্স বিয়ের পরে। আগের কথা আলাদা। তখন আমি বিবাহিতও ছিলাম না শ্বশুরবাড়ির লোকজনও ছিলো না। এখন শ্বশুরবাড়ির লোকজন আছে না। সবাই জানে ধ্রুব আমার ভাই। এখন আমি ওকে নাম ধরে ডাকি কি করে? ”

আমি মুচকি হাসলাম। তরু হঠাৎ চোখ পিটপিট করে বললো,”তুমি এত প্রশ্ন করছো কেন? কি ব্যাপার বলতো?”

—“এমনি। ধ্রুব কি বাসায় আছে?”

—“হুম।”

—“ঠিক আছে, তোমরা গল্প করো। আমি আসি। ”

ছাদ থেকে নেমে আমি সোজা ধ্রুবদের বাসায় গেলাম। ধ্রুব বাসায় নেই। আন্টি জানালো সে বাইরে গেছে।আমি আন্টির সাথে বসে বসে আড্ডা দিলাম আর তরুর শ্বশুর বাড়ির খোঁজখবর শুনলাম। তরুর বাচ্চা হবে জানতে পেরে আন্টি তাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। মেয়েদের প্রথম সন্তান বাপের বাড়িতে হয়। তরুর বাবা মায়ের দিকে থেকে আপনজন বলতে তো এরাই আছে। তাই খবরটা শুনেই আন্টি এবং ধ্রুব গিয়ে তরুকে নিয়ে এসেছে।

ধ্রুব এলো ডিনারের কিছুক্ষন আগে। তরুর বরের সাথে গল্প করছিলো। আমাকে দেখে প্রথমে অবাক হলো। এই কয়মাসে এই প্রথম আমি তাদের বাসায় গেছি। একটুপর পর আড়চোখে দেখছিলো আমি কি করি। আমি আন্টির ফোন থেকে মাকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আজকে আন্টির সাথে ডিনার করবো। খাবার টেবিলে তরুর বরের সাথে আমার আলাপ হলো। লোকটা বেশ ভালোই। এর সাথে তরু সুখেই থাকবে। ধ্রুব গম্ভীর মুখে খেয়ে উঠে গেলো। আমি ওর সাথে কথা বলার জন্য ফাঁক খুঁজছিলাম। কিন্তু শয়তানটা আমাকে কোন সুযোগই দিলো না।

অগত্যা আমাকে ওর সাথে দেখা না করেই বাসায় চলে আসতে হলো। সেই রাতে এক ফোঁটাও ঘুম এলো না। অস্থির হয়ে ভাবছিলাম কখন ওর সাথে কথা বলতে পারবো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভাবলাম ওদের বাসায় যাবো। পরে ভাবলাম এতসকালে কারো বাসায় যাওয়া ঠিক না। অভদ্রতা হবে। অনেক কষ্টে বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু শয়তানটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলো আমি তার সাথে কথা বলতে চাই তাই আমাকে দেখেই বন্ধুদের সাথে দেখা করার অযুহাতে বেরিয়ে গেলো। সারা বিকাল আন্টির সাথে বসে গল্প করলাম। সন্ধ্যে হয়ে এলো তাও সে এলো না। বাধ্য হয়ে সেদিনও আমাকে চলে আসতে হলো।

তারপরদিন ঠিক করলাম যা হয় হোক। আজকে ওর সাথে কথা বলবোই বলবো। আমার ভাগ্য ভালো। সেদিন ধ্রুব একা বাসায় ছিলো। আন্টি তরুকে চেকাপ করাতে নিয়ে গিয়ে ছিলেন। বেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলো তরুর বারো তেরো বছর বয়সী দেবর রাতুল। সম্ভবত ঘুমাচ্ছিলো সে। দরজা খুলে দিয়েই আবার ভেতরে চলে গেলো। আমি পা টিপে টিপে ধ্রুবর ঘরে দিকে গেলাম। ওর ঘর থেকে টিভির আওয়াজ আসছে, শব্দ শোনা যাচ্ছে তারমানে ধ্রুব বাসায়।

ইয়েস! আমার ধারণাই ঠিক। ধ্রুব চেয়ারে হাতলে কনুই ঠেকিয়ে বসে আছে। হাতটা মুঠো করে থুতনিতে চেপে রাখা। সামনে কম্পিউটারের মনিটরে মুভি চলছে। ইংলিশ মুভি। নাম জানি না। ও আমাকে খেয়াল করে নি। আমি গিয়ে নিঃশব্দে ওর পেছনে দাঁড়ালাম। কিন্তু মনিটরে আমার ছায়া পড়তেই ও বুঝে গেলো। মুভি পজ করে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখলো। বিস্মিত কন্ঠে বললো,”কি ব্যাপার তুমি?”

—“হুম আমি। তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি।”

ধ্রুব ফের মুভি চালু করে দিয়ে বলল,”বলো।”

—“তুমি আগে এটা বন্ধ করো।”

—“তুমি বলোনা, আমি শুনছি।”

—“তরুকে বিয়ে করো নি কেন?”

ধ্রুব আমার কথার জবাব না দিয়ে ভ্রু কুঁচকে সামনের মনিটরের দিকে চেয়ে রইলো। মুভিতে হিরো এবং হিরোইন দুজনেই ভিলেনের চালে খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছে। ধ্রুব ‘শীট’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। আমার বুঝতে অসুবিধে হলো না ধ্রুব আমার প্রশ্নটা শুনছে না! রাগ হলেও চেপে রেখে আমি আবার প্রশ্ন করলাম,”তরুকে বিয়ে করো নি কেন?”

ধ্রুব কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞাসা করলো,”কি?”

—“আমি জানতে চাইছি তুমি তরুকে বিয়ে করো নি কেন?”

—“সেটা দিয়ে তোমার কি দরকার? তুমি তোমার বিয়ে নিয়ে মাথা ঘামাও না!”

—“এটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না।”

—“সেটা তরুকেই জিজ্ঞেস করো।”

—“করেছি তরু জানে না।”

—“ওও!”

—“তো বলো? তুমি কেন তরুকে বিয়ে করো নি?”

—“আমি বিয়ে করবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চিরকুমার থাকবো।”

—“আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না।”

—“আমিও না।”

আমার রাগ উঠে গেলো। গলা চড়িয়ে বললাম,”করছো। তুমি আমার প্রশ্নেই সরাসরি জবাব দিচ্ছো না? কেন ঠাট্টা করছো?”

ধ্রুব কম্পিউটার টেবিলে সজোরে বাড়ি মেরে উঠে দাঁড়ালো। ওর চোখেমুখে প্রচণ্ড রাগ! একেবারে আমার মুখোমুখি অগ্নিচক্ষু নিয়ে চেয়ে থেকে বললো,”ঠাট্টা মনে হচ্ছে তোমার? আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি? কেন আমি তরুকে বিয়ে করি নি তুমি জানো না? জানো না তুমি?..কি হলো বলো? বলো বলছি?”

ওর ধমকের ওপর ধমক খেয়ে ভয়ে আমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার দশা। আমি তাড়াতাড়ি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বোঝালাম জানি। ধ্রুব মাথা কাত করে বললো,”কি জানো বলো?”

কিন্তু ভয়ে আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোলো না। তারওপর ধ্রুব ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। আমি জানি ও আমার সাথে খারাপ কিছু করবে না। কিন্তু রাগের সময় মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। তাই সাহস দিয়ে ওর প্রশ্নের দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম “তুমি তরুকে সহ্য করতে পারো না, তাই।”

ধ্রুব রাগে ঠোঁটদুটো চেপে ধরে আমার দিকে চেয়ে রইলো। স্পষ্টত বোঝা গেলো ও আমার ওপর হতাশ। দরজা খুলে দিয়ে আমাকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে বললো,”তোমার উত্তর পেয়ে গেছো! এবার তুমি আসতে পারো।”

আমি বেরোলাম না। সাহস সঞ্চয় করে বললাম,”আমি জানতাম না তুমি তরুকে বিয়ে করো নি।”

—“তো?”

—” না কিছু না।”

—“তো যাও বেরোও।”

আমি বেরিয়ে গেলে ধ্রুব ঠাস করে আমার মুখের ওপর রুমের দরজা বেরিয়ে গেলো। আমি অগ্নিচক্ষু নিয়ে দরজার দিকে চেয়ে থেকে বাসায় চলে এলাম। কিছুই তো জানা হলো না।উলটো অসভ্যটা ধমকে আমার প্রান বের করে নিচ্ছিলো।

তবে আমি দমলাম না। ধ্রুবর সাথে আবার কথা বলার সুযোগ খুঁজতে থাকলাম। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে আন্টির সাথে গল্প করতে ওদের বাসায় যেতাম। পরিণামে ধ্রুব আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করে রুমের দরজা বন্ধ করে দিতো। মহা বিপাকে পড়লাম। এই ছেলে ছাদেও যায় না, ঘরেও কথা বলার সুযোগ নেই। এদিকে মায়ের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে এবারের পাত্রটা বাবার বেশ পছন্দ হয়েছে। চিন্তায় চিন্তায় আমার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিলো। ধ্রুবর সাথে কথা বলার জন্য পাগল হয়ে উঠলাম।

অবশেষে ভাগ্য দেবতা আমার ওপর সুপ্রসন্ন হলেন। বিকেলে ধ্রুবর সাথে ছাদে দেখা হয়ে গেলো। ধ্রুব নিশ্চই ভেবেছিলো আমি ওদের বাসায় গল্প করতে যাবো। তাই ছাদে এসে বসেছিল। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো, মা ছাদে মরিচ শুকাতে দিয়েছিলো সেটা নিতে এসেই ধ্রুবর সাথে দেখা হয়ে গেলো। শয়তানটা আমাকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলো।
.
.
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here