মনের_মতো_তুই #পর্বঃ৮ #লেখিকাঃদিশা মনি

#মনের_মতো_তুই
#পর্বঃ৮
#লেখিকাঃদিশা মনি

লিলি ছুটে এসে আমায় বলল,

‘আদিত্য হাসপাতালে ভর্তি।এখনই খবর পেলাম।’

আমি হতবাক হয়ে লিলির দিকে তাকিয়ে থাকি।
‘এসব কি বলছিস তুই লিলি? কি হয়েছে আমার রাজপুত্রর?’

তৃপ্তিঃকি হয়েছে সব পরে জানতে পারবি।এখন তাড়াতাড়ি চল।

আমি আর না দাঁড়িয়ে চললাম ওদের সাথে।আব্বু ভেতরে ছিল তাই আম্মুকে বলেই বেরিয়ে আসি।

১৫.
হাসপাতালে পৌঁছে আমি ছুটে যাই আদিত্যর কেবিনের দিকে।বাইরে একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন।আমি ওনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
‘আদিত্য এখন কেমন আছে?’

ভদ্রমহিলা ভ্রু কুচকে বললেন,
‘কে তুমি? আদিত্যর ব্যাপারে জানতে চাইছ কেন?’

‘আমি হিয়া।আদিত্যর,,,’

আমার কথা না শুনেই উনি আমার গালে থাপ্প’র দেন।আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওনার দিকে।
‘তোমার জন্যই আমার ছেলেটার আজ এই অবস্থা।তুমি আমার ছেলের সাথে প্রতারণা করেছ।তাই আমার ছেলের এক্সি’ডেন্ট হয়েছে।’

ওনার কথা শুনে আমার চোখে জল চলে আসে।তারমানে উনি আদিত্যর মা।আর কি বললেন উনি আদিত্যর এক্সি’ডেন্ট হয়েছে।

তৃষাকে আসতে দিকে তার দিকে ছুটে যাই আমি।তৃষি আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।আমি তৃষার কাছে অনুরোধ করে বলি আদিত্যর সাথে কি হয়েছে তা যেন আমায় বলে।

তৃষা রাগে কটমট করতে করতে বলে,
‘সেদিন যখন তুমি আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলে তখন ভেবেছিলাম তুমি সত্যি আদিত্যকে ভালোবাসো।কিন্তু তুমি এটা কি করলে? তোমার জন্য আদিত্য ড্রিংক করে গাড়ি ড্রাইভ করার সময়,,,,’

তৃষার কথা শুনে আমি এক পা,এক পা করে পিছিয়ে আসি।আর কোন কথাই আমার কানে ঢুকছিল না।এরমধ্যে তৃপ্তি,লিলি ওরা সবাই চলে আসে।আমি প্রায় কেদেই দেই।শুধু আল্লাহকে ডাকতে থাকি।আল্লাহ যেন আদিত্যকে সুস্থ করে দেয়।

একজন ডাক্তার এসে বলেন,
‘পেশেন্টের খুব ব্লাড লস হয়েছে। এ পজিটিভ রক্ত লাগবে।আপনাদের মধ্যে কি কারো এ পজিটিভ রক্ত আছে?’

তখন আমি এগিয়ে গিয়ে বলি,
‘আমার রক্ত এ নেগেটিভ।আমি রক্ত দিতে চাই।’

ডাক্তার আমায় ভেতরে নিয়ে যান।

রক্ত দিয়ে বাইরে আসার পর আমি দেখতে পাই বাইরে রুহান স্যার এসেছেন।আদিত্যর মার সাথে খুব ঝগড়া করছেন উনি।স্বামী-স্ত্রীর এসব ব্যাপারে জড়াতে চাইনা বলে আমি বাইরে চলে আসি।

রিশেপসনের কাছে এসে বসে পড়ি।কখন যে চোখ লেগে যায় বুঝতে পারিনি।কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুম ভেঙে যায়।ঘুম ভাঙার পর চোখের সামনে রুহান স্যারকে দেখতে পাই।ওনাকে দেখে তো আমি খুব ভয় পেয়ে যাই।আদিত্যর মায়ের মতো বোধহয় উনিও আমায় কথা শোনাবেন।

কিন্তু আমার ভাবনাকে ভুল প্রমাণ ক্রে উনি বলেন,
‘তুমি নাকি আমার ছেলেকে রক্ত দিয়েছ? থ্যাংকস।তোমাকে যে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো বুঝে উঠতে পারছি না।’

রুহান স্যারের এরকম শান্ত ব্যবহার আমাকে আরো হতবাক করে।লোকটাকে এর আগে কখনো এত নম্রভাবে কথা বলতে দেখিনি।সবসময় সবার সাথে রেগে রেগে কথা বলত।আজ ওনার এই অন্য রূপ দেখে আমি কি বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

রুহান স্যার এবার বলেন,
‘আচ্ছা আদিত্যর সাথে কি তোমার অন্য কোন সম্পর্ক আছে? আমার কাছে কিন্তু কোন কিছু গোপন করবে না।’

আমি ভয়ে ভয়ে বলি,
‘জ্বি স্যার।আমরা একে অপরকে ভালবাসি।’

আমার কথাটা শুনে রুহান স্যারের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়।আমার মনে হয় উনি এখনোই আমায় বলবেন আদিত্যর থেকে দূরে সরে যেতে।কিন্তু উনি যে এমন কিছু বলবেন সেটা ভাবতে পারিনি।

আমাকে অবাক করে দিয়ে উনি বলেন,
‘আমার ছেলেকে যদি সত্যি ভালোবেসে থাকো তাহলে সবসময় ওর পাশে থাকবে।ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে বড় হয়েছে।আমি নিজেও ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।তাই বলছি যদি আমার ছেলেটাকে ভালোবাসো তাহলে ওকে আর কখনো কষ্ট দিওনা, ভালোবাসা দিয়ে ওর সব কষ্ট দূর করে দিও।’

আমি এবার কিছুটা সাহস করে বলি,
‘চিন্তা করবেন না স্যার।একবার শুধু আদিত্যকে সুস্থ হতে দিন।আমি চিরকাল ওর খেয়াল রাখব।আর কোন কষ্ট পেতে দেবনা।’

‘গুড এটাই শুনতে চেয়েছিলাম।আমি এখন আসছি।কোন প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবে।আর এখন থেকে আমিও কিন্তু তোমার বাবার মতো।’

রুহান স্যারের কথা শুনে আমার চোখে জল চলে আসে।আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না এই রাগী,বদমেজাজি লোকটা এভাবে আমায় আপন করে নেবে।

যদি উনি এত ভালো মানুষ হন তাহলে আদিত্যর মায়ের সাথে ওনার এত সমস্যা কেন।আমার মাথায় প্রশ্নটা কিছুক্ষণ ঘুরপাক খেলেও খুব একটা পাত্তা দিলাম না।

রুহান স্যার চলে যাওয়ার পর লিলি আমার কাছে আসে।এসে বলে,
‘আদিত্যর জ্ঞান ফিরে এসেছে।চল দেখবি চল।’

লিলির কথা শুনে আমি আর দেরি না করে ছুটে যাই আদিত্যর কেবিনে।

আমায় দেখে আদিত্যর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।কিন্তু আদিত্যর মায়ের মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।আদিত্যর মা আমায় বলেন,
‘এই মেয়ে কেন এসেছ এখানে? চলে যাও বলছি।নাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবেনা।’

আদিত্য ওর মাকে থামিয়ে বলে,
‘আম্মু ওকে আমি ভালোবাসি।প্লিজ ওকে এভাবে বলোনা।’

‘মেয়েটা তোকে এত কষ্ট দিল।আজ ওর জন্য তোর এই অবস্থা।আর তুই কিনা ওর হয়ে কথা বলছিস।’

‘আমার সাথে যা হয়েছে তাতে হিয়ার কোন দোষ নেই আম্মু।আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে ড্রাইভ করছিলাম।দোষটা তো আমারই।’

‘তবুও এই মেয়েটা তোকে ঠকিয়েছে।আমি কিছুতেই ওকে আর তোর কাছে আসতে দেবনা।’

‘প্লিজ আম্মু, আমি তোমায় রিকোয়েস্ট করছি।আমাদের আর আলাদা করে দিওনা।একবার হারিয়ে ওকে ফিরে পেয়েছি।আরেকবার যদি হারিয়ে ফেলি তাহলে আর আমি বাচব না।’

‘চুপ কর তুই।আর কোনদিনও এমন কথা বলবি না।তোর ভালোর জন্য আমি সব করতে পারি আদিত্য।তুই যদি এই মেয়েটাকে ভালোবাসিস তাহলে ওকে নিয়ে থাকতে পারিস।আমার কোন আপত্তি নেই।’

তারপর উনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,
‘শোন হিয়া।তুমি যদি আমার ছেলেকে আর কখনো কোন কষ্ট দাও তাহলে আমার থেকে খারাপ কিন্তু কেউ হবে না।মনে রেখো।’

কথাটা বলে উনি কেবিন থেকে বেরিয়ে যান।
১৬.
আমি আদিত্যর কাছে যাই।আদিত্যকে এই অবস্থায় দেখে যে কি খারাপ লাগছিল বলে বোঝাতে পারব না।

আদিত্য আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আমাকে আর কখনো ছেড়ে যেওনা হিয়া।এই কয়দিন তোমাকে ছাড়া যে কত কষ্টে ছিলাম সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’

‘আমি কথা দিচ্ছি আদিত্য।এরপর মৃত্যু ছাড়া আর কেউ কখনো আমাদের আলাদা করতে পারবে না।’

আমি আদিত্যকে বিশ্রাম করতে বলে বেরিয়ে আসি।তৃপ্তি এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে,
‘আদিত্য এখন কেমন আছে?’

‘কিছুটা সুস্থ।’

লিলিঃউফ, এতক্ষণ যে কি টেনশনে ছিলাম বলে বোঝাতে পারব না।আমি এখন যাই রে আজ আব্বু আমায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলেছে।

তৃপ্তিঃহ্যা আমাকেও ফিরতে হবে।আম্মু নাহলে অনেক রাগারাগি করবে।

লিলি আর তৃপ্তি একসাথে বেরিয়ে যায়।আমি হাসপাতালেই ছিলাম।পিছন থেকে হঠাৎ কেউ একজন আমায় স্পর্শ করে বলে,
‘আরে হিয়া না।কেমন আছিস?’

আমি পিছনে ফিরে তাকাতেই অবাক হয়ে যাই।কিছুটা আনন্দিতও হই।

‘ধ্রুব তুই।কেমন আছিস?’

‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো।কিন্তু তোর কি খবর? হাসপাতালে কি করছিস।’

‘একজন পেশেন্টকে দেখতেই এসেছিলাম।বাহ, তুই তো দেখছি শেষপর্যন্ত মেডিকেলে চান্স পেয়েই গেলি।স্কুলে থাকতে তো আমরা দুজনেই ডাক্তার হইতে চাইতাম।তারপর আমার দূর্ভাগ্য ম্যাট্রিকে জিপিএ ৫ মিস হয়ে গেল।তাই আর ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলোনা।কিন্তু আমি জানতাম তুই ঠিক মেডিকেলে চান্স পাবি।আমাকে জানাস নি কেন?’

‘কি করে জানাবো? এসএসসির পর তো ঢাকায় চলে এলাম আর তুই গাজীপুরেই রয়ে গেলি।তোর তো স্কুলে পড়া অবস্থায় কোন ফোনও ছিলনা। আর তোর বাড়িতে যে যোগাযোগ করব তোর বাবার ভয়ে সেটাও হয়ে ওঠেনি।তবে আমাদের ভাগ্যে বোধহয় আবার দেখা হওয়া লেখা ছিল।তাই দেখ আবার দেখা হয়ে গেলো।’

‘তা ঠিক।তুই তো দেখছি এখন আগের থেকেও বেশি হ্যান্ডসাম হয়ে গেছিস।তা গার্লফ্রেন্ড নেই তোর?’

‘আমি এসব প্রেম-পিরিতির মধ্যে নেই।তুই তোর খবর বল।’

ধ্রুবকে আদিত্যর কথা বলা উচিৎ হবে কিনা ভেবে পেলাম না।এরমধ্যে ও আমায় বলল,
‘আমার ক্লাস শুরুর টাইম হয়ে গেছে।তাড়াতাড়ি করে তোর নম্বর দে।এতদিন পর যখন আবার দেখা হয়েছে তখন তোকে আর হারাতে চাইনা।’

আমি ধ্রুবকে ফোন নম্বরটা দিয়ে দিলাম।এরপর ও চলে গেলো।ধ্রুব হলো আমার বন্ধু।আমরা ক্লাস ফাইভ থেকে একসাথে পড়ি।বাবার ভয়ে কোন ছেলের সাথে সেভাবে মিশতাম না।কিন্তু ধ্রুব অনেক মিশুক ছিল।যেচে আমার সাথে কথা বলত।স্কুলে ধ্রুবই আমার একমাত্র ছেলে বন্ধু ছিল।একসময় আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে উঠি।

এসব ভাবতে ভাবতেই হোস্টেলে চলে গেলাম।একটু ঘুমিয়ে নিলাম।

পরেরদিন ভার্সিটিতে দুটো ক্লাস করে বেরিয়ে পড়লাম আদিত্যকে দেখার জন্য।তবে হাসপাতালে গিয়ে সবার আগে ধ্রুবর সাথে দেখা হলো।ধ্রুব খুব জেদ করল আমি এখানে কার সাথে দেখা করতে এসেছি ও তাকে দেখতে চায়।

আমিও আর না করতে পারলাম না।ধ্রুবকে নিয়ে এলাম আদিত্যর কেবিনে।আদিত্য কি ধ্রুবকে দেখে রেগে যাবে? এই শঙ্কায় আছি।
চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here