মন_গহীনের_গল্প পর্ব-১১ রূবাইবা_মেহউইশ

মন_গহীনের_গল্প
পর্ব-১১
রূবাইবা_মেহউইশ
___________________
গৌধূলি কমলারঙে রঙিন হয়ে পশ্চিমে পাড়ি জমিয়েছিলো অনেক আগেই। পথে অন্ধকার সড়কবাতির আলো তো কখনো আসা যাওয়া করা গাড়ির হেড লাইটে সাঁই করে পেছনে চলে যাচ্ছে। থালার মত এক মস্ত চাঁদ খোলা আকাশে ঝলমলিয়ে হাসছে। হাত দুটো ব্যাথায় অবশ হয়ে আসছে মেহউইশের। সারাটাদিন একটা তিন মাসের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে থাকা তার জীবনে এটাই প্রথম। হাসপাতালে বাচ্চাদের ওয়ার্ডে সে কাজ করেনি কখনও তবুও একটু আধটু নিয়েছিলো কোলে৷ কিন্তু এভাবে সারাদিন! আত্মীয়-স্বজনও তেমন ছিলো না তাই অভিজ্ঞতার ছিটেফোঁটাও নেই তার। যে পথ আট ঘন্টায় শেষ করা যেত তা দশ ঘন্টার বেশি লাগছে তাদের । পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে থামিয়ে নির্জনকে খাওয়ানো আবার সে টয়লেট করায় ডায়াপার চেঞ্জ করা নির্জনকে সাফ করার কাজটাও রিশাদ নিজ হাতেই করেছে৷ মেহউইশ অবাক হয়ে শুধুই তাকিয়েছিলো। একটা ছেলে এতোটা দক্ষ হাতে সন্তানের যত্ন করতে পারে! সেও কিনা প্রথম সন্তান৷ মেহউইশ মেয়ে হয়েও এতখানি যত্ন কি করতে পারবে? ‘কক্ষনোই না’ নিজের ভেতর থেকেই সে জবাব পায়। রিশাদ মানুষ হিসেবে কেমন তা প্রথম দিনের আচরণে লেগেছিলো দানবের মতন। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ দিনেও অথচ আজকের এই রুপে সে এতোটাও মন্দ নয় ।কোথাও একটা লেখা পড়েছিলো মেহউইশ, হুমায়ূন আহমেদ স্যার তার মেয়ে শিলাকে বলেছিলো পৃথিবীতে খারাপ পুরুষ অনেক আছে কিন্তু খারাপ বাবা একটাও নেই।’ সন্তানের ভালো প্রতিটা বাবাই চায়। মায়েরা কি চায় না! অবশ্যই চায় নইলে নীলিমা এতোটা রিস্ক নিয়ে রিশাদের মত লোকের পেছনে লোক লাগানোর সাহস করতো না। আমার খোঁজও সে জানতো না আর আমাকেও এসে অনুরোধ করতো না নির্জনকে দিয়ে দিতে। নীলিমা সেদিন যা করেছিলো সবটাই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য কিন্তু সে যে ভুল করেছে তা হয়তো কখনোই আর সন্তানকে ফিরে পাওয়ার পথ করে দিবে না। অন্তত এই চারদিনে মেহউইশ যেই রিশাদকে দেখেছে নীলিমার জন্য ছেলেকে নিজের করে পাওয়া অসম্ভব । বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে মেহউইশের। জীবন বড় বিচিত্র। যেই লোকটা সন্তানের জীবনে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো পিতা সেই মানুষটাই আবার একটা মেয়ের জীবনে সবচেয়ে খারাপ লোক।

রাতের আঁধার ঘন থেকে ঘনতর হচ্ছে ।সমতল ভূমি ছেড়ে গাড়ি পাহাড়ি রাস্তায় উঠছে ধীরে ধীরে৷ মেহউইশ গাড়ির ভেতরে বসে অন্ধকারে যতটুকু ঠাওর করলো তারা পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে মোটামুটি উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। গায়ে পশম কাঁটা দিচ্ছে ভয়ে। এ পথে ঢাকা শহরের মত যেখানে সেখানে ল্যাম্পপোস্ট নেই। গা কাঁপিয়ে কান্না চলে আসবে আসবে অবস্থা।দু চোখ বন্ধ রেখে বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে শুরু করলো মেহউইশ আর দু হাতে নির্জনকে জাপটে ধরে রেখেছে বুকের মাঝে। পাশ থেকে মেহউইশের বিড়বিড় করা আওয়াজ কানে আসতেই এক পলক তাকিয়ে রিশাদ গাড়ির চলার গতি কমিয়ে দিলো। এই পাহাড়ি রাস্তায় নিজে ড্রাইভ করার অভিজ্ঞতা তার অনেক পুরনো৷ এ পথ এতোটাও উঁচু কিংবা আঁকাবাঁকা নয় যতোটা বান্দরবান,রাঙামাটির পথ৷ গাড়ি এসে থামলো সমতল থেকে কিছুটা উঁচুতে। জায়গাটা পাহাড়ের ওপর তা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না। গাড়ি থেকে রিশাদ আগে নামলো৷ ফোনের ফ্ল্যাশ অন করতেই একটা শব্দ হলো। শব্দটা ঠিক কাঠের ঠক ঠক শব্দের মত। গা ছমছমে অন্ধকার সামনে দাঁড়ানো রিশাদকেও চোখে পড়ছে না এখন ঠিকঠাক । গাড়ির জানালা খোলা বলেই হয়তো ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগছে। পরনে থাকা ওড়নাটা সুতির মধ্যে হওয়ায় ভালো হলো। নির্জনের দিকে তাকিয়ে মনে হলো বাচ্চাটারও শীত লাগছে কিন্তু কাঁচ উঠানোটাই জানে না মেহউইশ। বলতে গেলে এইরকম গাড়িতে সে রিশাদের সাথে বিয়ে হওয়ার পরই প্রথম উঠেছে। তার আগে সবসময় বাস,মাইক্রো কিংবা হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সে চড়েছে অনেক। সি এনজিতে ভাড়া বেশি হয় বলে কখনো সিএনজিতেও চড়ে না সে। বাইরের শীতল হাওয়া পশম ভেদ করে যেন মাংসে খোঁচাচ্ছে এবার। দ্রুত নিজের গায়ের ওড়নাটা দিয়ে নির্জনকে ঢেকে নিলো। তাকে সে এতোটাই ঢেকেছে এবং এমন করে ঢেকেছে যা দেখে যে কারে ভ্রম হবে সে নির্জনকে দুধ পান করাচ্ছে; এমনকি হয়েছেও রিশাদের। সে গাড়ির কাছে আসতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছিলো মেহউইশের দিকে তাকিয়ে। পরক্ষণেই তার ভুল ভেঙে গেছে মেহউইশকে মাথার ওপর কাপড় টেনে ঠিক করতে দেখে। এক মুহূর্তের জন্য রিশাদের মনে হয়েছে মেহউইশ বুঝি তার সন্তানের সত্যিকারের মা হয়ে গেল এবার৷ তবুও শান্তি মা না হোক সৎমায়ের আচরণও করছে না সে নির্জনের সাথে এই তো ঢের। রিশাদের সারাদিনের ক্লান্তি যেন এই এক টুকরো ভালোলাগায় দূর হয়ে গেল হাওয়ার বেগে। কানে আসছে সমুদ্রের গর্জন। এই পাহাড় থেকে পথ ডিঙিয়ে সমুদ্রে যেতে আধ ঘন্টা লেগে যায় অথচ পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ওই দূরের সমুদ্রের গর্জন কতো স্পষ্ট আর কতোটা কাছে মনে হয়৷ আচ্ছা, মেবিশ কি শুনেছে সমুদ্রের গর্জন! কথাটা মনে আসতেই রিশাদ গাড়ির সামনে এসে গাড়ির দরজা খুলে ডাকলো, মেবিশ!

মেহউইশ তাকালো রিশাদের দিকে৷ ফোনের ফ্ল্যাশের আবছা আলোয় রিশাদের মুখে এক ঝলক হাসি চোখে পড়লো তার।

-গাড়ি থেকে নামো। আমরা চলে এসেছি।

মেহউইশ চুপচাপ নেমে এলো গাড়ি থেকে ততক্ষণে আবারও কাঠের ঠক ঠক শব্দ৷ এখানে এই পাহাড়ের মাটিতে এমন শব্দ কি করে আসে! কয়েক সেকেন্ড পরই সে রহস্যের জাল ভাঙতে সক্ষম হলো। একজন বৃদ্ধা হাতে একটা লাঠি যেটাতে ভর দিয়ে সে এগিয়ে আসছে। রিশাদ গাড়ি থেকে নির্জনের ব্যাগটা আগে বের করলো এবং সেটা নিয়েই মেহউইশকে বলল, ‘চলো।’

বৃদ্ধা মহিলা রিশাদকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই মেয়ে কে?’

‘আপনার বউমা।’

‘নীলিমা?’ বৃদ্ধা প্রশ্ন করলেন। মেহউইশ এবার ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে দাঁড়ানো রিশাদকে দেখলো। অন্ধকারে যতটুকু বোঝা গেল রিশাদের মুখ,চোখের ভাব কঠিন। কিন্তু সে জবাব দিলো না বৃদ্ধার প্রশ্নের। ধীরে ধীরে রিশাদ আর বৃদ্ধাকে অনুসরণ করে মেহউইশ হাটতে থাকলো। পায়ের তলায় মাটি নেই টাইলেসের মত মনে হচ্ছে পথটা। পথেও কি টাইলস বসানো হয়! জানা নেই মেহউইশের । তবে তারা একটা কাঠের গেইট দিয়ে যতখানি সরু পথ পেরুলো পুরোটাই এমন টাইলসওয়ালা মনে হলো। এবার বুঝতে পারলো বৃদ্ধার হাতের লাঠির এই ঠকঠক শব্দ তখন এ পথে হেটে যাওয়ার কারণেই হয়েছিলো যেমনটা এখনও হচ্ছে।

সন্ধ্যের পর থেকে মাইমুনা রিশাদের নম্বরে কল করছে। দুয়েকবার মেহউইশের নম্বরেও করেছে। একটিবারের জন্যও কারো নম্বরে কল কানেক্ট হয়নি। চিন্তায় অস্থির মাইমুনার এবার কান্না আটকানো দ্বায় হয়ে পড়ছে। না চাইতেও মাথায় নানারকম দুশ্চিন্তা ভর করছে তার। সকালে ওরকম রেগে গেল রিশাদ মেহউইশও কেমন মুখের ওপর বলল সে পালিয়ে যাবে। রিশাদের মত ছেলে পারে না এমন কোন কাজ নেই তা ধারণা হয়ে গেছে মাইমুনার। যে ছেলে নিজ স্বার্থে মানুষকে কিডন্যাপ করে বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। এই ছেলের মানসিক সুস্থতা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে মাইমুনার। তার মেয়েটাকে এই ভয়ংকর লোকের হাত থেকে ছাড়াবে সে ভেবে পায় না। রাতের খাবার বেড়েছে তবুও মিহাদ খাচ্ছে না। তারও বোনের চিন্তায় গলা দিয়ে খাবার নামবে না। মা, ছেলে বড় আতংকে আছে সারাটাদিন মেহউইশের কোন খোঁজ না পেয়ে। মনে মনে আল্লাহকে ডাকা ছাড়া তাদের আর কোন পথও নেই। আত্মীয়-স্বজন বলতে মেহউইশের এক মামা ছাড়া কেউ নেই। তার কাছেও সাহায্য চাওয়ার মুখ মাইমুনার নেই।

শীতল আবহাওয়ায় যে শীত ছাড়াও কতোটা শীতল হয় তা এই পাহাড়ে না আসলে মেহউইশের জানা হতো না। দিনভর গরমে অতীষ্ঠ হয়ে বমি বমি ক্লান্তি নিয়েও গাড়িতে পার করেছিলো ভালোই। কিন্তু রিশাদের এই পাহাড়ি বাড়িতে এসে শীতে এখন কাঁপা কাঁপা অবস্থা। আঁধার ঘেরা পাহাড়ের ওপর এই বাড়িটা বাহিরে থেকে কেমন তা দেখা হয় নি। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই বেশ অবাক হলো সে। কি সুন্দর ঘর কত সুন্দর পরিপাটি। ইশ, টাকা থাকলেই বুঝি এত কিছু করা যায়! রিশাদরা বুঝি টাকা খরচ করার পথ না পেয়ে এত গুলো বাড়ি বানিয়েছিলো! রিশাদ মেহউইশকে একটা ঘরে রেখে আবার বাইরে বেরিয়ে গেল। কানে এলো গাড়ির আওয়াজ। সে হয়তো আবার গেল কোথাও। কিন্তু এই বাড়িটা এতোই নির্জনে যে এখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজও কানে লাগছে। গাছে ভরা এলাকা তাই হয়তো ঝিঁঝি পোকার ডাকও শোনা যাচ্ছে। মেহউইশ যে ঘরটায় আছে সে ঘরটাতে খাট অনেক বড়। আবার দেয়ালে একটা আয়নাও আছে। দূরে দাঁড়িয়েই আয়নায় তাকালো। দারুণ লাগছে মেহউইশ তোকে! স্বগোতক্তি করে উঠলো সে। বিয়ে হয়েছে, বাচ্চা আছে,স্বামী আছে, অর্তবিত্ত আরো কত কি। শুধু ইভান হারিয়ে গেছে। তাচ্ছিল্যের হাসি উঠে এলো ঠোঁটের ভাঁজে। কোল থেকে নির্জনকে বিছানায় রেখে নিজেও পাশে আধশোয়া হয়ে রইলো। ক্লান্তিতে শরীর আর চলতে চাইছে না একটুও। দু চোখে ক্লান্তি ঘুম হয়ে নামতে চাইছে তার৷ জীবনে এই প্রথম লংজার্নি করলো৷ জীবনটাও একটা জার্নি কখনও একটানা চলছে কখনো আবার বিরতি দিয়ে। এ জীবনে ক্লান্তি এসে সূর্যের মতোই আবার অস্তমিত প্রায় প্রতিটা দিন। আবার ভোরের মতোই উদীয়মান৷ এ জার্নি কবে শেষ হবে? মন থেকে আওয়াজ এলো, ‘এ তো সবে শুরু এই জার্নির শেষ মৃত্যুর পর!’

চলবে

(গল্পের নতুন মোড় পরের পর্ব থেকে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here