মন_গহীনের_গল্প পর্ব-১৬ রূবাইবা_মেহউইশ

মন_গহীনের_গল্প
পর্ব-১৬
রূবাইবা_মেহউইশ

💞
পূর্বের আকাশ রক্তিমবর্ণে রঞ্জিত সূর্যের দখল তখনও তেমন ছিলো না। নির্জন কম্বলের তলায় গড়াগড়ি করে পায়ের নিচে চলে গেছে মেহউইশের। নির্জনের নাড়াচাড়া পায়ের কাছে টের পেয়েই ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে সে। নিজের কম্বলখানা সরিয়ে দেখতে পায় নির্জন উল্টো হয়ে হাত পা ছুঁড়ছে অথচ একটুও কাঁদছে না। আশ্চর্যজনক লাগলেও সত্যিই নির্জন আওয়াজ করলো না৷ মায়া হলো মেহউইশের তার প্রতি। বাচ্চাটা কি এখনই বুঝে গেছে মেহউইশ তার সৎ মা! আর তাই হয়তো দুষ্টুমি করবে না বলে ঠিক করেছে। কে জানে সৎ মা হয়তো মারবে দুষ্টুমি করলে৷ মেহউইশ হাসছে একা একাই এসব ভেবে। হঠাৎ খেয়াল হলো নির্জনের বিপরীতে কম্বল ভাজ করে রাখা। তারমানে রিশাদ তার কম্বলটা নিজেই গুছিয়ে রেখে গেছে। কম্বলের পাশেই মেহউইশের ফোন আর তার নিচে এক টুকরো সাদা কাগজ। ফোন উঠিয়ে কাগজটা হাতে নিতেই চোখে পড়লো গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, ‘বিকেলের মধ্যে একটা পার্সেল আসবে। নাম সাইন করে রেখে দিও। এবং আনপ্যাক করে সাইজ চেক করে নিও। যেগুলো আনফিট হবে সেগুলো আলাদা করে রাখবে।’

‘সাইজ’ শব্দটা পড়ে মেহউইশের প্রথমে অন্য কথাটাই মনে আসলো। সে বিরক্ত হলো বিশ্রী রকমের। মনে মনে গালিও দিলো অসভ্য,ইতর লোক আর কিছু পেলি না অর্ডার করতে। শালা খবিশ কোথাকার! সকালের ফুরফুরে মেজাজটা এক মুহূর্তেই খারাপ হয়ে গেল।শেষ পর্যন্ত কিনা আন্ডারগার্মেন্ট প্রোডাক্ট আসবে তার জন্য পার্সেল হয়ে!

অম্বর ছোঁয়া ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে৷ অষ্টাদশী কন্যার নগ্ন পা ভিজিয়ে নোনাজল ফিরে ফিরে যাচ্ছে দূরে। ট্যুরিস্টদের আনাগোনায় পূর্ণ কক্সবাজারের প্রতিটি তীর। রিশাদের সময় থমকে আছে বালুতে দৌড়ে বেড়ানো লাল কাঁকড়ার পায়ে। সময়ও আজ তাকে চিমটি কেটে সাবধান করছে নির্জনকে সামলে রাখতে। শত্রুরা তার প্রতিটা পদচারণা তীক্ষ্ণ নজরে লক্ষ্য রাখছে। ডিভোর্সটাকে লিগ্যাল করতে আরও নাকি মাসখানেক লাগবে এমনটাই বলেছে উকিল। বাচ্চাটাকে নিয়ে লড়াই করাটা বড্ড মুশকিল। মেহউইশও তাকে নিজের করবে বলে মনে হয় না। পরনের সাদা শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা। সামুদ্রিক বাতাসের তেজে শার্টের ইন কখন একপাশ থেকে খুলে গেছে খেয়াল নেই। রুক্ষ চুলগুলো এলোমেলো হয়ে চোখেমুখে লুটোপুটি খাচ্ছে৷ বা হাতের কব্জিতে গাঢ় নীল রঙের টাইটা পেঁচিয়ে রাখা। দুশ্চিন্তাগুলো আচমকাই ঝড়ো বাতাসের মত রিশাদকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। এই ভর দুপুরে ক্লান্ত শঙ্খচিলের মত কিছুটা কষ্টও তাকে ক্লান্ত করে পথ হারা পথিকের মত উদভ্রান্ত করছে। ‘পিছুটান’ মারাত্মক পিছুটানে আটকে পড়েছে সে৷ অকূল পাথারে কোন কিনারা চোখে পড়ছে না। এতটুকু জীবনে মেহউইশ আর তার পরিবারের অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বায়িত্ব নিজেই নিজের কাঁধে টেনে এনেছে।মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে এদিকে নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎও এখন শংকাজনক বৈকি। বাবা কেন এত স্ট্যাটাস ফলো করছেন যেখানে তার সন্তানের সুখ নেই!

-‘স্যার!’ রিশাদের হোটেলের ম্যানেজার আল ইমরান বিচে এসে রিশাদকে ডাকলো।রিশাদ অন্যমনস্ক থাকায় প্রথম ডাকটা শুনলো না। ম্যানেজার আবারও ডাকলেন, ‘স্যার, মিসেস নীলিমা এসেছেন।’

– হু!

‘আপনার কাছে ম্যাম এসেছেন।’ ম্যানেজার ইতস্তত করেই বললেন কথাটা। তিনি জানেন নীলিমার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাই হয়তো হেজিটেশন বোধ করছিলেন কিছুটা।

‘আপনি যান আমি আসছি’ বলেই রিশাদ শার্টের ইন পুরোটা খুলে ফেলল।হাত দিয়েই চুলগুলোকে ঠিক করার বৃথা চেষ্টা করলো। হাতের টাইটা খুলে গলায় পরতে পরতে হোটেলের দিকে রওনা দিলো সে। হাতের ঘড়িটাতে সময় দেখলো বারোটা বাজে। নীলিমার কি এসময় আসার কথা ছিলো! মনে করতে পারলো না সে সঠিক সময়টা। শুধু মনে হলো এখন তাকে স্ট্রিক্ট থাকতে হবে যতোটা সম্ভব । যে কোন কিছুর বিনিময়ে নির্জন শুধু তার কাছে থাকবে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে নিজের ঠিক করা উকিলকে কিছু কাগজ তৈরি করতে বলে হোটেলের দিকে অগ্রসর হলো। মধ্যদুপুরে তপ্ত বালুতে রিশাদের পায়ের তালু ঝলসে যাওয়ার জোগাড় তবুও অনুভব কিছুই হচ্ছে না। জুতো জোড়া সে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে এসেছে। আজ হুমায়ূন আহমেদ এর হিমুর মত নগ্ন পায়ে একটু পথ চলেই দেখুক না। কেমন লাগবে! অনুভূতিশূন্য মনটাতে বালুর উত্তপ্ততা পায়ের চামড়া ভেদ করতেই পারেনি বুঝবে কি করে সে কেমন লাগে?

পাহাড়ের গা বেয়ে সরু একটা পথ নেমে গেছে সমতল এক রাস্তায়। মেহউইশ একটু আগেই নির্জনকে ফুপুর কোলে দিয়ে আনতুংকে সঙ্গী করে পাহাড় থেকে নিচে যাচ্ছে। রঙিন প্রজাপতির মত পাখনা মেলে ঘুরে বেড়ানোর দারুণ এক সুযোগ সে পেয়েছে আজ। একঘেয়ে জীবনের বাইরে এমন সবুজ এক ভুবন সে আগে কখনো দেখেনি। ফুপু নিজেই বলেছেন, ‘মেয়ে তুমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসো।’

মেহউইশ অবাক হয়ে তাকাতেই তিনি আবার বললেন, ‘ এই পাহাড় থেকে একটু নিচেই ছোট্ট একটা বাজার আছে চাকমাদের। ঘুরে আসতে পারো আনতুংকে সাথে নিয়ে যাও। গাড়ি তো রিশাদ নিয়ে গেছে তুমি রাস্তার পাশে অপেক্ষা করলে গাড়ি পেয়ে যাবে যাওয়ার।’ আনতুং বলে উঠলো, ‘ দুই মিনিটের রাস্তা গাড়ির কি কাম!’

কিছুক্ষণ দু মন দু দশা করে করে শেষ পর্যন্ত বেরিয়েই পড়লো মেহউইশ সঙ্গী হলো আনতুং আর এক প্রতিবেশী মেয়ে । ঠিক হলো হেটেই যাবে তারা। সোজা ঢালু পথটা রেখে আনতুং নিয়ে গেল পাহাড়ের গা বেয়ে উঁচু নিচু পথে। যে পথে গাছ আর ঘাস মিলে সবুজাভ লাগে পুরো পৃথিবীটাকেই। নামাটা কষ্ট না করে করেও অনেক কষ্টেই নামতে হলো তাদের। বাজার পর্যন্ত আসতেই ঘেমে নেয়ে একাকার মেহউইশ। সে পাহাড়ের গায়ে একটা ভাঙা পাথরের উপর বসে পড়লো৷ আনতুং বলল আর একটু সামনেই বাজার আমরা এসেই পড়েছি। এদিকে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে মেহউইশের ভয় রিশাদের চিরকুটটা নিয়ে। সত্যিই কি ওসবের পার্সেল আসবে বাড়িতে! রিসিভ করতে হবে সেগুলো আবার কোন রকম ভুল হলে লোকটা থাপ্পড় মারবে নাতো! ভয়েই একটা হাত আপনাআপনি গালে চলে গেল তার। আনতুং ডাকলো জলদি করো বাজারে যেতে দেরি হচ্ছে । ফেরার পথে গাড়ি না পেলে এই পথেই কিন্তু ফিরতে হবে৷ মেহউইশ উঠে দাঁড়ালো, আবার চলতে শুরু করলো পাহাড়ের চিকন রাস্তা ধরে। কয়েক মিনিট বাদেই চোখে পড়লো পথের কিনারা ঘেঁষে কয়েকটা বাঁশের তৈরি মাচা। তাতেই রয়েছে কিছু বাশ,বেতের তৈরি জিনিস। একপাশে তাঁতে বোনা পাহাড়ি খাদি কাপড়। কিছু এ্যালুমিনিয়ামের তৈরি জিনিসপত্র আর কিছু চুড়ি আলতা,ফিতা,কাজল বিভিন্ন প্রসাধনী। হতাশ হলো মেহউইশ এই সামান্য কিছু জিনিস দেখে। এর চেয়ে ভালো আর বেশি কিছু তো তার বাড়িতেই ছিলো। আবার মনে পড়লো বাড়িতে আছে এখানে তো নেই। এখানে এক মুঠো চুড়ি, একটা কাজলও নেই৷ আর করবেটা’ইবা কি সে এসব দিয়ে? যার জন্য সে সাজতে ভালোবাসতো সেই মানুষটাই তো আর তার নেই৷ সে নিজেও কি আছে আর তার! এক গুচ্ছ রেশমি চুড়ি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো সে পছন্দও হলো তার। হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট একটা পার্স যেটা রিশাদের ফুপু আসার সময় দিয়েছিলো সেটা খুলল। ফুপু পার্সের সাথে পাঁচশ টাকার একটা নোটও দিয়েছেন কেনাকাটার জন্য৷ সেটা দিয়েই দু’মুঠো চুড়ি কিনলো, একটা কাজল আর একটা ঝুনঝুনি যা ছোট্ট বাচ্চাদের খেলনা। চুড়ি কেনার পরই পাশের মাচায় হলুদ আর গোলপি মিশ্রিত রঙের ঝুনঝুনিটাতে চোখ যায় মেহউইশের। মনে পড়ে যায় নির্জনের কোমল মুখটি। ওই শান্ত বাচ্চাটির জন্য মায়া হয় এখন তার। খুশিমনেই ঝুনঝুনিটা কিনে আর কিছুই কিনবে বলে আনতুংকে ডাকলো ফেরার জন্য । আনতুংও বেতের তৈরি কিছু ঝুড়ি কিনলো প্রতিবেশী মেয়েটিও কিনলো। রাস্তার কিনারায় দাঁড়িয়ে রইলো তারা অনেকক্ষণ কোন গাড়িই না পেয়ে মেহউইশ বলল, ‘চলো সোজা পথেই হেটে যাই। গাড়ি পেয়ে গেলে উঠে যাবো। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে এখানেই সন্ধ্যে নামবে।’ সম্মতি জানিয়ে বাকি দুজনও হাটতে লাগলো। চলতি পথে থেমে থেমে একটা দুটো গাড়ি সাঁই সাঁই করে চলে যাচ্ছে। মেহউইশ শহরে থাকা মেয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়া তার পুরনো অভ্যাস। গাড়ি থামানোটাও কঠিন ব্যাপার নয় কিন্তু এখানে হয়তো ঢালু পথে যখন তখন গাড়ি থামানোটা সম্ভব হয় না। কি জানি! মেহউইশ অতশত বোঝে না সে বারবার হাত বাড়িয়ে গাড়ি দেখলেই থামানোর জন্য ইশারা করছে৷ চলতি পথে সামনে থেকে আসা হঠাৎ একটা মাইক্রোবাস আচমকা এলোমেলোভাবে এসে মেহউইশদের ধাক্কা মেরে বসলো৷ কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মেহউইশ আর প্রতিবেশী মেয়েটা পায়ে আঘাত পেল। কিন্তু তারা ভাগ্যের সুআচরণেই হয়তো অল্প আঘাতে বেঁচে গেলেও মাইক্রোবাসটি পড়লো খাদে৷ব্যথার চেয়ে ভয়টাই এতবেশি পেল মেহউইশ যার ফলে সে জ্ঞান হারালো। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন সে চট্টগ্রাম শহরে একটা বেসরকারি ক্লিনিকের ছোট্ট কেবিনে শুয়েছিলো। পাশেই সাদা শার্ট গায়ে রিশাদ বসে আছে। সকালে কি ড্রেস পরেছিলো রিশাদ তা জানতো না মেহউইশ৷ এখন এই শুভ্ররঙে দেখে মনে হচ্ছে ঐশ্বরিক কোন সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তিত মুখখানি বিমর্ষ করে বসে আছে সে৷ আর মেহউইশ তার বিমর্ষতার প্রধান কারণ। আদৌও কি তাই! সকল রাগ,জেদ কোথায় গেল এই দানবের?

চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here