Thursday, April 30, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প মন_গহীনের_গল্প মন_গহীনের_গল্প পর্ব-৩০ রূবাইবা_মেহউইশ

মন_গহীনের_গল্প পর্ব-৩০ রূবাইবা_মেহউইশ

মন_গহীনের_গল্প
পর্ব-৩০
রূবাইবা_মেহউইশ
💞

হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় ফোনটাও রুমেই রেখে এসেছে রিশাদ। ম্যানেজার সাহেব প্রায় আধঘন্টা যাবৎ রিশাদকে কল করেও যখন পেলো না তখন বাধ্য হয়েই রিশাদের রুমের দরজায় নক করে। মেহউইশের সবে আলমারী গোছানো শেষ হয়েছে। দরজায় নক শুনে লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে দেখলো দরজায় কে আছে। ফুপু হলে নিশ্চিত নাম ধরেও ডাকতো দু একবার। বাইরে দাঁড়ানো ম্যানেজারকে মেহউইশ চেনে না। তাই দরজা খুলবো কি খুলবো না ভেবে রিশাদের ফোনটা নিয়ে দেখলো তাতে পচাত্তরটা মিসড কল। সাইলেন্ট থাকায় সে কোন আওয়াজই শোনেনি৷ হয়তো ফোন করা ব্যক্তিটিই দরজায় কিন্তু সে কি করবে ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলল৷

– ম্যাম, রিশাদ স্যার কি রুমে আছেন? ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলো।

-নাহ, তিনি অনেকক্ষণ আগেই ঘর থেকে বেরিয়েছেন।

-ফোনেও পাচ্ছিলাম না তাই এখানে আসতে হলো। ডিস্টার্ব করার জন্য দুঃখিত ম্যাম৷

-ইট’স ওকে। উনি ফোনটা ঘরেই ফেলে গেছেন।

মেহউইশ কথা শেষ করতেই ম্যানেজার ফিরে যাচ্ছিলো তখনি পেছনে রিশাদকে দেখা গেল। মেহউইশ তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। ম্যানেজার এগিয়ে গিয়ে রিশাদকে কিছু বলতে চাইলে সে থামিয়ে দিলো, ‘আপনি যান আমি কিছুক্ষণ পর এসে কথা বলছি আপনার সাথে।’

ম্যানেজার আর অপেক্ষা করেনি। মেহউইশ একবার খেয়াল করলো রিশাদের চোখ,মুখের অবস্থা ভালো নয়। ভয় হলো এখন কি রিশাদ তাকে আবারও কিছু বলবে এভাবে গেইট খুলে ম্যানেজারের সাথে কথা বলায়! এই লোকের তো মতি গতির ঠিক নেই। অবচেতন মনে অন্যরকম ভয় জেঁকে বসলো কিন্তু তার ধারণা ভুল করে দিয়ে চুপচাপ ঘরে ঢুকলো রিশাদ। জামা কাপড় পাল্টে আবার বেরিয়ে গেল তার ফোন আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে। মেহউইশও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে নির্জনের জন্য দুধ বানাতে লাগলো৷

জেবুন্নেসা তার বড় ভাইকে জানালো সে আর রাশেদের সাথে থাকবে না। ডিভোর্স এর জন্য এপ্লাই করতে চায়। শুধু বয়স না ছেলে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা বলেও তার ভাই তাকে বোঝালো এখন এটা কোন সমাধান নয়।ডিভোর্স সত্যিই কোন সমস্যার সমাধান হতে পারে না তা জেবুন্নেসাও মানে। সে তো এতবছর সংসারও করে আসছিলো চুপচাপ। কিন্তু এখন যা করছে রিশাদের সাথে ভবিষ্যতে রিহানকেও নিয়ে তা করতে পিছপা হবে না এই লোক। আর মেয়েটারও ভবিষ্যত ভাবতে হবে এখন থেকেই।

রাইমা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে ফ্লোরে তার পাশেই তার কাঁধে হাত রেখে বসে আছে বৃদ্ধা। দরজার আড়াল থেকে সরে গেছে রিহান। কিশোর বয়সী ছেলেটার গরম মস্তিষ্ক তার মায়ের অতীত শুনে আচমকাই বরফ শীতল হয়ে গেছে। রক্তশূন্য মনে হচ্ছে তার নিজেকে আর ঘৃণায় শক্ত হয়ে আসছে মন। এত বছর ধরে আব্বু বলে জানা লোকটাকে শুধু একজন ধর্ষক ছাড়া কিছুই মনে হচ্ছে না এখন তার। একটু আগেই বৃদ্ধা বলেছে, ওবাইদুল যখন রাস্তায় সবার সামনেই রেহনুমার বাবার পা জড়িয়ে ধরে, ক্ষমা চায় এবং রেহনুমাকে বিয়ে করতে চায় তখনি রেহনুমার বাবা রাজী হয়ে যান৷ সেদিনই পরীক্ষা শেষে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে দেন তাদের। তারপর দিন জেবুন্নেসাকে বিয়ে করে বাড়ি ফেরেন রিশাদের বাবা। বাড়িতে কোন প্রকার প্রশ্ন করার কেউ ছিলো না তখন। রেহনুমার বাবা জেবুন্নেসার পরিবার আর ওবাইদুল এর পরিবারকে ডেকে আনুষ্ঠানিকতার কথা জানান। জেবুন্নেসার পরিবার খান বাড়িতে উপস্থিত হলেও অনুপস্থিত থাকে ওবাইদুল আর তার পরিবার। ওবাইদুল কাজী অফিস থেকে বাবা মাকে আনতে যাওয়ার কথা বলেই বিয়ের কাজ শেষ করে চলে যায়। সেই যাওয়াই থাকে তার শেষ যাওয়া। গ্রামে গিয়ে নিজের ঘরেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে সে। জেবুন্নেসাকে ধর্ষনের হুমকি দিয়েই ওবাইদুলকে বিয়েতে রাজী করিয়েছে রাশেদ। শুধু হুমকিই নয় সে প্রতারণাও করেছে । ওবাইদুল তার কথা রেখেছে রেহনুমাকে বিয়ে করেছে কিন্তু রাশেদ তার কথা রাখেনি। ওবাইদুলের নামে চিঠি দিয়ে জেবুন্নেসাকে বাড়ি থেকে বের করিয়েছিলো সে। আটকে রেখে তাকে সত্যিই ধর্ষণ করেছে। যা জেবুন্নেসার পরিবার কিংবা রাশেদের পরিবারের সবার অজানা। আর বিয়েটাও জেবুন্নেসা রাশেদের মিথ্যে হুমকিতেই করেছিলো। তখন তার এতোটা সাহস ছিলো না রাশেদের বিরোধিতা করার। নিজের সম্ভ্রম হারিয়েও রাশেদের কথায় ভয় পেয়েছিলো। ধরেই নিয়েছিলো সে যে ব্যক্তি তাকে ধর্ষণ করতে পারে সে দুনিয়ায় পারে না এমন কোন কাজ নেই। ওবাইদুলকে খুন করতেও সে একবারও ভাববে না। আর সেই ভয়েই ইজ্জত হারিয়েও রাশেদকে বিয়ে করেছিলো। নিয়তি তো আগেই লেখা ছিলো যা জেবুন্নেসার অজানা। খান বাড়িতে পা রেখেই জানতে হলো ওবাইদুল আর রেহনুমার বিয়ে হয়েছে কাল এবং আজ ওবাইদুল মৃত। ভালোবাসার মানুষের পরিণতি জানার পর অনেক অনেক দিন পাগলের মত ছিলো জেবুন্নেসা। রেহনুমাও অর্ধমৃত লাশের মতোই পড়েছিলো বাড়িতে। সময় কারো জন্যই অপেক্ষা করে না। সময়ের সাথে সাথে জেবুন্নেসা অনেকটা স্বাভাবিক হলেও রেহনুমা আর রাশেদের প্রতি জন্ম নিলো তার মনে বিষাক্ত ক্ষোভ৷ রেহনুমাকে একদমই সহ্য করতে পারতো না সে। এরই মাঝে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ রেহনুমার বাবার মৃত্যু হলে রেহনুমা আরও ভেঙে পড়ে। সে জেবুন্নেসার ক্রুদ্ধ দৃষ্টির সামনে টিকে থাকার সাহস হারিয়ে একসময় দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাশেদও নিজের কৃতকর্মের ফল ভালো কিছু না পেয়েই হার মেনে বোনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। তার প্রয়োজনের সবটা খেয়াল রেখেই সে দেশে জেবুন্নেসার সাথে নতুন সংসারে মনযোগী হতে চান। ততদিনে রিশাদ বুঝতে শিখে গেছে তার খালা তার সৎ মা। যে কিনা তাকে একসময় আদর করলেও এখন বিনাকারণেই দূরছাই করে। এতে করে সে খালা থেকে দূর আর বাড়ির আয়া, কাজের লোকদের সাথেই বেশি ঘনিষ্ঠ হয়। তবে রক্তের ধারা থেকেই হয়তো অর্জিত জঘন্যতম রাগটাও তার মধ্যে বিস্তৃতি লাভ করে। রিশাদ দূর হতে থাকে বাবার সঙ্গ, মা নামক খালার সঙ্গ থেকে ; তার সময় কেটেছে নিতান্ত একাকীত্বে অথবা উশৃঙ্খল বন্ধু-বান্ধবের সাথে ঘুরে ফিরে। তবে দুটো জিনিস তার মধ্যে কখনো আসেনি একটা নারীঘটিত কোন বাজে দিক আর দ্বিতীয়টি তার পড়াশোনায় অবহেলা। এ দুটি ব্যাপার কখনোই ঢুকতে পারেনি তার মনে কিন্তু ভালোলাগাটা এসেছিলো একজনের প্রতি৷ বাবার অর্থ নিয়ে অহংকারে হারাতে হয়েছে প্রিয় মানুষটিকে। সময়ের ধার অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে খান বাড়ির প্রতিটি মানুষকে শুধু বদলায়নি জেবুন্নেসার মনের ক্ষত আর রাশেদ খানের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভ। লোকটাকে খুন করতে পারলেই হয়তো সে মন থেকে সুখ পেত৷

বৃদ্ধা তার কথা শেষ করে আঁচল টেনে চোখ মুছলো। সব কাহিনি বলতে বলতে কখন যে তারও চোখে জল এসে উপচে পড়েছে টের পায়নি। রিহান বাড়ি ছেড়ে কোথায়, কোন পথে হাঁটছে নিজেও জানে না। শুধু জানে কথাগুলো বুঝি তার আড়াল থেকে না শুনলেই ভালো হতো। মায়ের জীবনের বিশ্রী ঘটনাগুলো না জানলেই হয়তো স্বস্তিতে জীবন পার করা যেত। এই বয়সের ভয়ংকর রাগগুলো এখন তার নিজের বাবাকেই খুন করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে৷ কি হতো এখন এই মুহূর্তে যদি আব্বু সামনে থাকতো! পায়ের কাছে ভাঙা একটা পাথর চোখে পরতেই মনে হলো এটা উঠিয়ে ঠিক বাবার মাথায় আঘাত করতো সে অথবা কোন ধারালো তীক্ষ্ণ ছুরি থাকলে! রাগ যেন তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুকোষকে উত্তপ্ত করে তুলছে। কি করতো সে? কি করবে সে! বাবাকে খুন করবে নাকি মাকে নিয়ে চলে যাবে বহুদূর। এতোটা দূর যেখানে তার মায়ের গায়ে কোন দুঃখের আঁচ পড়বে না।

স্রোতের বিপরীতে চলার জন্য শক্তি সর্বদাই অধিক প্রয়োজন। মেহউইশের জীবনও তার বিপরীতে চলছে। রিশাদকে সে যতোই চাইছে এড়িয়ে যেতে, সুযোগ পেলে পালিয়ে যেতে ততোই সে দূর্বল হয়ে পড়ছে এ সম্পর্ক থেকে পালিয়ে যেতে। নির্জনের ওপর মায়া পড়ে গেছে ভীষণ। রাত বিরাতে ঘুমের ঘোরে রিশাদের জড়িয়ে রাখাটাও আজকাল আর খারাপ লাগে না। জাগ্রত রিশাদকে সে যতোটা তুচ্ছ করে ততোটাই সে ঘুমন্ত রিশাদকে পছন্দ করে। ইভানের ভালোবাসা স্মৃতি হয়ে একের পর এক দিন করে পেছনে চলে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে হোটেলে আসার তাদের একমাস পূর্ণ হয়ে গেছে। নিয়ম করে রোজ সকালে হাঁটতে বের হয় মেহউইশ সাথে থাকে রেহনুমা আর কোলে থাকে নির্জন। ভোরের হাওয়ায় গায়ে রোদ মেখে এই হাঁটতে বেরুনোটা বেশি উপভোগ করে মেহউইশ। তার পেছনে কয়েকটা কারণ। প্রথমত রিশাদ তাদের থেকেও আগে উঠে সৈকতে এসে দৌঁড়ায়। লক্ষ্য করেছে মেহউইশ গত দু মাসে রিশাদের এই একটা নিয়মে কখনো ব্যতিক্রম হয়নি। ঢাকায় থাকতেও বাড়ির বাইরে দৌঁড়ে বেরিয়েছে। পাহাড়ি বাড়িতে থাকতে পাহাড়ি আঁকাবাকা পথেও সে দৌঁড়েছে আবার এখানে এসে বিচেও তাই করে৷ তার রুটিনে এই একটা জিনিস বোধহয় কখনো বদলায়নি। আর দৌড়ে থাকা রিশাদকে দেখে তার সবসময় মনে হয় এই লোকটা খারাপ নয়। ভালো হয়ে যাবে একদিন। দ্বিতীয়ত, ভোরে উঠে তার শরীর ও মন দুটোই দিনভর চাঙ্গা আর ফুরফুরে থাকে আর তৃতীয়ত, তার ঘরের কাজকর্ম সে সকাল সকালই শেষ করে বিকেলে দারুণ অবসর কাটাতে পারে। এখানে এসেই রিশাদ বলে দিয়েছে নিজেদের সকল কাজ নিজেরাই করতে হবে। কাজের লোক দেওয়া হবে না একজনও এমনকি অতি প্রয়োজন ছাড়া হোটেল স্টাফদের সহায়তাও নেওয়া যাবে না। এই একটা ব্যাপারেই মেহউইশের মনে হয়েছে লোকটা খুব কৃপণ।

চলবে

( পজিটিভ,নেগেটিভ যে যেমনই মন্তব্য করেন সকল প্রকার মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাদের। আর যারা চুপ থাকেন নিরপেক্ষ হয়ে চুপচাপ পড়ে চলে যান তাদের বলবো একটু হাত নাড়িয়ে দু চারটা শব্দে কিছু লিখে যাইয়েন৷ আগামী দুই পর্ব থাকবে মেহউইশ-রিশাদময়। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here