মন_গহীনের_গল্প পর্ব-৩৬ রূবাইবা_মেহউইশ

মন_গহীনের_গল্প
পর্ব-৩৬
রূবাইবা_মেহউইশ
💞
মেহউইশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে রাইমার দিকে। মধ্যরাতে কোলাহলমুক্ত হোটেলের চারপাশে ভাসছে শুধু সমুদ্রের গর্জন। মোজাইক করা ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে ডান পায়ের জুতোর চিকচিক করা পাথরটাকে দেখছে রাইমা। রিসেপশনের একপাশে কিছু সোফা আছে যেখানে বসে অপেক্ষা করছে রাইমার বন্ধু- বান্ধবীরা। রুমের জোগাড় কাল দুপুর বারোটার আগে হবে না এমনটাই বলল রিসেপশনিস্ট ছেলেটা। আগে থেকে বুক না করলে রুম পাওয়া কষ্টকর এই ঋতুতে। শীত নামবে নামবে করছে এখন থেকেই পর্যটকদের ভীড় বেড়েছে। রিশাদ ভেবেছিলো রাইমার বন্ধুরা সব অনুষ্ঠানের দিন সকালে আসবে সেই হিসেবে রুম কাল থেকে রিজার্ভ রাখবে। ভুল তারও হয়েছে সাথে রাইমারও। একটাবার ফোন করলেও এমন নাজেহাল অবস্থায় পড়তে হতো না। কিন্তু এই মুহূর্তে ঘুমন্ত রিশাদ বড়ই চিন্তামুক্ত কিন্তু চিন্তার সাগরে পড়েছে মেহউইশ। একটু আগেই সে এখানে এসে রাইমার সাথে কথা বলতেই পেছন থেকে তানভীর বলল, ‘ আপনি এখানে!’ চমকেছে তানভীর মেহউইশকে দেখে চমকেছে মেহউইশও। অনাকাঙ্খিত এই দেখা বড্ড গোলমেলে করে দিলো সবটা। রাইমা কিছু বলার আগেই তানভীর আবার বলল, ‘ ভালো হয়েছে আপনাকে পেয়ে। এই হোটেলে আছেন আপনি তাই না৷আমার একটু হেল্প লাগবে।’

-‘তানভীর থামো’ রাইমা ভয়ে ভয়ে তানভীরকে থামাতে চাইলো৷ তানভীর থামলো না বরং রাইমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ দেখুন না এই হলো আমার গার্লফ্রেন্ড৷ এটা তারই ভাইয়ের হোটেল আর কাল তার ভাতিজার বার্থডে৷ আমি তার ফ্রেন্ডসদের সাথে এসেছি কিন্তু আপাতত তার ভাইয়ের সামনে পড়তে চাচ্ছি না। আপনি কি,,,’

-‘তানভীর তুমি আমার ভাইয়ের কাছে লুকাতে চেয়ে ভাবীকেই সব বলে দিচ্ছো!’ অসহায়ের মত কথাটা বলল রাইমা। তানভীর বিষ্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে৷ রাইমার কথায় যেন তার মাথার উপরই বজ্রপাত হলো৷ মেহউইশ তার ভাবী এটাই যেন বজ্রপাতের প্রধান কারণ। রাইমার কথা শুনে সেই যে স্তব্ধ হয়েছে তানভীর আর কোন কথা বলেনি। রাতের আঁধার হালকা হতে শুরু করেছে। ভোর হতে বেশি দেরি নেই আর রিশাদের এলার্ম ঠিক পাঁচটায় বাজবে। রাইমার বন্ধুরা সবাই সোফায় গা এলিয়েই পড়ে রইলো। দুপুরের বাসে রওনা দিয়েছিলো তারা । জ্যামে আটকে দিনের অর্ধেক সেই সাথে রাতেরও অর্ধেক তারা বাসেই বসে ক্লান্ত এখন৷ ফোন না করার বোকামির খেসারত দিতে হচ্ছে৷ রাইমাও এবার ক্লান্তিমাখা পায়ে একটা সোফায় গিয়ে বসলো৷ ঠিক তখনই তানভীর এসে আবার মেহউইশের সামনে দাঁড়ালো।

-‘আমার কিছু জানার ছিলো যদি একটু সময় দেন।’ তানভীর বলতেই মেহউইশ দূর্বল চোখে চেয়ে রইলো তার দিকে। সে জানে তানভীরের কৌতূহলী মন কি জানতে চায়।

– ‘যা ভাবছো তাই সত্যি। ইভানের সাথে আমার বিয়ে হয়নি বিয়েটা হয়েছে রাইমার ভাইয়ের সাথে আর বিয়েটা স্বাভাবিকভাবেও হয়নি। আর কোন কিছু জানতে চেয়ো না।’

-কিন্তু ইভান ভাইয়ারও তো বিয়ে হয়েছে শুনেছি সেটা কার সাথে!

-আমার জানার কথা নয়।

মেহউইশ আর কথা বাড়াতে চাইলো না। সে রাইমাকে বলল ছেলে তো মাত্র চারজন তাদের রুমের সমস্যা হবে না। মিহাদ এসেছে কাল তার জন্য যে রুম সেটাতে ছেলেরা ঘুমাতে পারবে৷ ভোর হয়েই এসেছে তাই মিহাদকে উঠিয়ে নিজের রুমে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মেয়ে আটজন রাইমাকে নিয়ে৷ চাইলেও ফুপুর ঘরে থাকা সম্ভব হবে না। তানভীর কথাটা শুনলো একটু ভেবে বলল সেই রুমে না হয় মেয়েরা রেস্ট নিক আমরা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসছি । মেহউইশও কিছু বলতে চাইলো তখনি তার হাতের ফোনটা বেজে উঠলো। খেয়াল হলো সে রিশাদের ফোনটাই নিয়ে এসেছে আর স্ক্রীণে তার নিজের নামটাই জ্বলজ্বল করছে। তারমানে রিশাদ জেগে গেছে।

-তানভীর তুমি চাইলে এখন একটু সৈকত থেকে ঘুরে আসতে পারো। একটু পর এসো তখন বলা যাবে রুম চাই তোমার। ওর ভাইয়া
জেগে গেছে।

-ঠিক আছে আমি না হয় একটু ঘুরে আসছি।

-‘মেবিশ তুমি এখানে কি করছো’ দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে রিশাদ প্রশ্ন করলো৷ সোফায় বসা রাইমা সটান দাঁড়িয়ে গেল রিশাদের গলা শুনে। কক্সবাজারে আসার আগ পর্যন্ত তার এবং তানভীরের প্ল্যান ছিলো তারা একসাথে কক্সবাজারে ঘুরবে৷ হোটেলে বন্ধুদের সাথে তানভীরকেও বন্ধু পরিচয়ে রাখবে । কিন্তু মেহউইশ যা বলল তাতে ভয় হচ্ছে । দাদাভাই অতি চালাক লোক সত্যিই বুঝে যাবে আসল ব্যপার।

রিশাদ ঘুমঘুম চোখে উসকোখুসকো অবস্থায়ই নিচতলায় এসেছে। গায়ে তার পাতলা টি শার্ট আর ট্রাউজার হাতে মেহউইশের ফোন। রাইমা এগিয়ে এসে কথা বলল৷ কেমন আছে, কখন এসেছে এই কথার পাট চুকিয়ে বলল রুম দরকার। রিসেপশনিস্টের দিকে তাকাতেই সে হড়বড় করে জানাতে লাগলো কোন ফ্লোরেই রুম খালি নেই৷ কাল বারোটার মধ্যে তিনতলায় খালি হবে দুটো, দোতলায় হবে। এক পলক সবার দিকে তাকিয়ে রিশাদ একটু বিরক্তই হলো। এত লম্বা জার্নি করে আসবে আগেই জানানো উচিত ছিলো। এই ভোরে রুম খালি করা সম্ভব নয়। রিশাদ নিজেই বুকিংয়ে রেখেছিলো দুটো রুম কাল বারোটা থেকে কিন্তু এখন! অনেক ভাবনা চিন্তার পর ঠিক হলো মিহাদের রুমে ছেলেরা থাকবে আর রিশাদের রুমটা সাইজে অনেক বড় সেই সাথে বেলকোনিটাও অনেকটা রুমের মত। পর্দা,ম্যাট্রেস ইভেন কাঁচঘেরা হওয়ায় বাইরের আলো বাতাস নিয়ে টেনশন নেই। তাই মেয়েরা ঘরে এবং বেলকোনি মিলিয়ে থাকার জায়গা পেয়ে যাবে। রিশাদ মেহউইশকে বলল তুমিও তাদের সাথেই ঘুমাও। মিহাদ আর নির্জনকে ফুপির ঘরে দিয়ে এসো।

– আর আপনি? মেহউইশ জানতে চাইলো।

-‘আমার আর ঘুম হবে না। এমনিতেও ফজরের আজান হবে একটু পর তারপর এমনিতেই উঠে পরতাম। আমার ফোনটা দাও বাইরে থেকে হাটাহাটি করে আসি৷’ মেহউইশ বুঝলো সে এখন তাদের জন্য জায়গা ছাড়তে চাচ্ছে। রিসেপশন থেকে বাইরের গেটে যতটুকু চোখ যায় অন্ধকার এখন হালকা হয়ে গেছে। মেঘাচ্ছন্ন কালচে রঙটা বড্ড ফিকে করে দিয়েছে রাতটাকে। গাঢ় অন্ধকার নেই আকাশে নিশ্চয়ই এখন শুকতারা আছে! ভেবেই কেমন শিহরণ জাগলো মনে। ঝট করে বলে ফেলল, ‘ একটু ওয়েট করবেন? ‘

প্রশ্নবোধক চাহনি রিশাদের তা দেখে মেহউইশ বলল, ‘ আমিও একটু হাটতে বেরুতাম৷ ওদের রুম গুছিয়ে দিয়ে এক্ষুনি আসবো আর নির্জনকে মা আর ফুপির কাছে দিয়ে আসবো।’ সম্মতিসূচক চোখের পলক ফেলে মাথা নেড়ে সায় দিলো রিশাদ। খুশি হলো মেহউইশ সে দ্রুত আবার ফিরে গেল নিজের কামরায়। নির্জনকে কোলে তুলে ফুপির রুমে নক করলো৷ ফুপি দরজা খুলে অবাক হলেন এসময় নির্জনকে সাথে নিয়ে মেহউইশকে দেখে। ভয়ও হলো রিশাদের সাথে ঝগড়া হলো নাতো আবার! কিন্তু মেহউইশ কোন ঘোরে আছে কে জানে! সে গড়গড় করে বলতে লাগলো রাইমা এসেছে তারা ঘুমাবে এখন তাই দুটো রুম দরকার। নির্জনকে আর মিহাদকে এখানে তাদের খাটেই একটু জায়গা দিতে৷ দরজার শব্দ শুনে রেহনুমার পেছন পেছন মাইমুনাও উঠে এসেছেন। তিনি মেয়ের মুখে এত কথা এভাবে শুনে মুচকি হাসলেন। যেন এ ধরায় সবচেয়ে বড় সুখটাই সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। হাসির রেখা ঠোঁটে রেখেই তিনি বললেন, ‘দে নির্জনকে শুইয়ে দিচ্ছি। তুই গেস্টদের ব্যবস্থা করে বেরিয়ে যা।’ রেহনুমা তখনও হতবাক হয়তো ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি। মেহউইশ চলে গেল নির্জনকে দিয়ে। মিহাদের দরজায় নক করতে সেও ঘুম ঘুম চোখ ঢলে দরজা খুলল। একদমে তাকেও কতকটা বলে তার ব্যাগসহ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রিশাদ নিচে অপেক্ষা করছে তাই তাকেই ফোন করে বলল রাইমাদের উপরে পাঠান রুম গোছানো হয়ে গেছে। ফোন রেখে নির্জনের প্রয়োজনীয় কয়েকটা কাপড় আর খাবারের টুকটাক জিনিসপত্র ফুপির কাছে দিয়ে রিশাদের একটা জ্যাকেট হাতে নেমে গেল সে৷ রাইমারা ঘর লক করে ঘুমাবে বলেই মেহউইশ নিজের বুঝমত সবটা করে এসেছে৷ সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় দেখতে পেল রিশাদ তানভীরের সাথে কথা বলছে৷ ভয় হলো খুব কি কথা হচ্ছে তাদের মধ্যে! নিচে নামতেই রাইমাকে বলল যাও তোমরা। রুম নাম্বার বলে দিতেই সবাই নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে চলে গেল। হাফ ছেড়ে বাঁচলো মেহউইশ৷ রিশাদ বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই জ্যাকেটটা এগিয়ে দিলো মেহউইশ৷ এতক্ষণ খেয়ালই করেনি রিশাদ এই জ্যাকেটটা।

-‘এটা আনলে কেন? ‘

-‘ বাইরে ঠান্ডা হাওয়া থাকবে এখন। বাতাসটা বুকে লাগলেই স্বর্দি হতে পারে।’ রিশাদ আর কথা না বাড়িয়ে জ্যাকেটটা নিলো। সত্যিই তার একটু একটু শীত লাগছিলো।

রাত নিঃশেষের পথে ভোর আসবে আসবে করছে। পুব আকাশে মিটিমিটি শুকতারার জ্বলজ্বলে রূপ সেই সাথে নোনা হাওয়ার খুনসুটি৷ পাশাপাশি মেহউইশ রিশাদ নিঃশ্চুপ পথিকের মত পায়ে পায়ে এগিয়ে চলছে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে। কেউ কারো মুখের দিকে দেখছে না তবুও চোখের তারায় দুজনের মুখচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে। অবাধ হাওয়ার তোড় শরীরে কাঁপন তুলে আবেশে জড়িয়ে ধরছে সারা অঙ্গ। আহা! এত সুখ সুখ লাগছে এ হাওয়ার শীতল ছোঁয়া তা কি দুজনই বুঝতে পারছে না! পারছে তো দুজনই শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছে না, একটু জড়িয়ে নাও আমায়। একটু ছুঁয়ে দাও উষ্ণ আদরে। হাতের পিঠে হাতের ছোঁয়া, চোখের প’রে চোখ রাখা। ওষ্ঠযুগলে আলতো চুম্বন আর উন্মাদ হাওয়ায় হেঁটে বেড়ানো। কত না চমৎকার হতো এই ভোর! সবই কল্পনা কল্পনা কল্পনা।মেহউইশ হাসে তার কল্পনার স্পর্ধা দেখে।

চলবে

(ভালোবাসা অফুরান আপনাদের জন্য পাঠকগণ। মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here