মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (১৩)

#মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (১৩)

সকাল থেকেই অজস্র কাজ কর্মের পাঠ চুকিয়ে এখন ঝিমুচ্ছেন তামজীদ। বাবা কে কয়েক বার ডেকে গেছে তিয়াশা। তবে ভদ্রলোক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উপায় না পেয়ে মা কে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণের মাঝেই সকল কে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে হলুদের অনুষ্ঠানে শুরু হবে। দলে দলে লোক জন ভীর জমায়েত করেছে। একটু আগেই ফোন করেছিলো রাযীন। টুক টাক কথা ও হয়েছে দুজনার মাঝে। রাযীন যতো টা না উদ্বিগ্ন তাঁর থেকে বেশি উদ্বিগ্ন তিয়া। এই বিয়ে টা যেন ওর কাছে সাধনা স্বরূপ। বন্ধু বান্ধবে ভরপুর বাসা। তবে তিয়াশা ব্যস্ত, ভীষন ব্যস্ত আজ। সারাক্ষণ এই টা সেই টা করে চলেছে। কেউ কেউ তো বলেই ফেললো ‘ তিয়ার অন্তরে এখন বিয়ের ফুল ফুটেছে। ‘

আওয়ানের সাথে এসেছে মধুপ্রিয়া। মেয়ে টি কে ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছে। বিয়ের কোনে নাকি সব থেকে সুন্দর হয় তবে এই কথা টা ভুল প্রমাণ করে দিলো মধু। মেয়েটির সাথে হালকা আলিঙ্গন করলো তিয়া। মধু প্রশংসার স্বরে বলল
” ইউ লুকিং সো বিউটিফুল। কোন বিউটিশিয়ান এসেছিলো? ”

” আমি নিজেই সেজেছি। ”

” ওয়াও। তুমি তো খুব ভালো মেকাপ আর্টিস্ট। ”

” তেমন কিছু না। চলো তোমরা নাস্তা করবে। ”

একটু থামলো তিয়া। আওয়ানের মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই। ছেলেটির বাহু তে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে ধ্যান ফিরালো। ইশারা করতেই বলল
” তোরা যা আমি পরে আসছি। ”

” আমি একা খাবো? ”

” তিয়া আছে তো। ”

মধুর মন খারাপ। তিয়াশা বুঝতে পারলো বিষয় টা। আওয়ানের কথার মূল্য না দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বসিয়ে দিলো নাস্তার টেবিলে। দুপুরেই পরিবেশ গুমোট ছিলো বিকেল হতে না হতেই প্রচন্ড তাপ জমেছে। ঠান্ডা শরবতের গ্লাসে চুমুক দিলো আওয়ান। এক নিশ্বাসে শেষ করে বলল
” আর কিছু খাবো না। তুমি খাও। ”

দু একটা স্যান্কস মুখে দিলো মধু। আর খাওয়ার রুচি হলো না। পাশে বসে থাকা জলজ্যান্ত মানুষ টা এক গ্লাস শরবতেই আহার কমপ্লিট করেছে। সেই হিসেবে দুটো স্যান্কস টেস্ট করা তো বিশাল ব্যাপার।

তিয়া এক প্লেট খাবার নিয়ে এসেছে। নাকোচ করার সুযোগ পেল না আওয়ান। তাঁর পূর্বেই ছেলেটার দিকে এক টা পান্তুয়া পিঠা এগিয়ে দিলো। অবাক চোখ গুলো আরো বেশি বিস্মিত হয়ে গেছে। আওয়ান শুধালো–
” পিঠা? ”

” হু। প্রতি বছর ই শীতের মাঝে তোর বায়না থাকে আমি যেন পান্তুয়া পিঠা বানিয়ে নিয়ে আসি। এবার তো থাকা হচ্ছে না আর। তাই ভাবলাম আগেই বানিয়ে ফেলি। ”

শীতল চোখে তাকালো আওয়ান। দুটো পিঠে পর পর মুখে পুরে বলল
” খুব ভালো হয়েছে। বেস্ট একদম। ”

সন্ধ্যার দিকে মধুপ্রিয়া বাসায় যাওয়ার জন্য তাগাদা দিলো। কি যেন বিশেষ কাজ ফেলে এসেছে সে। আওয়ান বলল আরেকটু থেকে যেতে এখনি অনুষ্ঠান শুরু হবে তবে থাকলো না। বিদায় জানানোর সময় শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো মধুপ্রিয়া। বুকের ভেতর হু হু করে উঠলো আওয়ানের। চোখ দুটো মাটির দিকে রেখেই প্রশ্ন করলো
” এখন না গেলে হয় না? ”

” না। এখনি যেতে হবে আমায়। পরে খুব দেড়ি হয়ে যাবে। ”

” মধু। ”

” হ্যাঁ বলো। ”

” না কিছু না। সাবধানে যাও। ”

বিনাবাক্যে ব্যয়ে এগিয়ে গেল মধুপ্রিয়া। হাতের আঙুল কচলাতে শুরু করেছে আওয়ান। সর্বাঙ্গে আগুন লেগে গেছে যেন। শরীরের প্রতি টা শিরা উপশিরা বলছে ভালো নেই তাঁরা। হৈ হুল্লরের শব্দে আরো বেশি অসহ্য লাগছে সব। বের হওয়ার জন্য মনস্থির করতেই প্রফেসর শঙ্কর ভট্টাচার্যের সাথে দেখা। লোক টা যে খুব বেশিই সমীহ করে ওকে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এক বার খুব জটিল কথা বলেছিলেন তিনি। যাঁর উত্তর আজ ও খুঁজে পায় নি আওয়ান।
” কি আওয়ান। আমাকে দেখে বিব্রত হলে বুঝি? ”

” নো স্যার। আমি তো বরং আপনাকে দেখে খুব খুশি হয়েছি। ”

” তো চলো বসা যাক। ”

” অবশ্যই। ”

বন্ধুর মতো বসেছেন প্রফেসর শঙ্কর। এতে আওয়ানের কেমন ইতস্তত বোধ হলো। এক টা সিগারেট এগিয়ে দিতেই আওয়ানের মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেল। ভদ্র লোক মুখ ভর্তি হেসে বললেন
” বলেছিলাম না বন্ধু হবো তোমার। এখন ই উপযুক্ত সময়। নাও ফিল্টার টা। ”

” স্যার! আমি আসলে বুঝতে পারছি না। ”

” নাও তো আগে। ”

” আমি সিগারেটে খাই না। ”

” এসব চোরাবুদ্ধি দেখিয়ে লাভ নেই। ধরো এটা। ”

” সত্যিই খাই না আমি। ”

” মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে তাল তো মিলাও? ”

” না মানে–

” আরে মানে মানে করছো কেন? ধরো তো ভাই। ”

তুমুল উত্তেজিত হয়ে উঠলো আওয়ানের মন। ভাই বলে সম্বোধন করেছেন সব থেকে কঠিন ব্যক্তিত্বের স্যার টি। অবাক হওয়ার সাথে সাথে নানান প্রশ্ন ও জেগেছে অন্তরে। সিগারেটের ফিল্টার নিয়ে ধোঁয়া চাঁপাতে লাগলো। এই ইহজগতে শঙ্কর ভট্টাচার্য ই বোধহয় একমাত্র শিক্ষক যে নিজ থেকে ছাত্রের হাতে সিগারেট তুলে দিয়েছেন। অবশ্য ভদ্রলোকের দাবি এই মুহুর্তে আওয়ান আর তিনি বন্ধু। এর বাহিরে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।

*
আওয়ান কে প্রচন্ড ভালোবাসেন সুষমা। কখনো ছেলের গাঁয়ে হাত তুলেন নি। তবে আজ খুব করে ইচ্ছে হচ্ছে চড় বসিয়ে দিতে। রাগ নাকি অভিমান জানা নেই তবে অশ্রু ভেজা নয়নেই বের হয়ে এলো আওয়ান। বছর তিনেক পূর্বে বাইক টা তালা বদ্ধ করে রেখেছিলো সুষমা। কারন এই বাইক নিয়ে বড় রকমের দুর্ঘটনা হতে হতে বেঁচেছিলো। বহু দিন হলো দেখা হয় না বাইক টা। কখনো ইচ্ছে ও হয় নি। তবে আজ রাগ অভিমানের মিশ্র অনুভূতি থাকা তে সেই বাইক টা নিয়ে বের হলো। ধুলো বালি তে মাখোমাখো হওয়া বাইকে উঠে বসলো ইঞ্জিন টা কোন ভাগ্যে যেন ঠিক আছে। সা সা গতিতে বাইক চলছে। আকাশ টা কেমন স্থবির হয়ে পরেছে। কালো মেঘে আচ্ছাদীত আকাশ টা বার বার ডেকে চলেছে। মাটি গুলো শুষ্ক হয়ে গেছে প্রকান্ড রোদ্দুরে। শান্তির জন্য হলে ও বৃষ্টির প্রয়োজন। তবে নামছে না বৃষ্টি। মেঘ আর বৃষ্টির দূরত্ব চলছে যেন। নদীর পাড় ঘেঁষে বাইক ব্রেক করালো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হলো। তবে কান্না আসছে না কেন যেন। মাটি তে পদাঘাত শুরু করলো। আঁধারে ঢাকা অম্বর আজ অশান্ত। ভয়ঙ্কর হয়ে পরেছে সেই রূপ। সন্ধ্যার অস্থিরতা ওকে গ্রাস করেছে। আচ্ছা খুব কি ক্ষতি হয়ে যেতো হাতের সাথে হাত টা বাড়িয়ে দিলে?

সন্ধ্যের ঘটনা

প্রফেসর শঙ্কর ভট্টাচার্য মানুষ টার বিচক্ষণতার প্রশংসা করতেই হয়। তিনি প্রথমেই শুধালেন ” আমাকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিচ্ছো তো আওয়ান? ”

” জী স্যার। ”

” উহু হলো না। স্যার নই আমি , এখন আমি তোমার বন্ধু। ”

” জী। ”

” রিলেশনে আছো রাইট? ”

” হ্যাঁ। প্রিন্সিপাল স্যারের বন্ধুর মেয়ে মধুপ্রিয়ার সাথে বিগত কয়েক মাসের সম্পর্ক। ”

” কতো দূর এগিয়েছে সম্পর্ক? ”

” আমি ঠিক বুঝি নি স্যার। ”

” আবার স্যার? আহা আওয়ান! আমি তোমাকে বললাম না এই সময় টা তে শুধুই বন্ধু তোমার।আচ্ছা যাক গে সে সব কথা। এখন বলো মধুপ্রিয়ার সাথে ফিজিক্যালি ইনভলব হয়েছো কখনো? ”

ইষৎ রক্তিম হয়ে গেল আওয়ানের মুখ। ভদ্র লোক কে এখন ভদ্র বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শঙ্কর ভট্টাচার্য বললেন
” পুরো কথা টা শোনো আগে। আজকাল ছেলে মেয়েরা কি করছে সব ই আমার জানা। তোমার প্রতি আস্থা আছে আমার। তবু ও সিউর হতে চাচ্ছি। বি নর্মাল। ”

” আমি তেমন নই স্যার। ”

” যাক। বসো এখন, আজকাল ছেলে পুলের র’ক্ত গরম থাকে সব সময়। এরা হুটহাট কাজ করে প্রিয় জিনিস হারিয়ে ফেলে। ”

চিনচিন ব্যাথা অনুভব হলো এবার। শঙ্কর ভট্টাচার্য পিঠ চাপরে বললেন
” ভালোবাসা তো অনুভব ই করো নি ছোকরা। আমি জানি এই মুহূর্তে যেটা বলবো সেটা অন্যায়। তবে এই টা হলো বেস্ট সলিউলন। সময় আছে এখনো, যা তোমার অস্তিত্বের অংশ সেটার সাথে বেইমানি করো না। যাও আর বাঁধন খুলে দাও নিজের।”

চোখ খুললো আওয়ান। সন্ধ্যের এই কিছু কথা ওকে উন্মাদ করে দিয়েছিলো। নিজ অনুভূতি কে অনুভব করিয়েছিল। গিয়েছিলো নিজের ভালোবাসা জানান দিতে যদি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটা অনুচিত। তবে তিয়াশা ও খুব যত্ন নিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছে ওকে। আর যখন মেয়ে টার কাছে অনুনয় শুরু হলো তখন হুংকার তুলে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো। খুব করে বলেছিল ‘ এমন টা কেন হলো। আর কেন ই বা এই বন্ধুত্ব টা অনুভূতি জাগালো।’ আওয়ান হাজার বার বলা সত্তে ও রাজি হয় না তিয়া। সব টা ভেবেছে সে। পুরো দমে করে নিয়েছে এই অনুভূতির সমাপ্তি। আর সব টা যখন নজরে আসে সুষমার। তখনি তিনি রেগে যান। ছেলের প্রতি ক্ষোভ নাকি অভিমান ঝরিয়েছেন তা জানা নেই। তিয়াশা কে নিজের পরিবারের অংশ করার পরিকল্পনা ছিলো বহু পূর্বেই। মাঝে করা ভুল টাই সব শেষ করে দিয়েছে। মাটির তে হাঁটু গেড়ে বসে পরলো আওয়ান। চিৎকার গুলো এতো টাই ভয়ঙ্কর যে পাখিরা সব এলোমেলো ভাবে ছুটতে শুরু করেছে। ওর আর্তনাদে সাড়া দিচ্ছে মেঘ। ঝড়ো আবহাওয়া বহিছে চারপাশে। তবে অভিমানী বন্ধু বৃষ্টির দেখা নেই। তিয়াশার ছবি টা বুক পকেট থেকে বের করে শুরু হলো ছেলেটার আর্তনাদ আর পাগলামি প্রেম নিবেদন। সাথে নিজের প্রতি নিজের জন্য তিক্ত সব বানী। আঘাতে আহত হলো শরীরের প্রতি অঙ্গ। তবু ক্ষান্ত হচ্ছে না এই মন। তিয়াশা ছাড়া এক মাইক্রো সেকেন্ড চলা ও সম্ভব নয় ওর। এই বিশেষ বানী খুব করে বুঝে গেছে সে। কিন্তু তিয়া তো চাচ্ছে না এই বন্ধন। ভুলের শাস্তি গুলো বিচ্ছেদের মতো কঠিন শব্দে জুড়ে দিয়েছে।

#চলবে
#ফাতেমা_তুজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here