Monday, September 21, 2026

মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৮)

#মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৮)

প্রথম এক সপ্তাহ প্রচন্ড বিরক্ত করলে ও এখন আর বিরক্ত করে না উমর। অধুনা ভারসিটি তে ও আসে না। হঠাৎ এমন হওয়াতে সানিন এর মন বেশ খারাপ। অথচ তার খুশি হওয়া প্রয়োজন ছিলো। পরীক্ষা বিধায় খোঁজ ও নিতে পারছে না। হঠাৎ করেই কেন উধাও হয়ে গেল ছেলেটা! মন খারাপের বিশেষ কারন নেই। তবে নিজ মন কে বোঝাতে অক্ষম। বার বার পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখছে আসছে কি না উমর। কিন্তু জুনিয়র ছেলেটার দেখা নেই।
এক্সাম পেপার দিয়ে দিয়েছে। মোটামুটি কমন এসেছে প্রশ্ন। একটা ভালো দিক রয়েছে ওর। পরীক্ষার হলে চার পাশে টর্নেডো হয়ে যাক তবু ও তাকাবে না কোথাও। যা পারে সেটাই লিখতে থাকবে।

প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে যাচ্ছে তিয়ার। এই প্রশ্নের বিন্দু মাত্র কমন পরে নি তার। কাল সারা রাত নোট বই পড়েছে অথচ সেখান থেকে কিছুই আসে নি। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। এই প্রশ্ন যিনি করেছেন নিশ্চয়ই তার বউয়ের সাথে ঝগড়া লেগে থাকে সার্বক্ষণিক। না হলে এহেন আউফাউ প্রশ্ন করার প্রশ্ন ই আসে না। বরাবর ই ওর সামনে সিট পরে আওয়ানের। আজ ও তাই। কলমের ক্যাপ থুতনি তে ঠেকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো তিয়া। গোগ্রাসে হাত চালাচ্ছে আওয়ান। মনে হয় সব প্রশ্ন তার ই কমন এসেছে। স্যারের দৃষ্টি লক্ষ্য করে আওয়ান কে ডাকলো তিয়া। মিনমিনে কন্ঠে—
” এই আওয়ান। তিন নাম্বার কোশেন্ট টার আনসার কি হবে রে? ”

” নিজে লেখ। ”

” কি লিখতে বললি। বুঝি নি আরেক বার বল না। ”

” বললাম নিজের যা ইচ্ছে তাই লেখ। ”

” বল না রে ইয়ার। এতো কষ্ট করে আমি নোট বুক পড়লাম অথচ কোনো কিছু কমন আসে নি। ”

” মুখস্থ বিদ্যা করলে যা হয়। বলেছিলাম টেক্সট পড়তে। বাট তুই তো তুই ই। যা এখন ডিস্টার্ব করবি না আমায়। ”

মুখ টা শুকনো হয়ে গেল তিয়ার। ভেতরে পাতার মর্মর শব্দের ন্যায় আন্দোলনের সৃজন হয়েছে। নির্ঘাত এবার পরীক্ষায় ফেল আসবে। সেসব চিন্তা তে আসতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো।
” হোয়াট হ্যাপেন তিয়াশা! লিখছো না কেন তুমি? ”

” জী স্যার এখনি শুরু করবো। ”

” এটা তো ভালো কথা নয়। অলরেডি টেন মিনিট ওভার। অথচ তুমি এক টা শব্দ ও লিখো নি। ”

” প্রশ্ন গুলো পড়ছিলাম স্যার। এখনি লিখবো। ”

গার্ড টিচার কে দেখিয়ে লিখার অভিনয় শুরু করলো তিয়াশা। গার্ড চলে যেতেই আওয়ানের পিঠে কলম দিয়ে খোঁচা দিলো। পেছন ঘুরে আওয়ান বলল
” কি হয়েছে কি। এমন করছিস ক্যান। আরে ভাই লিখ না। ”

” দেখা। ”

” কি দেখাবো। ”

” প্রশ্ন। প্লিজ, প্লিজ দেখা না দোস্ত। ”

” পারবো না। পড়াশোনা করবে না আর এক্সাম হলে আমার গলায় লটকে পরবে ঐ টা হবে না বাবু সোনা। ”

তিয়াশা বসে রইলো। এতো সহজে ছাড়ার পাত্রী নয় সে। যদি আওয়ান প্রশ্ন না দেখায় তো কলহ রটিয়ে দিবে। সেই প্রত্যয় নিয়ে বসে রইলো মেয়েটি। দুষ্টুমি বুদ্ধির আনোগোনা চলছে অস্থিমজ্জা জুড়ে। জুতো খুলে ডান পা টা উঁচু করে আওয়ানের পিঠে ঠেকিয়ে দিলো। চোখ বড় বড় করে তাকালো আওয়ান। অবশ্য তিয়ার কোনো হেলদোল নেই। সে অন্য দিক ফিরে গুন গুন করছে। আওয়ান লেখায় ব্যস্ত হলো। এবার দু পা উঠিয়ে আওয়ানের বেঞ্চে রাখলো তিয়া।
” তিয়া হচ্ছে টা কি? ”

” কই কি হচ্ছে? লেখ তুই। আরে লেখোস না ক্যান। ”

ফোঁস করে দম ফেললো আওয়ান। লেখা শুরু করলো সে। তিয়াশার মুখ টা মেঘের আড়ালে চলে গেছে। আড়চোখে সেসব দেখলো আওয়ান। তিয়ার পা বার বার ওর গাঁয়ে স্পর্শ করে যাচ্ছে। যদি ও তেমন বিরক্তি আসছে না তবে স্যার দেখলে এই মেয়ের পরীক্ষা বাতিল করে দিবে। হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে গেল আওয়ান। এমন করাতে ভয় পেয়ে যায় তিয়াশা। অনুনয়ের সুরে বলল
” দোস্ত প্লিজ বিচার দিস না। ”

” স্যার কাইন্ডলি এখানে আসবেন। ”

গার্ড টিচার আসলেই লুজ পেপার চাইলো আওয়ান। এবার তিয়া যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। হেনোতেনো পর্যায় চলে এসেছে পরিস্থিতি। লুজ পেজ গুলো মার্জিন করে নিয়ে আবার লিখা শুরু করলো। তিয়াশা তখনো চুপচাপ বসে আছে। প্রচুর লিখছে আওয়ান।হাতের গতি এতো যে ঝড় কে ও হার মানাবে আজ। তিয়াশা ভালো মানের স্টুডেন্ট। সবার আগে পরীক্ষা শেষ করে। কিন্তু এবার যেন শনির সাথে রাহুর বিরোধ লেগেছে। সেই কারনেই খাতা খালি। এক্সাম শেষ হওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। পুরো খাতা জুড়ে এক টা কালো কালির দাগ ও নেই। গার্ড সবাই কে পেপার গোছাতে বলছেন। সবাই সেলাই করে নিচ্ছে খাতা। তিয়াশার পায়ে চিমটি কাটলো আওয়ান। মেয়েটির চোখ লাল হয়ে আছে। বোধহয় এখনি কেঁদে দিবে। ইশারা করলো আওয়ান। সামনে পেপার দেখে তিয়াশার চোখ ছলছল করছে।
” গাঁধা একটা। নেক্সট কিন্তু আর লিখে দিবো না। ”

বিস্ময়ে কথা বলতে পারছে না তিয়াশা। খাতা সেলাই করা হলো। সব চেইক করে সাবমিট করা হলো পেপার। হল থেকে বেরিয়ে চারপাশে আওয়ান কে খুঁজছে তিয়াশা। কোথাও নেই অনাকাঙিক্ষত প্রিয় সেই বন্ধু টি। ক্যাম্পাস পেরিয়ে গেটের কাছে এসে আওয়ান কে পরিলক্ষিত হলো তিয়াশার। কোনো কিছু না ভেবেই ছুটে গেল মেয়েটি। চোখ দিয়ে ইশারা করলো আওয়ান। অর্থাৎ কি হয়েছে? তৎক্ষনাৎ ছেলেটা কে জড়িয়ে কান্না জুড়ে দিলো তিয়াশা। মেয়েটির ছোঁয়া তে শক্ত পোক্ত শরীরে মৃদু সমীরন স্পর্শ করে যাচ্ছে। তিয়াশার বক বক শুরু হলে ও আওয়ান কথা বলছে না। কেমন যেন লাগছে ওর। এক অদ্ভুত ধাঁচের অসহ্যকর ভালোলাগার অনুভূতি।

*

দুই সপ্তাহ পর দেখা হলো জিমামের সাথে। ছেলেটা আজকাল মিশে না কেন যেন। মনে হয় খুব বেশিই ব্যস্ত। তবে সে ব্যস্ততা কি তা জানে না আরুশি। ভাইয়ের বন্ধুটি এতো টা অবহেলা কেন করছে কে জানে। অথচ এক কালে ওর পেছনে ঘুরেছে কতো। সেসব চিন্তা করতেই হতাশা এসে স্পর্শ করে ওর গাঁয়ের প্রতি টি লোমকূপ। ভারসিটি তে এডমিশন নিয়ে সবার আগে জিমাম কেই কল করেছিলো তবে ফোন টা সুইচ অফ বলেছিলো সেদিন। রাতে যখন কথা হলো তখন জিমাম বললো দেখা করতে চায়। তবে এখন লাপাত্তা বলা চলে। ফোন করলো আরুশি। জিমাম জানালো কাছাকাছি ই আছে। ফোন টা ব্যাগে পুরে বেঞ্চে পা উঠিয়ে বসলো সে। কয়েক টা বাচ্চা খেলা করছে। এদের মাঝে কেমন মিহি, কবোষ্ণ নিরুপদ্রব ছড়িয়ে আছে। এসব দেখলে হিংসে হয় ওর। খুব বেশিই অশান্ত হয় মন। জিমাম এলো ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বিশ মিনিট পর। অভিযোগ করতে মন চাচ্ছে না। তবে স্পষ্ট ভাষাতেই শুধালো
” একটু বেশিই লেট করে ফেললে না জিমাম? ”

” জ্যাম ছিলো খুব। ”

” বসো পাশে। আমি কিছু বলতে চাই তোমায়। ”

” আমি জানি কি বলতে চাও তুমি। এটাই বলবে যে তুমি ভারসিটি তে এডমিশন নিয়ে নিয়েছো। আর খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করবো আমরা। রাইট? ”

” হু। আমার মনে হয় সম্পর্ক টা লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। ”

” কিন্তু আমি যে ভাঙতেই চাই এই সম্পর্ক। একদম ভেঙে দিতে চাই। ”

ইষৎ চমকে উঠলো আরুশি। জিমাম নিশ্চিত রসিকতা করছে তাঁর সহিত। তবে এটা যদি রসিকতা ও হয় তবু ও ভালো লাগছে না ওর। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো। তবে জিমাম যেন মনস্থির করেই এসেছে। নয় এসপার নয় ওসপার।
” তুমি ঠিক আছো জিমাম। নিশ্চয়ই মদ গিলেছো। দেখো এসব ফাজলামি পছন্দ নয় এক বিন্দু পরিমান। আমি যাচ্ছি এখন। পরে কথা হবে।”

” আমি সিরিয়াস আরুশি। ”

থমকে গেল আরুশি। জিমামের কথা গুলো ভাবাচ্ছে ওকে। অতি সহজেই ছেলেটা সর্ম্পক চুকিয়ে দিলো। গত দু বছরে যতো উপহার দিয়েছিলো সব টুকে দিলো সাদা কাগজে। মিলিয়ে নিতে বললো সব। আরুশি হতবাক হয়ে রইলো নিজের ভালোবাসার পাই পাই হিসেব দেখে। এই উপহার গুলো কেনার জন্য কতো টা সেক্রিফাইজ করতে হয়েছে তা শুধু আরুশিই জানে। সে সব আজ তুচ্ছ!

গুরুম গুরুম করছে মেঘ। আবার এসেছে ধরায়। মেঘের ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত প্রিয় বন্ধু বৃষ্টি। সেদিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে আওয়ান। গত কয়েক ঘন্টা আগের দৃশ্য গুলো চোখে ভাসে শুধু। চোখ দুটো ঝাপসা বর্ণ হতে চায়। তবে এমন পরিস্থিতি তে শক্ত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। ঘরে এসে নিজের মা কে দেখে হতভম্ব হলো আওয়ান। ভদ্রমহিলার চোখে মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে। যেন কিছু বলতে চায়। তবে বিশেষ কিছু বললেন না তিনি। কেবল মাত্র বললেন রাতে খাবেন না আজ। তাই যেন ডাক না দেওয়া হয়। কথায় বোঝা যায় একা থাকতে চান সে। সুষমা চলে যেতেই আবারো জানালার কাছে এলো আওয়ান। কিছু সময় দাঁড়ানোর পর অনুভব হলো বৃষ্টির শীতল ফোঁটা। তুমুল গতিতে স্পর্শ করে যাচ্ছে চোখ মুখ কান নাক সব।
টুং করেই শব্দ হলো ফোনে। নিশ্চয়ই ম্যাসেজ দিয়েছে মধুপ্রিয়া। মেয়েটার সাথে সারাক্ষণ কথা না বললে অশান্ত হয়ে পরে। জ্বালাতনে পরলো আওয়ান। এখন আবার কল করেছে।
” হেইই বেবি। তুমি আমাকে ভুলেই গেছো। এটা কি ঠিক? ”

” স্যরি মধু। আমি আসলে ক্লান্ত ছিলাম। ”

” ওহ। আজকাল আমি কল করলেই তুমি ক্লান্ত থাকো। ভালো লাগে না আর। ”

” এমন টা নয় মধু। ”

” তুমি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না আওয়ান। আমি তোমার কাছে পুরনো হয়ে গেছি।”

” মাস খানেক হলো আমাদের রিলেশন মধু। তুমি পুরনো হও কি করে? একটু কমন সেন্স দিয়ে কথা বলো। ”

” হু! এখন বুঝতে পারছি আমি। যাও কথা বলার দরকার নেই। ”

” মধু লিসেন টু মি। ”

টুট টুট শব্দ করে কল কেঁটে গেল। কয়েক বার ফোন করলো আওয়ান। তবে প্রথম দিকে রিং হলে ও এখন সুইচ অফ। বেডের উপর ফোন টা ছুঁড়ে ফেলে হাঁটু গেড়ে বসলো মেঝে তে। ভালো লাগছে না কিছু। সব কিছু কে অসহ্য লাগছে। ব্যাংক থেকে এতো টাকা লোন নিয়েছে সুষমা। সেই জন্য বাঁধা রেখেছেন এই বাড়ি টা। লোন দিতে না পারলে বাড়িটা চলে যাবে ব্যাংক এর কাছে। সে চিন্তা তেই পাগল প্রায় অবস্থা। সাথে সুষমার অসুস্থতার খবর আজ একদম শেষ করে দিলো ওকে। কি করে বেঁচে আছে জানা নেই। মা কে হারিয়ে ফেলার চিন চিন ব্যাথা চোখ দিয়ে ঝরতে লাগলো। তবে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ধুয়ে মুছে দিলো সব টা। যেন বন্ধুর মতোই সঙ্গ দিচ্ছে।

আইডি ১ :https://www.facebook.com/fatema.tuz.9469

আইডি ২ : https://www.facebook.com/profile.php?id=100073915893185

#ফাতেমা_তুজ
#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here