মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৩
মনসুর ভাইয়ের চোখে অপার মুগ্ধতা। তার এই ঘোরলাগা দৃষ্টির সামনে নিজেকে সত্যিই সুন্দরী বলে মনে হয় আমার। সময় থাকলে একবার নিজের প্রেমে পড়ে দেখতাম! আপাতত আমার দম ফেলবার ফুরসত নেই। ঝামেলা করা কাস্টমারের ড্রাইভার লোকটি আবার এসেছে। বলল,
–স্যার বলছে, আপনি ঠিকই সেলাই করছেন। স্যারই মাপে ভুল করছে। এই শার্ট আরও দুই বছর আগে কেনা। সেই মাপ দিছে। দুই বছর আগের মানুষ কি আর এখন সেইম আছে? স্যার বলছে, আপনি যদি গিয়ে স্যারের গায়ের মাপ নিয়ে আসতেন!
ব্যাপারটা ঝামেলার। অবশ্য এইসব ঝামেলার কাজ আমার বেশি পছন্দ। ঝামেলার কাজে আমদানির গন্ধ পাওয়া যায়। সুমা ভাবি বাড়ির বাইরে পা দেয় না। তার স্বামী বিদেশ, তাকে বাড়ির বাইরে যেতে এলাউ করে না। আমি বাড়ি গিয়ে জামার মাপ নিয়ে আসি, বানানো হলে হোম ডেলিভারি দিই। বেশ কয়েকদিন তার ফোন পেয়েও যেতে সময় পাচ্ছিলাম না, একদিন ভোরে ফ্যাক্টরি যাওয়ার আগে তার বাড়ি গিয়ে উঠলাম। দরজা খোলে না। এদিকে আমি ভয় পেয়ে গেছি। একা মানুষ থাকে, কী না কী বিপদ হলো! আরো জোরে দরজা নক করতে গিয়ে প্রতিবেশীদেরকেও জড়ো করে ফেললাম। তারা দরজা এই ভাঙে কি সেই ভাঙে! একসময় দরজা অল্প ফাঁক হলো। আমাকে টেনে ভেতরে নিলো। গিয়ে দেখি, তার প্রেমিক উপস্থিত। এই হাতে ধরে, পায়ে ধরে অবস্থা। আমাকে ঘুষ দিলো মুখ বন্ধ করার জন্য।
আমিও মুখে গ্লু লাগিয়ে নিলাম। এখন দরকার না থাকলেও আমার কাছ থেকে জামা সেলাই করে সুমা ভাবি। ঈদে রেডিমেড জামা কিনলেও আমার কাছ থেকে দুটো থ্রিপিস বানিয়ে নেয়। আমার আগ্রহ টাকাতে, আমার কাস্টমার সৎ হলো নাকি জোচ্চোর সে দিয়ে আমার কাজ নেই।
টাকার জন্য আমি যেকোনোকিছু করতে পারি!
বললাম,
–আপনার স্যারের কার্ড দিয়ে যান। আমি আমার সময়মতো যাব।
কার্ড না। সে একটা ঠিকানা দিলো। কুশিয়ারা আবাসিক এলাকার একটা ফ্ল্যাট। স্যারের নাম সালমান ফারশি।
লোকটা চলে গেলে আমি মনসুর ভাইয়ের দিকে তাকালাম।
মনসুর ভাই গর্জন করে বলল,
–চোখ গরম করে কী বুঝাতে চাও? আমি মিথ্যা কথা বলি? তোমারে মিথ্যা বলে আমার কোনো লাভ আছে? তোমারে আমি গুণি? এমন চোখ দেখাবা না আমাকে। খুলে নিয়ে আসব।
আঙুলের কসরত করে আমাকে দেখিয়েও দিলো কীভাবে আমার চোখগুলো খুলে নেবে সে। বড়ো চাচার হাঁক শুনলাম,
–ঘটি না ডুবলেও তালপুকুর তালপুকুরই। এখনো তাতে পানি আছে। সৈয়দের মেয়ে রাত-বিরেতে দোকানদারী করবে কেন?
ওহ, বলা হয়নি, লালগতিবাজারের বিখ্যাত সৈয়দ আমরা। বিরাট বংশ! হাস্যকর হলো, এই বংশের এই প্রজন্মে কোনো পুত্রসন্তান নেই। সবগুলো বোন আমরা। আমাদের সাথে সাথে বংশের শেষ! তালপুকুরের ঘটডোবা জলও শেষ!
মনসুর ভাইকে বললাম,
–আপনার জন্য বকা শুনলাম। যান, বাড়ি যান। আপনার মা ভাত নিয়ে বসে আছে।
–তুমি কি এখনে বসে আমার মাকে দেখতে পাচ্ছ? দিব্যদৃষ্টি আছে তোমার? তুমি কি সঞ্জয় হইছ?
–সঞ্জয় কে?
–মহাভারতের সঞ্জয়। ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের লাইভ টেলিকাস্ট শোনাত।
আমি দোকান গুছিয়ে ফেলতে ফেলতে আরেকবার হাই তুললাম। বললাম,
–আপনার মা আসছিল দোকানে। আপনি তো আমার এই দর্জিঘরকে ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছেন। আপনাকে খুজতে এসেছিল। আজকে নাকি কোথায় মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল আপনার। সেটা এড়ানোর জন্য বাড়ি যাননি, দুপুরে খাননি।
মনসুর ভাইয়ের মুখ শুকিয়ে গেল। আমার বক্তব্যের পছন্দমতো অংশটা বেছে নিয়ে উত্তর করল,
–আমি ঠিকানা বানিয়েছি বলেই তোমার দোকানে উটকো লোক আসে না। চান্দা ফান্দা চাইতে আসে না। আমাকে ভয় পায় সবাই। আমার সাথে হিসাব কইরা কথা বলবা! আমি রেগে গেলে কিন্তু…
আমি বড়ো হাই তুলে বললাম,
–রেগে গেলে কী? আপনি নিজেরে কী মনে করেন? বাকের ভাই সাজছেন? তার পরিণতি মনে আছে? বেঘোরে মারা পড়বেন!
মনসুর ভাইয়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। কিন্তু মুখ উচু করে উদাস হওয়ার ভান করল। বলল,
–হায়াত ময়ূত আল্লাহর হাতে। মরে গেলে দাবি রাইখো না।
এইটুকু বলে গলা নিচু করল মনসুর ভাই। চাপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
–আমার জন্য তোমার দুঃশ্চিন্তা হয়, রুমকি? আমার কথা ভাবো? ভাইবো না, বাকের ভাইরে ফাঁসি দিয়েছিল নিজের লোকেরা। আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে নিজের লোক ভাবি না!
আমার বুকটা কেমন করল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় হাতদুটো থেমে গেল। পরেই নিজেকে ফিরে পেলাম। দোকানের চাবি নিতে নিতে বললাম,
–আমার ভাববার অনেক বিষয় আছে। সেসব নিয়েই সময় পাই না, আপনাকে নিয়ে চিন্তা করার সময় আছে নাকি? যান বাড়ি যান।
শাটার নামিয়ে বাড়ির ভেতর এলাম আমি। বড়ো চাচা আমাদের ঘরের সামনে রোয়াকের উপর বসে আছেন। আমাকে ডাকলেন কাছে। আমি পাশে গিয়ে বসলাম। চাচা ডানহাতটা বাড়িয়ে দিলেন। তার আঙুলের মটকা ফাটিয়ে দিতে হবে। ছোটোবেলায় এর বিনিময়ে দুই টাকা করে দিতেন আমাকে। বংশের একমাত্র শ্যামলা মেয়ে আমি। বড়োচাচা বলতেন ব্ল্যাক ডায়মন্ড।
এখনও বললেন,
–কী রে, কালামানিক, তোরে কতদিন দেখি না! রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি, তোর দেখা পাই না!
বড়ো চাচাকে দেখতে আব্বার মতো লাগছে। আমার গলায় দলা পাকাচ্ছে। আব্বা মরার পরে চাচারা আমাদেরকে ফেলে দেননি। কিন্তু তাদের সামর্থ্য কম। সবাই টেনেটুনে সংসার চালান। এসএসসির পরে বড়োচাচা গলায় হাত জড়িয়ে জানতে চেয়েছিলেন,
–কলেজ যেতে কী লাগবে তোর?
আমি মহিলা কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। কলেজের ইউনিফর্ম নেই। জামার উপর এপ্রন নইলে বোরকা পরতে হয়। আমি চাচাকে বলেছিলাম,
–বোরকা আর স্যান্ডেল জুতা কিনে দেন।
চাচা বললেন,
–আমি তো বুঝব না কিনতে, কালকে সকালে রেডি থাকিস, বাপ-বেটি মিলে কিনে আনব। তুই পছন্দ করে কিনিস।
সকালে নিউমার্কেট গিয়েছিলাম আমরা। সাথে বড়োচাচিও ছিল। সংসারের যাবতীয় কুটিলতা মানুষের মুখ দেখে বুঝতে শেখা পাঠের সেই শুরু আমার।
বড়োচাচির মুখটা পুড়ে ছিল সারাটা সময়।
আমার বুক ঢিপঢিপ করছিল। পছন্দ করতেই পারছিলাম না কিছু। একটা সময়ে চাইছিলামও না আর কিনতে। বড়োচাচার মুখের দিকে তাকিয়ে না ও করতেও পারছিলাম না। বোরকার গজ টাল মারা সামনে। একটা দেখিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম,
–এটা নেবো? ভালো হবে?
চাচি ঠোঁট উলতে বললেন,
–নে একটা! নিলেই হলো। পরের টাকায় এত বাছাবাছি কীসের? কম-টম দেখে নে।
আমার আব্বা তখন সদ্যই মারা গেছেন। ধুমধাম চোখে জল চলে আসত!
কিছুক্ষণের জন্য মৃত ভাইয়ের সন্তানের পিতা হতে পেরে চাচা আনন্দে উদ্বেল ছিলেন। ডিলাক্সে খেতে নিয়ে গেলেন দুপুরে। খিদেয় পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছিল কিন্তু মুখে বললাম,
–আমার একটুও খিদে নেই। আমার জন্য অর্ডার করার দরকার নেই!
–এতক্ষণ হেটে হেটেও খিদে লাগেনি? এইজন্যই গায়ে মাংস নেই এক ছটাকও। চুপচাপ খাবি। আমি অর্ডার করছি।
বড়োচাচি বললেন,
–ও খেতে চাইছে না, জোর করছ কেন? আমার প্লেট থেকে একটু দিলেই হবে। এমনিতেই একগাদা টাকা জলে গেল! আর যে কত যাবে!
আমি হিসেব করলাম দ্রুত, বারশো টাকা বোরকার কাপড়, পনেরশো টাকার স্যান্ডেল।
বড়োচাচির প্লেট থেকে এক চামচ বিরিয়ানি আমার প্লেটে দিলেন, চাচা মুরগির লেগপিস থেকে রানের টুকরোটা ছিঁড়ে দিতে দিতে বলল,
–কারোরই ঠিক করে খাওয়া হলো না। তিনজন তিনটা বিরিয়ানি নিলে মনভরে খাওয়া যেত!
আমি মাথা নিচু করে খেতে খেতে কয়েক ফোটা চোখের জল ফেললাম।
খাওয়া শেষে বড়োচাচিকে বললেন,
–ফালুদা অর্ডার করলে না? বুঝলি রুমকি, ডিলাক্সে এসে ফালুদা না খেয়ে বাড়ি যায় না তোর চাচি!
–না, আজকে খাব না। বেশি খেয়ে ফেলেছি, আমার হাসফাঁস লাগছে।
বড়োচাচি জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে প্রমাণও দিলেন।
–তাহলে ফিরনি খাও?
–না, না। ইচ্ছে করছে না।
–লাচ্ছি?
–না, বললাম না?
বড়োচাচা সব বুঝতে পারছিলেন, তার মুখটা নিরুপায় আর অসহায় দেখাচ্ছিল। বড়োচাচিকে সারাটা সময় তোয়াজ করে চলছিলেন, যেন আমার সাথে ভালো ব্যবহার করে। তার এই প্রয়াস বুঝতে পারছিলাম বলে আমার আরো কষ্ট হচ্ছিল। বড়োচাচা খুব করুণ মুখ করে যেন দয়াভিক্ষা চাইলেন,
–তুই কিছু খাস নি। একটা কিছু খা?
আমি ডানেবামে মাথা নাড়লাম জোরে জোরে।
সেদিন একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলাম আমি। যা আমি উপার্জন করি না, সেই জিনিস নিতে আমার আপত্তি আছে। আমি মিথ্যা বলি, চুরি করি, বাটপারি করি, অনেক লোককে ব্ল্যাকমেইল করি, কিন্তু কারোর দয়ার দান নিই না!
বাড়ি ফিরেই বোরকাটা পাশের বাড়ির লাকিভাবির কাছে বেচে দিয়েছিলাম। তবে, স্যান্ডেলটা অনেকদিন পরেছিলাম। জিনিসটা টেকসই ছিল।
যা আমার দরকার, চক্ষুলজ্জা করে তা প্রত্যাখ্যান করার মতো বিলাসিতার করার সুযোগ আমার নেই!
আমার কলেজে ভর্তি না হওয়ার সিদ্ধান্তে এই ঘটনাটা একমাত্র কারণ ছিল না। কিন্তু আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার অনেকগুলো নিয়ামকের মধ্যে অন্যতম ছিল।
কোনো ছেলেসন্তান না হওয়াতে আমার বাবার সম্পত্তির একটা অংশ চাচারা পাবেন। আমি ধর্মের আইন পড়ে দেখেছি। মৃত ভাইয়ের মেয়েদের লালন পালন এবং বিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব চাচা এবং চাচতো ভাইদের উপর বর্তায়। সেই দায়িত্ব যেন তাদের উপর চাপ তৈরি না করে তাই তারা ভাইয়ের সম্পদের আসহাবা অংশ পান। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায়, সম্পদের অংশ নিতে কেউ ছাড়ে না, কিন্তু দায়িত্ব পালনে সবার মন বেজার!
বড়োচাচা মাকে ডাকলেন। মা মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়ালে চাচা বললেন,
–মেয়ে বড়ো হইছে, এখন ওই মনসুরের সাথে মেলামেশা ভালো দেখায় না! যদি বিয়ে করতে চায়, আমরা আপত্তি করব না। ছেলে লাফাঙ্গা হলেও, বাপের টাকা আছে। বাপের যা আছে তাতে ওর তিন পুরুষ চলে যাবে।
মা মাথা নাড়লেন,
–ওর সাথে কিছু নেই রুমকির! এমনিতেই আসে।
–এই কথা রুমকির মুখ দিয়ে শুনতে চাই। বল, তোর সাথে মনসুরের কী সম্পর্ক।
আমি হাই তুলে দার্শনিকের ভঙ্গিতে বললাম,
–গরমের দিনে আকাশের মেঘের সাথে পথিকের যে সম্পর্ক, আমার সাথে মনসুর ভাইয়ের সেই সম্পর্ক।
–মানে?
বছরের উষ্মতম দিনগুলোতে প্রখর সূর্যের আলোর নিচে লোকের প্রাণ আইঢাই করে। আকাশে ভেসে বেড়ানো এক টুকরো মেঘের ছায়া তাকে প্রশান্তি দেয়। তাতে করে ম্যাজিকের মতো লোকের যাপিত জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় না! মেঘ তার কাছে কিছু চায় না, পথিকও মেঘের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে না। আমার কোনো বোঝাও মনসুর ভাই বয়ে দেন না। সে আমার গ্রীষ্মদিনের মেঘছায়া। তীব্র যাতনার এই দিনগুলোতে নিরবে আমাকে ছায়া বিলোয় সে। না আমি তাকে চাই, না সে আমার কাছে কোনো বিনিময় প্রার্থনা করে। সে অকাতরে দেয়, আমি সংকোচ ছাড়াই দুই হাতে নিই। কখনো কৃতজ্ঞতা বোধ করি না। ওতে আমার অধিকার আছে বলেই নিই। এখানে দায়-দাবির প্রশ্নই নেই। তোমরা যদি জানতে চাও, মনসুর ভাই আমার কে হয়? কী সম্পর্ক আমাদের? এই সম্পর্কের নাম দেবো কী? আমি বলব, ওই মেঘের সাথে পথিকের যে সম্পর্ক, সেটাই। নিরাপত্তার, প্রশান্তির।
এত কথা চাচাকে বললাম না আমি। ছোটো করে বললাম,
–কিছু না।
চাচা মাথা নাড়লেন। তার দাঁড়ি আঙুল চালিয়ে সমান করে মুঠোয় নিলেন। মাকে বললেন,
–তোমাদের বড়োভাবি একটা প্রস্তাব এনেছিল। তার কেমন সম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। সৌদি থাকে। সামনের মাসে দেশে আসবে। রুমকির ছবি দেখে ছেলে নাকি পছন্দ করেছে। না করার কারন নাই। মাইয়ার রঙটাই যা একটু ময়লা, কিন্তু ছবি-কাটিং তো এ ক্লাশ। এইরকম মুখের মাইয়া আরেকটা পাবে কই? সমস্যা হলো, ছেলের পড়াশোনা নাই। বকলমে টিপসই। আমি একটু নারাজি তাতে। রুমকি এখন যাই করুক, বোর্ডস্টান্ড করা মেয়ে। কিন্তু একটা কথা, দেওয়া থোওয়ার ক্ষমতা নেই আমাদের। কোনরকম মেয়ে পার করতে পারলেই বাঁচি। আর আরশি ছাড়া তো সবাই গরিব ঘরেই গেছে। এত ছুৎ ছুৎ করলে মেয়ের বয়স বাড়তেই থাকবে। সমান বয়সী বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে, রুমকিটা নাকউঁচা করে ঘুরে বেড়ায়, আমার বুকটা খালি খালি লাগে! কোন দায়িত্বই তো করতে পারলাম না, রুমকির বিয়েটা না দিয়ে মরলে ভাইয়ের কাছে গিয়ে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াব!
আমি হেসে ফেলে বললাম,
–ভাইয়ের কাছে যাওয়ার আগে আমার কাছ থেকে চিঠি নিয়ে যাবেন। আমি আপনার ভাইকে বলে দেবো, আমার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি! আমার অন্য বোনদের বয়সের আগে বিয়ে হয়েছে। বড়োচাচিকে বলবেন টেনশন কম করতে। টেনশন করলে তার প্রেশার বাড়বে। আমার বিয়ে নিয়ে তাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি নাকউঁচা করে ঘুরি না, মাথা উঁচু করে চলি!
মা মৃদুকন্ঠে বলল,
–আপনার ভাইই রুমকির সম্বন্ধ ঠিক করে গেছেন।
চাচা খুশি হয়ে গেলেন। চাপা গলায় বললেন,
–রুহুলের ছেলের সাথে? সেইটা? সেটা তো জানতামই। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ পাই না, তাই ভাবলাম সেটা বাদ হয়ে গেছে। আছে এখনো? তাইলে আলাপ শুরু করো? ছেলেটা চাকরি পেয়েছে শুনলাম। খুব ভালো ছেলে। আমাদের সব জানেশোনে, ঘরের পরেই থাকে, রুমকি দূরে যাবে না।
–ওদের মতিগতি বুঝে নিই আগে।
চাচা গলাটাকে আরেকটু চাপালেন,
–সেটাই ভালো, বউমা! কানে কথা বাজারে পড়ে! কে কোথায় ভাঙানি দেবে। শেষে রুমকির কপালে বিয়েভাঙা ছাপ্পা লেগে যাবে। বুঝেশুনে কাজ করো। আল্লাহ ভরসা। আয়, দোয়া করে দিই, আমার কালামানিকের সোনার কপাল হবে!
আমাকে টেনে নিয়ে দোয়াদরূদ পড়ে মাথায় ফু দিয়ে বললেন,
–তোর চাচিও টেনশন করে তোকে নিয়ে। কী যে তারাহুড়া তার! এই রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে পাঠাল!
চাচির সমস্যাটা আমি বুঝতে পারে না। তার কোন পাকা ধানে মই দিলাম আজকে?
রাতে ঘুমাতে গেলে ছুটকি এসে জড়িয়ে ধরল আমাকে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
–তুই শাফিন ভাইকে বিয়ে করিস না, রুমকি!
ছুটকিটা আমাদের সবার নাম ধরে ডাকে। কাউকে আপাটাপা ডাকে না। ও মুখটা আমার কানের সাথে চেপে ধরে বলল,
–শাফিন ভাই আর চৈতির মধ্যে কিছু আছে। মায়ের ফোন থেকে শাফিন ভাইকে কল দেয় ও। গুটগুট করে কথা বলে।
ঘুমে দুচোখ জড়িয়ে আসছে আমার। ছুটকি আর চৈতি জাতশত্রু। জানি দুশমন! একজন আরেকজনকে ফাঁসাতে ডেথবেড কনফেশন দিয়ে দিতে পারে!
এদের কথা আমলে নিয়ে ঘুম কামাই করার মানে হয় না!
আমি চিত হয়েই ঘুমিয়ে গেলাম!
চলবে…
আফসানা আশা
#মেয়েতুমিকিদুঃখচেনো?





