মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৪
শুক্রবার দিনটাতে একটু ঘুমাতে ইচ্ছে করে। মনে হয় – দুনিয়া চুলায় যাক, আমি একঘন্টা বেশি ঘুমিয়ে নিই! রাতে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘুমাতে যাই, আগামীকাল একটু বেশি ঘুমাব। কিন্তু এদিনটাতেই ঘুম ভাঙে সবার আগে। আমার ঘরের খোলা জানালা দিয়ে পাশের বাড়িটার এক ঝলক দেখা যায়। একদল বুনো ডুমুর ঝাঁপিয়ে উঠেছে। এই ডুমুর পাকলে কেমন খেতে হয়, আমি জানি না। আমরা কাঁচাই খেয়ে সাবার করে ফেলি। মানে, সবজির মতো রান্না করে খাই। ভেতরের বিচিগুলো ফেলে ছালচামড়াসহ পাতলা মাংসল অংশটুকু কেটে নিয়ে, গরম মশলা আর নারকেল দুধ দিয়ে রান্না করে মা। সাথে দেয় মাঝারি সাইজের চিংড়ি। অবশ্য চিংড়ি ছাড়াও অত্যন্ত উপাদেয় খাবার। ডুমুর গাছগুলোয় ছোটো ছোটো ফল এসেছে। আরো মাস দুই লাগবে খাবার উপযোগী হতে। এই গাছের পাতাও খুব প্রয়োজনীয় জিনিস। মাছ ডলতে কাজে লাগে। ডুমুর পাতার রূপদর্শন শেষে আড়মোড়া ভাঙলাম। আজকে অনেকগুলো কাজ আছে। বেশ কয়েকটা অর্ডার জমেছে। আজকে কাজ এগিয়ে রাখতে হবে। সামনের সপ্তাহে ওভারটাইম করা থেকে সহসা ছুটি মিলবে না। রাতে ঘুম চোখে নিয়ে সেলাই কাজ নিখুঁত করা যায় না। কমপ্লেইন আসে। অনেক সময়ই দ্বিতীয়বার কাজটা করতে হয়। বানানো জামার সেলাই খুলে রি-ডু করার সময়ে দুটো নতুন জামা তৈরি করে ফেলা যায়। নেভি রঙের একটা পাঞ্জাবির কাপড় কাটলাম। একটা মাদ্রাসা পড়ুয়া বাচ্চার ইউনিফর্ম। তিন শুক্রবারে মাদ্রাসায় ঘুরে মাত্র দুটো অর্ডার আনতে পেরেছি। হতাশ হয়ে যাইনি। মার্কেটে যে দাম চলে সব আইটেমে আমি বিশ পঞ্চাশ টাকা কম নিই। আস্তে আস্তে ক্লায়েন্ট বাড়বে। আমি আশাবাদী মানুষ। একশো টাকায় সালোয়ার কামিজ সেলাই করেছি শুরুতে। এখন বাজার রেটে চলে এসেছি। লেগে থাকলে সফলতা আসবেই। পাঞ্জাবির কাটা কাপড়টা তুলে রেখে আমি কুশিয়ারা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেলাম। মা আমাকে দেখেই বলল,
–আজকে কোথায় যাস?
–কেন আজকে কী?
–আজকে শাফিনের মাকে দাওয়াত দিয়েছি। শাফিনও রওনা করেছে।
–ওহ!
আমার মনে পড়ল। এই সেই বিশেষ দিন। আমার বুক ধুকপুক করল একটুখানি। হৃদয়যন্ত্রটা প্রমাণ দিলো, ও বেচারা এখনো রক্তমাংসের আছে – রোবট হয়ে যায়নি।
বললাম,
–আজকে একটা নতুন অর্ডার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তুমি তো জানোই, আমি কত পরিশ্রম করছি টেইলার্সটার জন্য। একবার ওটা স্টাবলিশ হয়ে গেলে, আমার আর তোমার শান্তির দিন, মা!
মা আমার পরিকল্পনা জানে। গার্মেন্টস এর চাকরিটা আমাকে মাসশেষে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক নিরাপত্তা দেয়। চাল, ডাল, তেল, লবণ আর আলু কিনে দিয়ে বাকি মাস আমি নিশ্চিন্ত থাকি। বোনেদের খাতা-কলম, টিউশন ফি দিই। তারপর দরজিগিরি করি স্বচ্ছলতার জন্য। ভালোমন্দ বাজার হয়, শখের দুটো কাপড় জামা কিনি, মাসে একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। পার্কে বেড়াতে যাই, একবার সিনেমা হলে গিয়ে ‘পরান’ সিনেমাও দেখে এসেছি। আমরা আমাদের দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠেছি, এখন জীবনকে উপভোগ্য করতে চাই। আর কিছুদিন পরে, আর দুটো সেলাই মেশিন আর দুজন কারিগর রাখার মতো অর্ডার পেতে শুরু করলেই চাকরিটা ছেড়ে দেবো। আবার পড়াশোনা করব। একটা ছোটো লাইব্রেরি করব। ব্যস্ত দিনের কাজের ফাঁকে গীতবিতানের পাতা ওল্টাব। পাশের তেপায়াতে থাকবে চায়ের কাপ, কাঁচাপাতি ভিজবে তাতে!
আমার পরিকল্পনা সুদূরদর্শী! সেই সুখের দিনকে নাগালে পেতে আজকে তো একটু বেশি পরিশ্রম করতেই হবে!
মা বলল,
–গোসলটা করে যা? একটা শাড়ি পরে যা। তুই আসতে আসতে শাফিন চলে আসতে পারে। দেখা গেল, ও আসলো, তুইও ঢুকলি!
–এখন শাড়ি পরতে পারব না, মা। আমার দেরি হয়ে যাবে। কুশিয়ারার বাসও পাব না পরে! আজকে তো জুম্মাবার। নামাজ পড়তে যাবে সবাই। এক ঘন্টার মধ্যে চলে আসব। এসে তোমার ফর্সা হওয়ার একশো এক হোম রেমিডি মেখে গোসল করব, নীল শাড়িও পরব! চৈতিকে বলো শাড়ি বের করে আয়রন করে রাখতে। কাপড়ের গ্রীজ নষ্ট হলে আমার বিরক্ত লাগে।
কুশিয়ারা আবাসিক কমপ্লেক্সে আসতে আধাঘন্টা লাগল আমার। নির্দিষ্ট ফ্লাট খুঁজে পেলাম। দরজা হাট করে খোলা দেখে একটু ইতস্তত লাগল। দরজার সামনে আওয়াজ দিলাম কয়েকবার,
–কেউ আছেন? হ্যালো?
ফিরে আসব, ড্রাইভার লোকটির দর্শন মিলল। নিচ থেকে উপরে আসছে। বুঝলাম সঠিক ঠিকানাতেই এসেছি।
আমাকে দেখে বলল,
–ভাবছিলাম, আপনি সন্ধ্যায় আসবেন।
আমি মৃদু হাসলাম। অচেনা জায়গাতে সন্ধ্যার সময় আসাটা নিরাপদ নয়। এইটুকু সতর্কতা নিতেই হয়। আরেকটা অস্ত্র আছে আমার হাতের কাছে। পাজামায় পকেট লাগানো আছে। সেই পকেটে একটা ধারালো টিপছুরি আছে। ছোট, নিরীহ নেইলকাটারের মতো দেখতে কিন্তু ঘাতক অস্ত্র!
জানতে চাইলাম,
–কয়েকবার আমাদের দেখা হলো। আপনার নাম কী, ভাই?
নাম বলতে গিয়ে একগাল হাসলো লোকটি,
–আফ্রিদি! আব্বা ক্রিকেটপাগল, পাকিস্তান টিমের ভক্ত!
আমাকে বলল,
–আসেন, স্যার বাসায় আছে।
আফ্রিদি ভাইয়ের পিছুপিছু গেলাম। বিশাল টিভিস্ক্রিন সামনে। এত বড়ো টিভি শোরুমেই দেখেছি। পঁচাশি ইঞ্চি মনে হয়। স্ক্রিনে না যেন মাঠে বসে খেলা দেখছি। মানুষগুলো জ্যান্ত। ডান পায়ে বল লাগিয়ে লালজার্সি খেলোয়াড়টা গোলপোস্ট বরাবর যে কিকটা দিলো সেটা টিভি ভেদ করে আমার মুখে এসে লাগবে মনে হলো। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অস্ফুটে আওয়াজ করলাম,
–ও মাই গড!
সাথে সাথে এলো শব্দটা ‘রুমঝুম!”
নিয়ন ভাই। আমি চমকে উঠেছি। চোখে ঝাপসা দেখছি। নিয়ন ভাই বলল,
–আমাকে চিনতে পারছ না?
এই মানুষটাকে আমি চিনব না? সবাই জানে, টেইলার্সের নাম আমার আর ঝুমকির নামে মিল করে দেওয়া। রুমঝুম টেইলার্স। আসলে তো এই নামটা আমার। নিয়ন ভাই আমাকে একটা বিশেষ নাম দিয়েছিল, এই নামের মায়া আমি কাটাতে পারিনি কখনোই!
নিয়ন ভাইয়ের চোখে বিস্ময়। আবার বলল,
–চেনোনি আমাকে? সত্যিই?
আমার গলা শুকিয়ে গেছে। বললাম,
–পানি খাব।
আফ্রিদি দৌড়ে গিয়ে পানি নিয়ে এলো।
আমি বসলে নিয়ন ভাই বলল,
–তোমাকে ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। এত চমকাবে বুঝিনি।
–তুমি মিথ্যে কেন বলেছ?
–কোনটা মিথ্যা? আমার নাম? নাম তো ঠিকই আছে। নিয়ন আমার ডাক নাম। বাড়িতেই শুধু ডাকে। রাজন ভাইয়ার ভালো নাম ওমর ফারুক।
–পদবি ব্যবহার করো না?
নিয়ন ভাই যেন বিস্মিত হলো,
–আমি তো চৌধুরি না! তুমি জানতে না?
আমি আরো অবাক হলাম,
–চৌধুরি না? তাহলে কী? আংকেলের নাম জাহেদ চৌধুরি! আন্টিও চৌধুরী পদবি ব্যবহার করেন। সারিকা চৌধুরী।
–সারিকা চৌধুরী আমার আম্মা হয়। আম্মা কখনো সন্তান জন্ম দিতে পারেনি। আমাদের দুই ভাইকে এতিমখানা থেকে এনে আম্মার কোলে দিয়েছিল আব্বা। এতিমখানায় আমাদের নাম যেমন দেওয়া ছিল, এডাপশন পেপার আর বার্থ রেজিস্ট্রেশনেও সেটাই থেকে গিয়েছে। এসব তো বিয়ের আগেই তোমাদের পরিবারকে জানানো হয়েছিল। তুমি জানো না?
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মানুষের জীবনের পরতে পরতে কত কথা লুকানো থাকে! কয়টা আমরা জানতে পারি? হয়তো আরশি আপু জানে, আমাদেরকে জানায়নি। জানবার জন্য আমি কেউ না। আমারও তো নিজের মা নেই। আমার গর্ভধারিনী মারা গেছেন আমাকে পাঁচ বছরের রেখে। পাঁচ বছরের বাচ্চার অনেক স্মৃতি থাকে। আমার গর্ভধারিনীর কোনো স্মৃতি আমার নেই!
বললাম,
–ওই নামেই তোমাকে চিনতাম। সেটা লুকিয়ে যাওয়াটা ও তো মিথ্যা বলাই হলো।
–নিয়ন ডাকলে তুমি আসতে?
নিয়ন ভাইয়ের চোখের ভাষা না পড়তে পারার মতো ন্যাকা আমি না। কিন্তু সেসব বিশ্বাস করতে চাইছি না। জীবন বাংলা সিনেমা নয় যে লোকে দুদ্দাড় বস্তির মেয়ে সুরিয়ার প্রেমে পড়ে যাবে। আর সিনেমার সুরিয়ারা ভীষণ সুন্দরী হয়। বস্তিবাসী হলেও তাদের প্রেমে পড়া যায়! আমার কিশোরীবেলার প্রেম আমার চোখ অন্ধ করে দিয়েছে। মুখ দেখে মনের কথা পড়তে বিভ্রান্ত হচ্ছি!
বসার ঘরটা আয়তনে অনেক বড়ো। ছিমছাম আসবাব। রঙের নিয়ন্ত্রনে ভিন্টেজ ছোঁয়া আছে। আমার খুব শীত করতে শুরু করল। হাত পা জমে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছি না। নিয়ন ভাইও কিছু বলছে না। দেশ ছাড়ার সময় নিয়ন ভাই আঠারো উনিশ, তারপর কেটে গেছে ছয় বছর। হিসেবে এখন চব্বিশ পঁচিশ। কিন্তু তার চেহারা অতটা ছেলেমানুষ না। এতিমখানায় থাকার কারনে কি পড়াশোনা দেরিতে শুরু হয়েছিল? স্কুল যাওয়া দেরিতে শুরু হলে এইচএসসি সতের আঠারতে হয়নি। নিয়ন ভাইয়ের বয়স কত?
আফ্রিদি ভাই একটা ফুলদানি হতে করে নিয়ে এলো। টাটকা কিছু রজনীগন্ধা সেখানে, যেন এইমাত্র বাগান থেকে ছিঁড়ে নেওয়া।
মৃদু সুবাসে ঘর ভরে গেল। টিভি পজ হয়ে আছে। এই বাসারই কোথাও লো ভলিউমে গান বাজছে। সুর-কথা ধরতে পারছি না। ব্রেইনও পজ হয়ে আছে।
আমার নার্ভাস লাগছে। সেটা কাউকে বুঝতে দিতে চাইছি না। নিজেও কনফিডেন্স খুঁজছি। চোখে চোখ রেখে জানতে চাইলাম,
–আমাকে ছল করে ডেকে আনার এত প্রয়োজন পড়ল?
–হ্যাঁ, আমি আমার পাওনা ছাড়ি না। তোমার দেনা আছে আমার কাছে।
ভুঁরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলাম। আরশির বিয়ের সময় গেট ধরেছিলাম বিশ হাজার টাকা, জুতা চুরি করে আট হাজারে ছেড়েছিলাম আর হাত ধোয়াতে মনে হয় দশ হাজারের কমে মানিনি। সেসব তো আমরা বোনেরা সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম। আমার ভাগে কত পড়েছিল?
নিয়ন ভাই হাসতে হাসতে বলল,
–তুমি এত সকালে আসবে আমি ভাবিনি। কোনো প্রিপারেশন নেই আমার। সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। আমার অন্যরকম পরিকল্পনা ছিল।
–এত সকাল? অলমোস্ট বারোটা বাজে।
–আমি দেশে এসে থেকে দেরি করে ঘুম থেকে জাগি। অন্যরা আমার রুটিনে তাল মিলিয়ে চলে। তাই ঘড়ির হিসাব আর আমার হিসাব একটু আলাদা।
–তুমি কি দেশেই থেকে যাবে?
–তুমি চাও আমি থাকি?
আমার সামান্য সন্দেহ হলো, সেদিনের ফোনকলের রহস্য হয়তো নিয়ন ভাই জানে।
আমি উত্তর না দিয়ে মুখে তালা মেরে রাখলাম। নিয়ন ভাই বলল,
–তোমার কাছে একটা ইন্সট্যান্ট নুডলস পাওনা আছে আমার!
আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিয়ন ভাই জোরে হেসে ফেলল,
–তোমাকে ছাড়া কাউকে কোনোদিন কিছু রান্না করে খাওয়াইনি আমি। ইনফ্যাক্ট, কিচেনে গেছি ওই একবারই! সেজন্য দেনা-পাওনা বিষয়টা আমার মাথায় আছে। এত বেশি ভুঁরু কুঁচকে ফেলার মতো কিছু না। কত তুচ্ছ ঘটনাই তো আমরা মনে রাখি।
ঠিক। আমরা অনেক সামান্য কথাও মনে রাখি!
নিয়ন ভাই বলল,
–তুমি কেসি ফাউন্ডেশনে প্রপোজাল পেপার দিয়েছিলে তোমার স্টার্ট আপের জন্য!
–ওটা তোমাদের?
–দাদার নামে নাম। কাশেম চৌধুরী থেকে কেসি ফাউন্ডেশন। দুঃস্থ মহিলাদেরকে ফাইন্যান্সিয়াল এসিস্ট্যান্স এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দিই আমরা। স্টার্ট আপে সাহায্য করি। প্রপোজাল কন্টেন্ট পছন্দ হলে অফিস স্পেসও দিই।
–সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার করো না! বিনিময়ে রেভিনিউ শেয়ার নাও। পার্টনার বা ইনভেস্টর বলতে পারো!
–তুমি তো রেগে যাচ্ছ! এত স্ট্রেট ফরোয়ার্ড হলে বিজনেস কীভাবে করবে? ফাউন্ডেশন কিছু ইনভেস্টিগেশন করেছে। আব্বার ফাইল অর্গানাইজ করতে সাহায্য চেয়েছিল। তখন তোমার ফাইলটা আমি পড়েছি। আর তোমার কাজের স্যাম্পলও পেয়েছি। ফাইনাল লিস্টে তুমি আছ। সেটা দেখে একটু ফান করতে ইচ্ছা করল।
আমার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে। বলতে চাইলাম, “তোমার সাথে আমার তামাশার সম্পর্ক না!’
নিয়ন ভাই তখনই বলল,
–তুমি সম্পর্কে বেয়াইন হও। সম্পর্কটা ঠাট্টা-তামাশারই!
রেগে গিয়ে বললাম,
–আমার সময়ের দাম জানো? এই দেড় ঘণ্টায় আমি কয় কেজি চালের দাম জোগাড় করতাম, জানো?
ও নাক সিটকালো,
–উহুহু, ভিক্টিম কার্ড ছেড়ো না! তুমি সুযোগসন্ধানী এবং মিথ্যাবাদী সেটা আমি জানি। কিন্তু আত্মসম্মানবোধ আছে ভেবেছিলাম!
–আমি কী আর কী না সেটা তোমাকে ভাবতে হবে না। অনেস্টলি, নিয়ন নামটা জানলে আমি অবশ্যই এখানে আসতাম না!
–কেন? আমি তোমার কী ক্ষতি করেছি? যা করার তুমি করেছ! আমি শুধু এগ্রি করেছি।
–আচ্ছা, আমি আসছি। আমার বাসায় গেস্ট আসবে। মাকে কথা দিয়ে এসেছি, তাড়াতাড়ি ফিরব।
নিয়ন ভাই মাথা নাড়ল,
–হুম জানি। ভাবির কাছে শুনেছিলাম, তোমার নাকি বিয়ে! কংগ্রাচুলেশন! আমার খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করার ইচ্ছা নেই। কিন্তু ছোটোবেলায় একজনকে বোকা বোকা কথা দিয়ে ফেলেছিলাম বলে ফিরেছি। এসে দেখি, সেও তোমার মতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিচ্ছে। মেয়েরা সবাই সুযোগসন্ধানী। কারো হৃদয় ভাঙতে দুবার ভাবে না। তুমি কারোর মন ভেঙেছ, রুমঝুম?
আমি উঠে দাঁড়ালাম। এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে কী না কী বলে ফেলব! আমাকে দাঁড়াতে দেখে নিয়ন ভাই হাত নাড়ল,
–তোমার কাছে আমার পাওনা ছিল। দেনা শোধ করে যাও?
–নইলে কি যেতে দেবে না?
–ইউ আর রাইট! যেতে দেবো না!
জেদি বাচ্চার মতো অদ্ভুত ভঙ্গি কথার! আমি মরিয়া হয়ে বললাম,
–কী করলে ইভেন হব?
–আমাকে একটা শার্ট, পাঞ্জাবি – যা খুশি বানিয়ে দাও।
হাল ছেড়ে দিলাম,
–দাও, স্যাম্পল দাও।
–আমিই মাস্টারকপি। আমার স্যাম্পল নেই!
–আরে মেজারমেন্ট এর জন্য, একটা শার্ট, পাঞ্জাবি যা তুমি এখন পরছ, কিছু একটা দাও। আমি মাপ নিয়ে যাই। পরে আফ্রিদি ভাইকে পাঠিও, তার কাছে দিয়ে দেবো!
নিয়ন ভাই উঠে দাঁড়াল। সটান দুই হাত সোজা করল। বুঝলাম, গা থেকে মাপ থেকে বলছে। মেজারমেন্ট টেপ ব্যাগেই ছিল। কাগজ কলম নিলাম।
প্রথমে কাঁধ। টেপের প্রান্ত ডান কাঁধে চেপে ধরে অন্য প্রান্তটা বাম কাঁধের শেষে চেপে ধরলাম।
–সাড়ে আঠার।
নিয়ন ভাই বলল,
–তোমার যার সাথে বিয়ে হচ্ছে তার কাঁধ এত ওয়াইড?
–জানি না। মেপে দেখিনি।
নিয়ন ভাই ঝট করে ফিরল। বলল,
–তার মানে, তার মাপে কখনো শার্ট পাঞ্জাবি বানাওনি? আমিই ফার্স্টটাইম?
অমায়িক এক গাল হেসে বলল,
–মানে, এত কাছাকাছি আমিই প্রথম?
আমি কড়াচোখে তাকালাম,
–দর্জির কাছে জামা বানিয়ে পরার দামে এখন দুটো শার্ট কিনতে পারা যায়। তোমার টাকা আছে, তুমি কাস্টমাইজ করে পরতে পারো। আর লোকে কেনা জামার ফিটিং এর সাথে কম্প্রোমাইজ করে নেয়। সোজা হয়ে দাঁড়াও? হাত সোজা করো।
–এত বাধ্য কোনোদিন হইনি। আমারও এটাই ফার্স্টটাইম। মানে, দর্জির কছে মাপ দেওয়া। না, স্কুলের ইউনিফর্ম এর মাপ দিতে যেতে হতো। মেয়ে দর্জির কাছে ফার্স্টটাইম! হুম, এটাই এপ্রোপ্রিয়েট।
মাথা নাড়ল ও।
আমি মুখ বন্ধ করে মাপ নিতে থাকলাম। লম্বার মাপ নিলাম। এরপর হাতা, হাতের মুহুরি। কাঁধের হাড় থেকে শুরু করে কনুই পেরিয়ে কবজি পর্যন্ত টেপ টেনে নিলাম। গলার মাপ নিতে টেপটা আলতো করে গলার চারপাশে ঘুরিয়ে নিলাম।
আমার বুক ঢিপঢিপ করছে। নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। এই মানুষটা আমার প্রথম প্রেম, কিশোরীবেলার ফ্যান্টাসী। একটা সময়ে কতরকমভাবে তাকে কল্পনায় ভেবেছি আমি। সেসব এরকম হুট করে সত্যি হয়ে গেলে কেমন লাগে বুঝতে পারো? আমার যে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে, এই তো বেশি। অতিরিক্ত ইমোশনাল হয়ে হার্টফেল করে মরে যাইনি এখনো, সেটাই তো অসম্ভব ঠেকছে!
নিয়ন ভাইয়ের শরীরের তাপমাত্রা টের পাচ্ছি, আরামদায়ক উষ্ণতা জড়িয়ে আছে। হাত সরিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে না। এরপর দূরে যেতে কষ্ট হবে, আমি তো আর সেই কিশোরীটি নেই!
বুকের মাপ নিতে হবে। টেপটা বগলের নিচ থেকে ঘুরিয়ে এনে বুকের মাঝ বরাবর ধরলাম দুই প্রান্ত। বললাম,
–নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতে হবে না। ছেড়ে দাও।
নিয়ন ভাই আমার হাতটা আরেকটু বামে চাপিয়ে নিলো। ফিসফিস করে বলল,
–সেটা কি চলছে? তোমার কী মনে হয়?
আমি কিছু বললাম না। বেয়াই বেয়াইনদের মধ্যে এরকম ঠাট্টা-তামাশা হরহামেশাই ঘটে থাকে। আমি একটা কিছু ধরে নেবো, তারপর চিৎকার করে বলবে, প্রাঙ্ক ছিল!
সংখ্যাটা লিখে আবার ফিরতেই নিয়ন ভাইয়ের মুখোমুখি হয়ে গেলাম। লম্বা মাপ নিতে হবে, বাইসেপ! তার বুক বরাবর ধরতে হবে মাপার টেপটাকে। আমার মনে হলো আর সম্ভব না। এরপর ফিটটিট হয়ে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলব। আমি ছিটকে গেলাম। দ্রুতপায়ে বাসার রান্নাঘর খুঁজে বের করলাম। দশ মিনিটের মাথায় এক বাটি নুডলস এনে নিয়ন ভাইয়ের সামনে ধরলাম,
–নাও। শোধবোধ!
নিয়ন ভাই হেসে দিলো,
–তুমি তো দুষ্টু আছ, রুমঝুম!
সেই একই বাক্য, একই মানুষ !
এত দিন ধরে কত সহস্রবার, কত সহস্র রকম করে এই একটা লাইনকে হাজার হাজার লক্ষবার আবৃত্তি করেছি!
আর একমুহূর্তও এখানে না!
ব্যাগটাকে টেনে নিয়ে দরজা পর্যন্ত এসেছি, নুডলস ভরা মুখে নিয়ন ভাই বলল,
–রুমঝুম, আমার একটা রেয়ার ট্যালেন্ট আছে। ফোনের অপর প্রান্তে কে আছে, নিঃশ্বাস গুণে বলে দিতে পারি আমি!
চলবে…
আফসানা আশা





