মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৭
কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছি, ঝুমকি কয়েকবার করে দেখল আমাকে। আমি চোখে সরিয়ে নিলাম। বললাম,
–কী দেখিস?
ও চ্য চ্য শব্দ করে বলল,
–ভাতের সাথে লিপস্টিকও খেয়ে ফেলেছিস! রিটাচ দে!
উফ! মনে হলো ধরা খেতে খেতে বেঁচে গেলাম। কোন মরণে পেয়েছিল আমাকে যে সাজতে বসেছিলাম! কেন যে এত ভালো লাগায় পেয়েছে!
ঝুমকি আবার ঘুরে এলো,
–বড়ো আপা, তোর মোবাইলটা দে। আমি স্যারকে কল করে জানি, আজকে পড়াবে কিনা!
ঘুম থেকে উঠে মোবাইলটাকে খুব চোখে চোখে রাখতে হয়েছে। ছুটকি ঘুমাচ্ছে যদিও, কিন্তু আমার চোর চোর লাগছে। এই যেন ধরা পড়ে যাব! আর আমার সমস্ত কুকর্মের অকাট্য প্রমাণ আছে মোবাইল জুড়ে!
সতর্কতাবশত ওটাকে ব্যাগে ঢুকিয়েছি সকালেই। দ্রুতপায়ে ঘর থেকে নামতে নামতে বললাম,
–আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, মায়েরটা দিয়ে কল দে।
–মায়ের মোবাইলে টাকা নেই।
–আমি যেতে যেতে লোড দিয়ে দিচ্ছি!
–এক মিনিট লাগত!
আমি জুতো পায়ে গলিয়ে ত্রাহি ত্রাহি করে পালালাম!
রাস্তায় উঠেই দেখা পেলাম শাফিনের। ভোরের রোদ গায়ে পড়েছে। শান্ত, সৌম্য মুখটা। ঘাড়ের উপর গামছা ঝুলছে। হাতে টুথব্রাশ। এইমাত্র মুখ ধুয়ে এসেছে। কিছু মুহূর্ত আছে, শৈশবের গন্ধমাখা থাকে সেগুলোতে। আমাদের এই বাড়ি, আমার মা, বোনেরা, এই লালগতিবাজার, মহল্লার বুনো সকাল, আর শাফিনের আমার দিকে এইভাবে হেঁটে আসা… সাথেসাথে মন ভরে যায় অনির্বচনীয় শান্তিতে। একগাল হেসে ও ধমক দিলো,
–এইত্ত! রুমকির বাচ্চা! তুই আন্ডার এরেস্ট! এক পা-ও নড়বি না!
শাফিন আমার কাছে চলে সেছে। আমার ওড়নার কোণা ওর হাতের মুঠোয়। বলল,
–তোর দেখা পেতে কয় টাকার টিকিট কাটতে হবে? আর ফোনে কথা বলতে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে কয়দিন আগে?
আমি কাঁদো কাঁদো হয়ে গেলাম,
–তিন দিন দেরি হলে একদিনের হাজিরা কাটে! ছেড়ে দে আমাকে!
–না, না, সুন্দরী! তোমাকে তো ছাড়া যাবে না! এতদিনে তোমাকে হাতের মুঠোয় পেয়েছি! আজকে আমার মনোষ্কামনা পূরণ না করে তোমাকে তো মুক্তি দেবো না, দেবী!
আমি মুখ বিকৃত করলাম,
–ভিলেন না, কমেডি হইছে! ছাড় এইবার, নইলে লাত্থি দেবো!
শাফিন জিভে কামড় দিলো, আঙুল নাচিয়ে সাবধান করে দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,
–স্বামীকে কেউ লাথি দেয়? ছিঃ! পাপ হবে তোর, মহাপাতকী! নরকে জ্বলবি তুই!
এমন ইয়ার্কি আমাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। তবুও, বিব্রত হলাম। অথচ, আজকের আগে এমন হয়নি। এসব স্বাভাবিক লাগত। সংকোচ ঝেড়ে আহ্লাদি গলা করে বললাম,
–অমন সুন্দর জায়গায় যেতে হলে, তোকে ফেলে যাব না, প্রমিজ! এখন ছাড়। ওই দেখ মেরিনা ভাবি বেরিয়েছে। সাতশো কথা ছড়াবে।
শাফিন ছেড়ে দিলো আমাকে। ঠোঁট উলটে বলল,
–দুইদিন আছি বাড়িতে। সন্ধ্যায় ফিরিস। কথা আছে।
আমি দৌড়ালাম! সবকিছু এভাবে ছুটেছুটে এড়িয়ে যেতে পারলে খুব ভালো হতো।
লাঞ্চটাইমে নিয়নের ফোন ধরলাম। খুব গম্ভীর গলায় বলল,
–কয়শো কল দিয়েছি, গুনে দেখো?
আমি দাঁত কিড়িমিড়ি করে জবাব দিলাম,
–আমার বাপের হোটেলে খাই তো!
–একবারও কি রিসিভ করা যেত না?
–আমার চৌদ্দহাতের ভেতর মোবাইল পেলে ফ্লোর ম্যানেজার খিস্তি দিয়ে আমার চৌদ্দগুষ্টির চৌদ্দটা বাজিয়ে দেবে!
নিয়ন দুই সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর জানতে চাইল,
–গালাগাল করে তোমাকে?
আমিও সেকেন্ড দুই সময় নিলাম। একটা টানা শ্বাস নিলাম। তারো চাইতে বেশি সময় নিয়ে নিঃশ্বাসটা ফেলে বললাম,
–আমি খুব ছোটো চাকরি করি। এখানে কয়েক হাজার টাকাই কেবল রোজগার করি, সম্মান জোটে না। গালাগাল খাই হরহামেশা। ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি। এটাই আমি!
নিয়ন সাথে সাথে বলল,
–আর এই তোমাকেই আমি খুব ভালোবাসি!
তোমাকেই শব্দটার উপরে অনেকখানি জোর দিলো ও।
আমি ফোন কেটে দিলাম। কান পেতে এরকম ভয়াবহ কথাবার্তা শোনার কোনো মানে হয় না। এরপর হাত পা কাঁপবে, বুক দুরুদুরু করবে! সুখের আতিসায্যে মরে যেতে ইচ্ছে করবে।
ওভারটাইম হলো না আজ।
সাড়ে পাঁচটায় ছুটি হলো। ফ্যাক্টরির গেট থেকে মাথা বের করেই দেখি নিয়ন দাঁড়িয়ে আছে। কচি জলপাইয়ের গায়ে রোদ লাগলে যেই রঙ ধরে, সেই রঙের শার্ট আর বেইজ রঙের প্যান্ট পরা। আমার দিকে তাকিয়ে যখন হাসলো, মনে হলো পৃথিবীর সব সুন্দররা ওখানে এসে জড়ো হয়েছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
নিয়ন এগিয়ে এলো আরো খানিকটা। বলল,
–একশো তেইশটা মেয়ে গুণলাম। এত দেরি হলো কেন তোমার?
আমি দাঁতে ঠোঁট চেপে মেজাজ সামলালাম। শান্ত হয়ে বললাম,
–তুমি এখানে কেন এসেছ? এইসব দেখা করাকরির কথা ছিল আমাদের?
–মনে হলো, কালকের জন্য তুমি রেগে আছ। কথা বলছ না, ঠিকঠাক রেসপন্স করছ না! ফেস টু ফেস এক্সপ্লেইন করাটা জরুরি মনে হলো!
–আট নয় ঘণ্টা ধরে এক্সপ্লেইন করেও আরো এক্সপ্লেনেশন বাকি আছে? আমি যদি ওভারটাইম করতাম? আরো দেরি হতো আমার?
নিয়ন কাঁধ নাচাল। নির্বিকার গলায় বলল,
–দাঁড়িয়ে থাকতাম!
আমি গলায় উদ্বেগ নিয়ে বললাম,
–মনসুর ভাই না এসে যায়! কে, কোথা থেকে দেখে ফেলবে কে জানে! তোমার গাড়ি কোথায়?
নিয়ন ওর ছোটো চোখগুলোকে আরো ছোটো করে ফেলল। বলল,
–মনসুর ভাইটা কে? ওহ তোমার সেই জান-কলিজা? তুমি কী কী করেছ, বলো তো রুমঝুম? কতগুলো আরো জান ফান আছে তোমার?
–একটাও কথা না।
আমিই ওর গাড়ি খুঁজে উঠে পড়লাম!
গাড়ির মধ্যে উঠে আমি বুকভরে শ্বাস নিলাম। জানতে চাইলাম,
–আমি এখানে কাজ করি, তুমি জানলে কীভাবে?
নিয়ন কাঁধ নাচাল,
–আমি কি তোমার সম্পর্কে কিছু জানি না? সব জানি। একটা রিসার্চ পেপার নামিয়ে দিতে পারব, এতকিছু জানি। শুধু আমাকে ভালোবাসো কিনা সেটা জানা বাকি ছিল। কাল সেটা জেনে নিয়েছি।
আমি উদাস হলাম,
–আমি তো তোমার সম্পর্কে কিছু জানি না!
–কী জানো না?
–তোমার নাম আর ঠিকানা ছাড়া আমি তো কিছুই জানি না। তুমি শান্ত নাকি চঞ্চল, গান শোনো নাকি কবিতা পড়ো, তোমার অভ্যাস, তোমার শখ, তোমার কাজ, তোমার স্বপ্ন, বন্ধবান্ধব, কাদের সাথে মেশো – আমি তো কিছুই জানি না!
–জেনে নিও!
–আমার সময় নেই। অনেক কাজ আছে।
–আজকে কিছুক্ষণ থাকো আমার সাথে?
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
–এমন ভান করছ যেন আমাদের এতদিন প্রতিদিন দেখা হয়েছে। আমাকে না দেখে মরে গেছ, সেটা তো না! এখন হুট করে মরেও যাবে না!
–আচ্ছা, এই দশ মিনিট। তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই?
–লালগতিবাজার বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত!
নিয়ন খুব দুঃখী গলা করে বলল,
–তুমি কি সবসময় এইরকম ইরিটেটেড থাকো? নাকি আমাকে দেখে রেগে আছ?
আমি চোখ বড়ো করে বললাম,
–আমি সবসময়ই বিরক্ত থাকি। দুনিয়ার সমস্ত মানুষকে চিবিয়ে, গিলে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে আমার! কোনোদিন মনে হয়, কোল্ডব্লাডেড মার্ডারার হয়ে যেতে। একটা একটাকে ধরে থাবড়াতে ইচ্ছে করে! মাঝেমাঝে মনে হয়, দুনিয়ায় আগুন লাগিয়ে দিই!
আমি চুপ করে গেলাম। মাথা ভার লাগছে। গাড়ির হেডব্যাকে হেলাম দিলাম।
আধামিনিট পরে নিয়ন বলল,
–তুমি এরকম লাশের মতো পড়ে আছ কেন? নিঃশ্বাস টিশ্বাস নিচ্ছ তো? মরে গেলে আমি কিন্তু বিপদে পড়ে যাব।
–বিপদ হোক!
–তুমি তো অনেক রেগে আছ! দেখো, আমার জন্য অন্য উপায় তো রাখোনি তুমি! আমি যদি জানতাম, আমার জন্য তোমার কোনো ফিলিংস নেই, আই উড হ্যাভ লেট ইট গো! ফান করার বাহানা করে ডেকে নিয়েছিলাম তোমাকে, ফান পর্যন্তই থাকত সেটা! কিন্তু তুমিও কনফেস করেছ। এডমিট করেছ, তুমিও ফিল করো। এরপরে আমি তোমাকে কী করে ছেড়ে দিতাম? তুমি বাড়ি ফিরে, মায়ের চাপে বাবার দেওয়া কথা রাখতে ঠিকই লক্ষীপক্ষী মেয়ে সেজে বিয়ে করে নিতে। কি, নিতে না?
আমি এসব অভিযোগের জবাব দিলাম না। ঘটনা সত্য।
নিয়ন বিদ্রুপ করে আমাকে ভেঙাল। একদম আমার মতো করে বলল,
–বিয়েশাদি কমপ্লিট করে আমাকে ফোন করে বলতে, স্যরি নিয়ন, ইউ ডিজার্ভ বেটার দ্যান মি! আমি তোমার যোগ্য না! তুমি অনেক ভালো মেয়ে পাবে যে তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসবে!
আমার মনে হলো, এটাও সত্যি। আমি সম্ভবত এটাই করতাম! এভাবেই বলতাম।
আমার হাত ধরল নিয়ন। গভীর গলায় বলল,
–আমি অনেক ভালো চাই না, রুমঝুম, আমি শুধু তোমাকে চাই!
আমার চোখে পানি এসে গেল চট করে। সিরিয়ালের সমস্ত তাকদুম তাকদুম বাজনাগুলো আমার কানের কাছে বেজে গেল একসাথে। বললাম,
–আমরা কালকে কথা দিয়েছিলাম, অন্তত দুই আড়াই বছর কাউকে কিছু বলব না। কালকের সবকিছু ভুলে থাকব। এর আগে যেমন ছিলাম তেমন থাকব। আমার অনেক দায়িত্ব, নিয়ন! আমি এরকম ইরেসপনসিবল হতে পারি না! আমাকে মানায় না এসব!
–দায়িত্ব পালন করতে বাধা হইনি তো! বরং ভাগাভাগি করে নিতে পারি। ফিফটি ফিফটি! ধরো, মাকে আমি নিলাম। আমার নিজের মা নেই। তুমি দাতা হাতেম তাঈ হয়ে আমাকে মা দিতে পারো। আর, তোমার বোনগুলোর মধ্যে যেটা একটু কম বিচ্ছু। যে ওই জান কলিজা লিখেছে তাকে কিছু দেবো না, বলে দিলাম। যদি তুমি রিকোয়েস্ট করো, তোমার সাথে আমার ঝগড়া হয়ে যাবে!
আমি হেসে ফেললাম। তারপর সিরিয়াস মুখ করে বললাম,
–আমি কারো কাছ থেকে কিছু নিই না!
–অন্য কেউ আর আমি কখনো এক নই। এখন তো একদমই নই!
তর্কে তর্ক বাড়ে। প্রসঙ্গ বদলালাম,
–তুমি বলেছ, তোমার আম্মাকে কখনো রাজি করাতে পারবে না!
–আমি ছোটো না, তাদের উপর ডিপেন্ডে করেও নেই যে আমার সবকিছুতে তার পারমিশনের প্রয়োজন হবে। তোমাদের বাড়িতে ফরমাল প্রপোজাল পাঠিয়ে খুব সহজে তোমাকে পেতে পারতাম। আরশি ভাবিও সেটাতে রাজি হয়নি, আম্মাও কোনদিন তাতে রাজি হবে না, সেটা বলতে চেয়েছি। আমার প্রিয় কিছু কোনোদিন আমাকে পেতে দেবে না সে!
–আর আংকেল?
–থাক না ওদের কথা! তুমি তোমার কথা বলো? মাকে কখন বলবে, তুমি এই বাবার কথা রাখা বিয়েটিয়ে করতে পারবে না?
–আগে শাফিনকে বলব। আজ।
–জান কলিজা ১? সে?
আমি ইতস্তত ভঙ্গিতে ঘাড়ে হাত ঘষলাম!
–ভালো হবে না, রুমঝুম! কালকের কথা ভুলে যেও না। এক মিনিটের জন্যও না! গতকাল কিন্তু…
আমি সর্বশক্তি দিয়ে ওর মুখচেপে ধরলাম,
–বলবে না, একদম বলবে না। কালকের কোনো কথা মুখ থেকে বের করবে না!
নিয়ন চোখ মটকাল!
আমি নড়েচড়ে উঠলাম।
–এসে গেছি। এখানেই নামব!
নিয়ন বিরক্তগলায় বলল,
–আফ্রিদি, তুই আজকে এত স্পিডে ড্রাইভ করলি কেন? তুইও আমার সাথে শত্রুতা করছিস?
আফ্রিদি মুখ নামিয়ে বলল,
–কই স্যার, চল্লিশের আশেপাশেই ছিল! দশ মিনিটের পথ পুরো তেইশ মিনিট লেগেছে আসতে।
–তাই? আমার মনে হলো মাত্র কয়েকটা মিনিট গেল!
আশ্চর্য, আমারও সেটাই মনে হলো! আইন্সটাইনের থিওরি অভ রিলেটিভিটি পড়েছিলাম! প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে সময় খুব দ্রুত চলে যায়!
নিয়ন বলল,
–কল দিলে রিসিভ করো, প্লিজ! এইটুকু করা যায়। রাতে কল দেবো।
আমি কিছু বললাম না। ও অপেক্ষা করে আছে জেনেও পিছু ফিরে তাকালাম না। ওর কাছে আমার অস্তিত্বের ডালপালা শেকড় মেলতে শুরু করেছে। সেগুলোকে আশকারা দিয়ে আরো গেঁড়ে বসতে দিতে চাইছি না!
আমার খুব ভয় করে!
দুঃখ পেতে হবে জানি বলেই খুব ভয় করে আমার!
চলবে…
আফসানা আশা





