মেয়ে, তুমি কি দুঃখ চেনো? – ৬
আমাদের বাড়িটা বাজারের খুব কাছে। এই মহল্লা কখনো ঘুমায় না। লোক গিজগিজ করছে সবসময়ই। মোড় ঘুরতেই চায়ের দোকানে মনসুর ভাইকে দেখতে পেলাম। আমার মনে হচ্ছে বিরাট কোন অপরাধ করে ফেলেছি, যেন চুরি করেছি নইলে ভয়াবহ কোনো কেলেংকারী! মনসুর ভাইকে দেখেও দেখিনি ভান করে বাড়ি এসে পড়লাম। আজকে বাড়ির বদলে পাতালে যাওয়ার রাস্তা জানা থাকলে আমি সেখানেই যেতাম!
কুশিয়ারা থেকে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা বেজে গেল। দুপুর থেকে আমার মোবাইল বন্ধ ছিল। মাকে কী জবাব দেবো সেটা ভেবে আমার মাথা কাজ করছে না। মিথ্যে কথা আমি হরে-দরে বলি। কিন্তু ফ্যাক্টরিতে ফ্লোর ম্যানেজারের কাছ থেকে সিক লীভ নিতে মিথ্যে বলা আর মায়ের কাছে এরকম একটা বড়ো ঘটনা নিয়ে মিথ্যে বলার মধ্যে পার্থক্য আছে। অনেক সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে হবে। মা চট করে ধরে ফেলতে পারে আমাদের সত্যি-মিথ্যা। ভয়ে ভয়ে ঘরে পা দিয়ে বড়ো চাচিকে পেলাম। আশ্বস্ত হলাম, এখনই মায়ের জেরার মুখে পড়তে হবে না। সময় পাওয়া যাবে অজুহাত তৈরি করার। ঘরের দিকে না গিয়ে আমি ঝুমকিকে ইশারায় বললাম আলনা থেকে আমার জামা দিতে। একবারে গোসল করে নেবো।
ঝুমকি আমার হাতে জামা আর গামছা দিতে দিতে বলল,
–তুই ছিলি কোথায়?
–বড়ো একটা অর্ডার পাব বলেছিলাম, না?
–তাই বলে সারাদিন? তোর ফোন বন্ধ কেন?
আমি নার্ভাস গলায় বললাম,
–চার্জ ছিল না!
ঝুমকি ভুঁরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। একবার ফুলচার্জ হলে প্রায় দুই তিন দিন আমার সেটে আর চার্জ দেওয়া লাগে না, আর চার্জ দেওয়ার কাজটা ঝুমকি খুব সময়মতো করে।
ও জেরা করার ভঙ্গিতে বলল,
–তুই কি শাফিন ভাইকে বিয়ে করতে চাইছিস না?
এই মেয়েটা খুব মেধাবী, ধীশক্তি প্রখর। আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ও বলল,
–না করতে চাইলে সোজাসুজি না কর। তারপর, মনসুর ভাইকে বিয়ে করে ফেল!
আমি যেন ছোটো, ও বড়োবোন। ঢোঁক গিলে বললাম,
–আর যদি অন্য কাউকে বিয়ে করি?
ঝুমকি তেতে গেল,
–অন্য কে? তোর মাথায় কী ঘুরছে? তোর কপালে দুঃখ দেখতে পাচ্ছি! মনসুর ভাইকে কষ্ট দিলে আল্লাহ তোকে মাফ করবে না, শয়তানী!
ঝুমকির চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
আজকের দিনটা ঘটনাবহুল ছিল। ওভারহেলমিং! অসহ্য রকমের সুন্দর একটা দিন! অদ্ভুত সব প্রাপ্তি আর দুর্বার আনন্দে আমি ক্লান্ত হয়ে আছি। একইসাথে প্রবল হয়েছে গ্লানিবোধ! ঝুমকির সাথে বচসা করতে ইচ্ছে করছে না। উত্তর করলাম না ওর কথার।
ও বলল,
–ঠোঁট ফুলাচ্ছিস কেন? আমি ভুল কোনটা বলেছি?
মা টের পেয়েছে আমি এসেছি। আওয়াজ পেলাম,
–রুমকি, আসছিস?
আমি দরজার পাশে দাঁড়ালাম। মা পানের খিলি বড়োচাচির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব রুষ্টগলায় বলল,
–বান্দার মনে যা, আল্লাহর মনেও তা! বাপের শেষ ইচ্ছার কদরও নেই, মা যে শান্তিতে চোখ বুজবে সেই ভাবও মেয়ের মনে নেই!
মায়ের অনুযোগের পাল্লা বাড়ছে, আমার অপরাধবোধও আমাকে নাকপর্যন্ত ডুবিয়ে দিচ্ছে। মা বলল,
–তোর ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। শাফিনের মা একটা শব্দও করল না! শাফিনও না!
বড়োচাচি আগ্রহী হলেন,
–কিচ্ছু বলল না?
মা মাথা নাড়ল,
–উহু! ওরা ভাবছে, রুমকি তো আছেই! বিয়ে একদিন হলেই হলো! শাফিন কেবল চাকরি পাইছে, ঘরদোর করবে, ভাইবোনদেরকে দেখবে, সংসারের উন্নতি করবে। বিয়ে হয়ে গেলে তো শাফিনের আলাদা সংসার হবে, খরচ বাড়বে, বউ নিয়ে ঢাকায় বাসা করে থাকবে। বছর গেলে বাচ্চাকাচ্চা হবে। এদিকে খরচাপাতি দেওয়া কমিয়ে দেবে। এইজন্য মুখে তালা দিয়ে আছে।
–মেয়ে তো পানিতে পড়ে যায় নাই একদম! তুমি এত ভাবো কেন? শাফিনদের আশায়ই বসে থাকবা কেন? লোকে তো তোমার কথাও বলে, সতীনের মেয়ে বলে তুমি আমাদের রুমকির মাথায় কাঁঠাল রেখে খাচ্ছ! নিজের মেয়েদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছ!
মা জবাব দিলো না। কখনোই এইসব অভিযোগের জবাব দেয় না সে। বড়োচাচিই আবার বললেন,
–যত অপেক্ষা করবা, যত দেরি করবা মেয়ে পার করতে, লোকে তত সৎ মা, সৎ মা জিকির করবে।
বড়োচাচি গলা চাপিয়ে বললেন,
–আমার ভাইস্তা কিন্তু রুমকিরে পছন্দ করেছে। দেশে আসবে সামনের মাসে। তুমি বললে, ফোনে ফোনে বিয়ে লাগায় দিতে পারি। ভিডিও কলে দেখবে, কাজি থাকবে এইপাশে, তিন কবুলে বিয়ে শেষ। খরচাপাতিও দিতে হবে না। ওদের অনেক আগ্রহ। সেধে আসা লক্ষী পায়ে ঠেলতে নাই! তুমি রাজি থাকলে কালকেও হয়ে যেতে পারে!
মায়ের হাতে চাপ দিলেন চাচি।
আমাকে পার করবার এত তাড়াহুড়া কেন তার সেটা আজ জলের মতো পরিষ্কার আমার কাছে।
মা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–মহারানির দুপুরে খাওয়া হয়েছে? পেটে গেছে কিছু?
আমি মাথা নাড়লাম। মা বলল,
–যাও, গা ধুয়ে এসে দুটো ভাত খাও। খেয়ে আমার জানে একটু শান্তি দাও!
বড়োচাচি বললেন,
–বিয়ের পানি গায়ে ছিটলে নাকি মেয়েদের রূপ বেড়ে যায়। রুমকির গায়ের রঙও খুলে গেছে। চোখমুখও কাটা-কাটা হয়েছে। ছোটো থাকতে যে কাকলাসের চেহারা ছিল, এখন তো তেমন নেই। যে দেখবে এখন, সেই পছন্দ করবে। সময় থাকতে বিয়ে দিয়ে দেও। এই সুন্দর বয়স বাড়লে থাকবে না।
মা প্রতিবাদ করল,
–চোখ-মুখ সবসময়ই সুন্দর ছিল ওর। সাজগোজ করেনি কোনোদিন এইজন্য লোকের চোখে পড়েনি। সাজলে ওর সাথে টেক্কা দেওয়ার মেয়ে এই সৈয়দ বাড়িতে নেই।
বড়োচাচির মুখ কালো হয়ে গেল। কিন্তু দমে গেলেন না। মুখে হাসি টেনে বললেন,
–আমি কথা বলব আমার বোনের সাথে? শুভ কাজে দেরি কী?
বড়োচাচির উদ্দেশ্য মায়ের কাছে পরিষ্কার না। নিষ্পৃহ গলায় বলল,
–মহারানির সাথে কথা বলে দেখি!
–ওর সাথে কী কথা! তুমি মা, তোমার কথাই শেষ কথা!
–না, সেই সৌভাগ্য কি আমার আছে? আমাকে মা মানলে কি এত ভোগান্তি দেয়? পেটে ধরতাম, তাহলে মায়ের টেনশন বুঝত! পেটে ধরিনি তো!
আমি সরে গেলাম। আজকে এই প্যাঁচালই চলবে সারা রাত! যতবার আমাকে দেখবে ততবার পেটে ধরা মা আর পেটে না ধরা মায়ের পার্থক্য, উদাহরণসহ শুনতে হবে। ইমোশনাল অস্ত্রশস্ত্রে মায়েদের ঝুলি ভরাই থাকে!
গোসল করে এসে দেখি মা ভাত বেড়ে বসে আছে। আমি কোনো শব্দ না করেই খেতে বসে গেলাম।
টিভি চলছে। বিটিভির রাত দশটার খবর শেষ হলো। সবার পরীক্ষার বছর বলে কেবল কানেকশন কেটে দিয়েছি। মা সন্ধ্যাবেলা ছোটোচাচির বাড়িতে সিরিয়াল দেখতে যায়।
মা কেঁদেছে। তার চোখ ভেজা। স্বান্ত্বনা দিতে বললাম,
–বিয়েটা দুই আড়াই বছর দেরি হলে কী অসুবিধা? আমার বিয়ে হয়ে গেলে খাবে কী, সেই হুশ আছে?
মনসুর ভাই ঠিক বলে। আমি রুঢ়ভাষী! মা কষ্ট পাচ্ছে, সেটা লঘু করতে গিয়ে আমি উলটো আরও আঘাত দিয়ে ফেললাম। আমার মনের সুকুমারবৃত্তিগুলো হারিয়ে গেছে আসলেই?
তাহলে আজ কীভাবে ভেঙেচুরে বিলীন করে এলাম নিজেকে? মেঘ না চাইতে যে জলোচ্ছ্বাস এসেছিল, স্বেচ্ছায় তাতে গা ভাসালাম কেমন করে? অত বেসামাল কেমন করে হলাম?
নাকি শুধু মায়ের সাথেই পারি? সে কি মা দুর্বল আর অসহায় বলে?
মা তরকারীর কড়াইয়ে মুরগীর কলিজা খুঁজে আমার প্লেটে দিতে দিতে বলল,
–পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। তোর বাপে মরলে আমরা কি ভেসে গেছি? তুই দাঁড়ায় গেছিস না? তোর বিয়ে হয়ে গেলে, এই তিনজনের কেউ না কেউ হাল ধরতে শিখে যাবে!
আমি শাক খেতে পছন্দ করি না। রেগে থাকা মাকে শান্ত করতে মিনমিন করে বললাম,
–আমাকে একটু শাক দাও। এরকম সবুজ সবুজ থাকলে খেতে ভালো হয়।
মা শাক দিলো না। পাঙাস মাছের পেটি দিলো প্লেটে। বাটা কাঁচামরিচ আর আদার ঘ্রাণে তরকারি মাখোমাখো। এই রান্নাটা মায়ের হাতে খুব ভালো হয়। পেটির তেলটুকু ভেঙে চৈতির প্লেটে দিতে দিতে বললাম,
–ওই কিপটা মুন্সীর মেয়ের হাতে তো সবার জন্য মাছের পেটি উঠবে না। মুন্সীর মেয়ে মনে করে, আমি রাক্ষসী, আমার এত বড়ো একটা পেট!
মা খ্যাক করে উঠল,
–ওরা খাইছে না? দুপুরে সবাই খেয়েছে! এই খাবে না, সেই খাবে না, ডিম খাবে না, মাছ খাবে না – একেকজনের শতেক বাহানা, আমার আর সয় না! গলায় দড়ি দিলে সবার মুক্তি। যার যা ইচ্ছা করবি! বড়ো বোনে সারাদিন পেটে দানা দেয়নি, মাছ তুলে দিলো ওমনি খেতে শুরু করে দিলি? এত নোলা হবে কেন? স্বার্থপরের গুষ্ঠি!
চৈতির চোখে পানি এসে গেল।
ভাত রেখে উঠে যেতে গেলে মা ধমক দিলো,
–খবরদার একটা ভাত যেন নষ্ট না হয়! চলা দিয়ে মেরে সমান করে দেবো!
মায়ের চলাকাঠের বাড়ির অভিজ্ঞতা আমাদের সবার আছে। আমি চৈতির সাপোর্ট নিতে গিয়েও থেমে গেলাম, মাকে রাগিয়ে দেবো না। আজকে আমি নিজেই ব্লান্ডার করে এসেছি।
ভয় হচ্ছে, আমার দিকে ভালো করে দেখলেই যেন বুকের ভেতরটা মা পড়ে ফেলবে স্পষ্ট করে।
এক লোকমা ভাত নেড়েচেড়ে কয়েকবার করে মাখলাম। কয়েকটা ঢোঁক গিলে বললাম,
–মা, যদি কোনোদিন শোনো, আমি খুব স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কথাই ভেবেছি… একদিন শুধু নিজের জন্য বেঁচেছি, একদিন নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি, খুব বড়ো কোনো সর্বনাশ করে ফেলেছি…
মা পাঙাসের একটা টুকরো ভেঙে অর্ধেক ঝুমকিকে, অর্ধেক ছুটকিকে দিতে দিতে আমাকে বলল,
–তুই যত হিসাব করে চলিস, জীবন অত গুনে গুনে চলে না, রুমকি! জীবনের হিসাবে ভুল-চুক হয়ই। বড়ো গোলমালও হয়। আমরা ভুল করেছি, তোরাও করবি। ভুল করলে ভুলের মাশুলও দিবি। শুধু থেমে যাবি না। চলবি। হারবি কী জিতবি, চলতেই থাকবি। জানবি, মা পাশে আছে। আমার চারটা বাচ্চার সাথেই আমি আছি। তোরা জিতে আসলেও মা ভাত রেধে খাওয়াব, হেরে গেলেও আঁচল পেতে বিছানা করে দেবো!
আমার গলা রুদ্ধ হয়ে আসতে চাইল। আমি কেমন করে ভুল করলাম! আমি কেমন করে ভেসে গেলাম!
খাওয়া শেষে সোজা বিছানায় চলে গেলাম। চৈতি একটু বিস্মিত হলো। জানতে চাইল,
–আজকে দোকানে যাবি না?
আমরা চারবোনই বড়ো হয়ে গেছি। বদনাম যেন না রটে, তাই বাইরের কোনো পুরুষের আমাদের বাড়িতে ঢোকা নিষেধ। শাফিনেরও। দোকান খুললেই শাফিন আসবে। অনেকদিন আমাদের দেখা হয় না। দুপুরে ফোন করেছিল। রিসিভ করতে পারিনি।
মনসুর ভাইও রাত বেশি হলে একবার দোকানে উঁকি দিয়ে যান।
আজ কারোর মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না আমার!
নকল হাই তুলতে তুলতে বিড়বিড় করলাম,
–আজকে একটা ভয়ংকর দিন গেছে, চৈতি! আমার মাথার ঠিক নেই। দেখা যাবে, শার্ট কাটতে গিয়ে পাজামা সেলাই করে ফেলব! আজকে ঘুমিয়ে যাই। কালকে আবার সকালে কাজে যেতে হবে।
আমি জানি, আজ আমার ঘুমও আসবে না!
চৈতি সরে গেল। আমার মনে হলো ও মায়ের মোবাইল নিয়ে কিছু একটা করল। ছুটকির সতর্কতা মনে পড়ে গেল আমার। আসলেই কি শাফিনের সাথে ওর কিছু?
মোবাইল সাইলেন্ট করা। নিয়ন কল দিয়েই যাচ্ছে। অনবরত। থামাথামি নেই। মেসেজ ঢুকতে ঢুকতে মেমোরি কার্ড ফুল নোটিফিকেশন আসছে। আমি উঁকি দিয়ে ঘরের পরিবেশ বুঝতে চাইলাম। মা ঘুমায়নি এখনো। ঘুমাতে দেরি হবে। হাতের সেলাই লাগে কিছু জামায়। বোতাম বসানো লাগে। সেসব খুচরো কাজ রাতে করে মা। ঝুমকি আর চৈতি মায়ের ঘরে নিচে বিছানা পাতে। ছুটকি আমার সাথে ঘুমায়। অনেক রাত জেগে পড়া করে ও। আমি মোবাইলটাকে বালিশের নিচে ঢুকিয়ে ছুটকিকে বললাম,
–তুই কি আরো রাত জাগবি?
ছুটকি একডাকে শুনল না। গভীর মনোযোগ পড়াতে। আবার ডাকলাম,
–আমাকে মশারিটা টাঙিয়ে দে।
ছুটকি শুনল না। আবার ডাকলাম,
–ছুটকি?
ছুটকি ক্ষেপে গেল,
–তুই আজকে এত বিরক্ত করছিস কেন? ঘুমা। আমি ঘুমানোর সময় মশারি লাগিয়ে দেবো।
–আর আমাকে মশা তুলে নিয়ে যাক?
–তোর আজকে হইছে কী? অন্যদিন মশারি লাগাতে দিস না, তোর দমবন্ধ লাগে বলে। আজকে প্যানপ্যান করছিস কেন? কোচিংয়ে কালকে মডেল টেস্ট আছে। ফার্স্ট হলে একশো টাকা পুরষ্কার।
–একশো টাকা আমি তোকে দেবো। তুই এসে ঘুমা!
ছুটকি ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল,
–রুমকি, আরেকবার আমাকে ডাকলে মশা লাগবে না, আমি তোকে ঘরের বাইরে ফেলে আসব।
ছুটকি কানে হাতচাপা দিয়ে জোরে জোরে পড়তে শুরু করল। অন্যদিন আমি ঘুমিয়ে যাই। কাউকে তো বলতে পারছি না, অন্যদিন আর আজ এক নয়! এক নয়! এক নয়!
ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে বালিশের নিচে।
আমি কাঁথার ভেতর সেধিয়ে গেলাম।
কাঁপা আঙুলে সবুজ বোতাম টিপে দিলাম। ফোনটা কানে চেপে মড়ার মতো পড়ে থাকলাম।
ওপাশ থেকে নিয়ন বলল,
–বের হয়েই আমাকে ভুলে গেছ? না একটা কল, না মেসেজ। পৌছালে কখন, কিছু না!
আমি উত্তর দিলাম না।
নিয়ন বলল,
–তুমি মাকে বলেছ, বিয়ে করছ না?
আমি নিশ্চুপ হয়েই রইলাম। নিয়ন বলল,
–কি? মানা করোনি? বলোনি, বিয়েটা তুমি করবে না?
গলার আওয়াজ আরেকটু বাড়িয়ে বলল,
–রুমঝুম?
আমার মনে হলো, এই ডাক ছুটকিও শুনতে পেয়েছে। চোরের মতো ফিসফিস করে বললাম,
–কাল বলব!
–আজকে কেন বলোনি?
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। গলা চাপিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,
–আজকে সুযোগ পাইনি! সবকিছু খুব দ্রুত ঘটে গেছে। বাংলা সিনেমার মতো করে তিন ঘন্টায় আমার জীবন পুরো বদলে গেল!
–আমার তো তাড়াহুড়া ছিল না। ইউ ওয়্যার ইন আ হারি। বাচ্চা একটা মেয়ে, বিয়ের জন্য হুড়োহুড়ি লেগে গেছে! নইলে, আমি তো চুপচাপ অপেক্ষা করেই ছিলাম!
আমি চুপ করে থাকলাম। অভিযোগের জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না।
আমার খুব সুখ সুখ লাগছে। ঝগড়া করতেও আনন্দ হচ্ছে।
–তোমার কোনো প্রমিজ ছিল না, রুমঝুম। আই ওয়াজ কমিটেড। লায়াবিলিটিজ ওয়্যার অলসো মাইন। আমাকে তো ডেসপারেট হতেই হতো। ফাঁক দিয়ে তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করে নিলে আমি কী করতাম? আই ওয়াজ হেল্পলেস। আমি ট্রিক করে ডেকে না আনলে, তুমি কখনো আমার কথা ভাবতে না। ঠিক না? ভাবিও পছন্দ করছিল না, সেজন্য তোমাদের বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আম্মাকে তো জীবনেও রাজি করাতে পারব না! তোমাকে ট্রিক করা ছাড়া আমার তো অন্য উপায় ছিল না! আর ডেকে নিয়ে এসে একটা ফাইনাল ডিসিশন না জেনে তো তোমাকে ছাড়াটাও সম্ভব হতো না! এত কম সময় দিলে তুমি আমাকে!
নিয়নের কাতর সংলাপের জবাবে আমি আস্তে করে বললাম,
–হুম!
ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাস পড়ল,
–শুধু এই? আর কিছু বলবে না?
–উহু?
–কালকে কখন দেখা হবে? আমি আসব?
–উহু।
–তুমি আসবে? প্লিজ?
–সম্ভব না!
অনুনয়ে নিয়নের গলা ভেঙে গেল,
–প্লিজ!
–সময় হবে না।
–ইউ আর সো ক্রুয়েল, রুমঝুম! সব কি আমি করব? তুমি কি আমার জন্য কিছু করবে না?
আমি ফিসফিস করে বললাম,
–আমার একটু সময় চাই! একসাথে এতটা, আমার সহ্য হচ্ছে না। স্বপ্নের মতো লাগছে। আমি কি তোমাকে আদৌ ডিজার্ভ করি?
–আমি তো অন্যভাবে ভাবি। চৌধুরীরা দত্তক না নিলে, আমি তো নিছক রাস্তার ছেলে, যার জন্মপরিচয়ই নেই! তখন জনৈক সালমান ফারসিকে দেখে তুমিও নাক সিটকাতে!
আমি হেসে ফেললাম সেই দৃশ্য কল্পনা করে!
নিয়ন বলল,
–তোমার আমার হয়তো কখনো দেখা হতো না! সেই সম্ভাবনাতে আনন্দ হচ্ছে তোমার? আনন্দ তো হবেই।জান কলিজার তো ছড়াছড়ি তোমার আশেপাশে! ওরা তোমার বোনেদেরকে ঘুষ হিসেবে কী দেয়, জেনে নিও তো!
ছুটকি আমার মাথা থেকে কাঁথা টেনে নিয়ে খুব সন্দিহান গলায় বলল,
–তুই কার সাথে কথা বলছিস? প্রেম করছিস, রুমকি?
আমি চমকে উঠে ফোন কেটে দিলাম।
ছুটকি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছে,
–তোর ভাবগতিক তো সুবিধার না। ফোন দে আমাকে? আমি দেখব ওটা কে?
আমি মোবাইলটাকে চেপে ধরে আবার কাঁথামোড়া দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ছুটকি ছাড়ল না আমাকে। কাতুকুতু দিতে দিতে নাজেহাল করে ছাড়ল। বলল,
–নাম বল, রুমকি? শাফিন ভাই? মনসুর ভাই? কোনটা? কার সাথে প্রেম তোর?
আমি ওকে শক্ত করে চেপে ধরে শুয়ে পড়লাম!
আচ্ছা, তোমরা বলো, কোনো এক সন্ধ্যাবেলায় তোমাদের এক চিলতে ছাদের উপর যদি আসমানের চাঁদটা নেমে আসে, তোমরা কি চাঁদটাকে জড়িয়ে ধরবে না? নিজেদের সামলে রাখতে পারবে? হুড়কো বানে কে না ভেসে যায়?
আমি ফিসফিস করলাম ছুটকির কানের কাছে,
–আমি ভুলটা করে ফেলেছি, ছুটকি!
চলবে…
আফসানা আশা





