Tuesday, April 14, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প আমি কাউকে বলিনি সে নাম আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ১৪

আমি কাউকে বলিনি সে নাম তামান্না জেনিফার পর্ব ১৪

আমি কাউকে বলিনি সে নাম
তামান্না জেনিফার
পর্ব ১৪
__________________________
সকাল সকাল আলেয়া চাচীর সাথে বেশ একটা তর্কযুদ্ধ হয়ে গেছে রূপার ৷ নিপার বৌভাতে আলেয়া বেগম যাচ্ছেন না কারণ সবাই চলে গেলে তার বড় জা সুফিয়া বেগমকে দেখে রাখার জন্য আপন কেউ থাকবে না ৷ তা তিনি যাবেন না বেশ ভালো কথা , না যাক ৷ সমস্যাটা হলো তিনি যাবেন না জন্য রূপাকেও তিনি পাঠাবেন না ৷ ভাবীরা তো যাচ্ছে , রূপা তো তাদের সাথেই যেতে পারতো ! কিন্তু চাচীর এক কথা “একলা ছাড়ুম না সেয়ান মাইয়্যা ” … এতগুলো লোক যাচ্ছে , তাহলে সে একলা হয় কিভাবে ! রূপা কত কিছু ভেবে রেখেছে , নিপা আপার শ্বশুরবাড়িটা কেমন এটা জানার জন্য ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে ! শুনেছে আশেপাশের দশগ্রামের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাড়ি তাদের ৷ বাড়ির সামনে না কী একটা ফোয়ারা আছে! ফোয়ারা জিনিসটা কী কে জানে .. সে যে কত সাধ করে আছে ফোয়ারা দেখবে সে কথা কী আলেয়া চাচী বোঝে না ! আসলে সবই বোঝে , ইচ্ছে করে তাকে যন্ত্রনা দেয় !

রূপার দুচোখ জলে ভরে যায় ৷ ওবাড়ি যাবার আগে মানিক চাচা একবার আলেয়া বেগমকে বলেছিলেন “বউ , যাইতে দেও না রূপারে ৷ আমি দেইখ্যা রাখুম ৷ ওর হাত ধইরা রাখুম ৷ ” জবাবে আলেয়া বেগম এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাঁকিয়েছে যে মানিক মিয়া আর কথা বলার সাহস পায়নি ৷ বিবাদহীন জীবন তার পছন্দ , বউয়ের সাথে বিবাদে যান না তিনি কখনই ৷

দুপুর বেলা আলেয়া চাচী রূপাকে খেতে ডাকলেন , যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে ! অথচ সকালেই বলেছেন “বেসাইস্তা লবলবি , একলা একলা যাইতে চায় সাহস কত বড় ! এমুন বেহায়া মাইয়্যা জীবনে দেখি নাই ৷ আমার গলায় আল্লাহ এই বিষের মালা ঝুলায়ে দিছে , জীবনডা শ্যাষ করে দিলো আমার …আর একবার যাইতে চাইলে এই ঘরের বাঁশ খুইলা তর পিঠে ভাঙমু লবলবি কুনহানকার ! ” মনে হচ্ছে সকালে বলা গালিগুলো এখন সব ভুলে গেছেন আলেয়া বেগম ৷ কিন্তু রূপা কিছুই ভোলেনি ৷ রাগ করে সে বসেই থাকলো বারান্দায় ৷ আজ তার বাসী বিয়ের খাবার কথা , সেটাই যখন হলো না দরকার নেই আর খাওয়ার ৷

আলেয়া বেগম ভাত নিয়ে রূপার কাছে এসে বসলেন ৷ রূপার উস্কখুস্ক চুলে হাত দিয়ে বললেন

— খালি বকাবকি করি সেইটাই দেখলি ! তরে নিয়া আমি সারাক্ষন চিন্তা মধ্যে থাকি এইটা দেখলি না ! মা রে তুই বড় হইতাছোস ! এখনও বাচ্চাদের মত ব্যবহার করলে হইবো ? নিজের কোনো যত্ন নেস না , সুযোগ পাইলেই বাড়ির বাইরে যাস … আমার ভয় করে !

—আমারে নিয়া কারো চিন্তা করনের দরকার নাই

—তুই আমার দায়িত্ব , ছুটোকাল থেইকা তরে আমি পালতাছি , আমি চিন্তা না করলে কে করবো ? রাগ করিস না , খাইয়া ল ! সকালেও খাস নাই ৷ তরে খাবার দিয়া তর বড়চাচীরে খাওয়ামু ৷ বইসা থাকনের কপাল কী আমার আছে ?

—আমি কী ছুটো বাচ্চা যে হারায়া যামু ? ক্যান আমারে বাইন্ধা রাখো চাচী ?

—মাইয়্যা মানুষ যেইদিন জন্মায় থেইকা যেইদিন মরে , এর মধ্যের একটা দিনও নিরাপদ নয় ৷ বাইরে শকুন ,ঘরে শকুন … সবার নজর খালি মাইয়্যা মানুষের শইল্যে ৷ সেই শইল্যে যহন যোয়ার আসে তহন আলোর দিকে ছুইট্টা আসা পোকার মত কিলবিলায়ে পুরুষ মানুষ আসে তার দিকে ৷ ছোক ছোক করে কখন …. শোন রূপা , সব কথা তরে কইতে পারুম না আমি ৷ খালি এইটা জাইনা রাখ আমি তর শত্তুর না ! ভাত রাইখা গেলাম , খাইস ৷ বড়ভাবীরে খাওয়ামু ৷ খাইয়া লইস , অন্নের উপর রাগ করন ভালা না …

রূপা আলেয়া চাচীর সব কথা বোঝে না ৷ তারপরও যতটুকু বোঝে ওর মনে হয় হয়তো চাচী ঠিক কথায় বলেছে ৷ এইতো দুদিন আগেও দুপুরে চাচীর চোখে ফাঁকি দিয়ে দোকানে হজমি কিনতে গিয়েছিল যখন , দোকানদার চাচা তার হাত টেনে ধরেছিল ! এত ঘিনঘিন করে উঠেছিল সে সময় তার শরীরটা ! লজ্জায় ঘৃনায় হজমির দাম দোকানদারের মুখে ছুড়ে দিয়ে দৌড়ে এসেছিল সে ৷ সব না বুঝলেও কিছু তো সে বোঝে ! হঠাৎ করেই একদম পরিচিত মানষগুলো তার দিকে অপরিচিতের মত করে তাকায় ৷ সেই লোভী চোখগুলোর কথা সে কাউকেই বলতে পারে না ৷ এমন কী বড় চাচার বাড়ির কাজের ছেলে রতন তাকে দেখলেই নোংরা একটা হাসি দেয় ! একা পেলেই পথ আটকে দাঁড়ায় ৷ ধমক দিলেও সেই নোংরা হাসি … রূপার গা ঘিনঘিন করে উঠে !

চাচী একেবারেও ভুল বলেনি ৷ এই প্রথমবার রূপার মনে হয় চাচী মানুষটা খুব খারাপ না … ভাতের প্লেট কাছে টেনে নেয় রূপা ৷ দূর থেকে বড় জা’কে খাওয়াতে খাওয়াতে সে দৃশ্য দেখেন আলেয়া বেগম ৷ একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ভাবেন , এবার তারও খেতে হবে … সকাল থেকে তিনিও খাননি ..

*********

জহুরা আর লাকী খুবই অবাক হয়ে দেখলো একটা মেয়ে নিপাকে সাজিয়ে দিচ্ছে ৷ একটু আগেই তারা জেনেছে এই মেয়েটা নিপার সতীন ৷ সতীন কেন সতীনের সাথে এমন হেসে কথা বলবে ! সতীনের উপর বিয়ে হয়েছে শোনার পর থেকেই তারা দুজনই মন খারাপ করে ছিল ৷ এখন এই পরিস্থিতি দেখে মন খারাপ করবে না অবাক হবে এটাই বড় প্রশ্ন !

নিপাকে দেখে মনে হচ্ছে ভাবলেশহীন একটা প্রাণী ৷ যার দেহে হৃদপিণ্ড হয়তো ধ্বক ধ্বক করছে কিন্তু তারপরও দেহ নিঃসার …. চোখে অশ্রু নেই কিন্তু দিপ্তীও নেই ৷

সুমাইয়া মেয়েটাকে ভালো লাগছে তার , আর কাউকেই ভালো লাগছে না ৷ স্বামী মানুষটাকে সবচেয়ে অসহ্য লাগছে ৷ সুমাইয়া তার সাথে এমন ভাবে মিশছে মনে হচ্ছে যেন রূপা ! এতটুকু সময়েই বেশ বোঝা যাচ্ছে মেয়েটার মনটা সরল ৷

সুমাইয়া বকবক করলেও নিপা ছিল নিশ্চুপ শ্রোতা ৷ খাবারের ব্যাচ বসা শুরু হয়েছে শুনে সবাই যখন ঘর খালি করে চলে গেল , তখন নিপা প্রথম কথাটা বললো ! সুমাইয়ার হাত ধরে বললো

—বুবু , আল্লাহর কসম আমি জানতাম না তার আগের বউ আছে ! জানলে আমি জান দিতাম তবু কবুল কইতাম !

—আরে পাগল করে কী ! আমি জানি রে বইন … কাউরে চেনা বাকী নাই আমার ৷

—আজ তো আমার বাপের বাড়ির লোকেরা আমারে নিয়া যাইবো ৷ আমি আর ফেরত আসুম না বুবু … কারো সংসার ভাইঙা নিজের সংসার আমি সাজাইতে পারুম না …

—হা হা হা!সংসার …. তা তুমি না আইতে চাইলেই যে সেইখানে তারা তোমারে রাখবে তার নিশ্চয়তা কী বইন ! যাও , ঘুইরা আসো ! তারা রাখতে রাজী হইলে অবশ্যই থাকবা …

—অবশ্যই তারা সব জানলে পরে রাজী হইবো ৷ আমার আব্বা আমারে খুব ভালোবাসে ৷ সে ও আমার মতই কিছুই জানতো , জানলে আমারে এই ঘরে সে কুনোদিনও পাঠাইতো না !

—আচ্ছা ঠিক আছে ৷ এইবার মুখ বন্ধ লিপিস্টিক লাগামু ৷ এরপর কাজল দিমু , চোখ পিটপিট করবা না একদম কয়া দিলাম ..,

নিপা মুচকি হাসে সুমাইয়ার কথা শুনে ৷

সুমাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে “পাগল মেয়েটা এখনও বোঝেনি , বিয়ের পর বাপ মা সবার আগে পর হয়ে যায় ৷ মেয়ে মানুষ বাপের কাঁধের বোঝা ৷ একবার ঝেড়ে ফেলার পর সেই বোঝা আর কেউ কাঁধে নিতে চায় না ! ”

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here