আমার পুতুল বর লেখিকা: আরশি জান্নাত (ছদ্মনাম) পর্ব : ৫২

আমার পুতুল বর
লেখিকা: আরশি জান্নাত (ছদ্মনাম)
পর্ব : ৫২

ঘুম থেকে উঠে নিজেকে সূর্যের বুকে আবিষ্কার করলো আরশি। সাথে সাথে চোখগুলো রসগোল্লার আকার ধারণ করলো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝলো ও নিজের ঘরেই আছে তারমানে সূর্য রাতে ওর ঘরে এসেছে। কিন্তু কি করে এলো! ও তো দরজা লক করে ঘুমিয়েছিলো। সরু চোখে সূর্যের দিকে তাকালো। বেশ আরামে ঘুমিয়ে আছে। একবার ভাবছে জাগিয়ে দিবে তো আরেকবার ভাবছে,” না থাক এতো আরামে ঘুমোচ্ছে জাগানোর দরকার নেই।” নিজেকে সূর্যের থেকে ছাড়িয়ে উঠে পড়লো। ফ্রেশ হয়ে সোজা নিচে নেমে গেলো। ব্রেকফাস্ট টেবিলে সবাই বসে আছে। অহনা আর আরিয়া মিলে সবাইকে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। আরশি কে নীচে নামতে দেখে সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। ওদের চাহনি দেখে আরশি কিছুটা ঘাবড়ে গেলো। মনে মনে ভাবছে– সূর্য আর ও একসাথে ছিলো কোনোভাবে এরা জেনে গেলো না তো! কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করলো না। স্বাভাবিকভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, — কি হয়েছে?
অহনা জামান চিন্তিত স্বরে বললেন,,
— আমি ভোরবেলা সূর্যের রুমের দরজা খোলা দেখে ভিতরে গিয়ে দেখি বেড ফাঁকা। এতো সকালে কোথায় গেলো! সব জায়গায় খুঁজলাম পেলাম না। পরে ভাবলাম হয়তো জগিং এ গেছে কিন্তু এতো বেলা হয়ে গেলো এখনো ফিরছে না ও তো রোজ ৭ টার মধ্যে ফিরে আসে। কোথায় গেলো বলতো!!
— আমি কল করেছিলাম মোবাইল অফ। সূর্যোদয়ের আগে কখনো এমন করেনি আজকে হঠাৎ কোথায় গেল তাও কাউকে কিছু না বলে, দশটা বাজতে চললো এখন পর্যন্ত আসছেনা। তুমি কি কিছু জানো আরশি সূর্য কোথায় গেছে?
এদের কথা শুনে আরশি বির বির করে সূর্য কে বকছে,,
— পাগল লোক একটা! কি দরকার ছিলো রাতে আমার ঘরে আসার? আবার ফোনটা ও অফ করে রেখেছে। মাথামোটা কোথাকার। এখন যদি ঘুম থেকে উঠে নিচে নেমে আসে তখন কি হবে!
— আরশি রানি? ( মৃদু ধাক্কা দিয়ে )
আরশি চমকে সুজানার দিকে তাকালো।।
— হ,,হ্যা আপ্পি কিছু বলছিলে?
সুজানা আরশি কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই সিঁড়ির দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।। আরশি ও সেদিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো। একে একে সবাই চোখ বড় বড় করে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে। সূর্য ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে আরশির পাশে বসে পড়লো। তারপর মাথা নিচু করে একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে খেতে শুরু করলো। অহনা জামান সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,,
— সকাল সকাল কোথায় গেছিলি তুই? তোকে তো সারা বাড়ি খুঁজলাম কোথাও পেলাম না তাহলে এখন উপর থেকে কি করে নামলি?
— আরশি!!
আরশি চোখ বড় বড় করে সূর্যের দিকে তাকালো।
সূর্য খেতে খেতে বললো,,
— আমি এখন বাইরে যাবো বিকালে ফিরবো তুমি তার আগেই রেডি হয়ে থেকো তোমাকে নিয়ে একটু বাইরে বের হবো।
— অ্যা! বাইরে কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে ? আর নিয়ে যাবে ভালো কথা সেটা এভাবে সকলের সামনে বলার কি আছে। তাও আবার মামনির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে বাইরে নিয়ে যাবে বলছে! সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওনার। ( মনে মনে )
আরশির জবাব না পেয়ে সূর্য আরশির দিকে ডান ভ্রু উচু করে তাকালো। আরশি সবার দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নেড়ে সায় দিলো। বাকিরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। ন্যান্সি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,,
— কিরে বলছিস না কেনো কোথায় ছিলি? আর কোথায় যাবি আরশি কে নিয়ে?
সূর্য জবাব না দিয়ে ধীরেসুস্থে খাওয়া শেষ করলো। তারপর উপরে যাওয়ার সময় সিঁড়ির কাছে থেমে বললো,,
— সারা বাড়ি না খুঁজে ঠিক জায়গাতে খুঁজলে অথবা একটু বুদ্ধি খাটালে তোরা ঠিকই বুঝতে পারতি আমি কোথায় ছিলাম। আর রইলো কথা আমি আরশি কে নিয়ে কোথায় যাচ্ছি,, তো শুনে রাখ আরশি কে নিয়ে আমি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি সেটা আমি ওকেই বলিনি সেখানে তোকে কি করে বলি !!
কথাটা বলে সূর্য সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।
সবাই সূর্যের যাওয়ার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলো পরক্ষেনেই সূর্য কি বলেছে তা মাথায় আসতেই এক সাথে আরশির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। সবাইকে এভাবে নিজের দিকে তাকাতে দেখে আরশি বিষম খেলো। কোনোমতে পানি খেয়ে দ্রুত নিজের ঘরে চলে গেলো। সবাই ওর কাণ্ডে হেসে দিলো।
______________________

— কি হয়েছে? এমন চুপ করে আছেন কেনো? কি কারনে ডেকেছেন সেটা তো বলবেন নাকি!!
অভ্র তখনো চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। নিধির এবার ভীষণ রাগ হলো। নিজের জায়গা থেকে উঠে অভ্রর সামনে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে দাতে দাত চেপে বললো,,,
— বিগত আধা ঘন্টা যাবৎ আমি অপেক্ষা করছি আপনি কি বলবেন তা শোনার জন্য কিন্তু আপনি কিছু না বলে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছেন!! কিছু যখন বলারই নেই তখন ডাকলেন কেনো শুনি?
অভ্র ছোট একটা শ্বাস ফেলে শান্ত চোঁখে নিধির দিকে তাকিয়ে বললো,,
— কালকে তোমাদের ডিনার ডেট কেমন গেলো?
— ডিনার ডেট!!
— হ্যাঁ কালকে তুমি আর মাহির ভাই না ডিনারে গেলে তোমার পছন্দের রেস্টুরেন্টে?
— হ্যা তা তো গেছি কিন্তু আপনি ডিনার ডেট বলছেন কেনো?
— বা রে হবু বর-বউ প্রথমবার একসাথে বাইরে ডিনারে গেলে তাকে অবশ্যই ডিনার ডেট বলে তাইনা?
তো বলো কেমণ লাগলো মাহির ভাইয়ের সাথে সময় কাটিয়ে? নিশ্চয় ভালো লেগেছে। আসলে মাহির ভাই মানুষটাই অসাধারণ। যে কারোরই তার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগবে।
— এসব কি বলছেন অভ্র? আমরা নরমাল ডিনারে গেছিলাম নাকি কোনো ডেটে! আর ভালো অবশ্যই লাগবে একটা কথা আপনি ঠিকই বলেছেন মাহির ভাই আসলেই একজন অসাধারণ মানুষ তাই তাঁর সাথে সময় কাটাতে যে কারোরই ভালো লাগবে। আমার ও লেগেছে। কিন্তু এই যে আপনি খোঁচা দিয়ে কথাটা বলছেন না সেটা আমার ভালো লাগেনি।।
— আমার কথা ভাল লাগবে কেনো তোমার!! যাও না যাও মাহির ভাইয়ের কাছে যাও সুন্দর সুন্দর কথা বলবে তোমার সাথে ওগুলোই তোমার ভালো লাগবে।
— অভ্র!! বার বার আমার সাথে মাহির ভাইকে কেনো জুড়ে দিচ্ছেন?
— জুড়ে দেওয়ার কি আছে উনি তো অলরেডি তোমার সাথে জুড়ে আছেন। বিয়ে করছো তোমরা কিছুদিন পরে।
— হ্যা তা তো করবোই। আসলে কি বলুন তো আমি না ভেবে দেখলাম ছেলে হিসেবে মাহির ভাই যথেষ্ট ভালো। যথেষ্ট ভালো কেনো বলছি অন্নেক ভালো এরকম ছেলে প্রত্যেকটা মেয়ে তার জীবনে চায়। আমি পেয়েও কেনো হারাবো? আর কার জন্য তাকে আমি দূরে ঠেলে দেবো কেউ তো নেই আমার লাইফে সুতরাং আমি ঠিক করেছি তাকেই বিয়ে করে নিবো ।
— কি বললে তুমি? মাহির ভাইকে বিয়ে করে নেবে? ( ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে )
— হ্যা । ( মুখ ঘুরিয়ে )
— না তুমি করবে না।
— আমিতো করবোই! আপনার কথা কেনো শুনতে যাবো আমি?
— শাট আপ নিধি! আর একবার বিয়ের নাম নিলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।
অভ্রর ধমকে নিধি কেপে উঠে সাথে সাথে দু কদম পিছিয়ে গেলো। অভ্র রাগে ফুসছে। ওর রাগ দেখে মনে হচ্ছে হাতের কাছে যাকে পাবে তাকেই তুলে আছাড় মারবে। নিধি ঢোক গিলে মিন মিন করে বললো,,
— আমি যাকেই বিয়ে করি না কেনো তাতে আপনার কি?
অভ্র নিধির দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর বাহু চেপে ধরে রাগি গলায় বললো,,,
— যদি অন্য একজনকে বিয়ে করবেই তখন আমাকে পাগল বানালে কেনো। কেনো প্রতিদিন প্রতিনিয়ত তোমাতে আসক্ত করলে? বেশ তো ছিলাম কেনো এলে আমার জীবনে? কেনো নিজের উদ্ভট কর্মকাণ্ড গুলোকে আমার অভ্যাসে পরিণত করলে! এক সময় তোমাকে তোমার করা প্রতিটা কাজ আমার বিরক্ত লাগতো। কিন্তু এখন ঐ গুলোকেই মিস করি। আগে তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করতো না, তোমার উপস্থিতি সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু এখন সারাদিন তোমাকে আমার সামনে বসিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে তোমার কথা শুনতে ইচ্ছে করে। কেনো হচ্ছে এসব? এর পিছনে দায়ী কে? সম্পূর্ণ তুমি নিধি। আমি বুঝতে পারছি আরশির প্রতি আমার যেই ফিলিংস টা ছিলো সেটা শুধুমাত্র ভালোলাগা। ওর প্রতিটা কাজ আমাকে ওর প্রতি আকর্ষিত করতো। আগে কখনো কোনো মেয়েকে ভালো লাগে নি কিন্তু ওকে দেখার পরে ভালো লেগে গেছিলো তাই সূর্য ভাই আর ওর ব্যাপারটা জানার পরে খারাপ লেগেছিলো কিন্তু অতটাও লাগেনি যতটা তোমার আর মাহির ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে লেগেছিলো। ( নিধি কে ছেড়ে দিয়ে ) তোমার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ কাজ করে না। মুগ্ধতা কাজ করে। হ্যাঁ আজ আমি স্বীকার করছি। তোমাতে মুগ্ধ আমি নিধি। তোমার প্রতিটা কথা কাজে আমি মুগ্ধ হচ্ছি। কই আগেতো এমনটা হতো না। তাহলে এখন এসব কেনো হচ্ছে? দেখো তোমার মনে এখন প্রশ্ন জাগতে পারে আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না? আমি এখন এটাকে ভালবাসার নাম দিতে পারি না। কিন্তু এটা জানি তুমি আমার কাছে অনেক ইম্পরট্যান্ট। ক্ষনিকের আকর্ষণ বা ভালোলাগা নও তুমি আমার। এসব কিছুর উর্ধ্বে।
নিধির চোঁখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। এক দৃষ্টিতে অভ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। হুট করে দৌড়ে গিয়ে অভ্রকে জড়িয়ে ধরলো। নিধির এহেন কাজে অভ্র দুপা পিছিয়ে গেলো। হতভম্ব হয়ে গেছে ও। নিধি কাদতে কাদতে বললো,,,
— আমি পেরেছি অভ্র। আমি পেরেছি। আপনার মনে নিজের জন্য জায়গা করতে পেরেছি। আজকে আমি খুব খুব খুশি। আমার আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শোনা লাগবে না। কারণ আমি বুঝে গেছি আপনি আমাকে ভালোবাসেন। অনেক অনেক ভালোবাসেন। আর আল্লাহ চাইলে খুব শীগ্রই আপনি ভালোবাসি কথাটা ও বলবেন। আমি সেই দিনটার অপেক্ষা করবো।
অভ্রকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। অভ্র কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে রইলো নিধির কথা শুনে। নিধির কথা শুনে আর মনোবল দেখে অভ্র মুচকি হাসলো। ধীরে ধীরে হাত দুটো এগিয়ে এনে নিধির পিঠে রাখলো। অজান্তে নাকি ইচ্ছে করে সেটা অজানা।।

#চলবে

আমার পুতুল বর
লেখিকা: আরশি জান্নাত (ছদ্মনাম)

🥀স্পেশাল পর্ব~

— সূর্য! কোথায় এসেছি আমরা। আরেহ! কি হলো চোঁখ বাঁধলেন কেনো?
— হুস! ডোন্ট ওয়ারি আমি আছিতো। ( আরশির কাধ জরিয়ে ধরে ) এসো।।
প্রায় ৫ মিনিট হাঁটার পর ওরা থামলো। আরশি ওর পাশে সূর্যের উপস্থিতি টের না পেয়ে ঘাবড়ে গেলো। মৃদু আওয়াজে ডাকতে লাগলো। না কোনো সাড়াশব্দ নেই। এবার আরশির ভয় করছে। দ্রুত চোঁখের বাঁধন খুলে ফেললো। সামনে তাকাতেই অবাক হলো। চোখ ঘুড়িয়ে চারপাশে তাকালো। দেখলো মাঝে সাদা আর লাল গোলাপ মিশ্রনে একটা সরু রাস্তা আর দুপাশের গাছগুলো ফেইরি লাইট দ্বারা সজ্জিত। যার ফলে চারপাশ আলোয় মুখরিত হয়ে আছে। সামনেই একটা সাইনবোর্ড দেখতে পেলো। সেখানে এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আশে পাশে তাকিয়ে সূর্যকে খুঁজলো কিন্তু কোথাও পেলো না। তাই ধীরে ধীরে ফুল দিয়ে বিছানো পথ ধরে এগিয়ে চললো। দু-মিনিট হাঁটার পর রাস্তা শেষ হলো। সামনে খোলা মাঠ। অন্ধকার সন্ধ্যায় ঝলমলে আলো দিয়ে এটিকে খুব সুন্দর লাগছিলো। এর মাঝে লাল গোলাপ দিয়ে লাভ আঁকা যার চারপাশে লাইট জ্বলছে। লাভের পিছনে ডলার ট্রি জায়েন্ট মারকিউ ডাই লেটারস দিয়ে “I love you” লিখা। দুপাশের গাছগুলো অনেক সুন্দরভাবে লাইট দিয়ে সাজানো। ডান পাশে একটি বেঞ্চ আছে যা পাতা এবং শাখার ছাদের নীচে আবৃত যার ফলে এটাকে একেবারে সুন্দর করে তুলেছিলো। বেঞ্চে একটা বাক্স রাখা যার উপরে বড় বড় করে লেখা,”এটা তোমার জন্য”। আরশি এগিয়ে গিয়ে বক্সটা খুললো। খুলতেই আরশির চোঁখ থেকে পানি পড়তে লাগলো। বক্সে ওদের বিয়ের ছবি। ছবিটাতে বেনারসি পরে আরশি পুতুল হাতে মাথা নিচু করে বসে আছে আর সূর্য ওর পাশে বসে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আরেকটা ছবিতে আরশি অদক্ষ হাতে কাবিননামায় সই করছে আর সূর্য চোখমুখ শক্ত করে কাবিননামার দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিগুলোর সাথে একটা নোট আছে যেখানে লিখা,,”আমরা আমাদের অনিচ্ছায় এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি দিম্মার কাছে গ্রেটফুল তোমাকে আমার জীবনে এনে দেওয়ার জন্য। তুমি আমাকে ভালোবাসা কি সেটা বুঝিয়েছো। বাধ্য করেছো তোমাকে ভালোবাসতে। যার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।।”
মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে দেখলো সূর্য হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে। আরশি বক্সটা বেঞ্চে রেখে দৌঁড়ে গিয়ে সূর্যকে জড়িয়ে ধরলো। সূর্য ও আরশি কে জড়িয়ে ধরলো। আরশি কে নিজের সামনে দাড় করিয়ে হাত ধরে বললো,,
— আমি জানি আমি দূরে চলে গিয়ে তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। তোমার ছোট্ট মন টায় আঘাত করেছি। বাট আই প্রমিস আজ এখন থেকে আমি তোমাকে আর কষ্ট পেতে দেবো না। নিজের সবটুকু দিয়ে তোমাকে খুশি রাখার চেষ্টা করবো। আমি তোমাকে আমার জীবনে চাই, আমার জীবনের শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকতে চাই। I want to love you and cherish you all my life.
আরশি কান্না করেই যাচ্ছে। সূর্য হাত বাড়িয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিলো। দু হাত দিয়ে আরশির গালে আলতো করে হাত রেখে চোখে চোখ রেখে বললো,,,
— আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ মোর দ্যান এনিথিং অ্যান্ড আই মিন ইট।
আরশি কাপা কাপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বললো,,
— আ,,আমিও আপনাকে খুউউব ভালোবাসি।
সূর্য মুচকি হেসে আরশির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পকেট থেকে একটা পুতুল বর বের করে বললো,,
— পুতুল বউ! তুমি কি আবার তোমার এই পুতুল বরটাকে বিয়ে করবে? হবে কি তার পুতুল বউ টু রিয়্যাল বউ!!!
আরশি সূর্যের হাত ধরে ওকে টেনে তুললো। পুতুলটাকে নিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,,
— আমিতো অনেক আগেই নিজেকে আপনার কাছে সপে দিয়েছি। নতুন করে আর কি বলবো! তবুও বলছি দুবার কেনো আপনি বললে হাজার বার এই আপনিটাকেই বিয়ে করতে রাজি আমি।
সূর্য আরশির কপালে দীর্ঘ চুমু এঁকে দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো। সাথে সাথে অনেকগুলো হাত তালির আওয়াজ পেলো ওরা। আরশি আর সূর্য চমকে একে অপরকে ছেড়ে যেখান থেকে হাত তালির আওয়াজ এসেছে সেদিকে তাকালো। দুজনেই হতভম্ব হয়ে গেলো। কারণ ওদের সামনে সুরাজ জামান, অহনা, আফিফ হাসান, আরিয়া, আরশ, সুজানা, রিক, রোজ, ন্যান্সি, মাহির, মিহি রেহান, নিধি, অভ্র, নাহিদ সকলে দাড়িয়ে আছে। সবার মুখেই প্রশান্তির হাসি লেগে আছে। রিক দৌঁড়ে গিয়ে সূর্যকে জড়িয়ে ধরলো।
— ওয়েল ডান ইয়ার। তোর আজকের কাজটার জন্য আই এম প্রাউড অফ ইউ ম্যান।। ওহ হ্যা নতুন জীবনের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা তোদের দুজনকে।
রোজ, সুজানা, মিহি, ন্যান্সি, নিধি মিলে আরশি কে জড়িয়ে ধরলো। একসাথে বলে উঠলো,,
— কংগ্র্যাচুলেশনস আরশি রানি।।।
সূর্য আর আরশি এখনো অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। অহনা আর আরিয়া এসে সূর্য আর আরশি কে একসাথে জড়িয়ে ধরলো। দুজনের কপালে চুমু দিয়ে বললো,,,
— অনেক অনেক শুভকামনা তোদের। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তোরা যেনো সারাজীবন একসাথে কাটাতে পারিস। বিপদে আপদে একে অপরের ঢাল হতে পারিস।
সুরাজ জামান ছেলের কাধে হাত রেখে বললেন,,
— আজ সত্যিকার অর্থে তুমি তোমার দিম্মা কে দেওয়া কথা রাখতে পেরেছো।
আফিফ হাসান তার আদরের মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। ভাঙ্গা গলায় বললেন,,
— তোর ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে সুখী হ মা!
আরশির চোঁখ আবার ভিজে উঠলো। বাবাকে জরিয়ে ধরে কেঁদে দিলো। আরশ মুখ ফুলিয়ে বাবা আর বোনের মাঝখানে ঢুকে দুহাত দিয়ে দুজনকে জরিয়ে ধরলো। ওর কাণ্ডে আফিফ হাসান আর আরশি হেসে ফেললো। সূর্য সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,,
— তোমরা সবাই এখানে কি করছো? জানলে কি করে আমরা যে এখানে আছি?
সবাই হেসে দিলো। হাসতে হাসতে রিকের দিকে ইশারা করলো। বেচারা রিক সবাইকে নিজের দিকে ইশারা করতে দেখে হাসি থামিয়ে দিলো। সূর্যের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিললো। কারণ সূর্য ওর দিকে রাগি চোখে তাঁকিয়ে আছে। আরশি কৌতুহল দমাতে না পেরে প্রশ্ন করলো,,
— কিন্তু ভাইয়া আপনি কি করে জানলেন আমরা এখানে?
রিক আমতা আমতা করে বললো,,
— আমি আসলে কাল রাতে সূর্যকে ফোনে এসব ডেকোরেশন করার ব্যাপারে কথা বলতে শুনেছিলাম। তাই সকালে ও যখন তোমাকে নিয়ে বাইরে বের হবে বললো তখন আমি সবাইকে এই ব্যাপারে জানিয়ে দেই। আর এখানে তোমাদের পিছু পিছু আসার আইডিয়াটা ও আমিই সবাইকে দিয়েছিলাম।( আড় চোখে সূর্যের দিকে তাঁকিয়ে) । তোমরা বেরোনোর দু মিনিট পরে আমরাও বেরিয়ে পরি। সূর্য তোমার চোখ বেধে দিয়ে যখন আড়ালে চলে গেলো তখন আমরা ওর থেকে লুকিয়ে আগেই এই জায়গায় চলে এসেছিলাম। আর এতক্ষন তোমাদের সব কথাই আমরা আড়ালে লুকিয়ে শুনেছি। ( দাত কেলিয়ে )
সূর্য এসে রিকের ঘাড় চেপে ধরলো। দাতে দাত চেপে বললো,,
— হারামি একটা। আমার আরো কতো প্ল্যান ছিলো সব নষ্ট করে দিলি তুই। ইচ্ছেতো করছে তোর ঘাড় মটকে দেই।
মাহির হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে রিক কে সূর্যের থেকে ছাড়িয়ে নিলো। রিক ঘাড়ে হাত দিয়ে অহনার দিকে এগিয়ে গেলো। অহনা সূর্যকে চোখ রাঙিয়ে বললো,,,
— রিক যা করেছে বেশ করেছে। আমরা এখানে না এলে এতো সুন্দর মুহূর্তটা মিস করে ফেলতাম। খবরদার যদি ওকে বকেছিস তো !!!
সূর্য গাল ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর গাল ফুলানো দেখে সবাই জোরে হেসে উঠলো। সুরাজ জামান প্রশান্তির হাসি হেসে বললেন,,,
— ছেলে মেয়ে দুটো একে অপরকে মেনে নিয়েছে জেনে ভীষন শান্তি লাগছে। এবার শিগগিরি আবার ওদের বিয়েটা দিতে পারলেই মায়ের আশা পূরণ হবে ।
সূর্য আরশির দিকে তাকিয়ে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— বাবা আমি ঠিক দু মাস পর এই তারিখেই আরশি কে বিয়ে করতে চাই।
সবাই অবাক হলো সূর্যের কথা শুনে। সুরাজ জামান বললেন,,
— এতো জলদি কেনো সূর্য? তোমার পড়াশোনা তো এখনো শেষ হয় নি। আর একমাস পর আরশির ফাইনাল এক্সাম। তাহলে??
— বাবা আমি যা বলছি ভেবে চিন্তেই বলছি। তোমরা হয়তো ভূলে গেছো ঠিক দু মাস পর এই দিন টাতেই আমার আর আরশির বিয়ে হয়েছিলো আর আমি চাই আমাদের সেকেন্ড বার বিয়েটাও সেদিনই হোক। আর রইলো কথা আমার পড়াশোনা ও আরশির পরীক্ষার কথা তো আমার পড়া আমি বিয়ের পর ও কমপ্লিট করতে পারবো। আর আরশির এক্সাম আমাদের বিয়ের ডেটের আগেই শেষ হয়ে যাবে। সো আমি তো কোনো প্রবলেম দেখছিনা।
কেউ কিছু বলবে তার আগেই আরশি বললো,,
— আমি ও সেদিন বিয়ে করতে চাই।
সুরাজ জামান আফিফ হাসানের দিকে তাকালে তিনি মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। রিক জোরে শিস বাজালো। সবাই খুশি হয়ে গেলো। আরিয়া অহনা কে জড়িয়ে ধরে বললো,,
— খুব জলদি আমার বেয়ান হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও আপা।
অহনা হেসে দিয়ে আরিয়া কে জড়িয়ে ধরলো।
মাহির সবার অগোচরে সুজানার কানে কানে বললো,,
— দেখছিস সবাই কতো খুশি আরশি আর সূর্যের বিয়ে নিয়ে। সূর্যের দিকে একবার তাকা নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে খুব দ্রুত পাবে যেনে ওর মুখটা কেমন চকচক করছে। আজ যদি তুই ও আমাকে তোর মনের কথাটা জানিয়ে দিতিস তাহলে আমাদের ও বিয়ের সানাই বাজতো। আমার ফেস ও এমন চকচক করতো। কিন্তু আফসোস আমার কপালটাই খারাপ। না তোর মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শোনা হলো আর না তোকে জলদি বিয়ে করা হবে। ( দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে )
সুজানা ও মাহিরের মতো ফিসফিস করে বললো,,
— কে বলেছে তোর কপাল খারাপ? সবাই বিয়ের আগে ভালোবাসি বলে , বিয়ের আগে প্রেম করে আমরা নাহয় বিয়ের পরেই প্রেম করবো।
কথাটা বলে সুজানা মুচকি হেসে আরশির দিকে এগিয়ে গেলো। মাহির সেখানেই স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে। সুজানার কথাগুলো ওর কানে বাজছে। হুশ ফিরতেই ইয়েস বলে চেঁচিয়ে উঠলো। সবাই অবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির থতমত খেয়ে বোকা হেসে বললো,”সরি”। সবাই ওর দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আবার নিজেদের আলাপে মনোযোগ দিলো। মাহির সুজানার দিকে তাকিয়ে দেখলো ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। বিনিময়ে মাহির ও হাসলো। যেই হাসিতে দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের ছোঁয়া লেগে আছে।

— আচ্ছা চল এবার ফিরে যাই আর কতক্ষন থাকবো।( রোজ )
— আমি বলি কি চলোনা সবাই মিলে আজ কোনো রেস্টুরেন্টে ডিনার করি। ( ন্যান্সি )
— ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। তুই ও দেখছি আমার মতো বুদ্ধিমান হচ্ছিস।
ন্যান্সি রিক কে ভেংচি কাটলো।। সূর্য হেসে বললো,
— হ্যা আইডিয়া টা ভালো। বাবা, বাবাই তোমরা কি বলো?
— আমার কোনো আপত্তি নেই তুমি কি বলো আফিফ?
— ছেলেমেয়েদের যা ইচ্ছে তাতেই আমি রাজি।
— ইয়ে!!!! ( রিক-রোজ-ন্যান্সি)
— মাহির ভাই, মিহি, রেহান, অভ্র, নিধি, নাহিদ তোমরাও আমাদের সাথে যাচ্ছো!
ওরা হেসে বললো,,” অবশ্যই”।

আফিফ হাসান, আরিয়া, সুরাজ জামান আর অহনা এক গাড়িতে। রিক, রোজ, ন্যান্সি আর নাহিদ একটাতে। সূর্য-আরশি, মাহির-সুজানা, অভ্র-নিধি আলাদা আলাদা গাড়ীতে উঠে পড়লো। মাহির মিহি কে ওদের গাড়িতে উঠতে বললে মিহি আড়চোখে রেহানের দিকে তাকালো। যা মাহিরের নজর এড়ালো না। তবুও না বোঝার ভান করে ওকে গাড়ীতে উঠতে বললো। মিহি মুখ গোমড়া করে উঠতে নিলে রেহান এসে আটকে দিলো। মেকি হাসি দিয়ে মাহির কে বললো,,
— ভাইয়া কেনো শুধু শুধু কাবাবের মাঝে হাড্ডি টানছেন বলুনতো?
মাহির ভ্রু কুঁচকে বললো,,
— মানে!
— ইয়ে মানে,, আপনি আর সুজানা আপু যাচ্ছেন। কিছুক্ষন একা টাইম স্পেন্ড করবেন। ইউ গাইস নিড সাম প্রাইভেসি রাইট! সো এর মাঝে এই লাল… উহুম্ (কেশে) মানে মিহি কে নিয়ে যাওয়া কি দরকার? তাহলে তো আর আপনারা প্রাইভেসি টা পাচ্ছেন না। তো আমি বলি কি আপনারা যান আমি নাহয় ওকে নিয়ে আসছি।
মাহির কিছু না বলে ওদের দুজনকে দেখছে। সুজানা রেহানের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়ে ফেললো। মিহি রেহানের দিকে তাকালে রেহান চোঁখ দিয়ে ইশারা করে কিছু বলতে বললো। মিহি আমতা আমতা করে বললো,,
— হ্যা ভাইয়া তোরা যা আমি বরং ওনার সাথে আসছি।
মাহির ছোট্ট করে বললো,,
— ঠিক আছে আয় তবে।
মিহি বড় করে হেসে মাথা দুলালো। তারপর রেহানের গাড়িতে গিয়ে বসে পড়লো। রেহান ও মাহিরের থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো। মাহির ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। যে হাসির মানে সুজানা কিছুই বুঝতে পারলো। শুধু তাকিয়ে রইলো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here