কৈশোরে প্রেম|| ||অংশ: ০৫||

||কৈশোরে প্রেম|| ||অংশ: ০৫||

“পনেরো বছরের ধাড়ি কুলাঙ্গার হয়ে কীভাবে মেট্রিক পরীক্ষায় ফেল করলি তুই? পড়ালেখায় কী মন ছিল? থাকলে তো ফেল করতি না। বদমাইশ ছেলেপেলের সঙ্গ ধরে নষ্ট হয়েছিস। আমার মান সম্মান আর কিছুই বাকি রাখিসনি। এত টাকা আমি তোর পেছনে খরচ করে আজ কী পেলাম? আর পরীক্ষা দেওয়াবো না তোকে। রমিজের ওয়ার্কশপে গিয়ে কাজ শিখ। দু’টাকা রোজগার করলে বুঝবি বাপের টাকা কেমনে উড়াইছিস।”, বাবার বলা কথাগুলো বারবার মেহরাবের কানে বাজছে।

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। জীবনটাকে বড় মূল্যহীন মনে হচ্ছে তার। পাখির মতো উড়াল দিলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। মা-বাবার মান সম্মান আর টাকা খরচ নিয়েও ভাবতে হবে না। পৃথিবীর মানুষ তাকে ভালোবাসে না। মা-বাবা ভালোবাসে না তাকে। ইলমাও ভালোবাসে না। ভালোবাসা এক মহামূল্যবান জিনিস যা সবার কপালে জুটে না। যার ফলস্বরূপ কেউ কেউ মরে গিয়ে বেঁচে যায় আর কেউ কেউ বেঁচে থেকেও প্রতিদিন অগণিতবার মরে। মেহরাব মরে গিয়ে বেঁচে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আকাশে মুক্ত পংখী হয়ে উড়াল দিল। কিন্তু তার গন্তব্য আকাশে নিয়ে গেল না বরং মাটিতে আছড়ে ফেললো।

সবাই যে যার পছন্দের ভালো কলেজে ভর্তি হয়। ব্যাঘাত ঘটান প্রহেলির বাবা। শামসুল গাজী নিজ শহর ঢাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরের একটা স্কুলে হেডমাস্টার হয়ে যোগদান করেন। পরিবারকে এই শহরে একা রেখে যাওয়া অনুচিত মনে হয় তার কাছে। কিছুদিনের মধ্যে পরিবারকেও নিয়ে যেতে চান তিনি। প্রহেলিকে সেখানের একটা কলেজে ইন্টার ভর্তি করে দেবেন। শহর ছেড়ে যাওয়ার আগে নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে চায়। মায়ের মোবাইল এনে কয়েকবার কল দেওয়ার পর রিসিভ করে নাহিয়ান।

নাহিয়ান কল রিসিভ করে তিক্ত কণ্ঠে বলল, “এতবার কল দেওয়ার কী আছে? আমি সমস্যায় থাকতে পারি না? একটু তো ধৈর্য রাখা উচিত। সময় পেলে কল দিতাম আমি।”

তড়িঘড়ি করে সে বলল, “নাহিয়ান, আমি অনেক ভয় পাচ্ছি। তুই কই? বাবা হুট করে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে। আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারবো না। প্লিজ কিছু একটা কর। না-হয় আমায় নিয়ে পালিয়ে যা।”

আচমকা মোবাইলটা কান থেকে টান মেরে নিয়ে নেন আরফা খাতুন। প্রহেলির কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। বিছানায় ছিটকে গিয়ে পড়ে। কখন গালে চড় পড়েছে বলতেই পারেনি। এত জোড়ে চড় সে তার এই বয়সে কখনোই খায়নি। কিছু বলার আগেই চুল ধরে টেনে তুলেন আরফা খাতুন।

গাল চেপে ধরে বললেন, “ঘর ছেড়ে পালিয়ে আমাদের মান ইজ্জত নষ্ট করবি তুই! এতবড় সাহস কী করে হলো তোর? তোর মতো নষ্ট মেয়েকে আমি কীভাবে আমার গর্ভে ধরলাম!”

কপালে হাত দিয়ে বিছানায় বসে যান। মেয়ে এমন কাজের কথা কখনো ভাববে তিনি কল্পনাও করেননি। নাক টেনে টেনে কাঁদছে প্রহেলি। চোখের জল গাল ভিজিয়ে দিচ্ছে বারংবার। হেঁচকি তুলছে থেমে থেমে। আরফা খাতুনের গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। একমাত্র মেয়েটা তাদের মান ইজ্জত ডুবাতে লেগেছে। মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনে ততক্ষণে প্রহেলির বড় ভাই প্রান্ত ছুটে আসে।

আরফা খাতুন একা একাই বলছেন, “হায় আল্লাহ! কী পাপ করছিলাম যে এমন করলা আমার সাথে! এই বয়সেই যদি এমন করিস তাহলে আরেকটু বড় হলে তো তুই না জানি কী করবি! তোর বাপ শুনলে হার্ট অ্যাটাক করে মরবে। এমন কুলক্ষণা মেয়ে কেন জন্ম দিলাম খোদা!”

প্রান্ত মায়ের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আম্মু? কী করেছে প্রহেলি? এমন বলতেছ কেন?”

“তোর আদরের বোন কোন বদমাইশ ছেলের সাথে পালিয়ে যেতে চায়।”

“মা, নাহিয়ান মোটেও বদমাশ ছেলে নয়।”, প্রহেলি কথাটা বলে থামার আগেই প্রান্ত আরেকটা চড় বসিয়ে দেয়।

“মায়ের সামনে নির্লজ্জের মতো দাঁড়িয়ে কথা বলছিস কীভাবে তুই? বেয়াদব কোথাকার! আর একটা কথা বললে টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দিব।”

কপট রাগে মায়ের সামনে এসে বলল, “আজই কাপড় গুছাও। বিকেলের ট্রেনে আমরা চট্টগ্রাম যাচ্ছি।”

“কিন্তু বাবা তোর ভার্সিটি!”

“আমি টিসি নিয়ে নিব এসে। তুমি ওসবের চিন্তা করো না।”

প্রহেলির কান্নার শব্দ বেড়ে যায়। প্রান্তের পা ধরে ফ্লোরে বসে বলল, “ভাইয়া এমন করিস না। নাহিয়ানকে অনেক ভালোবাসি। আমি পালিয়ে যাব না কথা দিচ্ছি। আমাকে যাওয়ার আগে শেষবার দেখা করতে দে। প্লিজ ভাইয়া তোর পা ধরছি।”

প্রান্ত একটা ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। পেছন পেছন ছুটে যেতে চাইলে আরফা খাতুন তার হাত ধরে বললেন, “আর এই রুম থেকে এক কদমও বের হতে পারবি না তুই। জিনিসপত্র গুছিয়ে নে। না গুছালে সব আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে যাব।”

বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে যান। মায়ের কাছে অনুনয় বিনয় করে কিন্তু কোনো কাজ হয় মা। দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে একটা সময় ক্লান্ত হয়ে নিচে শুয়ে পড়ে প্রহেলি। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলও যেন শুকিয়ে এসেছে। দরজা একটু ফাঁক করে একটা প্লেটে দুপুরের খাবার আর পানি দিয়ে যান আরফা খাতুন। বিকেল তিনটার ট্রেনে বের হবেন। তৈরি হওয়ার জন্য বলে যান।

খাবারের দিকে তাকিয়ে রয় কিছুক্ষণ। খুব ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু খাবার গলা দিয়ে নামবে না তার। মনের ক্ষুধার কাছে পেটের ক্ষুধা হার মানে। পানি খেয়ে সোজা হয়ে বসে কাপড় গুছাতে লেগে যায়৷ নাহিয়ানের জন্য একটা চিঠি লিখে যাওয়ার সময় অপির হাতে দিয়ে যায়।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শহর পেরিয়ে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটা দুইতলা বাসার উপরতলা ভাড়া নেন শামসুল গাজী। ওখানের একটা কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন প্রহেলিকে। প্রান্ত কিছুদিন পর তাদের রেখে ঢাকা থেকে টিসি নিয়ে চলে আসে এখানেরই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একা বন্দী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে প্রহেলি। নাহিয়ানের সাথে তেমন একটা যোগাযোগ হয় না তার। অপির সাথে মাঝেমধ্যে কথা হলে একফাঁকে নাহিয়ানের সাথে লুকিয়ে কথা বলে নিতো। কলেজে প্রতিদিন প্রান্ত দিয়ে আসে আবার নিয়েও আসে। চোখেচোখে রাখা হয় তাকে। তবুও চুরি করে কথা হতে থাকে তাদের। কখনো সপ্তাহ, পনেরো দিন বা মাসও চলে যায় কথা না বলে। তবু প্রহেলির ভালোবাসায় কোনো কমতি আসে না। কিন্তু নাহিয়ানকে সে আগের মতো পায় না। নাহিয়ান কলেজ জীবন নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠে। তার জন্য যেন কোনো টানই নেই। অপি একদিন জানায় নাহিয়ান নতুন প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছে। বিশ্বাস করে না প্রহেলি। সম্পর্কটা যেন নেই আবার না থেকেও যেন কিছু একটা আছে।

বছর চলে যায় সময়ের গতি ধরে। রোজকার রুটিনে বিকেলের সময়টা ছাদের কোণে কাটে প্রহেলির। সামনের প্রশস্ত মাঠে ছেলেপেলেদের খেলা দেখতে বেশ ভালো লাগে। চিল্লাপাল্লা, হাঁক, হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে বিকেলটা বেশ ভালো কাটে। নাহিয়ানের সাথে সেই আগের মতোই। তবে আগের থেকে যোগাযোগটা আরো কমেছে। কলেজের বাইরে রাসেলের দোকানে গিয়ে দৈনিক একবার কল দেওয়া অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। কল দিলে নাহিয়ান প্রায়ই রিসিভ করে না। কখনো কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে কল দেয় প্রহেলি। দোকানী রাসেলও বিরক্ত হয়ে যায় তার কাণ্ডে। তবে ধীরেধীরে এসব দেখতে দেখতে মায়া হয়ে যায় তারও। মাঝেমধ্যে কথা হয়ে উঠলে তার চেহারায় উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়। সেদিন আর রাসেল তার থেকে ফোন বিল নেয় না।

খানিকটা হেসে বলে, “আপা, আজ আপনি অনেক খুশি লাগছে। এই হাসিখুশি মুখটাই রাখেন সবসময়। আজ আপনার থেকে বিল নিবো না।”

প্রহেলি তখন জোর করে টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। তবে অনেকবার টাকা দিতে বিফল হয়েছে সে। রাসেল প্রহেলিকে বোনের মতো আদর করে।

নাহিয়ান বলেছে কলেজ পাস করার পর ভার্সিটিতে ভর্তি হলেই সে এখানে চলে আসবে। প্রহেলি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার। ছাদের ফুল বাগানে ছোট-বড় ফুল ফুটেছে। হঠাৎ করে একটা বল এসে প্রহেলির গায়ের উপর পড়ে। বলটা হাতে নিয়ে নিচে তাকাতেই দেখে একটা ছেলে ব্যাট হাতে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মাথাভর্তি একঝাঁক এলোমেলো চুল। পরনে নীল রঙের জার্সি।

“বল দেখে মারতে পারো না?”

ছেলেটা কিছুই বলে কেবল ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। প্রহেলি দ্রুত নিচে নেমে নিজের রুমে গিয়ে এক টুকরো কাগজে লিখে দেয়, “আর কোনোদিন বল এসে পড়লে কেটে রেখে দিব।”

ছাদে এসে চিরকুট পেচিয়ে বলটা নিচের দিকে ছুঁড়ে মারে। বল হাতে নিয়ে ছেলেটা চিরকুটটা পড়ে পকেটে ভরে রাখে। প্রহেলি ভ্রু বাঁকিয়ে তাকায়। মাঠে ফিরে যাওয়ার সময় বারবার পেছন ফিরে তাকায়।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here