কৈশোরে প্রেম|| ||অংশ: ০৬||

||কৈশোরে প্রেম|| ||অংশ: ০৬||

প্রেম একেক বয়সে একেক রকম প্রভাব ফেলে। কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া প্রহেলির মাঝে অনেক পরিবর্তন আসে। শরীরের সৌন্দর্যের বৃদ্ধি পায় তার। এই সৌন্দর্যে যে-কোনো ছেলে নিজেকে উৎসর্গ করে দিতে চাইবে। ঠিক তেমনটাই হতে যাচ্ছিল দিয়ানের বেলাতেও।

নিয়ম করে বিকেল বেলায় প্রহেলিদের ছাদে বল এসে পড়তে লাগে। ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা প্রতিদিন বল নিতে নিচে এসে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। সে প্রথম ভেবেছিল বল ফেরত দেবে না। কিন্তু ছেলেটার মুখ দেখে কেমন মায়া হয় তাই না দিয়ে পারে না। অবাক করা বিষয় হলেও কোনোদিন খেলা না থাকলেও ছেলেটাকে মাঠের পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। রোদ বৃষ্টি কিছুই মানে না।

মোবাইলের অভাবে বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় প্রহেলির। প্রথম প্রথম মাঝেমধ্যে কথা হলেও এখন আর একেবারেই কথা হয় না। যে বান্ধবীদের ছাড়া এক মুহূর্ত চলতো না তারাই আজ কে কোথায় আছে কিছুই জানে না সে। লুকিয়ে যাও একবার মোবাইল হাতে পায় তখন কোনোরকম নাহিয়ানের সাথে কথা বলে নেয়। এরই মধ্যে নিচের তলার বাড়িওয়ালার মেয়ে ত্রয়ীর সাথে প্রহেলির বেশ ভাব জমে যায়। ত্রয়ী যদিও তার থেকে তিন বছরের ছোট। ত্রয়ীর সাথে বিকেলে ছাদে বসার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে মাঠের পাশ ধরে হেঁটে বেড়ায়। আজও রাস্তায় হাঁটছে দু’জনে। আরফা খাতুন যদিও বের হতে দিতে চাচ্ছিলেন না তবু অনেক কষ্টে বের হয়েছে। ঘরে বসে থাকতে থাকতে আর ভালো লাগে না তার। একমাস বাকি প্রহেলির এইচএসসি পরীক্ষার আর সে এভাবে বিকেলে হেঁটে গায়ে বাতাস লাগিয়ে বেড়াচ্ছে এটা তার মায়ের সহ্য হয় না। তার কথামতে, এখন সারাক্ষণ টেবিলের সাথে লেগে থাকতে হবে।

রাস্তার পাশ ধরে গাছের ছায়ায় হাঁটছে তারা। মাঠের মধ্যে ছেলেরা ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত৷ ছোট বড় অনেকেই খেলা দেখছে দাঁড়িয়ে। যেন কোনো ওয়ার্ল্ডকাপ চলছে। ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা মাঠের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করছিল। প্রহেলিকে চোখে পড়তেই খেলা ছেড়ে তার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকে। সে যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই ঘুরে দেখছে। লম্বা চুলগুলো দু’হাতে পেছনে ঠেলে দেয়। মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ে সম্পূর্ণ মুখে।

প্রহেলি চোখ ফেরায় অন্যদিকে। এই ছেলের এমন চাহনি তার ভালো ঠেকে না। কৌতুহল বশত সে ত্রয়ীকে জিজ্ঞেস করল, “ওই ছেলেটা কে রে?”

“কোন ছেলে?”

“ওই যে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা। যে প্রতিদিন বল মারে ছাদের উপর আবার নিতেও আসে।”

“ওহ! দিয়ান ভাইয়া? সে মাঠের ওই পাশের হোস্টেলে থাকে। এখানের সব ছেলেরাই স্কুল হোস্টেলের। দিয়ান ভাইয়া অনেক ভালো। ঢাকা থেকে এসেছে দুই বছর হলো। সেই লেভেলের ভালো ক্রিকেট খেলে। আর কী সুন্দর গান গায়। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে দিছে। আমার ক্রাশ সে। যদিও ভাইয়া মেয়েদের দিকে তেমন একটা ঘেঁষে না। শুনেছি আন্ডার নাইনটিনে ক্রিকেট খেলতে যাবে। সুযোগ হয়ে গেলে বাংলাদেশ দলের একজন ক্রিকেটার হয়ে যাবে ভাবতে পারো! ইশ যদি প্রেমটা হয়ে যেত তার সাথে।”

প্রহেলি আরেকবার তাকায় দিয়ানের দিকে। কেন জানি ছেলেটাকে তার অনেক পরিচিত মনে হয়। মনে হয় কোথায় যেন দেখেছে এই চেহারা। কিন্তু মেলাতে পারে না সে।

এইচএসসিতে এ+ পাওয়ায় প্রহেলির পরিবারের সবাই খুশি হয়ে যায়। এবার একটু ভালো করে পড়ে ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিলেই হয়ে যাবে। প্রহেলিও খুব করে চাচ্ছে নাহিয়ান যে ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেবে সেও সেটাতে যাতে চান্স পেয়ে যায়। ভাগ্যক্রমে ভালো রেজাল্ট করে একই চান্স পেয়ে যায় দু’জন।

চট্টগ্রাম থেকে আবারো ঢাকা ফিরে আসে তারা। প্রান্ত ঢাকায় ভালো একটা কোম্পানিতে চাকরি করে। আগে থেকেই সে এখানে থাকে। প্রথমে ঢাকায় তাদের নিতে নারাজ হলেও বাবার কথা অমান্য করতে পারে না। প্রহেলিকে ভর্তি করে দেয়। মায়ের উপর দায়িত্ব দেয় যাতে খেয়াল রাখে। প্রান্তের কাছে একটা মোবাইল চাইলে সে তাকে বলে দেয় যে কোনো মোবাইল দেওয়া হবে না। ভার্সিটি পড়ুয়া সে হয়তো প্রথম মেয়ে যার কোনো ব্যক্তিগত মোবাইল নেই। কিন্তু এই দুঃখটা ঘুচে যায় তার বাবার কারণে। শামসুল গাজী তাকে নতুন একটা ফোন কিনে দেন।

ফোন হাতে দিয়ে বলেন, “আমার লক্ষ্মী মামণিটাকে তার ভালো ফলাফলের উপহার দিলাম। আশা করি সে আমার বিশ্বাস ভাঙবে না।”

প্রহেলি কেবল মাথা ঝাঁকায়। কিন্তু মনে মনে ভয় পাচ্ছে। সে তার বাবার বিশ্বাস ঠিকই ভাঙতে চলেছে।

দিয়ান ওখানেরই একটা কলেজে ভর্তি হয়। প্রতিদিন মাঠে যায় প্রহেলির অপেক্ষা করে একবার হলেও ছাদে দেখতে পাবে কিন্তু দেখা আর পায় না। কিছুদিন অপেক্ষার পর ত্রয়ীকে একদিন রাস্তায় দেখতে পায়। দ্রুত তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ত্রয়ী, তোমার সাথে যে একটা মেয়ে প্রতিদিন ছাদে আসতো তাকে আজকাল দেখা যায় না কেন?”

ত্রয়ী প্রথমে খুশি হয় দিয়ান তার সাথে কথা বলতে এসেছে ভেবে কিন্তু পরক্ষণেই প্রহেলির কথা জিজ্ঞেস করাতে কিছুটা মন খারাপ হয়। মলিন মুখে বলল, “প্রহেলিকা আপুরা তো ঢাকা চলে গিয়েছেন। আপু ওখানে ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছেন তো তাই।”

“ওহ! আচ্ছা!”, বলেই দিয়ান চলে যায়।

সেদিনের পরেও প্রায়শই দিয়ান প্রহেলিদের বাড়ির সামনে আসতো কখনো যদি দেখা পেয়ে যায় এই ভেবে। কিন্তু প্রতিবারই তার আশায় পানি পড়ে যায়। তবু সে আশাহত হয় না। অপেক্ষায় থাকে একদিন নিশ্চয়ই দেখা হবে।

প্রথম দিন ভার্সিটিতে যাচ্ছে প্রহেলি। ভার্সিটিতে যাওয়ার খুশির চাইতে নাহিয়ানের সাথে দুই বছর পর দেখা হবে এটা ভেবেই খুশি আটকে রাখতে পারছে না সে। প্রিয় মানুষের সাথে এতদিন পর দেখা করতে যাবে কিছু একটা উপহার নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তার কাছে তো তেমন টাকা নেই। মাটির ব্যাংকে যাতায়াত খরচ আর টিফিনের টাকা থেকে কিছু করে জমিয়েছিল। গুনে দেখল সেখানে পাঁচশো পঁচিশ টাকা হয়েছে। এই টাকায় নাহিয়ানের জন্য কী উপহার কেনা যায় তাই ভেবে পায় না। অবশেষে ভাবলো একটা ভালো দেখে টি-শার্ট কেনা যাবে।

একটা সাদা টি-শার্ট কিনে মায়ের চোখের আড়ালে ব্যাগে ভরে নেয়। ভার্সিটিতে আসতেই দেখল নবীন বরণ অনুষ্ঠান চলছে। এত মানুষের ভীড়ে সে নাহিয়ানকে কোথায় খুঁজে পাবে! মোবাইলটা বের করে নাহিয়ানের নম্বরে কল দেয়। নাহিয়ান তাকে বটতলায় বসতে বলে। সে ওখানেই আসবে তার সাথে দেখা করতে। প্রহেলির চোখ জ্বলে যাচ্ছে ভালোবাসার মানুষটাকে দেখার জন্য।

দূর থেকে নাহিয়ানকে চিনতে খানিকটা সমস্যা হয় প্রহেলির। দুই বছরে মানুষ কতটা বদলে যায়৷ আগের থেকে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে সে। কাপড়-চোপড়ে এসেছে অনেক বড় পরিবর্তন। প্রহেলিকা একবার নিজের দিকে তাকায়। পরিবর্তন তো তার মাঝেও এসেছে। তবে অতিরিক্ত নয়। সাধারণ একটা থ্রিপিস পরেছে। হালকা মেকাপ করেছে। তবে চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে। নাহিয়ান কাছে আসতেই বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। ইচ্ছে করছিল তার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে। কিন্তু কেন জানি একটা লজ্জাবোধ হচ্ছে তার। বেশ দূরত্ব এসেছে তাদের মধ্যে। নাহিয়ান আগের থেকে অনেক লম্বা হয়ে গেছে। নিজেকে কেমন বেমানান লাগছে তার পাশে।

“তুমি তো খানিকটা মুটিয়ে গেছ প্রহেলি।”, নাহিয়ানের প্রথম কথা এটাই ছিল।

প্রহেলি মৃদু হেসে চোখ নিচে নামায়। কী বলবে ভেবে পায় না। নাহিয়ানই আবার বলল, “তবে তোমাকে এখন বেশি হট লাগছে।”

লজ্জায় মুখ খানিকটা আরক্ত হয় তার। সমস্ত দেহ কুঁচকে একটুখানি হয়ে আসে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি আগের থেকে বেশি সুন্দর হয়ে গেছ।”

শব্দ করে হেসে দেয় নাহিয়ান। প্রহেলির চেহারায় উজ্জ্বলতা বেড়েছে আগের থেকে। স্কুলের সেই মেয়েটা আর নেই। শরীরের এই খানিকটা পরিবর্তনে রূপ যেন উতলে পড়ছে। সাধারণ একটা ড্রেসেই তাকে অসাধারণ সুন্দর করে তুলেছে। আশেপাশের অনেক ছেলেই তার দিকে তাকাচ্ছে। আচমকা নাহিয়ান প্রহেলিকে জড়িয়ে ধরে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে থাকে। কেন জানি দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। এই বাহুডোরে নিজেকে রাখতে চাচ্ছে না। অস্বস্তি অনুভব করছে। নাহিয়ান তার অস্বস্তি কিছুটা বুঝতে পারে।

“স্যরি, এভাবে হুট করে জড়িয়ে ধরায় মাইন্ড করোনি তো? আসলে আগের অভ্যাসটা রয়ে গেছে। তোমাকে দেখে আর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। আর কখনো তুমি না চাইলে এমন করবো না।”

নাহিয়ানকে কথা শেষ করতে না দিয়ে প্রহেলি তাকে জড়িয়ে ধরে। চেনা মানুষটাকে কেন তার অচেনা লাগছে জানে না! কিন্তু সে চায় না এই অচেনা ভাবটা ধরে রাখতে। নিজেকে এভাবে গুটিয়ে নিলে সম্পর্কে আরো দূরত্ব আসতে পারে। এটা কোনোভাবেই হতে দিবে না। নাহিয়ান তাকে যেভাবে চায় সেভাবেই তার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করবে।

ভার্সিটিতে এসে তাদের প্রেম আরেক ধাপ এগিয়ে যায়। যা না হওয়ার তাও হতে শুরু করে। বটতলা তাদের প্রেমের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়৷ প্রহেলি কখনো বাঁধা দিতে পারে না তাকে। সে কল্পনাও করতে পারেনি তার জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে। কতটা চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে নাহিয়ানের কাজ তা ভেবে উঠতে পারেনি।

চলবে…
লিখা: বর্ণালি সোহানা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here