গোধূলী_আকাশ_লাজুক_লাজুক (পর্ব-১০) সিজন ২

#গোধূলী_আকাশ_লাজুক_লাজুক (পর্ব-১০)
সিজন ২
লেখক– ইনশিয়াহ্ ইসলাম।

২০.
মেহজা কোন জামাটা পরবে ভেবে পাচ্ছে না। কোনটা পরলে একটু বেশি ভালো লাগবে এই সেই নানান কথা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ কাবার্ডের এক কোণে পড়ে থাকা শপিং ব্যাগের দিকে চোখ গেল। তাতে আছে ইরার দেওয়া সেই গাউন! মেহজা ব্যাগটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসে। বিছানার উপর রেখে রুম থেকে বের হয়। ড্রয়িং রুমে ইরফান বসে আছে। টিভিতে খেলা চলছে, মনোযোগ দিয়ে সে খেলা দেখছে। বাংলাদেশ খেলছে না অবশ্য। অন্য কোনো দেশের টেস্ট ম্যাচ। মেহজা সোফার সামনের ছোট টেবিলের দিকে তাকায়। ইরফানকে সে ফ্রিজ থেকে আইসক্রীম বের করে দিয়েছিল সেই আইসক্রীমের বাটি টেবিলে পড়ে আছে। ইরফান এখনও ধরেও দেখেনি বোধ হয়। আইসক্রীমও গলে গেছে অনেকটা। ভেবেছিল আরো কিছু দিবে তবে আর কিছু নিতে গেলেই ইরফান বলে কিছু লাগবেনা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসার তাগিদ দেয় বরং। অগত্যা সে তৈরি হতে আসে কিন্তু পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় অপচয় করে। ইরফান বারবার ঘড়ি দেখছে। যেহেতু তার চার বোন আছে সে জানে মেয়েদের সাজতে কেমন সময় লাগে। তবুও সে আশা করছিল মেহজা কম সময় নিবে। টেবিল থেকে আইসক্রীম নিয়ে সে ধীরে ধীরে খাচ্ছে। মেহজা এবার দরজা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিল। তারপর গাউনটা পড়ে তৈরি হলো। চুলগুলো তার স্ট্রেইট করা তাই চুলে চিরুনী করেছে কেবল। কেননা এমনিতেই চুলগুলো সুন্দর লাগে তাই আর কোনো স্টাইল করা লাগেনা তার এই চুলে। টুকটাক প্রসাধনী মেখে সে যখন রুম থেকে বের হলো তখন দেখে ইরফান ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে পানি পান করছে। মেহজার মনে পড়ে কতবড় বোকামি করেছে! পানিটাই তো দিতে ভুলে গেছে সে। হিলের ঠক ঠক শব্দে ইরফান ও তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে তাকায়। এক পলক তাকিয়েই চোখ সরায়। গ্লাসটা রেখে স্বাভাবিক হয়ে বলে,
-‘তৈরি তো?’
-‘হুম।’
-‘আচ্ছা। তবে চাবি নিয়ে নাও আন্টি বলেছেন দরজা লক করে নিতে ভালোভাবে।’
-‘ঠিক আছে।’

চাবি নিয়ে সদর দরজায় লকটা করেই তারা দুজন লিফটে গিয়ে ওঠে। ইরফান চুপ করে আছে। তবে মেহজার কেমন কেমন লাগছে। লজ্জা লাগছে খুব বেশি। সে এখন চোখ তুলে যে একবার লোকটাকে দেখবে সেই সাহসও নেই। গাড়িতে ওঠার পরেও দুজন চুপচাপ ছিল। গাড়ি যখন মাঝপথে তখন ইরফান বলল,
-‘তুমি সবার সাথে কেন গেলে না?’
-‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’
-‘এত ঘুম কাতরে তুমি! ঘুম যাবে নিয়ম করে। অনিয়মের ঘুম ভালো না। রাতে কী সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকো।’

মেহজার ভীষণ কষ্ট হলো ইরফানের খোঁচা মারা কথা শুনে। সে মুখ বেজার করে বলল,
-‘না। আমার কোনো মোবাইল নেই।’
-‘কী বলছ! আজকালকার ছেলে মেয়েদের তো এইট থেকেই পার্সোনাল ফোন থাকে।’
-‘আমার নেই। পরিবার থেকে দেয়নি। আমারও দরকার পড়েনি। হয়তো সামনে দিবে।’
-‘তাহলে তোমার দিন কাটে কীভাবে?’
-‘আমার বই পড়ার অভ্যাস। সারাক্ষণ বই পড়ি।’
-‘কেমন বই পছন্দ তোমার?’
-‘উপন্যাস বেশি ভালো লাগে।’
-‘সেটাই ভালো লাগবে। উপন্যাসে শুধু প্রেম আর প্রেম! ভালো বই পড়বে। এই যেমন হডসনের ব’ন্দু’ক। বা অস্টিন ক্লেওন এর স্টিল লাইক এন আর্টিস্ট পড়বে। বা দ্যি মিরাকের মর্নিং পড়বে।’
-‘মিরাকেল মর্নিং ছাড়া বাকি দুইটা পড়েছি। ওইটা আমার সংগ্রহে নেই’
-‘আমার কাছে আছে। তুমি চাইলে নিতে পারো।’

এতক্ষণে লোকটার কথা মেহজার ভালো লাগল। এমন সুন্দর করে কথা বললেই তো হয়। সারাক্ষণ খোঁচা মারার কী দরকার! মেহজা বলল,
-‘আচ্ছা নিব তাহলে।’

কমিউনিটি সেন্টারে এসে দেখল এখন খাওয়া দাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ইরফানের মা টেনে নিয়ে গিয়ে ইরফান আর মেহজাকে খাবার টেবিলে বসায়। তারপর তিনিও বসেন। মেহজাকে বলল,
-‘এত দেরি করলে কেন মা! আমাদের বুঝি আপন লাগে না? তাই আমাদের অনুষ্ঠানে আসার জন্য তোমার এত গাফিলতি করতে হলো!’
-‘না না আন্টি। এমনটা নয়।’
ইরফান মুখের খাবার শেষ করে বলল,
-‘আপন পরের কী আছে! প্রসঙ্গ যখন ঘুমের তখন আর কিছুরই প্রয়োজন পড়েনা। কি বলো মেহজা? ঠিক তো!’

মেহজার রাগ উঠে গেল। এই লোক তো চরম অসহ্যকর। মেহজার মনে হলো খোঁচা দেওয়ার যদি কোনো প্রতিযোগিতা হয় উনি প্রথম হবেন। মেহজার মা এলো তখন। বলল,
-‘আমি তো তোকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি। এই গাউনে চেনা যাচ্ছিল না। আমি আরো ভাবলাম লাল সালোয়ার কামিজটা পরে আসবি। সেটাই নামিয়ে রেখেছিলাম বিছানায়।’
-‘ওটা এখন আর ভালো লাগেনা পরতে।’
-‘আগে তো যেখানেই যাওয়ার ছিল সেখানেই ওইটা পড়ার বায়না ধরতি। যাই হোক! ধীরে সুস্থে খা। চিংড়ীর প্রিপারেশনটা বেশ ভালো হয়েছে। কী বলেন ভাবি!’

শেষ কথাটা মাহিমা বেগমের উদ্দেশ্যে বলে তিনিও একটা চেয়ার টেনে বসলেন। মাহিমা বেগম বললেন,
-‘চিংড়ী আর কোথায় খেতে পারলাম! এলার্জির জন্য কেউ খেতে দিল না। সেটা ছিল এক কষ্ট এখন আপনি আবার মজে বলে কষ্ট করলেন ডবল।’

কথাটা শুনে মেহজা খিলখিল করে হেসে দিল। ইরফান শুধু তার দিকে সেসময় এক পলক তাকিয়েছিল।

২১.
ইকরার আর তার বরের ফটোগ্রাফি চলছে। তাই মেহজা তার কাছে আপাতত গেল না। তার দেখা হলো তনুশ্রীর সাথে। সে দেখেই বলল,

-‘বাহ! গাউনটা খুব সুন্দর তো। তোমাকে খুব মানিয়েছে।’
-‘ধন্যবাদ। তোমাকেও এই সুন্দর শাড়িতে ভীষণ ভালো লাগছে।’
-‘আমি জানি তো!’
তনুশ্রীর কথা বলার ধরনে মেহজা একগাল হাসে। তনুশ্রী বলল,
-‘তুমি আয়োজনটা দেখেছ? এলাহি কান্ড বুঝলে!’
-‘হুম দেখছি তো।’
-‘কচু দেখেছ। দোতলায় গেলে হা হয়ে থাকবে। লাইটিং যা চমৎকার হয়েছে! তুমি এত দেরি করলে কেন? আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। ভাবলাম সেখানে দুইটা ছবি তুলে দিবে আমার।’
-‘আচ্ছা চলো। এখন তুলে দিব।’

দোতালায় উঠে মেহজার চোখ বড় হয়ে গেল। আসলেই অপূর্ব সুন্দর ডেকোরেশন হয়েছে। অবশ্য এর কারণ একটু পর এখানে বর কনের ফটোসেশন হবে একটুপর। মেহজা তনুশ্রী বেশ কিছু ছবি তুলল। তখন তারা একটা সোফায় গিয়ে বসে। সেখানে এক মধ্যবয়স্ক লোক আগে থেকেই বসা ছিল। খুব চিন্তিত দেখা যাচ্ছে তাকে। তারা দুজন দুজনের মধ্যে কথা বলছিল। হঠাৎ করেই লোকটা তাদের দিকে তাকায়। তারপর বলে,
-‘তোমরা কী পক্ষ মা?’
প্রথম সাক্ষাতে আর প্রথম কথপকথনে কেউ মা বলে ডাকলে সূচনাটা মধুর হয়। তনুশ্রী বলল,
-‘মেয়ে পক্ষের আঙ্কেল।’
-‘আমি ছেলে পক্ষের আবার মেয়ে পক্ষের। এই নিয়ে এক ঝামেলায় পড়েছি বুঝলে!’
-‘তাই নাকি! দুই পক্ষের কীভাবে?’
-‘মেয়ের হই ফুপা আর ছেলের হই মামা।’
-‘বাহ! তো ঝামেলাটা কী?’
-‘এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হলো। লোকটাকে বলল আমি কোন পক্ষের। আমি বললাম ছেলে পক্ষ আবার বললাম মেয়ে পক্ষ। লোকটা কী ভাবল! আমি নাকি বিনা দাওয়াতের মেহমান। খেতে বসলাম কিছু অপরিচিত লোকের সাথে সবার সামনে বদমাইশ লোক বলে উঠল আমি নাকি বিনা দাওয়াতের এই সেই হেনতেন। আমাকে নাকি বের করে দেওয়া দরকার। কী একটা কান্ড বুঝলে! আশেপাশে আমি চেনা জানা কাউকে দেখতে পেলাম না। অসভ্য লোক গুলো একপ্রকার জোর জবরদস্তি করল টেবিল থেকে উঠতে। পরে আমার ছেলেকে কল করলাম। সে আসার পরই সবকয়টা চুপ। তারপর খাবার খেলাম। কিন্তু অপমান হলো খুব। এখন নিচে যেতেই পারছি না। লোকজন হাসছে। ব্যাপারটা ক্লিয়ার হলো। তবুও ওই যে আমার অপমান হলো খাবার পাতে সেই নিয়ে হাসছে। তখন থেকে বাথরুম পেয়েছে তবুও বসে আছি। এবার বোধ হয় পাজামা ভরিয়ে ফেলব।’
তনুশ্রী চোখ মুখ কুঁচকে ‘ইউউউ’ করে ওঠে। মেহজার লোকটার জন্য খারাপ লাগল। সে বলল,
-‘আপনি এই ছোট্ট ব্যাপারটা জন্য শরীরের ক্ষতি কেন করবেন? এইভাবে বসে থাকবেন না। চলুন আমি সাথে যাই। কেউ কিছু বললে একদম ঠুসসা মেরে দিব।’
-‘ঠুসসা কী?’
-‘একটা স্পেশাল মা’র। পরে বলব। আগে চলুন।’

অবশেষে লোকটার বাথরুম করা হলো। তার নাম করিমউল্লাহ মোরশেদ। লোকটার সাথে তনুশ্রী আর মেহজার ভাব হলো। তিনি তাদের তার বাসায় যাওয়ার জন্য বললেন। অতঃপর কিছুক্ষণ পর আবার চারিদিকে হাঁটাহাঁটি করতে থাকল। বাথরুম করার পর তার মনের সব সংকোচ দূর হলো বোধহয়।

মেহজা তনুশ্রীর থেকে এবার আলাদা হলো। ইরাদের সাথে দেখা না করলেই নয়! সে স্টেজের দিকে গেল। ইনায়া বলল,
-‘মেহজা! কী প্রিটি লাগছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আসো ছবি তুলব সবাই।’

ইরা বলল,
-‘আমি ভাবতেও পারিনি এত ভালো ভাবে গাউনটা স্যুট করবে। দারুন লাগছে।’
-‘ধন্যবাদ আপু।’

ইকরাও প্রশংসা করেছে। তবে ইমা বলল,
-‘বাসায় পড়ালেখা করছ তো?’
এই প্রশ্ন শুনে নতুন বর সহ সবাই হো হো করে হাসতে থাকে।

ছবি তোলার সময় ইনায়া ইরফানকে ডাক দিল। সে সামনেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল। ইনায়া তাকে নিয়ে দাঁড় করায় মেহজার সামনে। সবাইকে হাসতে বলা হলো মেহজা হাসল না। ইনায়া বলল,
-‘একটু হাসো তো। এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? আমরা আমরাই তো। নাকি ইয়াজের সামনে হাসতে লজ্জা লাগছে!’
এই কথা শুনে ইরফান মেহজার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। এতে লজ্জা পেয়ে মেহজা মাথা নুইয়ে ফেলে। ছবিটা সেভাবেই উঠল। ইরফান মেহজার দিকে তাকিয়ে আছে আর মেহজা লজ্জায় নতজানু হয়ে। এক সুন্দর মুহূর্ত।

আসার সময় করিমউল্লাহ কোথা থেকে ছুটে আসেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন,
-‘মেহজা মা! শোনো কথা, ওই বদমাইশ যেগুলো খাবার পাতে আমায় অপমান করেছে আসলে ওই বদমাইশ গুলো নিজেরাই বিনা দাওয়াতে খেতে এসেছে। পাছে আমি যদি তাদের ধরে ফেলি তাই আমাকে টেবিল থেকে সরিয়ে দিচ্ছিল সাথে অপমান ফ্রী। আর লোকজনের বাঁকা চাহনী যাতে আমার দিকেই থাকে সেই প্রচেষ্টা। কত বড় অস’ভ্যের দল! ভাবতে পারছ?’

#চলবে
(লেখাটা খারাপ হয়েছে নিজেরই ভালো লাগছেনা। চমকটা পরের পর্বের জন্য তোলা রইল।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here