টিপ_টিপ_বৃষ্টিতে_পর্ব ১১

#টিপ_টিপ_বৃষ্টিতে
#পর্ব_১১
লেখিকা #Sabihatul_Sabha

এক কোনে চুপটি মেরে বসে আছে বিথী। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিও আজ কাল ওর সাথে অভিমান করেছে সহজে আসতেই চায় না। হাত খুব জ্বালা করছে, মাথা প্রচন্ড ব্যাথায় অস্থির কিন্তু এই ব্যাথা থেকে যে মনের গভীরে যেই ব্যাথাটা ওটা বেশি পোড়াচ্ছে।

দুপুরে আকাশ বাসায় এসে ওর আম্মুকে বললো চা দিতে।
বিথীর শাশুড়ী ওর দিকে তাকিয়ে বললো,’ সারা দিন তো শুধু বসে বসে খাও। ছেলেটার একটু খেয়াল রাখতে পারো এই বয়সে এসে ও আমার শান্তি নেই। সারাদিন কাজ করতে হয়,নবাবের বেটি আনছে উনি পায়ের উপর পা তুলে খাবে।

বিথীঃ আম্মু আমি তো সারাদিন সব কাজ করলাম। আপনি তো শুধু…
আর কিছু বলার আগে ওর শাশুড়ী কান্নাকাটি শুরু করে বললো,’ আজ কাল তো তোমাকে কিছু বলাও জায় না। আমার মুখে মুখে যা আসে তাই বলে দাও।আমি তো এই বাসার কেউ না আমি চলে যাবো।
বিথীঃ আম্মু প্লিজ আপনি কান্না করবেন না।

বিথীর শাশুড়ী ন্যাকা কান্না করতে করতে নিজের রুমে চলে গেলো।

বিথী একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আকাশের জন্য চা বানাতে গেলো।

চা বানিয়ে আকাশের হাতে দিতেই আকাশ একটা সুন্দর হাসি দিলো।
আকাশের মুখে এমন হাসি দেখে বিথীর বুক কেঁপে উঠল। এই সুন্দর হাসির পেছনে যে কতো বড় ভয়ংকর প্লেন লুকিয়ে আছে তা বুঝতে আর বেশি সময় লাগলো না বিথীর।
আকাশ চা একটু মুখে দিয়ে বিথীকে এক হাতে কাছে টেনে নিলো। নিজের কোলে বসিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
বিথী ভয়ে কাঁপছে।
আকাশ বিথীর ভীতু মুখটা দেখে মুখে একটা ফোঁও দিয়ে হাতে হাত রাখলো। বিথীর হাতটা গরম চা’য়ের কাপে চেপে ধরলো।

ব্যাথায় বিথীর চোখ লাল হয়ে গেলো। গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পরছে। কিন্তু আকাশের তাতে কিছু যায় আসে না।সে বিথীর হাত এখনো চেপে ধরে আছে। বিথীর এই কান্না যেনো আকাশের দেখতে খুব শান্তি লাগছে। আর বাঁকা হাসি দিয়ে এখনো তাকিয়ে আছে।
বিথীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,’ এটা আমার মা’র মুখে মুখে তর্ক করার শাস্তি। অবশ্য শাস্তি কম হয়ে গেছে সামনে এমন করতে আর দেখলে এর থেকে বড় শাস্তি দেওয়া হবে।

বিথী পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। সামান্য একটা কথা বলায় আজ ওর এই অবস্থা!! প্রতি দিনের এত এত শাস্তি আর নিতে পারছে না সে। সে-ও তো একটা মানুষ,এখন আর নিজেকে মানুষ মনে হয় না রোবট মনে হয়।

আকাশ চা’য়ের কাপ শুদ্ধ বিথীকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়৷ কাপ ভেঙে বিথীর হাত অনেকটা কেটে যায়।

আকাশ সে দিকে তাকিয়ে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিথীকে বলে উঠলো দ্বিতীয় ভুল হলো ” আমার চা’য়ে পরিমাণ মতো চিনি পরে নি।” তাই আজ তোমার খাবার বন্ধ। বলে বাহির দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো।

দীর্ঘ ৬ঘন্টা ধরে ঠিক একি ভাবে বসে আছে বিথী চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। হাতের রক্ত শুকিয়ে গেছে। শরীর খুব দুর্বল লাগছে। মাথাও কেমন ঝিমঝিম করছে। এই বদ্ধ ঘরে ওকে দেখার মতো কেউ নেই। আজ নিজের একটা ভুলের জন্য মা-বাবা থেকেও নেই।সে সিদ্ধান্ত নেয় সে এই নরকে আর থাকবে না। প্রতি দিন এত অত্যাচার সে আর নিতে পারছে না,সে নিজেকে শেষ করে দিবে। এত অবহেলা, অত্যাচার,ঘৃনা নিয়ে সে আর এই বেইমান,বিশ্বাসঘাতকে ঘেরা পৃথিবীতে থাকতে চায় না। মা-বাবার কতো আদরের মেয়ে ছিলো সে। মা বাবার চোখের মনি ছিলো আর আজ তারা ওর দিকে তাকায় পর্যন্ত না। হয়তো এমন মেয়ের দিকে তাকাতে ঘৃনা হয়। সে আজ কেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে নিজেকে শেষ করে দিবে।

*****

মৌ মাথা নিচু করে বসে আছে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে। ওর সামনে গালে হাত দিয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে আছে দীপ্তি। আজ যে বাসায় কি হবে আল্লাহ ভালো যানে।

একটু পর দীপ্ত বাসায় এসে বাসার অবস্থা সবার মুখ দেখে বুঝে গেছে বাসায় কিছু একটা হয়েছে।

দীপ্ত ওর আম্মুর পাশে গিয়ে বসলো।
ওর আম্মু সোফায় চুপচাপ বসে আছেন।
দীপ্তঃ কিছু কি হয়েছে আম্মু..?

দীপ্তর আম্মু নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,’ শুননা দীপ্ত, আমি না একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি..
দীপ্তঃ আম্মু তুমি কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নাও না। আর শুধু একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছো এটা নিয়ে এতো আপসেট হওয়ার কি আছে।
~ আগে শুনবি তো…
দীপ্তঃ বলো..?
~ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি মৌ কে আমাদের বাসায় সারা জীবনের জন্য রেখে দিবো।
দীপ্ত মনে মনে খুব খুশি এতে ওর নিজেরি লাভ।
দীপ্তঃ খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছো।
~ আমাদের সাফিনের সাথে ওকে খুব মানাবে।
দীপ্তঃ ক…কি বলছো তুমি। হঠাৎ এমনটা মনে হওয়ার মানে বুঝলাম না। কেনো দেশে কি আর কোনো মেয়ে নেই নাকি ওকেই কেনো..? আর তোমার যদি ভাইয়ার জন্য মেয়ে লাগলে আমাকে বলো হাজার হাজার মেয়ে এনে দিবো।

~ আগে শুনবি তো, আজকে ওর চাচ্চু এসে ছিলো ওকে নিতে। যখন আমি বাঁধা দিলাম আমাকে যা নয় তা বলে দিলো। আমার কি হয় ও..? আমি কোন অধিকারে ওকে এখানে রাখছি..? আরো অনেক কিছু।
মৌ ভয়ে কান্না করছিলো।
আমি তখন ওর চাচ্চুকে বলেছি মৌ আমার ছেলের হবু বউ তিন দিনের মধ্যে আমার ছেলের বউ করে নিবো।
তখন উনি বললো,’ তিন দিন পর আমি পুলিশ নিয়ে আসবো। আপনারা ওকে কিভাবে আঁটকে রাখেন দেখবো।

~ আমি এখন চাচ্ছি সাফিনকে যেভাবেই হোক বাসায় আনতে। মৌ খুব ভালো আর লক্ষি মেয়ে।

দীপ্ত কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেলো।

****

অথৈ বসে বসে গেমস খেলছে এমন সময় ওর মোবাইলে অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো।

অথৈঃ হ্যালো…
……..
অথৈঃ কে বলছেন..?

~ কেমন আছো..?

অথৈ আর বুঝতে বাকি নেই ওপাশের লোকটি কে..?
অথৈঃ আপনার সমস্যা কি..? এই নিয়ে কয়টা নাম্বার আমি ব্লক করেছি আপনার। যে পুরুষের লজ্জা নেই আমি তাদের একদম পছন্দ করি না।পুরুষ মানুষ এতো বেহায়া হয় কিভাবে..? আর একবার কল দিলে আমি সিম চেঞ্জ করে নিবো।

~ ওফ্ফ তুমি তো পুড়াই আজকে জ্বাল মরিচ হয়ে আছো। শুনো জ্বাল মরিচ তুমি যাই বলো আর যাই করো না কেনো। আমি তোমার পিছু ছারছি না। আর তুমি এখন আমার সাথে দেখা করবে না হলে আমি তোমার বাসায় চলে আসছি।

অথৈঃ আপনি কি পাগল..?
~ হুম আমি পাগল শুধু তোমার।
অথৈঃ ফালতু কথা বন্ধ করুন।
~ এত ফালতু কথা শুনেও তো তুমি পটে যাও না। আর কি করলে তোমার মন জয় করতে পারবো..?
অথৈঃ আপনি আমাকে আর কল দিয়ে ডিস্টার্ব না করলে আমি আপনার নামটা আমার মনে লিখে নিবো।
~ ঠিক আছে আর কল দিবো না নিচে আসো। আমি দাঁড়িয়ে আছি।
অথৈঃ কিইইই!!
~ হুম তুমি যদি পাঁচ মিনিটে না আসো। তাহলে আমি তোমার কাছে চলে আসছি।
অথৈঃ আপনাককে তো আমি…
~কি জড়িয়ে ধরবে। ওকে নিচে আসো আমি না হয় আমার জ্বাল মরিচের ইচ্ছেটা হালকা করে পূরণ করে দিবো।
অথৈঃ থুর। বলে কল কেটে দিলো।
লজ্জায় দু-হাতে মুখ ডেকে নিলো। না চাইতেও যে এই ছেলের পাগলামোর প্রেমে একটু একটু করে পরে যাচ্ছে।

*****

শুভ নিচে এসে দেখে ঐশী সোফায় গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে।

শুভ ঐশীর সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। ঐশীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেঁসে দিলো। কত কিউট লাগছে ঐশীকে।মুখের উপরে কিছু চুল পরে আছে। যার জন্য ঐশীর ঘুমে সমস্যা হচ্ছে।
শুভ হাত বাড়িয়ে ঐশীর চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে দিলো। ঐশীকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো।

দরজার সামনে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে তাকিয়ে আছে আদিত্য।
আদিত্য নিজে ঐশীর কাছে আসতে নিয়ে ছিলো তার আগেই শুভ চলে আসে। সে ভেবেছিলো শুভ গেলে ও ঐশীকে নিজের রুমে রেখে আসবে। কিন্তু এখন ওর খুব খুব খুব বেশি রাগ হচ্ছে শুভর উপর। শুধু বড় ভাই বলে কিছু বলতে পারলো না ছোটো হলে এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দিতো ওর জিনিসে হাত দেওয়ার জন্য। কিন্তু ভাই ঐশীকে ওর রুমে না নিয়ে নিজের রুমে নিলো কেনো..? ভাই কে আমি চিনি উনি খারাপ কিছু করার ছেলে নয় তবুও ছেলে মানুষ কখন কি করে ফেলে নিজেও জানেনা। আদিত্যর ভেতরে ছটফট শুরু হয়ে গেলো।

শুভ ঐশীকে নিয়ে সুন্দর করে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিলো। ঐশীর মায়াবী মুখটার দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে আজ ওর কাছে ঐশীকে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দরী নারী মনে হচ্ছে। তার বউ পৃথিবীর সব থেকে বেশি সুন্দরী নারী। ঐশীর মুখের উপর ঝুঁকতেই ওর হার্টবিট স্বাভাবিক থেকে অস্বাভাবিক ভাবে বিট করা শুরু করলো।বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো। সে ঐশীর কপালে ছোট্ট করে একটা চুম্বন একে দিলো। ঐশীর গালের মাঝখানে একটা তিল আছে যেটা ওর সৌন্দর্য ফুটে বাড়িয়ে দেয়। শুভ আবারও সেই তিলটায় কিস করতে যাবে তখনি বাহিরে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ হলো।
শুভ পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকাতেই কি যেনো একটা ছায়া সরে গেলো।

চলবে…..

ভুলত্রুটি মার্জনীয়.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here