Wednesday, June 17, 2026
Home "ধারাবাহিক গল্প তোমায় ঘিরে তোমায় ঘিরে শারমিন আঁচল নিপা পর্ব-৪

তোমায় ঘিরে শারমিন আঁচল নিপা পর্ব-৪

তোমায় ঘিরে
শারমিন আঁচল নিপা
পর্ব-৪

কারণ একটা বাচ্চা মেয়ে হাতে ফুল নিয়ে গাড়ির গ্লাসে চড় কষাচ্ছে। ধরীতা ঘুমটা মৃদু করে মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকাল। গাড়ির গ্লাসটা খুলে বলল

“কী চাই?”

“ফুল নিবেন?”

“আমার ফুলের দরকার নেই। যাও তো তুমি।”

“আপা ভাইয়ারে কন আপনারে কিনে দিতে। এতে ভালোবাসা বাড়ে।”

“আরে এই মেয়ে কী বলে কে তোমার ভাইয়া? আর কিসের ভালোবাসা?”

পাশে বসে অধরা মুচকি মুচকি হাসছে ধরীতার কথা শুনে। আর সিয়াম তাদের কথোপকথন বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

ধরীতার কথা শুনে মেয়েটা একটু হেসে বলল

“ভাইয়ার সাথে রাগ করছেন বুঝি? দাঁড়ান ভাইয়ারে বলি একটা ফুল কিনে দিতে। তাহলে রাগ ভাইঙা যাইব। এই বলে মেয়েটা সামনের জানালায় গিয়ে সিয়ামকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল

” ভাইয়া আপারে একটা ফুল কিনে দেন তাহলে আপার রাগ ভেইঙা যাইব।”

সিয়াম হতবাক কণ্ঠে বলতে লাগল

“আরে কী বলছো মেয়ে উনি তোমার আপা না। ফুল সব কিনে নিচ্ছি সমস্যা নেই। তবে এমন বলো না।”

মেয়েটা এবার আরেকটু হাসলো। নাছোরবান্দা মেয়ে সম্পর্কের মানে বুঝে না বা সম্পর্কের বুনন শৈলী জানতেও চায় না। হাসিটা প্রশস্ত করে বলল

“আপনিও আপার সাথে রাগ করছেন? এ ফুলগুলা দিয়া সব রাগ মিটাইয়া নেন।”

পাশ থেকে ধরীতা কড়া গলায় বলে উঠল

“এই মেয়ে তুমি ভারি বেয়াদব তো। কখন থেকে কী বলছো এসব। কানের নীচে একটা মারব বলে দিলাম।”

সিয়াম ধরীতার কথা শুনে ধরীতাকে থামিয়ে দিল হাতের ইশারায়। তারপর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল

“এত কথা বলতে হবে না। দাও সবগুলো ফুল। আর কত হয়েছে বলো।”

মেয়েটা হাতে গুনে হিসাব করে বলল

“দুইশত ছাপ্পান্ন টাকা ভাইয়া। আপনি দুইশত পঞ্চাশ টাকা দিন।”

সিয়াম ফুলগুলো নিয়ে মেয়েটার দিকে পাঁচশত টাকার নোট দিয়ে বলল

“তোমাকে ফেরত দিতে হবে না।’

মেয়েটা চকচকে পাঁচশ টাকার নোট হাতে পেয়ে দৌঁড়ে যেতে নিল। সিয়াম এদিকে ধরীতাকে উদ্দেশ্য করে বলল

” কারও সাথে এরকম আচরণ করবেন না। বাচ্চা মেয়ে মনে যা এসেছে বলেছে। ওর টার্গেট ফুল বিক্রি করা তাই এতসব কথা বলছিল। তার সাথে এভাবে কথা বলা আপনার উচিত হয়নি। মেয়েটা এতগুলো কথা পেটের দায়ে বলেছে। সে তো আর জানে না আপনার আর আমার মধ্যে সম্পর্ক কী। আন্দাজে সম্পর্কের বিস্তার বুনে কথাগুলো বলেছে। তার অবস্থায় থাকলে বুঝতেন জীবনের বাস্তবতা কত কঠিন।”

ধরীতা আর কিছু বলল না। কেন জানি না আজকাল তার মেজাজ বেশ রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। চাইলেও সে কিছু করতে পারে না। নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা যেন তার হাতে নেই। এ রাগ কীভাবে কমবে তার জানা নেই। সে চুপ হয়ে বসে রইল। সিয়াম এদিকে অধরার দিকে ফুলগুলো বাড়িয়ে দিয়ে বলল

“এই যে এগুলো আপনার জন্য। আপনার তো আজকে ব্রেক আপ হয়েছে। মন খারাপ। আশা করি ফুলগুলো পেয়ে একটু হলেও মন ভালো হবে।”

অধরা সিয়ামের কথা শুনে বড়ো চোখে তাকাল। কাঁপা হাতে সিয়ামের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে নীচের দিকে তাকাল। এতই লজ্জা পাচ্ছে যে সিয়ামকে ধন্যবাদ বলার কথাও সে ভুলে গেছে। এদিকে সিয়ামের কান্ড দেখে ধরীতা সিয়ামের দিকে আড় চোখে তাকাল। কেন জানি না বিষয়টা তাকে একটু হলেও আঘাত করেছে। কেন আঘাত করেছে জানে না সে। তার কাছে মনে হচ্ছে সিয়াম অধরাকে ফুল গুলো দিয়ে তাকে অপমান করেছে পরোক্ষভাবে। তবুও সে চুপ রইল। মনে মনে ছক কষতে লাগল সিয়ামকে কীভাবে এতগুলো অপমানের জবাব দেওয়া যায়। গাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাম এখনও ছাড়েনি। বেশ খারাপ লাগছে তার। মাথাটাও ব্যথা করছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা চলতে শুরু করল। কিছুদূর গাড়িটা এগুনোর পর কিছু মানুষের ভিড় দেখতে পেল রাস্তায়। সিয়াম, ধরীতা আর অধরা বুঝতে পারছে না মানুষ রাস্তায় এত ঝঁটলা পাকিয়ে আছে কেন! তারা তিনজনেই গাড়ি থেকে নামল। সিয়াম ভীড় এড়িয়ে ভেতরে গিয়ে থমকে গেল। বাচ্চা মেয়েটা পড়ে আছে রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায়। পাশেই সিয়ামের দেওয়া পাঁচশত টাকার নোট। সিয়ামের মাথা ভনভন করে ঘুরছে। যে হারে রক্ত পড়ছে মেয়েটার মাথা থেকে এ মুহুর্তে মেয়েটাকে হাসপাতালে না নিয়ে গেলে মেয়েটা মারা যাবে। সিয়াম দ্রূত মেয়েটাকে কোলে নিল। ধরীতা সিয়ামের কোলে সেই মেয়েটাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল। একটু সময়ের ব্যবধানে মানুষের জীবনে কত কিছু ঘটে যায় সেটাই ভাবতে লাগল সে। ক্ষণিকের ব্যবধানে কেবল জীবনের গতির মোড় বদলে যায়। সিয়াম ধরীতা আর অধরাকে বলল মেয়েটাকে ধরে বসতে। তারা দুজন মেয়েটারকে ধরে আছে। মেয়েটা ছটফট করছে। মাথাটা ধরীতা অধরার পরা উড়না দিয়ে বেঁধে দিল যাতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। সিয়াম দ্রূত গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালের পথে রওনা দিল।

প্রায় আধাঘন্টা পর গাড়িটা নিকটস্থ একটা হাসপাতালে পৌঁছাল। সিয়াম মেয়েটাকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখে জানাল মেয়েটার অবস্থা ভালো না। রক্ত লাগতে পারে। মেয়েটার ব্লাড গ্রূপ তাদের জানা আছে কি’না। সিয়াম জানাল মেয়েটার ব্লাড গ্রূপ জানা নেই। ডাক্তার আর কথা বাড়াল না। দ্রূত চিকিৎসা করতে লাগল। এক পর্যায়ে এসে জানাল ‘ও’ পজেটিভ ব্লাড লাগবে। মেয়েটার ব্লাড গ্রূপ ‘ও’ পজেটিভ। সিয়াম হতবাক হয়ে জানাল তার ব্লাড গ্রূপ বি পজেটিভ। ধরীতা পাশ থেকে বলে উঠল

” আমার ব্লাড গ্রূপ ‘ও’ পজেটিভ। আপনারা আমার থেকে ব্লাড নিন। ”

ডাক্তার কথাটা শুনে ধরীতাকে নিয়ে গেল। ব্লাড চেক আপ করে ধরীতার থেকে ব্লাড নিয়ে মেয়েটাকে দিল। প্রায় তিন ঘন্টা সময় পর মেয়েটার জ্ঞান ফিরল। জ্ঞান ফেরার পর মেয়েটা তাকিয়ে দেখল সিয়াম পাশে বসা। ধরীতাও তার সাথে বসা। কথা বলতে মেয়েটার বেশ কষ্ট হলেও একটু জোর খাটিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল

“আমি এখন বাসায় যাইতে পারুম ভাইয়া?”

সিয়াম হালকা হেসে বলল

“তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। আচ্ছা তোমার নাম কী?”

“আমার নাম রাণী।”

“বাসায় কে আছে তোমার? আর বাসা কোথায়?”

মেয়েটা চোখটা বন্ধ করে আস্তে গলায় জবাব দিল

“বস্তিতে বাসা। মা ছাড়া কেউ নাই। আমার চিকিৎসার খরচ কেডা দিব। আমার মা তো কিছু করে না। ফুল বেঁইচা যা পাই তাই খাই। এত টাকা মা কই পাইব।”

মেয়েটার কথা শুনে ধরীতার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। এত কঠিন সময়েও এসে মেয়েটা তার চিকিৎসার খরচ নিয়ে ভাবছে। মানুষ কতটা অসহায় হলে এরকম সময়ে এমন চিন্তা করে সেটাই ভাবছে সে। বয়সটা বেশ কাঁচা মেয়েটার। অথচ এ মেয়েটায় সংসারের হাল ধরেছে। সত্যিই সে রাণী কোনো মায়ের রাণী। অর্থহীন রাণী। যে রাণীর টাকা নেই তবে এক রাশ বাস্তবতাকে ঘিরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন আছে। ধরীতা কাঁদতে কাঁদতে কোমল কণ্ঠে বলল

“রাণী তোমার চিকিৎসার দায়িত্ব আমার। তোমার বস্তির ঠিকানা দাও আমরা তোমার মাকে নিয়ে আসব। এখানে যত টাকা লাগে আমি বহন করব।”

ধরীতার কোমল কণ্ঠ শুনে সিয়াম চমকে তাকাল। তার চোখের জল দেখে সিয়াম কিছুটা বিস্মিত হলো। এত রুড মানুষটার কোমল ছবিটা তার চক্ষুগোচর হওয়া মাত্রই যেন বুকের ভেতর কী যেন বয়ে গেল। জানে না সেটা কী। তবে কিছু অনুভূতির তীব্র আবছাব আলপনা হয়েছে সেটা বুঝতে পারছে। অধরাও অবাক। ধরীতা সহজে কাঁদে না। অনেক দিন পর তার চোখে জল দেখে অধরাও ধরীতাকে বিস্ময় নিয়ে অবলোকন করছে।

এর মধ্যেই নার্স এসে একটি সংবাদ দিল। যা শুনে সবাই ভয় পেয়ে গেল।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here