মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৬)

#মেঘের_বন্ধু_বৃষ্টি (৬)

একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল। প্রজ্জোল এখনো সেই হসপিটালেই। সৃষ্টিকর্তার রহমতে এখন অনেক টাই সুস্থ। আওয়ানের খুব রাগ হয়েছিলো সেদিন। তবে সকলের বাঁধা তে রওনাকের চৌদ্দ মাইলে ও যাওয়া হয় নি তাঁর। অন্যদিকে সব কিছুর জন্য নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছে তিয়াশা। ওর ধারণা প্রজ্জোল যদি ওর বন্ধু না হতো তা হলে রওনাক এমন টা করতো না। সেই দুঃখে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। প্রজ্জোল কে নিয়ে আসার জন্য ই তৈরি হচ্ছে আওয়ান। হালকা নীল রঙের শার্টে সেজে উঠে আওয়ানের সুঠাম দেহ। আয়নায় তাকিয়ে নিজের ই হার্ট মিস হলো কয়েক বার। এই সময়ে মধুপ্রিয়ার কাছাকাছি গেলে নিশ্চয়ই পুরো দমে মন দিয়ে বসবে মধু।
জিমামের সাথে বাইক নিয়ে ছুটে চলেছে হসপিটালের পথে। তবে পথিমধ্যেই ঘটলো আরেক বিপত্তি। কি যেন হয়েছে মধুপ্রিয়ার। সমান তালে কেঁদে যাচ্ছে। আওয়ান কি বলবে ঠাওর করতে পারছে না। পরিশেষে ঠিক করলো মধুপ্রিয়ার কাছে যাবে। জিজাম কে হেলমেট দিয়ে বলল
” বিকালে দেখা হচ্ছে তবে। এখন আমাকে যেতেই হবে দোস্ত। ”

” আরে ধ্যাত কি যে বলিস না। সমস্যা নেই কোনো। তুই যা, দেখ কি হলো। ”

” হুম। ”

” তবে বিকেলে আসবি কিন্তু। ”

” বললাম ই তো আসবো। নিশ্চয়ই আসবো আমি।”

ডানে বামে তাকিয়ে রাস্তা পার হয়ে এলো। হাতের ঘড়ি টার দিকে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সময় স্থির হয়ে গেছে। প্রচন্ড চিন্তা হলো এবার। মধুর কিছু হলো কি না সেই ভয়।

অডিটোরিয়াম টা ফাঁকা। বাইরে থেকে হালকা হালকা আলো এসে ঢুকছে। সেই আলো তে পরিবেশ টা আরো অদ্ভুতুড়ে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বহু দিন পর আলোর সঞ্চালন ঘটেছে এই স্থানে। দ্বার খুলে কয়েক বার ডাকলো মধুর নাম ধরে। তবে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না।বিরক্তি আর রাগ নিয়ে বের হতে যেতেই নুপুরের ঝমঝমে আওয়াজ শ্রবণ হলো। ফট করেই পেছনে তাকালো সে। কোথাও কিছু নেই। দুই ভ্রু তে উঠা নামা শুরু হয়েছে। মনের অন্তঃপুরে বাজে ধারণা রা লুটপাত চালাচ্ছে।
বেশি কিছু কল্পনার আগেই আলোকবর্তিকা দৃশ্যবান হলো। সাথে কোনো রূপসী নারীর অবয়ব। একটু একটু করে আলোবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে আসছে মধুপ্রিয়া। আওয়ান ভাষাহীন হয়ে থেকে নিজ মন কে শাসন করলো কয়েক বার। তবে চোখ যেন সরছেই না। মধুর অধরে স্মিত হাসি। সে বলল
” আমি তোমাকে পছন্দ করি আওয়ান। ”

নিজ কান কে বিশ্বাস হচ্ছে না। মধু নিজ থেকে প্রপোজ করবে যা ছিলো কল্পনার অতীত। মেয়েটি হাঁটু গেড়ে বসে আছে। কত গুলো চমকিত দৃষ্টি অপেক্ষা করছে উত্তরের আশায়। তবে তৎক্ষনাৎ উত্তর না দিয়ে কন্ঠে ঝাল মিলিয়ে বলল
” উচিত করো নি মধু। আমি টেনশনে ছিলাম। তুমি কি ধোঁকা দিলে তবে? ”

” খুব খুব স্যরি। আমি সত্যিই এতো ভেবে কাজ করি নি।প্লিজ মাফ করে দাও।”

মাফ করলো আওয়ান। হালকা হাতে আলিঙ্গন করলো মেয়ে টি কে। আওয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো মধুপ্রিয়া। এই সুন্দর মুহূর্তের জন্য কতো দিন যাবত অপেক্ষায় ছিলো। আজ সেটা পরিপূর্ণতা পেল।

প্রজ্জোল কে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে আওয়ান আসে নি। ফোন টা ও সুইচ অফ। জীবনে এই প্রথম বার আওয়ানের প্রতি ক্ষিপ্ত হলো জিমাম। বহু বছর আগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বুঝিয়েছিলো আওয়ান। সেদিন থেকেই জিমামের লাইফের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশে আবদ্ধ হয়েছে আওয়ান। তবে আজ কি না সেই বন্ধুত্বের সংজ্ঞা ভুলে গেছে নিজেই। মানুষ বুঝি ক্ষনিকে পরিবর্তন হয়?

লিভিং রুম থেকে হাসির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। অনেক দিন পর বন্ধুরা সমাবেশ করেছে। সেই আনন্দে ছোট খাটো পার্টির আয়োজন ও হলো। ফোন রেখে সকলের সাথে যোগ দিলো জিমাম। ওর মন টা বার বার ই অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। তিয়াশা সে টা লক্ষ্য করে বলল
” এই জিমাম কি হয়েছে রে তোর? সেই কখন থেকে দেখছি জোড় করে হাসার চেষ্টা করছিস। কোনো সমস্যা? ”

” কই না তো। সব ঠিক ই আছে। আসলে বহু দিন পর আড্ডা দিচ্ছি সকলের সাথে তাই কেমন যেন আড়ষ্টতা কাজ করছে। ”

” আচ্ছা সবাই আছে আওয়ান কোথায়? ”

” কি যেন দরকারি কাজে আটকে গেছে রে। এতো প্ল্যান করে নিজেই আসতে পারলো না। ”

অর্ধ সত্য বলেই প্রসঙ্গ বদল করলো জিমাম। শাম্মির হাত ধরে আছে প্রজ্জোল। জমজ হওয়ার দরুন জীবনে ভালোবাসা কম হয়েছে, বরং মারামারি হয়েছে বেশি। তবে এবার যেন দুজনের মন গলেই জল হয়ে গেল। ভাই বোনের অনন্য ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। সত্যি বলতে আমরা প্রিয় মানুষ দের আঘাত করতে পারি তবে অন্য কেউ আঘাত করলে সহ্য করতে পারি না।

*

সেদিনের পর তিন টে দিন চলে গেল। আজকাল তো ভারসিটি তে ও আসছে না আওয়ান। সারাক্ষণ মেতে থাকে মধু প্রিয়ার সহিত। নতুন প্রেমে পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। সময় কেঁটে যায় চোখের পলকেই। সুষমা অধুনা আগের মতো সন্তান দের প্রতি খেয়াল রাখছেন না।সব সময় উদ্বিগ্ন থাকেন। না হলে টানা তিন দিন ভারসিটি না যেয়ে থাকতে পারতো না আওয়ান। আরুশির পড়া শোনা তে ও ঢিল হয়েছে। ভারসিটি গুলো তে একের পর এক পরীক্ষা দিয়ে চলেছে তবে ভাগ্য সহায় নেই। পাবলিক ভারসিটি তে চান্স হচ্ছে না। যা ও হচ্ছে তাও মনের মতো বিষয় পাচ্ছে না। সেই নিয়ে মনে মনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি ও হয়েছে। সকলের মাঝে হাসি খুশি থাকলে ও রাতের মধ্য ভাগে বাথরুমের ট্যাপ ছেড়ে কান্না করে। কখনো বা হাত পা কামড়ে ধরে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে কি না!
আরুশির লিখে দেওয়া লেটার গুলো মনে ধরেছে মধুপ্রিয়ার। সেই কারনে আবার বোনের শরনাপন্ন হলো। দরজার কাছে এসে ঠক ঠক আওয়াজ করলো। ভেতর থেকে রেসপন্স নেই। আবার নক করলো আওয়ান তবে আরুশির সাড়া শব্দ নেই। গুটি পায়ে বেডের কাছে এসে নোট প্যাড রেখে বলল
” বনু আরেক টা লেটার লিখে দিবি প্লিজ। প্রমিস ক্যাম্পাসের স্পেশাল ফুচকা ট্রিট দিবো। ”

একটু থেমে আবার বলল
” দেখ পাঁচশো টাকা ও দিবো। প্লিজ বোন লিখে দে না। ”

আরুশির সাড়া নেই। এবার মেয়েটির গাঁয়ে ঠেলা দিলো আওয়ান। তবে যা দেখলো এতে করে বুকের ভেতর ছ্যত করে উঠলো। মুখ দিয়ে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। হাত থেকে কলম পরে গেল। কোনো দিকে না তাকিয়ে আরুশি কে কোলে তুলে নিয়ে ছুট লাগালো। ওর মস্তিষ্ক কি বুঝেছে জানা নেই তবে ওর মন বলছে হসপিটালে যেতে হবে। না হলে প্রিয় বোন কে হারিয়ে ফেলবে।

হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে প্রবেশ করেই আরুশির গালে চড় মা’রলেন সুষমা। রাগে শরীর কাঁপছে ওনার। কল্পনা ও করতে পারে নি ওনার মেয়ে বি’ষ খাবে। ঘৃনা হচ্ছে খুব। ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার দরুন নানা রকমের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। জীবনের উপাংশ নিয়ে রচনা করেছেন নানান বই। আজ সেই মায়ের মেয়ে হয়ে এমন ঘৃনিত কাজ!
” আমার গর্ভের সন্তান না তুই। ”

” আম্মি প্লিজ থাক না এখন। ”

” চুপ একদম চুপ। আশকারা পেয়ে লাটে উঠে গেছে। না হলে এমন কাজ করতে পারতো না। ”

” ডাক্তার স্ট্রেস নিতে বারন করেছেন। তুমি না হয় পরে বকা দিও।অসুস্থ শরীর নিয়ে এমনি তেই চ’ড় খেল। আর বলো না প্লিজ। ”

আরুশি কে কিছু কথা বলার জন্য উদ্বৃত্ত হয়েছিলেন তিনি তবে ছেলের কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। এলোমেলো লাগছে সব। আজ এতো গুলো বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে তোলা সাহস টুকু ভেঙে গুরিয়ে গেছে। মন টা কেমন কু গাওয়া শুরু করেছে। যদি সময় মতো হসপিটালে না নিয়ে আসা হতো তাহলে আরুশি কে হারিয়ে ফেলতেন তিনি। এই বিভর্ষ চিন্তা গুলো মাথায় আসতেই চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হলো। তবে জীবনের এক পর্যায়ে এসে মানুষ কাঁদতে পারে না। এদের কাঁদতে দেওয়া হয় না। মনোকষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য হলে ও শক্ত থাকতে হয়। যেই সময় টা গত দশ বছর যাবত পাড় করে চলেছেন তিনি।

আরুশির খবর শুনে হসপিটালে এসেছে তিয়াশা। যদি ও বা আওয়ানের সাথে মনোমালিন্য চলছে তার। তবে আরুশির খবর পেয়ে না এসে পারে নি। করিডোরে দেখা হলে ও পাশ মারিয়ে চলে গেল তিয়া। হৃদয়ে জমায়েত কষ্ট খানি অন্তঃস্থলেই পিষে বেরিয়ে এলো আওয়ান। ভালো লাগছে না কিছুই। সকালের ঘটনা মনে পরলেই শরীরের প্রতি লোমকূপে শীতল স্রোত নেমে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর সমস্ত টাই আঁধারে নিমজ্জিত।

নত জানু হয়ে আরুশি উত্তর করলো
” আমি ডিপ্রেশনে চলে গেছিলাম আপু। বিগত দিন গুলো তে এতো পড়াশোনা করে ও কোনো পাবলিক ভারসিটি তে চান্স হলো না। যা ও হয়েছিলো পছন্দ মতো বিষয় পাই নি আমি।এতো এতো টেনশন মিলিয়ে আমি আর পারছিলাম না। সেই কারনেই ঔষধ —

ডুকরে কেঁদে উঠলো আরুশি। খোলা চুল গুলো রাবার ব্যান্ড দিয়ে বেঁধে দিলো তিয়া। আপাততো এই বিষয়ে আর ঘাটাবে না বলে স্থির করেছে। জীবনে মানুষ শুধু শুধু আ’ত্মহননের পথ বেছে নেয় না। এর পেছনে উপযুক্ত কারন না থাকলে ও কিছু কারন অবশ্যই থাকে।

#ফাতেমা_তুজ
#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here