রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী পর্বঃ৬১

রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
পর্বঃ৬১
#Saiyara_Hossain_Kayanat

ছেলেদের না-কি কান্না করতে নেই! কেন এই নিয়ম তৈরি করেছে সমাজ রৌদ্র তা জানে না। কিন্তু কেন যেন এই মুহূর্তে রৌদ্রর ইচ্ছে করছে সমাজের তৈরি এই নিয়ম ভেঙে চুরমার করে দিতে। হ্যাঁ তাই হলো। ভেঙে দিলো সমাজের নিয়ম। ছেলেরাও কাঁদে। ছেলেরাও ভেঙে পড়ে। তারাও একটা সময় পরিস্থিতির কাছে অসহায় হয়ে পরে। কাছের মানুষগুলোকে হারানো ভয়ে বুকের ভেতর অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। চোখে থেকে গড়িয়ে পরলো কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রুজল। এই কান্নার কোনো শব্দ নেই। নিশ্চুপ কান্না। রৌদ্র তার কাঁপা কাঁপা হাতে আরশির ডান হাতটা চেপে ধরলো। তার কম্পিত ওষ্ঠদ্বয় আরশির হাতে আলতো ছুঁয়ে দিল। হাতের উপর মাথা ঠেকিয়ে নিঃশব্দে চোখেরজল ফেলছে। সবার সামনে নিজেকে শক্ত রাখতে পারলেও এখন পারছে না। কোনো মতেই নিজেকে সামলিয়ে নিতে পারছে না সে। একটু পর পর রৌদ্র বড় বড় শ্বাস নিয়ে কিছুটা কেঁপে উঠছে। আরশির জ্ঞান ফিরছে। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকিয়েছে। আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিলো। সব কিছু বুঝে উঠতে দু-এক মিনিট সময় লেগেছে। হঠাৎ করেই আরশি আবিষ্কার করলো সে তার ডান হাত নাড়াতে পারছে না৷ মাথা খানিকটা উঁচু করে ডান দিকে ফিরে তাকালো। রৌদ্রর অগোছালো চুল দেখতে পাচ্ছে। পিঠ অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। আরশি রৌদ্রর মাথায় বাম হাত রাখলো। আরশির হাতের ছোঁয়া পেয়ে রৌদ্র ঝট করে মাথা তুলে তাকালো। আরশি ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে আছে। রৌদ্র উত্তেজিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। আরশির গালে,কপালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে অস্থিরতার সাথে বলতে লাগল-

“আরু তুমি ঠিক আছো তো? এখনো কি মাথা ঘুরাচ্ছে? খারাপ লাগছে তোমার! কি হলো চুপ করে আছো কেন? আমার কথার উত্তর দাও আরু। কিছু তো বলো।”

আরশি রৌদ্র দিকে মিনিটখানেক সময় স্থির চোখে চেয়ে থাকলো। মুহুর্তেই গাল ভর্তি হাসির রেখা টেনে নিয়ে বলল-

“ডাক্তার বাবু আপনি এতো উত্তেজিত হয়ে পরলে আপনার রোগীর কি হবে!”

রৌদ্র ভ্রু কুচকালো। সরু চোখে আরশির দিকে চেয়ে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। আবারও চেয়ারে বসে পরলো রৌদ্র। গম্ভীর গলায় আরশিকে বলল-

“আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আপনি মজা করছেন মিসেস আরু!”

আরশি হাসি থামিয়ে গোমড়া মুখে বলল-

“আপনি শুধু শুধু রেগে যাচ্ছেন কেন রোদ?”

“কবে থেকে দূর্বলতা অনুভব করছেন আপনি?”

আরশির প্রশ্নের জবাবে পালটা প্রশ্ন করলো রৌদ্র। আরশি ছোট্ট করে উত্তর দিল-

“বেশি না অল্প কিছুদিন ধরে।”

“আমাকে আগে বলেন নি কেন?”

রৌদ্র কড়া গলার প্রশ্নে আরশি কোনো প্রতিত্তোর দিলো না। চুপ করে আছে। অপরাধবোধ কাজ করছে মনে। রৌদ্র তার গাম্ভীর্যপূর্ণ চাহনিতে আরশির দিকে চেয়ে বলল-

“এতো বড় মেয়ে হয়েছেন। সরি মেয়ে বললে ভুল হবে। কিছুদিন পরই তো মা হতে চলেছেন। অথচ এখনো মিনিমাম কমন সেন্স বলতে কিছু নেই আপনার এত্তো বড় একটা মাথায়। আপনার মনে রাখা উচিত এখন আপনি একা নন। আপনার মাঝেই তুলতুল বেড়ে উঠছে। কীভাবে নিজেকে আর এই অনাগত বাচ্চাটাকে সুস্থ রাখা যায় তার খেয়াল রাখতে হবে। অথচ আপনি সবসময় বেপরোয়া ভাব নিয়ে থাকেন। প্রেগ্ন্যাসির সময় অসুস্থতা, দূর্বলতা, মাথা ঘুরানো এসব বিষয় সামান্য ব্যাপার মনে করে অবহেলা করলে যে কত বড় অঘটন ঘটাতে পারে তার কোনো ধারনা আপনার মধ্যে আছে? আপনাকে কতবার বলেছি আপনার খারাপ লাগলে আপনি সাথে সাথেই আমাকে বলবেন! কোনো কিছুর দরকার হলে আমাকে জানাবেন। আমার সাথে শেয়ার করবেন সব কিছু। কিন্তু নাহ আপনি তো আমার কোনো কথাই রাখলেন না। নিজের মর্জি মতো চলে বেড়ান সব সময়। দেখলেন তো আপনার এমন বেখেয়ালির জন্য আজ কি হলো? ধ্রুব পাশে না থাকলে কি হতো! যেখানে সাখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতেন। তুলতুলের কি হতো ভেবেছেন?”

আরশির উঠে বসলো। তীক্ষ্ণতার সাথে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল-

“আর কতো বকবেন রোদ? একটু থামুন এবার। আপনার গলাটাকে একটু বিশ্রাম দিন। বেচারা কথা বলতে বলতে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পরেছে। বেশি না অল্প কিছুক্ষণের জন্য শান্ত হোন। একটু পর না হয় আবার বকবেন।”

রৌদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেবিনের বাহিরে যাওয়ার জন্য হাঁটা শুরু করলো। কেবিনের দরজা খোলার আগেই আরশি অবেগী কন্ঠে রৌদ্রকে ডাক দিলো-

“রোদ!”

রৌদ্র নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পেছন ফিরে আরশির দিকে তাকালো। আরশি তার মায়াবী চোখে রৌদ্রর দিকে চেয়ে আছে। যে চোখের মাঝে এক সমুদ্র ভালোবাসা বিদ্যমান। রৌদ্র এই চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রাগ করে থাকতে পারলো না। বিস্ময়ের গলায় জিজ্ঞেস করল-

“কিছু বলবে আরু!”

আরশি লাজুক হেসে মিহি কন্ঠে বলল-

“ভালোবাসি রোদ।”

রৌদ্র অপলকভাবে আরশিকে দেখছে। সে কোনো মতেই এই মেয়েটাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। একদিনও থাকা সম্ভব হবে না এই মেয়েটাকে ছাড়া। আরশির লাজ্জা, অস্থিরতা, মুচকি হাসি এসব না দেখে থাকা তার পক্ষে মৃত্যুর সমান। এই মেয়েটা তার অর্ধাঙ্গিনী নায় বরং সম্পূর্ণাঙ্গিনী। এই মেয়েটার মাঝেই তো তার প্রানভ্রমর আটকে আছে। রৌদ্র আরশির দিকে চেয়ে হাল্কা হেসে কেবিন থেকে থমথমে পায়ে বেরিয়ে গেল। কেবিনের বাহিরেই দাঁড়িয়ে আছে কতোগুলো বিষন্ন ভগ্নহৃদয়ের মানুষ। কারও মুখে কোনো কথা নেই, আছে শুধু উদাসীনতা আর ভয়। খুব কাছের কাউকে হারিয়ে ফেলার ভয়। কিন্তু রৌদ্রর মাঝে আছে তার ভালোবাসার মানুষ, অনাগত সন্তান আর ছোট ভাই সমতুল্য ধ্রুবকে হারিয়ে ফেলার তীব্র আশংকা। এই তিন তিনটে মানুষের অনিশ্চিত জীবনের কষ্টের ভার নিয়ে সে কিভাবে থাকবে? রৌদ্র চুপচাপ গম্ভীর পায়ে রিসিপশনের দিকে চলে গেল। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি তাকে। হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করার মতো ভাষা তাদের নাই। বাকরুদ্ধ হয়ে আছে সবাই। আরশিকে কয়েকঘন্টার মধ্যেই বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। নীল ওরা সবাই আরশির সামনে স্বাভাবিকভাবেই থাকার চেষ্টা করছে। আরশি যতক্ষণ সামনে থাকে ততক্ষণ নিজেদের হাসিখুশি ভাবেই উপস্থাপন করেছে। আরশি এখন নিজেদের ফ্ল্যাটের সোফায় বসে আছে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীল আর আদ্রাফ। পাশে বসে আছে নীলা। রৌদ্র, নির্বান আর ধ্রুব এখানে নেই। তারা হয়তো খাবারের ব্যবস্থা করতে গেছে। আরশির বাবা-মা কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। কিছুটা সময় পর নিরবতা ভেঙে আরশি অসহায় কন্ঠে বললো-

“সরি রে। আমার জন্য তোদেরকে এত কষ্ট করতে হচ্ছে। তোদের নতুন বিয়ে হয়েছে আর তার মধ্যে আমি ঝামেলা পাকিয়ে ফেললাম।”

নীল রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আরশির দিকে। চোয়ালে শক্ত করে কঠিন গলায় বলল-

“শোন আশু সব সময় বেশি পাকনা পাকনা কথা বলবি না বলে দিচ্ছি। আমরা কি কেউ বলেছি আমাদের কষ্ট হচ্ছে? আর আমাদের বিয়েতে ঝামেলা পাকিয়েছিস মানে কি! আমাদের বিয়ে হয়েছে একদিন বা দুদিনের জন্য না। সারাজীবন একসাথেই থাকবো সেখানে একদিন একসাথে সময় না কাটালে তেমন কোনো বড় ঝামেলা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। আগে তোর স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে হবে। তুই অসুস্থ হয়েছিস এটা দেখে নিশ্চয়ই পাষণ্ড মানুষের মতো ঢেং ঢেং করে বউ নিয়ে ঘুরে বেড়াবো না!”

আরশি চুপসে গেল। গাল ফুলিয়ে মলিন কন্ঠে বলল-

“আজ একটু অসুস্থ হয়েছি বলে তোরা সবাই একের পর এক এভাবে বকাবকি করেই যাচ্ছিস আমাকে। কোথায় একটু সেবা করবি তা না উল্টো লেকচার দিয়ে দিয়ে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিস।”

“ওহহহ তাই না-কি!! আয় তাহলে তোকে কোলে নিয়ে আদর করি।”

আদ্রাফ দাঁতে দাঁত চেপে কথা গুলো বলল। আরশি ভ্রু কুচকে ক্ষীণ গলায় বলল-

“যত্তসব হারামির দল।”

নীলা এবার প্রচন্ডরকম বিরক্ত হয়ে মুখ খুললো-

“এই তোরা চুপ কর তো। সব সময় কি তোদের ঝগড়া না করলে ভালো লাগে না না-কি!! অসহ্যকর।”

সবাই চুপ হয়ে গেল। যে যার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে আর বসে আছে। রৌদ্র আর নির্বান এসে পরেছে। ধ্রুবকে দেখাতে না পেয়ে আরশি সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“ধ্রুব কোথায়? ও তো আপনাদের সাথেই ছিলো।”

“আন্টির কিছু জরুরি কাজ ছিলো তাই তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়েছে ধ্রুবকে।”

রৌদ্র স্বাভাবিকভাবেই আরশির প্রশ্নের উত্তর দিল। আরশি আর তেমন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। রৌদ্র একপ্রকার জোর করেই ধ্রুবকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে। ধ্রুবর অবস্থাও তেমন ভালো দেখাচ্ছিলো না। তাই রৌদ্র কড়া গলায় বলে দিয়েছে বাসায় যেয়ে বিশ্রাম করার জন্য। ধ্রুব বাধ্য ছেলের মতোই রৌদ্রর কথা মেনেছে।

—————————

সময় নিজের মতোই যেতে থাকে। দিনের পর দিন পেরুতে থাকে। এখন আরশির প্রেগন্যান্সির আটমাস চলছে। রৌদ্র এখন দিনের বেশির ভাগ সময় আরশির খেয়াল রেখেই কাটিয়ে দিচ্ছে। নীল, ধ্রুব ওরা সবাই প্রতিদিনই আরশির সাথে সময় কাটিয়ে যাচ্ছে। তবুও সব কিছুর মাঝে কেমন যেন একধরনের চাপা কষ্টের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে। এই কষ্ট কারও সামনে প্রকাশ করা যায় না। আর না কারও সাথে শেয়ার করে কমানো যায়। মনের মধ্যেই গুনে পোকার মতো কুড়ে কুড়ে খায়। আরশির মা চেয়েছিলেন আরশিকে তাদের বাসায় নিয়ে যেতে। কিন্তু আরশি আর রৌদ্র কেউ রাজি হয়নি। আরশির প্রায় পেইন হয়। মাথা ঘুরায়। তবে কিছুক্ষনের মধ্যেই আবার ঠিক হয়ে যায়। সময়ের সাথে সাথে যেন রৌদ্রর মনে ভয়েরা এসে কড়া নাড়তে শুরু করেছে। রৌদ্র আরশিকে এখনো কিছু বলেনি। সব কিছু সে নিজের মধ্যেই রেখে দিয়েছে। সারাদিন আরশির সাথে স্বাভাবিক ভাবেই থাকে কিন্তু রাত হলেই সব ভয়, আশংকা, বিষন্নতা চারপাশ থেকে রৌদ্রকে আঁকড়ে ধরে। সারারাত আরশির দিকে তাকিয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়। বুকের মধ্যে তীব্র অসহ্য ব্যথা আর হাহাকার অনুভব করে আরশির ঘুমন্ত দেখলেই। এই কদিনে রৌদ্রর মাঝে অনেক অবনতি ঘটেছে। স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে আগের থেকে খুবই অবনতি হয়েছে। চোখের নিচে কালি পরেছে। শরীর কেমন যেন বর্ণহীন ফেকাসে হয়ে গেছে। রৌদ্র তাকিয়ে আছে তার পাশে শুয়ে থাকা রুদ্রাণীর দিকে। আরশি নিশ্চিন্তমনেই ঘুমিয়ে আছে।

———————

আরশির পেইন হচ্ছে। অসহ্য ব্যথায় বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। আরশির গোঙানির শব্দে রৌদ্র আসলো। আরশিকে এই অবস্থায় দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে রৌদ্র। পাগলের মতো করছে। দ্রুত আরশিকে পাঁজকোলে নিয়ে বেরিয়ে পরলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে। চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে দুজনের। একজন ব্যথায় কাতরাচ্ছে আরেকজন ভালোবাসা হারিয়ে ভয়ে নিঃশব্দে অশ্রু ফেলছে।

চলবে…

[অনেকেই ভাবছে আমি আরশিকে মেরে তার হার্ট ধ্রুবকে দিয়ে দিবো। ভাইরে ভাই এমন সাংঘাতিক চিন্তা ভাবনা আমি কখনো করি নাই।😑 আমি এতটা নির্দয়া না। যাইহোক ধন্যবাদ আর ভালোবাসা সবাইকে।❤️❤️]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here